পাণ্ডুলিপি থেকে : ক্রুশকাঠে জেগে থাকা যিশু

এক-নদী জল

এক-নদী জল বর্ষা আসার আগে, গাছে গাছে দ্যাখো বসন্ত বাঁধে ঘর, হাজার ফুলের মৌসুমি অনুরাগে প্রেমিকেরা শেখে কোকিলের অক্ষর। কোকিল কী জানে?—বিরহী আলিঙ্গন। আর জানে ঠিক মন নয় সহজিয়া, পদাবলি লেখে রাধিকা-ব্যাকুল মন সুরে সুরে গায় ‘ভ্রমর কইও গিয়া’। ভ্রমর কী বলে?—যমুনা-উতল ভাষা। কী কথা শোনায় শহুরে পাখির কানে? ‘বসন্ত জেনো রঙের জোয়ারে ভাসা।’ বিচ্ছেদ তবু রাধারমণের গানে। এক-নদী জল বর্ষা আসার আগে বর্ষা নেমেছে, যমুনা যে থইথই, সব বসন্তে তোমাকে সুদূর লাগে, এই বসন্ত?—হারাবার গল্পই!

তিস্তা

এত যে নদী—তোমার আমার ব্যক্তিগত, এত যে খাদ উজানভাটি—বৃষ্টিহত, এত যে ঝড়, চণ্ড হাওয়া—ভয়ংকরী, তারই মধ্যে দু-এক পাতা অঙ্ক করি। একটুখানি যোগবিয়োগ আর গুণ ও ভাগ, বালির মধ্যে ঘুমন্ত সব ঝিনুক-দাগ। ভগ্নাংশের এপার-ওপার শুকনো চড়া। বাতাস বাউল। মৃত নদীর গন্ধ ওড়া। অঙ্ক মেলে। শেষ বিকেলে শূন্য থাকে। উড়িয়ে দেই খেয়াঘাটের শূন্যতাকে। চুক্তিবিহীন অঙ্কটা কি এতই সরল? তোমার আমার তিস্তা জুড়ে নেই কোনো জল? তোমার আমার তিস্তা জুড়ে নেই কোনো জল! নেই কোনো জল, নেই কোনো জল, নেই কোনো জল...

যাত্রা

রাত্রি যখন জেগে ওঠে সন্ধ্যায়, ভিড়গুলো ছোটে নির্জনতার বাড়ি, পাখিদের মন নিভুনিভু তন্দ্রায়, খেয়াঘাটে থামে ঢেউগুলো সারিসারি। তখন গাছেরা কথা বলে চুপিচুপি, জানালার ফাঁকে দীর্ঘ শ্বাসের হাওয়া— ফিরে চলে স্মৃতি অদেখা ভবিষ্যতে, ভাঙা পাল, তবু সমুদ্রে নাও বাওয়া! তখন এ-পথে কেউ নেই। শুধু জানি, ঝরা পাতা ওড়ে। অশ্রু ত গান্ধার। তারাটির সাথে তারাটির কানাকানি। ডুবুডুবু নাও, সম্মুখে আন্ধার। থই থই জল। ডুবে গেছে বাতিঘর। পাটাতন কাঁপে। ঢেউ ভারি গম্ভীর। কিনারার পথে যাবে যে পরস্পর— মাড়িয়ে যাবে না জলার্ত কুম্ভীর? ডুবুডুবু নাও, ধসে গেছে ছায়াপথ, উজানে দ্যাখোরে মেঘেদের ডম্বর, ‘বাইয়া যাও মাঝি, অন্তর বাইয়া যাও।’ মেঘেরা ঢাকুক অনন্ত অম্বর। রাত্রি যখন জেগে ওঠে সন্ধ্যায়, আঁকড়ে ধরো কি খড়কুটো তৃণদল? সামাল সামাল মন বুঝি ডুবে যায়! আর কিছু নেই। মনটাই সম্বল।

কুঁড়েঘর

কুঁড়েঘরে নামা কালো রাত্রিতে মনে হলো আজ, আমরা কখনো কবিতা পড়ি নি বাতাসের ঝড়ে, জড়িয়ে ধরি নি দু’জনের দেহ ভয়ানক শীতে, আমরা কেবল দেখেছি নীরব ঠান্ডা দহন। অথবা দেখি নি চোখে নেচে ওঠা রোদের আবির, পালক-গাঁথানো পাখির আদর—আঙুলে ও নখে, পাতা-ঝরা গান পাথরের মতো বেজেছে অধীর আমাদের বুকে। আমরা কখনো কবিতা পড়ি নি অতি দূর গ্রহে শোক দূরে ঠেলে, যা-কিছু মধুর রঙিন অসুখ থাকে মানুষের বুকে আর প্রেমে আমাদের কাছে আসে নি সেসব বাতাসে ওড়ানো পালকের মতো...

নো এক্সিট

রাস্তা জুড়ে তোমার চুলের গন্ধ ভাসে, এই বাতাসে নামল যখন তুমুল তুফান, তোমার কাঁধে হাত রেখেছে বসন্ত-রাত, উড়ছে ধুলো, ধূসর ব্যথা, দু-এক পাতা রবীন্দ্রনাথ পড়তে পড়তে মেঘের ডালে ফুল ফুটেছে গহিন কুসুম, পাপড়ি জ্বালে অনেক আগুন, অনেক পোড়া ধূপের গন্ধ, আমার কিন্তু নো এক্সিট, দরজা বন্ধ,                 জানালা বন্ধ...

চুমু

অর্ধেক চুমু খেয়ে ছুড়ে ফেলেছ তুমি, বাকি অর্ধেক কুড়িয়ে নিয়েছি আমি। এখনও যেখানে ছাতিম-গন্ধ ফোটে, তোমার উচ্ছিষ্ট হাতে আমি সেই চৌরাস্তায় থামি। সে-পথে অন্ধকার, প্রাগৈতিহাসের ধুলো, হরিৎ অরণ্য থেকে পাতা খসে যায়। একটি পাতার হৃদয় খুলে পড়ি, সে-অরণ্য পুড়ে গেছে চুম্বনতৃষায়।

পথ

আমার ডান পাশে বুদ্ধ বাম পাশে চাঁদ, সামনে ধু-ধু পথ। শেষ স্টেশনে নামব বলে গাড়িতে উঠেছি, গাড়ি যাচ্ছে, অথবা যাচ্ছে না... আমার ডান পাশে অন্ধকার বাম পাশে আলো। পথ জুড়ে ছেয়ে আছে বুদ্ধের হাসি। মায়াবী। কালো।

ফানা

কী বিস্ময়! তোমার উত্থানমুখ, তোমার বিলয়। ব্যথার রক্তিম ফুল, অন্তিম শ্বাস, বীজের ভেতর থেকে একা একা জেগে ওঠা গাছ। শেকড়ে নিহিত জল, মৃত্তিকা-রাখি, ধীরে ধীরে ছড়াল পাতা, শাখার শিয়রে এসে সুর দিল পাখি, সেই সুরে সূর্যস্তব, মুখরিত দিন; তোমার উত্থান, তবু তুমিই বিলীন!

ক্রুশকাঠ

গির্জার স্তব্ধতা নিয়ে চলে যাচ্ছ তুমি। মোম জ্বেলে জেগে আছেন যিশু। পেছনে হাজার রাত, দগ্ধ মরুভূমি। বৃশ্চিক-দংশন শেষে আমি তবু স্বপ্নের পিছু।

শ্যামনৌকা

আষাঢ়িয়া মেঘ। জল থই থই। শ্যামের নৌকা ভাসে। একাকিনী রাধা, রাত্রির সই যমুনায় নেমে আসে। বৃষ্টির ছাট। ভিজে ওঠা ছই। কৃষ্ণের তল্লাসে, কফিনের মতো যৌবন ওই পাটাতন জুড়ে হাসে। সে হাসিতে ভাঙে নাওয়ের গলুই, বৈঠার উল্লাসে। কফিন-শরীর—প্রাণ ছুঁই-ছুঁই, শ্যামনৌকায় ভাসে। আষাঢ়িয়া মেঘ। জল থই-থই...

প্রব্রজ্যা

শোনো মাঝরাত, শোনো নীল রাত, আহা, টাপুরটুপুর বৃষ্টি। তার গম্ভীর কালো ভঙ্গির নীল ফণায় নেচেছে সৃষ্টি। আহা বৃষ্টি কালো বৃষ্টি। দ্যাখো ছুটেছে মাতাল জঙ্গি। এই শয্যায় তার কব্জায় আজ আসমান সাতরঙ্গী। শোনো মাঝরাত, শোনো বিষ-রাত আহা, ছোবলে কাঁপাও শয্যা। দেহকাণ্ডের মধুভাণ্ডের কাছে চেয়েছ কি প্রব্রজ্যা?

বাড়ি

অনেক অনেক দিন বাড়ি যাই না। মনে হয় ত্বক ফুঁড়ে শেকড় গজিয়ে গেছে। তারপর হঠাৎ একদিন বাড়ি যাই। রাস্তার পাশে কুয়াশাভোর। কফিনের ডালা খুলে কখন যেন উঠে আসে ইউক্যালিপটাসের ঘ্রাণ। মৃত নর্তকীর মতো কোমল বিষাদ। অনেক অনেক দিন বাড়ি যাই না। যেতে যেতে ফিরে আসি। ধূপগন্ধ রাত্রির কফিন। কিছু ফুল। মাঠের সবুজে কাঁপে সন্ধ্যার অতল। মনে হয় ত্বক ফুঁড়ে শেকড় গজিয়ে গেছে। ডানার ভেতরে শুধু অন্ধকার, অন্ধকার...
সুমন সাজ্জাদ

সুমন সাজ্জাদ

জন্ম ৮ মে ১৯৮০। স্নাতক, স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।...বিস্তারিত