কোয়ারেন্টাইনে লেখা কবিতাগুচ্ছ

অপেক্ষা

অবরুদ্ধ দিনগুলিতে তিলোত্তমার কথা মনে পড়ে আমার।

যে চেকপয়েন্ট-জালে মাছের মতো আটকা পড়া যুবকদের বুকে কোনো নারীর নাম নয়, শুনতে পেত : আজাদি, আজাদি, আজাদি...

তার চিনার বৃক্ষের মতো শরীর, তুষারের মতো ত্বক, গোলাপের মতো চিবুক, আর হ্যাজেলনাটের মতো বাদামি দুই চোখে—

ক্লান্তি ছাড়া আমি আর কিছুই দেখি না।

সারা দুনিয়া যাওয়ার আগেই কাশ্মীর লকডাউনে গেছে, প্রেমিকেরা কবরে গেছে, প্রিয়ারা অপেক্ষা করতে করতে বুড়ো হয়ে গেছে।

কুনান পোশপোরার কান্না মুছে ফেলেছে ইয়াহার অ্যাসথেটিক, রিলায়েন্সের পিছু নিচ্ছে রামজন্মভূমি, শ্রীনগরের রাস্তায় তোমাকে একা দেখায় তিলো।

পুরনো পৃথিবীটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে গেলে, এই করোনা দুর্যোগে, তুমি কি তখনো তার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে?


স্থিরচিত্র ২০২০

মৃতদেশে পায়ে পায়ে হেঁটে আসে বরাতের রাত বুকে ঘূর্ণিজল শ্বাসে লেগে থাকে আল্লার আয়াত আতরের ঘ্রাণ মাখা স্মৃতি ওড়ে নিদান বাতাসে ভাতের খোয়াব নিয়ে নিদ্রায় অভুক্ত শিশু হাসে গাড়ি থেকে স্টিরোফোম বক্স নামে রহমত হয়ে ঘড়ি থেমে যাওয়া এই মারীক্লান্ত শেষের সময়ে মুনাজাতে মুখে উঠে আসে মৃদু মানুষের হাত...


ফিরে যাওয়ার আগে

থামো। স্টপ। অনেক হেঁটেছ, এবার একটু থামো। পেছনে তাকিয়ে দ্যাখো আকাশ ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। গ্রামগুলো শুষে নিয়ে একদিন আলো জ্বেলেছিলে নিনেভের মতো মৃত্যুনীল আজ সেই তিলোত্তমা। ফুল আর ফসল ছাড়া ভেবেছিলে মানুষেরা বাঁচে। ভেবেছিলে খিদে পেলে অর্থকড়ি ধুয়ে খাওয়া যাবে। তাই তুমি নদীগুলো বাঁধ দিয়ে বেঁধে ফেলেছিলে ধর্ষকামীদের মতো, যারা ভালোবাসতে জানে না। তুমি পাহাড় দেখে উঁচু হতে শেখো নাই খুঁড়ে আনতে চেয়েছ তার যত লুকোনো সম্পদ। তুমি সমুদ্র দেখে গভীর হতে শেখো নাই বহু প্রাণ খুন হয়ে গেছে তোমার প্লাস্টিকে। বাতাস আর পানিকেও তুমি ভাগ করে নিয়েছ যেমন ভাগ করে নিয়েছো জমি আর মেয়েমানুষ। নবিরা এসেছেন বারবার, বলেছেন সংযত হও। তুমি তাদের কবরের ওপর ভক্তির দালান তুলেছ। মসজিদের সামনে বসে ছিল যেই ক্ষুধার্ত শিশুরা তাদেরকে দেখে তোমার খোদার কথা মনে হয় নি। তুমি তাঁকে খুঁজেছ নিজের ইগোর অলিতে গলিতে। যাঁরা বলেছেন, ‘পাবে সামান্যে কি তার দেখা?’ তাঁদের জবান তুমি বন্ধ করে দিতে চেয়েছ। আগুন আবিষ্কার করে তুমি তাকে সভ্যতা বলেছ সেই আগুনে তোমার ফুসফুস আমাজন পুড়ে গেছে। থামো। স্টপ। অনেক হেঁটেছ, এবার একটু থামো। জিরাও। দম নাও। সময় আছে, তাড়াহুড়া নেই। তাছাড়া তোমাকে ফিরে যেতে হবে অনেকটা পথ। যেখান থেকে এসেছিলে। মায়ের কাছে। প্রকৃতির কাছে।


সংজ্ঞা

দূর থেকে দেখলে পিঠে রক্তের দাগও সুন্দর লাগে, রক্তজবার মতো বেশি বেশি করে স্যার/ম্যাডাম শুনতে ইচ্ছা করে।

দূর থেকে দেখলে মনে হয় ডাণ্ডা মেরে ঠান্ডা করা উচিত এবার একটু ম্যানার শেখাতেই হয় ফকিন্নির পোলাদের।

দূর থেকে দেখলে ফুলের বাগানে জন্ম নেয়া আগাছার মতো লাগে উপড়ে ফেললেই পালন করা হবে নাগরিক দায়িত্ব।

দূর থেকে দেখলে মেজাজ খারাপ আর মুখ তিতা হয়ে যায় যেন স্বর্গের সুনাম নষ্ট করতেই এসেছিল তারা!

দূর থেকে দেখলে ঘিন্না, বা খুব বেশি হলে, করুণা হয় ইচ্ছে করে মার দিতে, বা ভাতের মাড়।

দূর থেকে দেখলে দাস মনে হয় ওদের, আর নিজেকে নাগরিক হাতের পাঁচ আঙুল কি আর সমান হয়?

এই দূরত্বটাই শ্রেণি, আর দেখতে থাকাটাই রাষ্ট্র।


থিয়োনের কন্যার জন্য

এই চতুর্থ শতকে, এই ভেঙে পড়তে থাকা সাম্রাজ্যে, এই নিবু নিবু বাতি আলেকজান্দ্রিয়ায় শুধু একজন মেয়েমানুষকেই ভালোবাসা যায়।

সে প্রভু থিয়োনের কন্যা, সে আফ্রোদাইতের শরীরে প্লাতোর আত্মা, সে সেই নারী যার নামে আলো হয় আকুলআগোরা।

আমি তার দাস। এ ব্যাপারে সাক্ষী আছে প্রত্ন দেবতারা। জিপসির মতো পায়ে পায়ে ঘোরা ইসরাইল বংশের নবিরা।

কিন্তু যুদ্ধ বেঁধে গেছে বহুত্ব আর একে, সমানে সমানে, ছেলেরা অস্ত্র হাতে নিচ্ছে বই পিছে ফেলে রেখে।

তুমি তবু ডুবে আছ সংখ্যায় ও চিন্তায়, হেলেন বংশের শেষজন, নির্বিকার হেঁটে যাচ্ছ চারপাশের রক্ত ও ধোঁয়ায়।

এবার আমি আম্মোনিয়াসের কোনো কথায় গলব না, দোযখের সব রাস্তা রুটি দিয়ে কেনা, হাসির আড়ালে চিরকালীন হায়েনা।

হে হিপাটিয়া, সন্ত সিরিলের শাস্ত্র আর প্যারাবোলানির প্রস্তর ও অগ্নি থেকে আমি তোমাকে লুকিয়ে রাখব নিশ্বাসে আমার।

ইরফানুর রহমান রাফিন

ইরফানুর রহমান রাফিন

জন্ম ১০ এপ্রিল, ১৯৯২; লেখক, অনুবাদক, গবেষক। প্রকাশিত গ্রন্থ— চলে যাওয়া সময়...বিস্তারিত