বই থেকে : শেমিজের ফুলগুলি

উপাদেয় ◘◘

গমের শিষ দুলছে। সোনা রং গাছগুলি মাঠের নথ যেন। লুকোচুরি খেলছে ঘাসে নীলচে প্রজাপতি। শরীর ঘেঁষে নুয়ে পড়ছে বিকাল। মজে যায় রোদ, আরও দৃশ্য ও সংকেত। ঢালু পথে সবুজ ঘাস। যেন কোনো কারুচিত্রের পাশে মিহি আচ্ছাদন। ছড়িয়ে আছে উপাদেয় রূপে। বাছুর চরে। কচি খুরের ছাপ। গাঢ় চোখে বিম্বিত গ্রাম। ছড়া কাটতে কাটতে গাছের খোড়লে লুকায়। হাসে উচ্চস্বরে। নড়ে ওঠে হতচকিত গমের হিরন্ময় চোখ। চিকন দাঁতগুলি খিলাল করে যাচ্ছে হাওয়া। বিকালের রাগে শিশুরা ছড়ায় সুর। আধোআধো বোলে লতাপাতায় ঢেউ। নৃত্যপর ফড়িং। গোচরের ওপারে সুন্দরের মন্থর রং। মর্মের গাঢ় প্রত্যাদেশ। অমেয় কোনো প্রহরের পরে, সন্ধ্যা, জগতের নৈঋত কোণে—নামছে। বনের উঁচু দেশ থেকে ধীরে চেপে বসে সবুজ ঘোড়ায়।

হেমন্তের শরীরে ◘◘

এক অপার শুরুর পাদদেশে শুয়ে ভাবি, কখনো কখনো জীবন সুন্দর। রোদ আরো রোদে উজ্জ্বল। যেন কোনো জঙ্গলে নদীর ভিতর ভুস করে ভেসে ওঠা মাছ। কটুতিক্ত আখ্যান থেকে উঠে আসে স্নিগ্ধসাঁতার। রোমন্থন চেয়ে ভালো এই সংরাগ। পানির কলরোলের ভিতর একটা সবুজ পাতা ভেসে যাচ্ছে কেমন। ছোট ছোট বুদ্বুদ ওঠে। পাশ ফেরে কেউ এই ঘনমধ্যাহ্নে। চাটাই বিছিয়ে আলসে পড়ে থাকা লোক। দেখছে, পাখির খুনশুটি। মৃদুভাষী হাওয়া সুর তুলছে কানে। মুখর কাজের হাতগুলি। তীরধরে পাকিয়ে উঠছে জীবন। একপ্রস্থ দূরে হেমন্তের শরীরে কুঁড়ি জাগে। পুরানা ছাল ফেটে হাসে কচি ডাল। মর্মের অস্ফুট কথনে রাঙায় বনপথগুলি। যেন কোনো আনাড়ি কাণ্ড থেকে ছেঁকে আনছে মধুরসগুলি, কখনো কখনো এত বলশালী কাল। বাঁকে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, আবছা হয়ে এল পিছনের গ্রামগুলি। আর কত মিইয়ে যাওয়া স্বর গলে যাচ্ছে ক্রমে।

খোদক ◘◘

এই গণ্ডগ্রামে কেউ নিভে গেল। অজস্র পাতা ঝরে আছে নিভৃত বাগানের ভেতর। মাটি খুঁড়ছে কতিপয় আধবুড়া হাত। চোখের দিকে তাকাতে পারি না। শব্দহীন জ্যোৎস্নার মতো মায়াটুকু ফুরিয়ে এল। আজ এত আলো, রোদ, ইশারা—কেবলি ফিরে আসছে। কোনোদিন আর ভাষা জোগাবে না যে ঠোঁট, চুপসে আছে হরিতকীর শুকনা ফলের মতো। কেমন শুয়ে আছে দেখ। নিস্পন্দ এক অবয়ব ঘিরে না বলাটুকু ব্যক্ত হতে ব্যাকুল। একে একে ভিড়ছে সংশ্রবের শতছিন্ন চিহ্নমালা। মাটি এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে হাওয়া বইছে। সাধারণ কোনো বিকালের মতো সে মুহূর্ত ঘনিয়ে আসে। কোমর অব্দি পাটখড়ি মেপে উঠে এল সহজ সেসব হাত। মোহহীন সেই খোদকেরা সাবলীল হেঁটে যায়। পাতা ঝরার থেকেও নীরবে নিভে যায় শরীর। নুয়ে পড়া পাকুড়ের নিচে এক টুকরা নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে এল।

সবজি কাটার পাশে ◘◘

তোমার সবজি কাটার পাশে আটকে যাচ্ছে চোখ দরজা খোলা রেখে রোদে সঁপে দিলে পিঠ। খোঁপা বাঁধার মুহূর্তে, কী দেখছে বিড়াল নোনা চাহনিতে। পুষ্করিণীর ঘাটে ফেনিয়ে তুলছে অশ্লীলতা। ঢলে পড়া কয়েকটি রাজশিমের লতা ভারাক্রান্ত আমকাঠের আলনা একগুচ্ছ লাউশাক, শীতকালীন শিম ও ফুলকপির তাজা অনুভূতি চিরে চিরে তোমার হাতের মুঠি হয়ে উঠছে সাবলীল।

হনন ◘◘

আজ রাত্রিতেই সমাধা হবে। সুবহে সাদিকের খানিক আগে। বাঁশঝাড়ের পিছন দিকটায়। ছোট্ট ডোবার পাড়ে। ব্যাঙ ডাকছে প্রেয়সীকে। তার মনে পড়ল প্রেমের দিনগুলি। বলা হলো—‘দৌড়াও’। চোখ বন্ধ করে স্ত্রীকে আলিঙ্গন করল কল্পনায় আর সন্তানাদির শরীরে মেখে দিল প্রেম। নারীর শরীর যেন শাদাকালো দিনের। চাঁদের আলোয় ফর্সা হয়ে উঠছে। জংলার লতাপাতাগুলি মৃদু দুলছে। হালকা ঠান্ডা হাওয়া। বাঁশ পাতার খসখস। পড়ে যেতে যেতে নাম নিল আল্লার। মুঠিতে ঘাসপাতা আর কাদামাটি। শরীর যেন পাথরের মতো ভারী—কথা শুনছে না। টেনে তুলতে গিয়ে তলিয়ে গেল ডোবার অন্তর্দেশে। জগডুমুরের পাতায় নৃত্যপর অন্ধ পিঁপড়ারা আর চরের কিনার ধরে কয়েকটি দাঁড়াশ।
মোস্তফা হামেদী

মোস্তফা হামেদী

২৭ আগস্ট, ১৯৮৫; ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, ঢাকা...বিস্তারিত