কেমন আছ, নবতরুণ গাছ

কেমন আছ, নবতরুণ গাছ

হয়তো আগামী বসন্তে ফুটবে আমাদের কথাকলি—

দিকে দিকে ভয় ও গুঞ্জন। পথ-ঘাট নির্জন— থেমে গেছে চতুর লেনদেন। এখন কিছুটা একা আমি। সবজিবাগান ধরে হাঁটি। টমেটোর রং পেকে লাল হয়ে যাচ্ছে। হেঁটে হেঁটে কিছুটা তোমার দিকে যাচ্ছি। ভেবে ভেবে কতদূর আর যাওয়া যায় একা। একেকটা মুহূর্ত ধ্যানী মুনিয়ার চেয়ে নত, ক্রমশ আক্রোশ। ওই তুলসী ঘ্রাণের কাছাকাছি জমা থাকল সব।


সাবানফেনায় পুড়ে যাচ্ছে দেহ

অপদেবতা টাইপের আবহাওয়া। সুনসান ঘরবাড়ি। সাবানফেনায় পুড়ে যাচ্ছে নরম দেহ। তবু চেয়ে আছি মনোরম। অফুরন্ত সময় যেন কচ্ছপের মতো, মরণ।

তুমি বললে, যতটুকু পারো মেঘের সঙ্গে কথা বলো। বৃষ্টি কতটুকু হবে জেনে নাও।

তারপর মেঘের জাহাজে চড়ো। এই অফুরন্ত সমুদ্র পাড়ি দাও।


আরো কিছুদিন পাখিরা একাই উড়বে

দুপুর, এখন সহস্র স্লোগান নিয়ে আসে। আর বাতাসে মরণ আহবান। যারা করুণ—তারা আরো বেশি করে বাজে। চারপাশে এত কলরব। এত কাছে গোলাপের ঘ্রাণ, পাচ্ছি না। দিকে দিকে লালসংকেত।

আপাতত, আমরা কেউ কারো দিকে ফিরছি না আর স্যাভলনে পুড়ে যাচ্ছে দেহ, কাম, বীজের আরাধনা। আমাকে একা পেয়ে ভয় দেখাচ্ছে ডাকিনী ও নমরুদ। হয়তো আরো বড় কোনো ক্রন্দন নিয়ে পড়ে থাকবে এই অঢেল অবসরে। হয়তো আরো কিছুদিন পাখিরা একাই উড়বে।

ফুঁসছে মরণবীনা—নগর থেকে দূর এই হেলেঞ্চার গ্রামে।


হোম কোয়ারেন্টাইন

কত কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। রোগ ও রোদ কড়া নেড়ে ডাকছে। আর চোখের গহ্বরে একটাই কোলাজ—জীবাণুর। এত কাছে ভয় ও অভিসম্পাত। এরূপ করুণ ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় আরো কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করি।

কাছাকাছি, সবজির বনে একটা ডালিম নিঃশব্দে ঝরছে। সকাল থেকে শুধু তার ঝরে যাওয়া দেখছি।


দেয়ালের পাশে আবদ্ধ সংলাপ

এখন, যতটুকু দেখা যায় তার বাইরে আকাশ। দেয়ালের পাশে আবদ্ধ সংলাপ, চিত হয়ে, মৃদু হয়ে, ভেতরের শ্বাস হয়ে আছে।

এখন ভেতরে, ভেতরের শ্বাস—বাইরে, বাইরের আস্বাদ একটি ক্ষণকালের দিকে মরণ আভাস, বিষবাহী সাপের চেয়ে ধাবমান।


মুখোমুখি

চিরহরিৎ বৃক্ষটি চেয়ে আছে—আমি চেয়ে আছি

আমি শেষকথা কি বলেছি? এখন দুর্যোগকাল— কম্পমান ভিতরপৃথিবী থেকে আমরা কি খুব দূরে সরে যাব এখন?

তবু দেখো, আমার বোধের থেকে যে উদগত ধ্বনি আছড়ে পড়ছে ঠোঁটে, তার নিহিত তাৎপর্য তোমার।


ওই বিফল বনে

আমাকে তুমি কী পান করালে—মৃত্যু ও দ্বিধা?

গনগনে এই আগুনের পা থেমে গেল ওই বিফল বনে, স্বরচিত পাপের ধারণায় মিশে।


মুহূর্ত

আজ বুঝেছি, কেন গোধূলি আর গম্ভীরতার দিকেই শুধু পৌঁছাই

দূরে কোথাও ভায়োলিন খুব বাজছে। ম্লান সে সুর-তরবারি। দিকের শূন্যরেখা ধরে এঁকেবেঁকে ছেয়ে আছে মাতাল পাথার। সেখানে একটিও ফুল ফুটে নেই। বহুকাল ফিরছি কোথাও। আকাশে, পাখিদের পালকের চলাফেরা দু একটি খসে যাওয়া পাতার মতন, পতনগামী। সমতলে আমার কোনো গন্তব্য নেই,

শেষ গোধূলিটির দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া।


চন্দ্রের মতো মোলায়েম

এখন হীনম্মন্যতাই হিন্দোল—নত হয়ে আছে মন। আর বাকি সব চন্দ্রের মতো মোলায়েম।

এ অবধারিত কালে পড়ে থাক ফটফটে পৃথিবীর ছায়া। অস্বচ্ছ আয়নার ভেতর দিয়ে মেলানো যাবে না কিছুই।

বরং প্রশ্ন করি, অপেক্ষার কত বাকি? এইসব শঙ্কা ও শবযাত্রার পাশে কারা জেগে থাকে?

কে অধিক?


প্রান্তরের হল্লা

আর কোনো ছবি নেই—দিকে দিকে অবনত মায়া। নত হয়ে আছে প্রান্তরের হল্লা। আর পেছনে সব ছায়া।


আমি, নাদান মেয়ে

মুঠো খুলে দেয়াই ভালো। যে যার নিজের দিকে সরে যাক।

আমি কি আমার অধীন? যে বাঁশি বাজছে নিয়ত, তার সুর আমার অনুগত নয়।

পৃথিবী নিয়তি সময় বালক সরে যায় ক্রমে।

আমার মন, আমাকে মানে না তোমার পাখি, তোমার অধীনস্থ নয়।

এরকম, একশত সত্যের পাশে আমি এক মেয়ে। মাথা নত করে দিচ্ছে অশ্রু। আর অফুরন্ত ছলনা।


একেকটা দিন সত্য হয়ে উঠছে

পরাজয় নিয়ে বসে আছি। প্রস্ফুটিত যত কলরব, সবই নব তরঙ্গের।

মাঠের দিকে হেঁটে যাই। ধীরে ধীরে অচেনা এক জগতের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছি। বাড়ির পথ ধরে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করি।

বাবা-মার সব চুল পেকে গেলে একেকটা দিন সত্য হয়ে ওঠে খুব। মিথ্যে বাহাদুরির ভিতর থেকে বের হয়ে আসি।

পাখিটা নেই। বৃষ্টি পড়ে, ঝুমকো জবার পাপড়ি গলে— গাছটা আর নেই। আসা-যাওয়ার রাস্তাটা কই? সে পথে বালক আর নেই।

একজন পুরাতনের কাছে, পুরাতনের দৃশ্যমান কোনো ছবি আর নেই।


গমন

তোমার দিকে যাচ্ছি মানে তোমার দিকে যাওয়া নয়। আমার জন্য অপেক্ষা করছে আরো কোনো বৃহৎ পাষাণ।

নুসরাত নুসিন

নুসরাত নুসিন

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৯০; পার্বতীপুর, দিনাজপুর। এমফিল গবেষক, ঢাকা...বিস্তারিত