ইউসুফ-জুলেখা
◘◘
ইউসুফের জেরা :
বলো তোতাপাখি
দাও নির্ভুল সাক্ষ্য
কার চোখে কার
হেনেছে কটাক্ষ
কার পিঠে আঁকা
কার নখের আঁচড়
কার প্রেমে জ্বলেছিল
রাঙা দ্বিপ্রহর?
কার প্রেমে পড়ে
কার পুড়েছিল মন
বলো তোতা বলো
কিছু রেখো না গোপন।
জুলেখার মন :
ছুরি রেখে হাতে, শত পুরবাসিনীর মাঝে
ইসুফকে দেখে
কে হায় হৃদয়হীনা, আপেল কেটেছে হাত
অক্ষত রেখে।
ঋতুমতী
◘◘
মাসের তিনটা দিন ফুল বাগিচাকে
ভালোবেসে এক লাল জবা ফুটে থাকে
রক্ত শূচিতা পায়, জবার কেশর
বেয়ে নামে লালস্রোত যৌনকাতর।
কাতর মলিন শিখা একা পিলসুজে
কামনায় কাঁপে আমি থাকি চোখ বুজে
চোখ বুজে থাকি তবু দেহ কাঁপে কেন
নদী ঢেউ যেন কেউ বেধে রেখেছেন
সেই ঢেউ কেটে যদি মৃদু তরী ছুটে
দুচোখের আরশিতে কত তারা ফুটে।
দুচোখে তারার নাচ, দেহ থরথর
ঋতুকাল কেন এত পিপাসা কাতর!
সিঁথির সিঁদুর
◘◘
সাধের সোয়ামি শোনো আমি বলি একটা কিছুর
বাহানায় বাসি ফুলের মতোই ঝরে যেতে চাই
যদি বা না হয়—রূপশালি ধান, দুধের দোহাই
না মরেই যেন মুছে দিও না গো সিঁথির সিঁদুর।
নেহাত না হলে, তুলে দিও মোরে একই সে চিতায়
সহমরণের অঙ্গার হয়ে মিশে রবখন
জোড়া ভুত হয়ে নতুন ঘরের পুরানা ভিটায়
দোঁহে দোল খাব, হাওয়ায় হাওয়ায় পাতার নাচন।
তোমার শরীরে তশরিফ নেব অত আশা নাই
বরং সে মাটি হয়ে যদি হাঁটি, যে জমির বুকে
ছায়া পড়ে তব। টোল খাওয়া গালের শূন্যস্থানে
—যদি মিশে রই—এক ফোঁটা ঘাম হয়ে চিবুকের।
আমি লোকগান, গোলা ভরা ধান পুরানা দিনের
মেসেঞ্জারের সিন অপশনে পেতে রাখা চোখ
তুমি তার কিছু তুলে নাও যদি, এটুকু নিদেন
না শোনো না-হয়, অন্ততঃ বলি, এইই কম সুখ!
সায়াহ্ন
◘◘
সারাদিন কী যে বিচ্ছিরি হিজিবিজি
রোদে পুড়ে ঘামে জবজবে শিরদাঁড়া
সূর্য-শাসন এখন বিগত প্রায়
বিকেলের দিকে গুছিয়ে রাখছি পাড়া।
সারাদিন ধরে বয়ে চলা খড়কুটো
দুপুরের ক্রোধ সামলিয়ে করপুটে
এইবার বুঝি পাখির ডানার শ্রম
মিলবে ছানার খিদে ভরা দুই ঠোঁটে।
কে যেন দিচ্ছে নয়া ডাস্টারে মুছে
ব্ল্যাকবোর্ড হতে পুরনো চকের ভুল
নিকানো বোর্ডের নিকষ অন্ধকার
বেনি বেয়ে নামে কলেজ ফেরতা চুল।
কার ছাদে কার ঘুড্ডি গোত্তা খেয়ে
হাওয়ায় ভাসছে স্বাধীন উড়ার সুখে
মাজা দেওয়া সুতো লাগল না কাজে মোটে
পতনের রীতি বুঝে নেয় উজবুকে।
ইথারে ইথারে ভাসে কত কথকতা
সেলফোনে কেউ দূর বন্ধুকে ডাকে
ইলেক্ট্রিকের পিলারে ঝুলানো তার
একটা আকাশ দুই ভাগ করে রাখে।
পাশাপাশি দুই সাইকেল গেল হেঁটে
সওয়ারি দু’পায়ে প্যাডেলে মারছে ঠাপ
কত ক্রোশ গেলে থাকে না ফেরার পথ
চামচে মেপেছি—জীবনটা আধাকাপ।
বিকেলের ছায়া তেরছা হচ্ছে ক্রমে
কমলাপ্রবণ আকাশ পড়ছে ঝুঁকে
হোসেনের লহ মাখা গোধূলি আবিরে
এইসব কথা লিখে রাখি নোটবুকে
শারীরিক
◘◘
ভোরে ওঠে আধঘণ্টা দৌড়াও
জিমে যাও সপ্তাহে চারদিন।
সারা দিনে আট গ্লাস পানি
আরও এক গ্লাস দুধ খেয়ে তারপর ঘুম।
শরীর শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?
ধৃতরাষ্ট্রের শোক
◘◘
চোখ হয়ে জন্মাতে পারতাম
কারও বিস্তৃত ভ্রুভাগের নিচে
অথচ আমারে মানুষ বানায়ে
পাঠালেন খোদা ভুল দহলিজে।
এখন আমার অন্ধ এ দেহ
ভরা ধৃতরাষ্ট্রের পরাজয়
অবসিত আজ কুরুক্ষেত্র
কাহিনি থামাও, প্রিয় সঞ্জয়!
আকাশ
◘◘
আমি খরতাপ
চৈত্রের নীল
নিদাঘের দিনে
তুমি বর্ষার
জলভার মেঘ
রিজার্ভ বেসিনে।
নাকি তারাভরা
কালো রাত্রির
পশ্চাৎপটে
আন্ধার মনে
লাগে যারে সেও
আসমান বটে।
কমলা প্রবণ
আকাশের রং
গোধূলির কাছে ঋণী
খোদার কসম
কখনো এমন
আকাশ দেখি নি।
কাবিলের প্রেম
◘◘
উৎসর্গ
বুঝেছি বিরাট এক দাতাকর্ণ তুমি
দিয়েছ পালের থেকে সেরা ভেড়াটিকে
সংসারী মন আমার—
প্রয়োজন শেষে
অবশিষ্ট
, উদ্বৃত্ত যতটুকু টিকে
—
সেটুকু দিয়েছিলাম উৎসর্গ রূপে।
ভাবি নি কখনো কোন বিনিময়ে কেনা
যায় তোমাকেও প্রভু
জনক অবোধ
!
খোদা
, তুমিও বুঝলে না!
অভিশাপ
বুঝেছি পাতক আমি ক্ষমাহীন পাপ
করেছি তোমার কাছে দিও অভিশাপ
তাই বলে আকলিমা
! জগৎ মাতার
সন্তানগণের প্রতি সেরা উপহার
,
ওষ্ঠে যার রক্তবর্ণ স্ফীত পয়োধর—
কনে দেখা আলো দিয়ে গড়া সে দেহ
’র
মালিকানা নিয়ে নিবে অবোধ হাবিলে—
হায় খোদা
, মনে মনে এই ভেবেছিলে
!
পুনর্জন্ম
প্রেমিকের মন সে তো হোক সহোদর
প্রথম প্রেমের খুনে রাঙা হলো কাবিলের খঞ্জ।
সেই খুন খুন নয় যে খুনি আশেক
জেনে রেখ পৃথিবীতে কোনোদিন এক
আসবে নবীন কবি, মহাপ্রজ্ঞাবান
বলবে সে—ভালোবেসে—
যদি কেউ খুনি হতে চান, তাই হয়ে যান।
শব ই মেরাজ
◘◘
ইসরাফিলের শিঙায় বাজুক সানাই-এর সুর
আকাশ আলোকবাজিতে সাজাও প্রিয় মিকাইল
নিজের সুরতে গড়িয়াছি দেহ প্রিয় বন্ধুর
তাহার মিলন পথ চেয়ে আজ বেচইন দিল।
মেরাজের পথে বুরাকে সওয়ায়, কী যে হিম্মত!
সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আজ এল মুসাফের
রোশনাইয়ে তার পুড়ে যায় প্রায় খোদায়ি তখ্ত
উড়বার দিশে ভুলে যায় ডানা জিবরাইলের।
লাল মরুভূতে জ্বালায়ে প্রদীপ আমার প্রেমের
কেয়ামত তক মত্ত জিকিরে তার উম্মত
নিরলে তাহারে শুধায়েছি শুধু কাছে পেয়ে ফের
কী চাও বন্ধু দিল খুলে বলো গো মোহাম্মদ।
অশ্রু মুছিয়া বলিলে খানিক নীরবতা পর
তুমি তো সকল দেনেওলা তাই নাই চাইবার
কিছু কম চেয়ে হারাতে না চাই বেশিটুকু আর
কবুল কর গো প্রভু এইটুকু শুধু চাওয়া মোর।
আহাহ কী কথা! বলিয়া পূর্ণ করিলা এ নিরাকারে
এমন মায়াবী মিরাজের রাত কেন রোজ আসে না রে?
রাতের মরণ
◘◘
শোনো লাল পাড়
নাকের নোলক
কাজল নয়ন শোনো
সারা পাড়া প্রায়
ঘুমায়েই গেছে
ঘরে নেই কেরোসিনও।
ঘুমিয়েছে পাড়া
কী যেন ইশারা
দিচ্ছে দুচোখ বুজে
কাঁপা আলো তব
দেহ হয়ে জ্বলে
নিস্তেজ পিলসুজে।
দেহ নিঃসাড়
নিঃশ্বাস ঘন
হয়ে আসা এই রাতে
আমার মরণ
লেখা আছ তোর
লাভা ছোটা যমুনাতে।