রক্তপরদেশনামা

সনেট

কিভাবে দ্বিতীয় জন্ম, রূপমগ্ন, মৌন পরবাসে! আমাকে বিনাশ করে শ্রেণিহিংসা, যেন ইউসুফ স্বদেশ হারিয়ে একা, চুপ থাকি মূঢ় কারাবাসে। আমার ক্বলবে গুপ্ত হানা দেয় দ্বীপদেশি কূপ। আত্মাকে কেমন মূল্যহীন বেচে দিয়েছি আকামে শরীর আমার পরে নেয় মিথ্যা ‘বিদেশি’ গোপনে। যেন আর কোনোদিন ফিরব না হাওড় মাকামে আমার কবর হবে ছিন্ন ভিন দেশের বাগানে। তাই কবিতার গুহ্য মিরাকলে দিয়েছি ভাসায়ে ভাষার সাম্পান। রাত্রি হলে, যেন শান্ত শব্দজলে মেঘনা, যমুনা ক্লান্ত ভেসে আসে, জননী অভয়ে। কামেল ডালিম পড়ে মায়াকবিতার গাছতলে ফুলের গরিমা হয়, ফল পড়ে ঋতুর সঞ্চয়ে শীতের সকাল ফিরে আসে লাল আগুন পোহালে।

সনেট ২

লিখি রক্তপরদেশনামা, লিখি কবিতা নির্ভয়ে তোমার কলম সাক্ষী করো, দূর সাজাও ওপেরা। কোথাও জামিন পড়ে, কোথাও হাকিম নামে জয়ে। আমার কবিতা জান দেবে পলাশীর রক্ত-ঘোড়া। কখনো অচেনা কুঞ্জ, ভিনগ্রহ সালসা সাবিলা আমাকে উজাড় করে, নীরব পাগল করে কাজ। যতটুকু ঘুম অবকাশ, শুনি তরজা পহেলা। বন্দুকে স্বদেশ ফোটে, চাঁদ টিকা বিরহের তাজ। শরীরে যমুনা বহে, বহে ভাব, চিন্তা, রক্তমাংস তার কলোরোল থেকে জেগে ওঠে জননী বাঙলা। বিদেশ স্বদেশ যেন—এই গুপ্ত আবিদের অংশ জিন্দা মন, জিন্দা শব্দশিশু, কাব্যভাগ্য তারতিলা। ঘাসেতে বিছানা পাতি, ধ্যান করি সুবহে সাদিকে হৃদয় গহিন করে ফোটে বাংলাফুল দিকে দিকে।

সনেট ৩

জলপিয়ালের রোদে বসে গুপ্ত বাসনা পোহাব। তরল হয়েছে মন, আঙুরের রস পড়ে পায়ে সেই গন্ধে ছুরি, চাকু, তরবারি জঙ্গলে খোয়াব। ময়ূর, ময়াল, তারামাছ নেচে ওঠে মম গায়ে । তন্দুরআগুন ছেনে উষ্ণ নিয়ে এসেছি হৃদয় যেন দরবেশ ভাব গ্রীষ্ম, বর্ষা, নীলবর্ণ শীতে। মধুর আজান পড়ে কেটে যায় আগুনের ভয়। আমার স্নাতক দান—শস্যগাছ, ফল আগামীতে। বিছানা অবাধ্য করে, জাগো তুমি ফজরের পাখি সুজুদ ঘনায় তাসবিতে, ভাঙে পৃথিবী-বন্ধন দেখি ডাক শোনে নিদ্রামন, হাতে বাঁধে বোন রাখি। হাজারো ব্যঞ্জন, ঘরভরা মাছ—কুহকী রন্ধন। রাতে মুক্তি, রাতে কাটে মৃত্যুভয়, তৃষ্ণা অভিশাপ তুমি যুক্ত আমি যুক্ত, শুভ ঘটে শান্তি, মিলন প্রতাপ।

সনেট ৪

বিচে বিচে বেলা গেল, শোনো তুমি কাঁকড়া কানাড়া। হাঙর, স্ন্যাপার, বারামুণ্ডি দেয় সমুদ্র পেট্রোল যাও—ব্রা বনেটে, রমণীরা লজ্জা হারায় অধরা যারা থাকে দেহপাশে তারা লোভী, পুরুষ দুর্বল। দেখাবে সমস্ত কিছু, চাইলে দেবে না মধুবিষ রস, রক্ত, চক্ষুনাশ—সুন্দরের বিষম জারণে দাঁড়ানো পিস্তল থেকে পানি পড়ে, ক্লিন্ন জন্মশিষ। নরক পাতাল খুলে দেয় লাল হৃদয় হরণে। তাই চলে আসি দ্রাক্ষাকুঞ্জে, লাল ডালিম সভায় সেদিন উত্তাল মন, দূরদেখা—কাটল শরীর, যেন আমি পান করি লিথিজল হেমন্ত প্রভায়। পাই না পাই না দেখা, থাকে চিহ্ন মাটির তরীর। বিচবালি লুকিয়েছে রক্তফুল প্রিয় কারবালা ফিরে যাব, স্নেহ নেব, বাংলাদেশ সুজলা সুফলা।

সনেট ৫

ক্ষণিক আশ্রয় নেয় সুরে, কালো বেহেলায় লীন টোটেম যদিও নাই—তবু দীর্ঘ জারি রাখে জাতি। বাঙালি হাওড় থেকে উড়ে এসে বাহিরে রঙিন আত্মীয় স্বজন থাকে দূ্রে, বিদেশি-পড়শি, জ্ঞাতি। আসবে ব্রাদার কবে হাতি করে, তালপাতা ঘরে জেয়াফত দেবে ভাই বোন, বন্ধু আজনবি লোক। আমাকে যদি না চেনো তুমি, তবু নেব বুকে করে আমরা বাঙালি, সুখে দুখে থাকি বিদেশ ভূলোক। গোপন মরণ কেউ—বাংলাশত্রু, বেচে স্বাধীনতা বাড়ির স্বজন করে ভিনদেশি, হাতে দেয় ফুল। ভারত বর্ষের এই অমোঘ নিয়তি, নেই ত্রাতা জানে না কে শত্রু, মিত্র, কে-বা করে যত ভুল। লড়াই করেছি হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ! আমরা বীরের জাতি, করি ভাই নিধনের যুদ্ধ!

সনেট ৬

আহুর মাজদা দেশে সপ্তভাষা, রংধনু নামে। বেটি বেটিকে বিবাহ করে। তারা বিদ্বেষী কিতাবে। হারায়েছে গুপ্তধন, মাজাভাঙা পুরুষ। না-কামে হয়েছে সংগীতপ্রেমী, স্বপ্ন মাপে মধুর শরাবে। বিলাস বিলাস করে—মার্বেলের সাদ্দাদ মহলে আদিম নগর যেন, খুলে আদ সামু‌দ, শাদারা। আফ্রিকা, ভারত লিপ্ত, গোত্রহীন, ভূগোল গুগলে উত্তর দক্ষিণ আত্মহারা, খুলে উলুরু সাহারা। আমার ভবনে উড়ে ঐশীবাণী পাখির জামাত আয়না অধীর কথা বলে, ঘুরে জননীর ছায়া জঙ্গলে শৈবালে মাতৃগন্ধ, জাগে গোলাপহায়াত। রাত্রির প্রপঞ্চে ঘুরে দুধমুখ, অপরূপ মায়া। ভিড়ের ফিতনা ছিঁড়ে সন্তানের হাতের মেহেদি সুজুদে পানাহ, মাংসযুদ্ধে মন যখন জিহাদি।

সনেট ৭

সময় কর্পূর—নদীস্রোত, মৃত্যুচিহ্ন বহমান ঘুমের অঘুমে সাপে কাটে অভিযোজনের ছুরি। পাহাড় ভ্রমণ করি, জায়মান আমার হায়াত। সকাল বিকাল ডলারের খোঁজে কত রাস্তা ঘুরি। ট্রেন কি এসেছে তেড়ে, ঘোড়াবেশে শীতের বরফে? নাকি দূত-ফারিস্তা নিয়েছে কেড়ে মেঘের স্টেশন! আমার ফেরারি লেখা ভাসে মেঘে, অমোঘ হরফে। একদিন জুম্মাবারে নিয়ে নেব সমাপ্তি আসন। শুনেছি তিতির, কুকাবুরা ডাক সাপের সকাশে প্রবাসে জননী আসে সকালের আলপথ নেমে। আপেলে-জিঙ্গেল বাজে, রক্ত পড়ে ঝুলন্ত জিসাসে। আমার কবিতা গুপ্ত-স্তরীভূত পাথরের খামে। আসো তুমি মিশে দেখো যুদ্ধদেশ, কস্তুরী সুঘ্রাণ তোমার দ্বিতীয় জন্ম হোক, সাঈদীয় কবিতার প্রাণ।

সনেট ৮

কোথাও দাওয়াতের জন্য উঠে পড়ব সকালে। তিতির পাখির স্নেহে কোলাকুলি দেবো পরস্পরে। বলব—পিঞ্জর খোলো, ধানজল লাগাও জোয়ালে। গাছ থেকে গাছে কাকাতুয়া নাচে ব্লুগাম প্রহরে। যেনবা এসেছে শুভকাল, খোলাফায়ে রাশেদিন বলছে—সালাত করে দাও, জীবন পরীক্ষা শুধু। কুল্লু নাফসিন জায়াকাতুল মওত—রাত্রিদিন ভালো না খারাপ জেনে যাবে চক্ষু নামলে ধু-ধু। আমার হয়েছে যাত্রা—আননুর কোরান কালাম জ্বলছে বুকের বাড়ি, শুচিকাম হবে তাহাজ্জুদে। থাকে অবিনাশী যুল জ্বালালি ওয়াল ইকরাম। ঈমান জব্বর, শিক্ষা নিই আল্লাহর তাওহীদে। ছিলাম গাফেল বড় দ্বীনহীন—মগ্ন বাংলাদেশে কফিন খুলেছে, বৃষ্টি পড়ে ধীরে, পাথর-আকাশে ।

সনেট ৯

পরকীয়া করি নাই আমি, তবু জ্বলি আরব রমণী। তোমার জৌলুসে রক্ত ঝরে, আমি পাগল কায়েস তোমাকে আবির করে পেতে গিয়ে সীমানা মানি নি। কী খুন লুকিয়ে রাখো চোখে, ছাই আমার খায়েস। আমার ক্বতল হলো—ভরাবুক, স্বর্ণআপেল নড়নে যেনবা কামান-গোলা উড়ে আসে মাটির শরীরে। ‘লাইলি’ ‘লাইলি’ ফোটে অবিরাম আমার মরণে তোমাকে দেখার স্বাদ থাকে গুপ্ত, আমার কবরে। বিবাহিত আমি, তবু বিবাহিত নই তোমার সুন্দরে আমাকে ফাঁসিতে দাও, মারো, না হয় চড়াও শূলে। পুড়ুক আমার দেহ, আমি রুটি—তোমার তন্দুরে। তুমিও আপন, বধূ সাজো বাঙালি রমণীকুলে। বিশ্বাসী পুরুষ আমি, অধিকার হালাল নিকাহ বাঙালি আরব করে প্রেম, শুরু প্রথম বিবাহ।

সনেট ১০

গোপন শহিদ আমি, মরে যাই, ভাষার বাগানে হিংসার কার্তুজ ফোটে কবিতার লাল সীমানায়। আমার নিখোঁজ পাখি খুঁজে বাসা আকাশে, দক্ষিণে। যা চাই তা নাই, শব্দ লুপ্ত, জান নগ্ন তড়পায়। নিজেকে হারিয়ে খুঁজি নিজের ঠিকানা, দেশ-বাড়ি। এসেছে কি দূর খলিফা? লন্ঠন জ্বলে ওঠে ঘরে? আমাকে কি দেবে সঙ্গ, অশ্বারোহী, তৌহিদ শিকারি? নতুন জীবন নেব, অগ্নি জ্বেলে শব্দ-অন্ধকারে। জানি আলো নেভে, বাজু নড়ে ক্রূর করাত কলের। লাখো প্রাণ ঝরে গেছে, যুদ্ধক্ষেত্র—কফিনের গান। জ্বালিয়ে রেখেছি সাদা পতাকা কামিন, শান্তি ফের পাথরের বুকে পানি আসে, গলে বেভুল শামান। সীমানা পেরিয়ে যাই নীল নদ কেটে, কাঁপে শ্বাস দূরে পড়ে থাকে অভিশপ্ত ফেরাউন, রামেসাস!
১৫/০৭/২০২০ - ০৫/০৯/২০২০ সিডনি, অস্ট্রেলিয়া
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

জন্ম ৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫; কিশোরগঞ্জ। পৈতৃক নিবাস রায়পুরা, নরসিংদী। ইংরেজি...বিস্তারিত