চিহ্ন

এই ম্লান পৃথিবীর নক্ষত্রে খচিত কবি জীবনানন্দ দাশ-কে পেয়ারা বাগান ইলিশের ঝাঁক নক্ষত্রের নির্দেশ আমি এইসব সঞ্চয় করেছি দিগন্তবিস্তার গল্পে লিপ্ত অনেক পুরনো এক দুপুরের প্ররোচনায়। তখন রৌদ্র উজ্জ্বল সময়ের বিদ্যা নির্ণয় করে চলে বিগত আর আসন্নের ব্যবধান মানুষের যাপনতন্ত্রে ভোরবেলা আনে আমরণ দীপ্তি বিশেষত আলো ফোটার ছলে বস্তুত তুমি এসেছিলে। শার্টের হাতায় মুখের রৌদ্র মুছতে মুছতে ভোরবেলাটি কীর্তনখোলায় ভেঙে গেল। নদী যেমন বেলা ফুরাবার প্রতীক প্রেম নিতান্ত সময়ের পথিক! জেনেছে হারানো দুপুরের কথক তাকাবার সময় তাকাতে হয় নইলে চশমার কাঁচে চোখে রক্তের ক্ষয়। গৌতমের কন্যা ভুলে যেও না সময়ের ঝাউবনে দোদুল্যমান প্রজ্ঞার কথাসমাচার। তারপর অনন্ত নক্ষত্রবীথির দারুণ সভাসদ এই চাঁদ ছমছমে জাহাজঘাটে এল হুঁইসেল বাজিয়ে এই রাত বরিশাল আর সশব্দ চাঁদ আমাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেল। নদীবাহক মাকসুদ নিয়ে এল সময়ঘনিষ্ঠ পাপের তরিকা বন্ধুদের তল্লাটে আমি আগুনে প্রসিদ্ধ হলাম তবু আমার নিঃস্বতা ফুরালো না আমি আরো একা হয়ে গেলাম সেলাইকলের শব্দে। কাঠবাদামের মতন খোসা ছড়িয়ে দিয়েছিল প্রথা— আমার ল্যাপটপে যদি তুমি শুয়ে থাকতে পৃথিবীর ধ্বংস অবধি অবিচল প্রাত্যহিকতার মতন— জীবনবন্ধু কী বলো, আমার নিঃস্বতা কিছু কি হত লুপ্ত, ঋদ্ধি শোনাত কি সঙ্গমধুর গান? প্রেম চিরকাল সর্বহারার দলিত স্বাক্ষর আর অমোচনীয় ব্যর্থতার দস্তাবেজ তবে? তুমি আর আমি যখন যৌথ প্রেমে তখনো বেদনা থাকে গুপ্ত জীবাণুর মতন তুমি আর আমি যখন বিচ্ছিন্ন প্রেম তখন প্রকাশ্য হিংসার ব্যাকরণ প্রেম দ্বন্দ্বগঠিত সমাসের মতন চুম্বন আর দুঃখের বাহক। অথচ মানুষ জন্মায় আর যাচনা করে মৃত্যু অবধি নবীন প্রেম! তোমার মতন আমারও এভাবেই সর্বস্ব গেল ভ্রমের আনন্দে। এই হুইসেল কম্পিত চাঁদের আশ্রয়ে সর্বহারা শরীর সম্বল করে বহমান কীর্তনখোলার তীরে দাঁড়ালাম নামাজের ভঙ্গিমায়— ঢেউয়ের স্বত্ত্বাধিকারী হে নদী! আমার চোখের জল নিয়ে আমাকেও বয়ে নিয়ে যাও দিকশূন্য পাথারে। চিরতরে নিভিয়ে দাও দ্বন্দ্বে উত্থিত আবেগের দাহকুণ্ডলী। কীর্তনখোলার নৈর্ব্যক্তিক জলধারা আমার ব্যক্তিগত অশ্রুজল নিয়ে বয়ে গেছে নেয় নি আমাকে। বেদনার ভাষা দূরে প্রবাহিত বেদনার উৎস জাহাজের ডেকে—চাঁদের আওতাধীন দুঃখের সমীপবর্তী। মানুষটি কাঁদছে। আমি হুহু করে চোখ মুছতে মুছতে জনমদুঃখের শাস্ত্র পড়ছি সময়ের সংস্কৃতি আমাকে রেখে গেছে এই নদীঘাটে গতকাল বেঁচে থাকার স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ!
৩০ মার্চ ২০২০
শাহমান মৈশান

শাহমান মৈশান

নাট্যকার, নির্দেশক, অনুবাদক ও শিল্প-সমালোচক। সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার এন্ড...বিস্তারিত