প্রথম বিচার
এক মহান সুউচ্চ গ্রন্থবিপণিবিতানের দোতলা। বারান্দার নিকটস্থ প্রান্তে বসিয়া বাক্যালাপমগ্ন তিন কবি। হস্তে ধৃত ধূম্রশলাকা। তাঁহাদের দৃষ্টি ও বাক্য-ধ্বনিতে যারপরনাই বিরক্তি; বিবমিষা থাকিলে থাকিতে পারে, কহিতে পারি না।
কাব্য বাবাঠাকুর : ব্যাটা কবিতা লেখে!
আকাশ নন্দন : কে?
কাব্য বাবাঠাকুর : ওই তো যাইতাছে!
আকাশ নন্দন : অ! ঐশ্বর্য অগ্নি? অর তো বই বাইর হইছে এইবার মেলায়— মেঘ গেল পশ্চিমে...তারপর কি জানি বইটার নাম...?
কাব্য বাবাঠাকুর : মেঘ গেল পশ্চিমে, সুন্দরের তাবিজ।
পবিত্র মহাপ্রভু : কবিতা বোঝে! কবিতা নিয়া মিনিমাম সেন্স আছে ওর?
আকাশ নন্দন : বুঝবো ক্যামনে! বইটই কিছু পড়ে? কবিতার কমনসেন্স থাকলে কি আর সীমান্ত শরাফতের কবিতানামক রদ্দি মালগুলা ছাপে! একটা বাঁশ দেওন দরকার।
কাব্য বাবাঠাকুর : আমি অরে কবি মনে করি না। কবি হইতে হইলে মেধা দরকার, মনন দরকার। চিন্তার স্বচ্ছতা দরকার। ওর একটাও নাই।
অক্ষর প্রকাশনী
আকাশ নন্দন : ছাপলেই কি আর কবি হওন যায়! এর থিকা আমার একটা কবিতা শোন...
কাব্য বাবাঠাকুর : নতুন?
আকাশ নন্দন : নতুন মানে, বাংলা কবিতায় নতুন। এক্কেবারে আনকোরা। লালন ফকিররে এইখানে ডিকনস্ট্রাক্ট করছি। মডার্ন ম্যানদের সঙ্গে মিলায়া দিছি। কবিতার নাম ‘সাঁই’। শুনিস মনোযোগ দিয়া...
সাঁই আমারে নিয়া যাও, আমারে ডাক দিয়া নিয়া যাও, চৌদিকে পিচ্ছিল দুনিয়াদারি, মধুম্রক্ষণ, সংহিত অন্ধকার রজনীবিভূতি, আমারে নিয়া যাও মুসার লাঠি, চাঁদ সদাগরের দেশে, আউলবাউল কৃষকের অন্নের ভিতরে সুগন্ধি লঙ্কাকাণ্ড, কিন্তু তুমি আমার বুকে দিলা বিষের ভাণ্ড; কচি লাউ ধইরাছে মাটির গাছে সাঁই গো, তুমি ডাক দেও...
কাব্য বাবাঠাকুর : অসাধারণ! চমৎকার, অসাম! এক কাজ কর ধ্রুপদী সম্রাট ভাইয়ের এবং পদ্যঘণ্টাতে ছাপাইতে দে।
পবিত্র মহাপ্রভু : হ, ছাপতে দে। দারুণ একটা মিথিক ওয়ার্ল্ড তৈরি করছস। সাঁই, মুসা, চাঁদ সদাগর সব মিথরে তুই একখানে করছস। এই কম্বিনেশনটা ভালো।
কাব্য বাবাঠাকুর : নাগরিক যন্ত্রণা থাইকা একটা মুক্তির কথা যে তুই মিথের মধ্যে দিয়া এইভাবে বলতেছিস, এইটা একটা পোস্টমডার্ন ব্যাপার। এই ধারার কবিতার তো এইটাই কৌশল। লেখাটা বেশ সিগনিফিকেন্ট।
আকাশ নন্দন : তোর ‘চাকু’ কবিতাটা কিন্তু অদ্ভূত ইমাজিনেশনে ভরা। সিম্বলগুলো অন্যরকম তাৎপর্য ক্যারি করে।
কাব্য বাবাঠাকুর : চাকু?—
অন্ত্যরীক্ষে, শূন্যে শূন্যে ভাসমান মহান চাক্কু; যে আমাকে বিদ্ধ করে, খুঁজে নেয় দুঃখহলুদসময় কাঠিন্য-ক্রীতদাস, পুঞ্জপুঞ্জ, হাড়িকাঠসম, তথা সমুদয় স্নেহউষ্ণীষে। কেবলই বন্ধুর বাড়িতে নাচে প্রেমের ঈগল।
•আচ্ছা, তোমরা আমার বইটা পড়েছো•
আকাশ নন্দন : চাইর লাইনের মইধ্যে একটা এপিক টেস্ট আছে। বলা যায়, বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের সামিল। এজরা পাউন্ডের ছোট কবিতাগুলারে মনে করায়া দেয়।
পবিত্র মহাপ্রভু : আমার আবার মনে পড়তেছে ওমর খইয়ামরে। রুবাইগুলা কি চমৎকার। চাইর লাইনে দর্শনের ছড়াছড়ি।
কাব্য বাবাঠাকুর : আমাদের এগুলারে ইউজ করতে হইবো। পোস্টমডার্ন দুনিয়া সেন্টার ভাইঙ্গা দিছে। এখন প্রান্ত থাইকা মার্জিনাল পিপল, মার্জিনাল ওয়ার্ল্ড থাইকা সব নিতে হবে। থিংস ফল এপার্ট, সেন্টার ক্যান নট বিল হোল্ড...
আকাশ নন্দন : বুদ্ধদেব-জীবনানন্দদের খেল খতম। শামসুর রাহমান আল মাহমুদদের আর দরকার নাই। সুনীল-শক্তি-শঙ্খ-জয়রা কি ঘোড়ার আণ্ডা লিখছে! এখন দরকার পোস্টমডার্ন, পোস্ট কলোনিয়াল কবিতা।
পবিত্র মহাপ্রভু : আর তোর পোস্টমডার্ন! অগ্নি তো দেখি এই দিকেই আসতেছে।
আকাশ নন্দন : আরে অগ্নি ভাই, ক্যামন আছেন? দৈনিক তেলেসমাতিতে আপনার চাইরটা কবিতা পড়লাম।
ঐশ্বর্য অগ্নি : চারটা না, তিনটা। ভালো তো তোমরা? লেখালেখির খবর কী?
কাব্য বাবাঠাকুর : লেখালেখি আমার তেমন হইতাছে না। মানে আসতেছে না।
ঐশ্বর্য অগ্নি : আসছে না? কোত্থেকে আসবে? হা হা হা... লেখালেখি কী সহজে আসে?
পবিত্র মহাপ্রভু : আপনি এতো লেখেন কী করে? যে পত্রিকা খুলি সেখানেই আপনার লেখা।
ঐশ্বর্য অগ্নি : হাতের এই জ্বলন্ত-পুড়ন্ত সিগারেটটা দেখছ না, জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তেমনি জ্বলেপুড়ে, নিজের আত্মা আর অস্তিত্বকে ছাই করে কবিতা লিখতে হয়। নিজের আত্মাকে প্রতিনিয়ত পোড়াই আর কবিতা লিখি।
আকাশ নন্দন : ঠিক বলছেন। একদম আমার মনের কথা।
ঐশ্বর্য অগ্নি : আচ্ছা, তোমরা আমার বইটা পড়েছো?
আকাশ নন্দন : তার আগে বলেন আপনার ত্রৈমাসিক কবিতাকাসুন্দি কবে বাইর হচ্ছে?
ঐশ্বর্য অগ্নি : আগামী মাসের মাঝামাঝি। কেবল একটা লেখার জন্য আটকে আছি। আমার নির্বাচিত কবিতার ওপর একটা লেখা লিখছে সীমান্ত শরাফত। ওর লেখাটা এলে প্রেসে দিয়ে দিবো।
•মাস পিপল কবিতার কী বোঝে? তারা বোঝে খালি গদগদ পুতুপুতু লুলুলুলু ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও’ মার্কা থার্ড ক্লাস ইমোশনাল এক্সপ্রেশন•
পবিত্র মহাপ্রভু : কিন্তু সীমান্তরে লিখতে দিলেন! ও কী বোঝে কবিতার!
ঐশ্বর্য অগ্নি : কে লিখবে? কাব্যের জগত তো হিংসায় ভরে গেছে। আমি ওকে লিখতে বলি নাই, ও ইচ্ছে করেই লিখতে চাইল। তোমরা তো আমার কোনো লেখাই পড় না।
পবিত্র মহাপ্রভু : এইটা ঠিক বললেন না অগ্নি ভাই। আমরা আপনার লেখা মনোযোগ দিয়াই পড়ি।
কাব্য বাবাঠাকুর : হ্যাঁ, মেঘ গেল পশ্চিমে, সুন্দরের তাবিজ। পাণ্ডুলিপিটা আমার ভালো লাগছিল। কিন্তু বইটা তেমন লাগল না। আপনি তো আমার প্রিয় কবিতাগুলি বাদ দিছেন। অনেক বদলাইছেন, না?
ঐশ্বর্য অগ্নি : দু’একটি বাক্য, শব্দ আর ইমেজ বদলে দিয়েছি, কবিতা তো বাদ দেই নি।
কাব্য বাবাঠাকুর : ‘সুখ-দুঃখের বারোমাইস্যা’, ‘ভূতের সঙ্গে সহবাস’, ‘পাগলী ও বলদসিরিজ’ এই কবিতাগুলি তো দেন নাই।
ঐশ্বর্য অগ্নি : এগুলো আছো তো। তুমি বোধ হয় মনোযোগ দিয়ে পড় নাই।
কাব্য বাবাঠাকুর : পড়ছি, খুঁটাইয়া খুঁটাইয়া পড়ছি। ‘চংক্রমণে বকপক্ষী’ কবিতাটাও দেন নাই।
ঐশ্বর্য অগ্নি : থাক ভাই, তুমি আসলে বইটা দেখই নাই।
পবিত্র মহাপ্রভু : ভুইলা গেছে বোধ হয়।
ঐশ্বর্য অগ্নি : আমাকে নিয়ে তোমরা না লেখ, কিন্তু একটু পড়তে তো পার। তবে একটু লেখালেখি হলে ভালো। কত অ-কবিকে কবি বানাচ্ছো তোমরা...
কাব্য বাবাঠাকুর : কি যে বলেন অগ্নি ভাই! আপনিই তো কবি বানাচ্ছেন। কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড। সীমান্ত শরাফতের মতো লোক কবি হয় কেমনে বলেন আমারে!
•তোমাদের, একটা কথা বলি, কাউকে বলো না। গত সংখ্যার কবিতাকাসুন্দিতে ওর যে কবিতাগুলো গেছে সেগুলো ছাপানোর জন্য কম করে হলেও আট-দশবার আমার বাসায় গেছে•
আকাশ নন্দন : ও তো পপুলার ঘরানার কবিতা লেখে। পপুলারিটি দিয়া কবিতা বিচার করেন আপনি?
কাব্য বাবাঠাকুর : পপুলারিটি হইলো পতনের সিঁড়ি। মাস পিপল কবিতার কী বোঝে? তারা বোঝে খালি গদগদ পুতুপুতু লুলুলুলু ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও’ মার্কা থার্ড ক্লাস ইমোশনাল এক্সপ্রেশন!
পবিত্র মহাপ্রভু : পাবলিকরে নিয়া বা পাবলিকের লাইগা কবিতা লেইখা কবিতার কোনো লাভ নাই। পাবলিকের আর্ট বড়জোর ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে’ আর ‘আমি হব সকাল বেলার পাখি’ পর্যন্ত। কবিতা তো থটফুল আর্ট, হাই আর্ট।
কাব্য বাবাঠাকুর : সীমান্ত শরাফত হইল মিডিলক্লাস সেন্টিমেন্টওয়ালা কবি। ল্যাঙ্গুয়েজের কোনো এক্সপেরিমেন্ট নাই।
ঐশ্বর্য অগ্নি : সীমান্তর ওপর খেপে আছো মনে হচ্ছে? কি বলব তোমাদের, একটা কথা বলি, কাউকে বলো না। গত সংখ্যার কবিতাকাসুন্দিতে ওর যে কবিতাগুলো গেছে সেগুলো ছাপানোর জন্য কম করে হলেও আট-দশবার আমার বাসায় গেছে। না ছাপিয়ে উপায় কি? আমি তোমাদের জিনিয়াস মনে করি। অথচ তোমরা আমাকে লেখা দাও না।
কাব্য বাবাঠাকুর : ক্যান! দিছিলাম তো!!
আকাশ নন্দন : তিনজন এক সঙ্গে দিছিলাম।
ঐশ্বর্য অগ্নি : দিয়েছিলে!... ও হ্যাঁ মনে পড়েছে। তোমাদের লেখাগুলো যে-ফাইলে রেখেছিলাম প্রেসের কম্পিউটার থেকে সে ফাইল হারিয়ে গিয়েছিল। শেষ দিকে এমন হয়েছিল যে, তোমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি নাই।
আকাশ নন্দন : আচ্ছা, অগ্নি ভাই, আমাদের বয়সী তরুণদের নিয়া আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ঐশ্বর্য অগ্নি : পর্যবেক্ষণ ওই অর্থে বলা যাবে না। তবে যা পড়েছি তাতে মনে হয়, আশি-নব্বই দশকের মধ্যেই তোমরা ঘোরপাক খাচ্ছো।
কাব্য বাবাঠাকুর : সেটা কী রকম?
ঐশ্বর্য অগ্নি : আশি-নব্বইয়ের কবিরা যেমন কবিতায় দেশজ ঐতিহ্য ও আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছে কিংবা কবিতায় আধ্যাত্মিক এক লোকদার্শনিকতাকে আশ্রয় দিয়েছে সে-রকম একটা ধরণ তোমাদের কবিতায় দেখা যাচ্ছে। আর একটা দুর্বোধ্যতা তোমরা তৈরি করছ। এটা তোমাদের জন্য ক্ষতিকর।
কাব্য বাবাঠাকুর : দুর্বোধ্যতা? এইটা কবিতার বিরুদ্ধে পুরানা অভিযোগ। আপনার কবিতা প্রসঙ্গেও এই অভিযোগ তোলা যায়।
ঐশ্বর্য অগ্নি : তুলতে পারো। পাঠকের স্বাধীনতা আছে। কিন্তু অন্যদের তুলনায় আমি সহজ হতে চেয়েছি।
কাব্য বাবাঠাকুর : আমাদের সময় নিয়া বলতে পারি, আমরা প্রথাকে ভাঙতে চাই। ছন্দ ভাঙতে চাই। পুরানা উপমা-রূপক ঝেড়ে ফেলতে চাই। বিষয়ের বিনির্মাণও আমরা করতে চাই।
•অ্যাকাডেমিগুলা মেইনলি গাধাদের দখলে•
ঐশ্বর্য অগ্নি : উদ্দেশ্য তোমাদের মহৎ। কিন্তু বল তো দেখি, প্রথা, ছন্দ, বিষয়-বিনির্মাণ—এ-সব বলতে তুমি কী বোঝো?
কাব্য বাবাঠাকুর : এগুলা নিয়া কথা বলা তো সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।
ঐশ্বর্য অগ্নি : আমি জানি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। ভাঙতে চাই, ভাঙতে চাই বললেই ভাঙা যায় না। কাকে, কেন, কীভাবে ভাঙতে চাও সে বিষয়ে ক্লিয়ারকাট ভাবনা দরকার। ছন্দ না জানলে ছন্দ ভাঙবে কী করে? মধুসূদন ছন্দ জানতেন বলেই ভাঙতে পেরেছিলেন।
আকাশ নন্দন : একশ ভাগ খাঁটি কথা।
ঐশ্বর্য অগ্নি : তোমরা তো একটা লিটিলম্যাগ করতে পারো। বিশেষ সংখ্যা করতে পারো গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের নিয়ে, সাক্ষাৎকার ছাপতে পারো। বাংলার প্রফেসরদের দিয়ে সমালোচনা লেখাতে পারো সিনিয়র কবিদের ওপর। যদিও ইউনিভার্সিটির গরু গাধা প্রফেসররা সাহিত্য-টাহিত্য বোঝে না।
•একটা কথা বলি, অন্যভাবে নিও না। অনেকেই তো আমার ৪৫তম জন্মদিনে আমাকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করার কথা ভাবছে•
কাব্য বাবাঠাকুর : না না না, প্রফেসর-ট্রফেসর দিয়া কাজ হবে না। শিল্পমূল্য বিশ্লেষণে গিয়া এরা সাহিত্যের সাড়ে বারোটা বাজায়।
ঐশ্বর্য অগ্নি : তবু একাডেমি তো! যতোই অকাট মূর্খ হোক-না-কেন, এদের একটা সিলমোহর লাগেই। দুই একজন শশিভূষণ দাশগুপ্ত, প্রমথনাথ বিশী-টিশি না থাকলে চলে!
পবিত্র মহাপ্রভু : তা ঠিক। অ্যাকাডেমিগুলা মেইনলি গাধাদের দখলে। সমস্যা আরেকটা জায়গায়। টাকা পয়সা জোগাড় করাই তো মহা মুশকিল।
ঐশ্বর্য অগ্নি : ওটা কিছু নয়। হয়ে যাবে।
পবিত্র মহাপ্রভু : শুধু টাকা না, লেখা আর লেখকও দরকার। বিশেষ সংখ্যা করব কার ওপর? ওরকম সিগনিফিকেন্ট কবি লেখক কি তৈরি হইছে গত দুই দশকে?
ঐশ্বর্য অগ্নি : কথাটা ভুল। তোমরা আসলে দেখতে পাও না। খুঁজে নিতে হবে কে গুরুত্বপূর্ণ। মরে যাবার পর লেখকের মূল্যায়ন করে কী লাভ। একটা কথা বলি, অন্যভাবে নিও না। অনেকেই তো আমার ৪৫তম জন্মদিনে আমাকে নিয়ে বিশেষ সংখ্যা করার কথা ভাবছে। কিন্তু আমি ওদের থামিয়ে রেখেছি... কেননা আমি ওদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না।
আকাশ নন্দন : কারা করতে চায় বিশেষ সংখ্যা?
ঐশ্বর্য অগ্নি : নাম বলার দরকার নেই। অনেকেই আছে। আমি তোমাদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। তোমাদের কাছ থেকে এরকম আহ্বান এলে আমি লুফে নিতাম।
•বুদ্ধদেব বসুর কথা ভাবো। উনি না থাকলে কোথায় থাকতেন জীবনানন্দ•
কাব্য বাবাঠাকুর : অগ্নি ভাই, আপানাকে নিয়া সংখ্যা করতে গেলে তো আপনার দশকের আরো কয়েকজনরে গুরুত্ব দিতে হয়। যেমন ধরেন, য়ারিফ বোহেমিয়ান, শাহেদ কহিতুর, কিংশুক মুহম্মদ এদের কথাও ভাবতে হয়।
ঐশ্বর্য অগ্নি : বুঝলাম বাবাঠাকুর। কিন্তু তোমাদের দেখতে হবে এই দশকে কার অবদান সবচাইতে বেশি। নিজের কথা নিজের বলতে হচ্ছে, সরি। তবুও বলি, আমি তো কবিতায় এক্সপেরিমেন্ট করেছি। ট্রাডিশন আমার কবিতার অবলম্বন। তোমরা যদি ফর্মের কথা বলো, তাও তো আমি এগিয়ে। আমি হাইকু লিখেছি, সনেট লিখেছি, তানকা লিখেছি, রুবাই লিখেছি। বাংলা-সংস্কৃত-আরবি ছন্দ মিলিয়ে কম করে হলেও ১৬ রকম ছন্দের পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছি। এগুলো কি আমার অর্জন নয়। আমি তো বৈশ্বিক হতে চেয়েছি।
কাব্য বাবাঠাকুর : সবই বুঝি, কিন্তু...
ঐশ্বর্য অগ্নি : কিন্তু-টিন্তু করে কিচ্ছু হবে না। সিনিয়র কবি হিসেবে আমার উচিত তোমাদের সর্বাত্মক সহায়তা করা। একইভাবে তোমাদের উচিত আমাকে সহায়তা করা। লেখালেখির জগতটা সহায়তার। বুদ্ধদেব বসুর কথা ভাবো। উনি না থাকলে কোথায় থাকতেন জীবনানন্দ!
আকাশ নন্দন : নাট্যকার নিয়ামত আলী লাল আর আহমদ ইদ্রিস বান্টুর কথা মনে পড়তেছে। এঁরা পরস্পরের প্রশংসা কইরা বেড়ায়।
•দৈনিক তেলেসমাতি, দৈনিক কালাপাহাড়, দৈনিক খবর ছাপাই—এগুলো আমার লবির•
ঐশ্বর্য অগ্নি : তুমি এটাকে ন্যারোলি দেখছ কেন? এখন তো গ্লোবালাইজেশনের যুগ, কবিকে এখন গ্লোবাল হতে হবে। ঘরে বসে গদ্য-পদ্য লিখলে চলবে না।
পবিত্র মহাপ্রভু : আমাদের আসলে ঐক্য নাই। ঐক্য থাকলে লেখালেখির কাজ অনেক সহজ হইত। আসলেই আমাদের একটা লিটিলম্যাগ দরকার।
কাব্য বাবাঠাকুর : তাছাড়া মিডিয়া সাপোর্ট দরকার। দরকার পত্রিকার সাপোর্ট।
ঐশ্বর্য অগ্নি : হাইলি এপ্রিশিয়েটেবল কথা বলছ। গ্লোবাল হবার সাথে এটার একটা যোগ আছে। কবিকে যেতে হবে মিডিয়ার কাছে। সেটা হতে পারে প্রিন্ট বা ভিজ্যুয়াল। এফ.এম. রেডিওগুলোকেও ব্যবহার করা যেতে পারে। দরকারে আমরা সেগুলোও ব্যবহার করব। এই তো সেদিনের কথা পাতিহাঁস পত্রিকার সম্পাদক ঋত্বিক ইউসুফ রেডিওতে কথা বলল। ইন্টারভিউ দিল। এগুলোর একটা প্রয়োজন আছেই, নয়তো পিছিয়ে পড়বে। দেখছো, আমার কবিতায় কেমন লাইক পড়ে!
পবিত্র মহাপ্রভু : কথাগুলো ভাববার মতো অগ্নি ভাই।
ঐশ্বর্য অগ্নি : ভাববার মতো শুধু নয়। ভাবতেই হবে কনটেমপোরারি ওয়ার্ল্ডে। নো চিন্তা। দৈনিক তেলেসমাতি, দৈনিক কালাপাহাড়, দৈনিক খবর ছাপাই—এগুলো আমার লবির। তোমাদের তো একটাও বই বের হয় নাই। বের টের করতে হবে না! ‘গ্রন্থকীট’ প্রকাশনীর সঙ্গে তোমাদের ব্যাপারে কথা বলব, কেমন? আজ আমি যাচ্ছি চ্যানেল বাতাসিবার্তাতে; সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা নিয়ে একটা ইন্টারভিউ আছে।
•কবি, কবিতালেখ্য ও (a + b)² = গদ্যচরিতমানস : আকাশ নন্দন•
দ্বিতীয় বিচার
মাসাধিককাল পর। হস্তে তামাক্কুধৃত কবির তসবিরমণ্ডিত প্রচ্ছদপটসহ বিশেষ পত্র বাহির হইল। তাহাতে লিখিয়াছেন পবিত্র মহাপ্রভু, কাব্য বাবাঠাকুর, আকাশ নন্দন, মহম্মদ কৃষ্ণ গোঁসাই, ইন্দ্র গরুড় ইত্যাকার কবিতাকার। স্থানস্বল্পতাহেতু বিশেষ সংখ্যাটির সমুদয় রচনার বর্ণনা উদ্ধার অসম্ভব। এক্ষণে আমরা পত্রটির সূচিপত্রের কিয়দংশ পাঠকবর্গের দৃষ্টিগোচর করিতেছি।
ঐশ্বর্য অগ্নির কবিতা : বাংলা কাব্যে রেনেসাঁস : ড. সৈয়দ মতলব আলী খান
ঐশ্বর্য অগ্নি : জীবন ও সাহিত্য : অধ্যাপক ড. খাদেমুজ্জামান
ঐশ্বর্য অগ্নি : বাংলা কাব্যের দিগ্বলয় : পবিত্র মহাপ্রভু
কবি, কবিতালেখ্য ও (a + b)² = গদ্যচরিতমানস : আকাশ নন্দন
•আমাদিগকে লইয়াও একটি বিশেষ পত্র প্রকাশ পাইতে পারিত। কেননা শুনিতে পাই বঙ্গদেশে কবি ও কাকের সংখ্যা সমানুপাতিক•
তৃতীয় বিচার
বিশেষ পত্রটির উদ্বোধন দিবস। বৈকালিক আসরে সমাগত অতিথিকুলে রহিয়াছেন গুম্ফদেশ মর্দনরত বিরলকেশ কতিপয় অধ্যাপক, ভূলোক-দ্যুলোক কম্পনকারী সরকারি কবিদল, গৌরবভারানত নাদুসনুদুস কতিপয় লিটিলম্যাগ সম্পাদক এবং অবেণীসম্বন্ধ কেশভারবাহী কর্পোরেট কবিবৃন্দ।অনুষ্ঠানস্থল বাংলার বিখ্যাত একাডেমির চত্বর-সংলগ্ন বটবৃক্ষতল। তৎকালে বৃক্ষশাখায় উপবিষ্ট ছিলেন মান্যবর এক কাক ও কাক-পত্নী। সাময়িক পত্রটির প্রচ্ছদপট দেখিয়া কাক কর্কশ স্বরে কাতর সঙ্গীত জুড়িয়া দিলেন। কাক-পত্নী কহিলেন, ‘কহ, হে, কলাবিদ কাক, কাতর ক্রন্দনের কারণ কী?’ তদুত্তরে কাক কহিলেন, ‘আমাদিগকে লইয়াও একটি বিশেষ পত্র প্রকাশ পাইতে পারিত। কেননা শুনিতে পাই বঙ্গদেশে কবি ও কাকের সংখ্যা সমানুপাতিক।
চতুর্থ বিচার
আমি যখন কবিতা লিখতে বসি অরুণবাবু বলেন— এ তো ইশতেহার হয়ে যাচ্ছে! আমি যখন ইশতেহার লিখি বরুণবাবু বলেন— এ তো ঠিক কবিতার মত শুনাচ্ছে! তারপর থেকে কারো কথায় কান না দিয়ে বাকী জীবনভর আমি শুধু কবিতার মত ইশতেহার আর ইশতেহারের মত কবিতা লিখে যেতে থাকি। [অমিতাভ দাশগুপ্ত, ‘কবিতা ও ইশতেহারপঞ্চম বিচার
যে লেখে সে কিছুই বোঝে না যে বোঝে সে কিছুই লেখে না দু-জনের দেখা হয় মাঝে মাঝে ছাদের কিনারে ঝাঁপ দেবে কিনা অর্থহীনতার পরপারে! [শঙ্খ ঘোষ, ‘বোধ’•শাদা পাতার চেয়ে উৎকৃষ্ট হতে হবে তোমাদের•
ষষ্ঠ বিচার
লেখো যা তোমাদের খুশি যে-কায়দায় লিখতে ইচ্ছে করে তাতেই অনেক রক্ত ব’য়ে গিয়েছে সেতুর তলা দিয়ে এই কথাই বিশ্বাস ক’রে যে কেবল একটা রাস্তাই ঠিক। কবিতায় সবকিছুই চলে। একটাই শুধু শর্ত, বলাই বাহুল্য : শাদা পাতার চেয়ে উৎকৃষ্ট হতে হবে তোমাদের। [নিকানোর পাররা, ‘তরুণ কবিরা’সপ্তম বিচার
না জেনে করণ কারণ কথায় কি হবে। কথায় যদি ফলে কৃষি তবে বীজ কেনে রোপে। [লালন