কবিতার দিন শেষ হইছে। আবার কবিতার দিন শুরু হইছে। আমার কথার মধ্যে একটা হেঁয়ালি আছে, কিন্তু সামনে আগাইলে এর অর্থ ধরা কষ্টকর হইব না। আশির দশকে যারা কবিতা লিখতে আসছিল তারা বলত, বাংলাদেশে তারা কবিতাকে অকবিতা থেইকা মুক্তি দিবে, তারা কেবল কবিতাই লিখবে। কেন তারা এমন কথা বলছিল? এর আগের দশকের কবিতা কি তাহলে কবিতা ছিল না? স্বাধীনতার পরের দশক, সত্তরের দশকের কবিতাকে যে দোষে দোষী করা হয়, যেমন— ভাবে এবং ভাষায় অতি সমাজ- বা রাজনীতি-মনস্ক, বাকসংযমহীন, সরল আত্মমগ্ন, মেধা-মননহীন, স্লোগানমুখর এবং আঙ্গিকে (ষাট দশকীয়) খোলামেলা, ভঙ্গুর—এইসব অভিযোগের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া আশির দশকের কবিরা কবিতাই লিখবে বা কবিতাকে অকবিতা থেইকা মুক্তি দিবে। কিন্তু কী হইল? তারা আসলে সত্তর এবং আশির দশকের কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের কবিতাই লিখল! তাদের কবিতা আর পশ্চিমবঙ্গের কবিতার ভাব, ভাষা, রূপ, বিষয় এবং নির্মাণ খুব কাছাকছি চইলা আসলো। এইটা হইল কেন? এইটা তো হইবার কথা ছিল না। বাংলাদেশের কবিরা যে পথ হারায়া ফেলল, তারা তাদের নিজেদের পরিচয় মানে তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মগত পরিচয়কে যেন অস্বীকার করল। তারা ধর্মে, অধর্মে, শিক্ষাদীক্ষায়, ভাষা এবং বচনে পশ্চিমবঙ্গ সাহিত্য-ডোমেইনের সাথে এক হইয়া গেল। এই যে তাদের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস এইটা একদিনে হয় নাই, সেইটা অনেক আগে থেকেই শুরু হইছে। সেই পলাশীর যুদ্ধে মুসলমানের পরাজয়, ইংরেজদের কাছে ক্ষমতা চলে যাওয়া, তারপর বাঙালি হিন্দুদের উত্থান, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনের আওতায় বাঙালি হিন্দুরা যখন নিজেদেরকে চিনতে শিখল। তাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মিথ, পুরান ইংরেজ সাহেবদের মাধ্যমে পাইল, তারপর নিজেদেরকে একটা ভারতীয় (হিন্দু) সভ্যতার কাছে সঁইপা দিল। আর সেইটা উনিশ শতক, বিংশ শতক পার হইয়া এই একবিংশ শতাব্দীতে আইসাও আমাদের বাংলাদেশি কবিরা ধইরা রাখল বা পাইল।
রাশিয়ার মা, মাটি এবং খ্রীস্টীয় ধর্মের সাথে নাড়ির টান না থাকলে আলেকজান্ডার পুশকিন ‘দ্য ব্রোঞ্জ হর্সম্যান’ বা ‘ইয়েভেজেনি ওনেজিন’, লিও টলস্টয় ‘ওয়ার এন্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা’ এবং দস্তয়েভস্কি তার মাস্টারপিস ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ লিখতে পারত না।
২
তার ‘পলিটিক্স’ বইতে অ্যারিস্টটল বলছেন যে মানুষ একটা রাজনৈতিক প্রাণী, কারণ সে ভাষা-ব্যবহারকারী এবং নীতি-নৈতিকতা-সচেতন একটি সামাজিক জীব। সুতরাং লেখাও তাই। লেখা মানুষ বিচ্ছিন্ন না, তাই লেখা ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজ, রাজনীতি, নিজস্ব ভাষা এবং নিজের সাংস্কৃতিক সাইকিকে ধইরা আগায়। এইটা কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে কাজ করে যখন তারা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হয়, যখন তারা ভাব এবং চিন্তায় স্বাধীন হয়। পরাধীন মানসিকতার লেখকদের লেখায় শৌর্য-বীর্য থাকে না। তাদের লেখায় আধ্যাত্মিকতাও থাকে না, কারণ তারা আত্মবিচ্ছিন্ন, তারা নিজের শেকড়, নিজের পরিচয়ের সাথে নিজেদেরকে একাত্ম করতে পারে না। রাশিয়ার মা, মাটি এবং খ্রীস্টীয় ধর্মের সাথে নাড়ির টান না থাকলে আলেকজান্ডার পুশকিন ‘দ্য ব্রোঞ্জ হর্সম্যান’ বা ‘ইয়েভেজেনি ওনেজিন’, লিও টলস্টয় ‘ওয়ার এন্ড পিস’, ‘আনা কারেনিনা’ এবং দস্তয়েভস্কি তার মাস্টারপিস ‘ক্রাইম এন্ড পানিশমেন্ট’ লিখতে পারত না। তাই ঠিক লেখা হইল একটা লড়াই, একটা রাজনীতি, একটা দায়বদ্ধতা—প্রথমে নিজের কাছে, পরে দেশ, জাতি এবং বিশ্বের কাছে। মনে কইরা দেখেন একদিন বাঙালি মুসলমানেরা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ১৯০৩ সালে ব্রিটিশ রাজের কাছে বঙ্গভঙ্গের দাবি জানাইছিল। বেশিদিন আগের ঘটনা না। একশ বছর পিছাইয়া থাইকা যে শূন্যতার সৃষ্টি হইছিল সেইটা তাদেরকে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাহিত্যিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে পিছাইয়া রাখছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে মুর্শিদাবাদ থেকে সইরা গিয়া যখন কলকাতা ইংরেজদের রাজধানী হইল তখন শিল্প-কারখানা মানে অর্থনীতির চাকা বা সভ্যতার আলো সেই কলকাতায় আইসা লাগল। আমাদের পূর্ব বাংলা ছিল কাঁচামাল সরবরাহের দেশ। তাই অর্থনৈতিক দিক দিয়া বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হইতে পারে নাই। যখন ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কারণে একটা সুযোগ আসল তখন সাম্প্রদায়িক, উচ্চ বর্ণের বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকেরা এইটা মাইনা নিতে পারে নাই। তাই বঙ্গভঙ্গ বেশিদিন টিকে নাই। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বঙ্গভঙ্গ বন্ধের আন্দোলন করছিলেন। কইবেন কবিতার সাথে এইটার সম্পর্ক কী? আছে আপনি বাঙালি মুসলমান, আপনার তো নিজেদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য জানতে হইব। নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতার পদ্ধতি না জানা থাকলে ভালো কবিতা লিখতে পারবেন না।
বাংলাদেশের কবিতা ঐতিহাসিকভাবেই সাব্জেক্টিভ না, অব্জেক্টিভ মানে বাইরের ঘটনা, বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়া বেশি তাড়িত। যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ।
৩
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জন্ম নেওয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদিতার সাথে মুসলমান জাতীয়বাদিতারও জন্ম হইল। নানাবিধ আন্দোলনের হাজির থাইকা মুসলমানেরা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান পাইল। উদ্দেশ্য নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতি, শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য চাকরিগত সুযোগসুবিধা লাভ। কিন্তু এইখানে তেমন কিছু হইল না। কারণ বাঙালি মুসলমান এক নির্যাতন থেইকা আর এক নির্যাতনে আইসা পড়ল। এই সময়, এই পূর্ব বাংলা মানে আমাদের বাংলাদেশে, যাদেরকে আমরা চল্লিশের দশকের কবি বলি, যেমন— ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন এবং আহসান হাবীবের মতো স্বকীয় ভাব এবং ভাষার কবির আগমন। ইসলামিক আদর্শ এবং ঐতিহ্যের কবি ফররুখ আহমদ ছাড়াও, কবি আহসান হাবীব এবং সৈয়দ আলী আহসানের কবিতায় পূর্ব বাংলার মাটি, রূপ, গন্ধ, সমাজ মানুষের স্পর্শ পাওয়া গেল। আসলে বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে চল্লিশের দশক যে নিষ্ঠা এবং প্রতিজ্ঞা নিয়া আসছিল তার কোনো তুলনা নাই। কারণ এই সময়ের এই তিন কবির কবিতা ত্রিশের কবিতা থেইকা আলাদা হইয়া ঠিক বাংলাদেশের কবিতা হইয়া উঠছিল। বিশেষ কইরা আহসান হাবীব এবং সৈয়দ আলী আহসানের কবিতা। তাদের কবিতায় না পাওয়া যায় তিরিশি অবক্ষয়ী আধুনিকতার ব্যাধি-গন্ধ, না দেখা যায় ভারতীয়তার উদীয়মান প্রতিমা। ফররুখের রোমান্টিকতা এবং তার কবিতার শৈলীর সাথে সাথে আহসান হাবীবের স্বদেশলগ্ন, মগ্ন আর্তি, আলী আহসানের ঋজু এবং প্রগাঢ় উচ্চারণ বাংলাদেশের কবিতাকে দিছিল একটা ভূমিজাত, বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয়, ঐতিহ্যগত বলিষ্ঠ উত্তরাধিকারের অঙ্গীকার। কিন্তু এইসব কিছুর ভাটা পড়ল পশ্চিম পাকিস্তানি বর্ণবাদী প্রশাসকদের নিপীড়নমূলক রাষ্ট্র-পরিচালনার কারণে। আর একটা কথা এখানে স্মরণ রাখা জরুরি—বাংলাদেশের কবিতা ঐতিহাসিকভাবেই সাব্জেক্টিভ না, অব্জেক্টিভ মানে বাইরের ঘটনা, বিশেষ করে রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়া বেশি তাড়িত। যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ।
তাই বাংলাদেশের কবিতায় বিজ্ঞানের নাম কইরা নাইমা আসলো অজ্ঞেয়বাদ, প্রশ্ন, সন্দেহ এবং সর্বশেষ নাস্তিকতা! তাই তো দেখি পঞ্চাশের কবি শামসুর রাহমানের হাত ধরে লিখিত হইল আধুনিক কবিতা মানে কিছু ধর্মনিরেপেক্ষ কবিতা তথা ধর্মবিরোধী কবিতা।
৪
১৯৫২ সনের ভাষা আন্দোলন একটা হঠাৎ গজানো আন্দোলন ছিল না। এইটার মধ্য দিয়া পূর্ব বাংলার জনগণের কয়েক বছরের ক্ষোভ একটা পলিটিকাল রূপ পাইল। সবচেয়ে বড় কথা হইল এইটা সেই কালমিনেশন পয়েন্ট যার মধ্য দিয়া বাঙালি মুসলমান জুলুমের বিরুদ্ধে শক্তভাবে দাঁড়াইবার প্লাটফর্ম পাইল। কিন্তু যেইটা হইল সেইটা ছিল বাংলা ভাষা-কেন্দ্রিক, জাতিবাদী আন্দোলনের প্রথম ছবক। বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত তাদের ক্রমশ ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ এই ভাষা আন্দোলন দিয়া ঘটালো। এইটার প্রতিক্রিয়া ব্যাপক হইল।
এক, চল্লিশের দশকের আদর্শবাদী কবিতা থেকে সইরা গিয়া বাংলাদেশের কবিতা ত্রিশের আধুনিক কবিতার সাথে যোগ দিল। দুই, কবিতার ভাষা এবং বিষয় বদলাইয়া গেল। বাংলা ভাষা নিয়া পশ্চিম পাকিস্তানি জুলুমবাদী, বর্ণবাদী প্রশাসন যে ষড়যন্ত্র শুরু করছিল এবং যার ফলে দেশের মুসলমান কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী সবাই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে দাবি এবং রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা সংরক্ষণ—তার মধ্যে দিয়া কবিতার সাইকি, রূপ, ভাষা সবই পরিবর্তিত হইল। তো সেই সময় যারা কবিতা লিখতে আসে তাদের মধ্যে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ এরকম অনেকেই বাংলাদেশ, বাঙালির জাতিগত পরিচয়, ভাষা, দেশীয় রূপ, বৈচিত্র্য এবং জনসংস্কৃতি নিয়া লিখলেন। কিন্তু ধর্ম নিয়া কবিতা লেখা একটা ট্যাবুর মতো হইল। ষাটের দশকে আইসা মুসলমানি কবিতা লেখা প্রায়ই থাইমা গেল। কবিতায় ঘোষণা দিয়া আধুনিকতার নামে ধর্মনিরপেক্ষতা (পড়েন ইসলাম ধর্ম বাদ দিয়া) আমদানি হইল। আমাদের বাম-রাজনীতিবিদরা ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বইলা চালাইয়া দিল। এই সময়ে, এই যে বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় মূল্যবোধের এপিস্টেমিক পরিবর্তন, এইটা থেকে বাংলদেশ আর সহজে সরে আসলো না। হঠাৎ কেন কবিতায় ধর্মনিরপেক্ষতা হাজির হইল? ভাইবা দেখার বিষয়। খুব সম্ভবত পঞ্চাশের দশকের পশ্চিম বঙ্গের মার্কসিস্ট রাজনীতি লেখক-কবিদের মনে সমাজতান্ত্রিক রোমান্টিকতার স্বাদ পাওইয়া দিছিল। কার্ল মার্ক্সের সেই বিখ্যাত বচন—ধর্ম আফিমস্বরূপ—যেইটা আসলে তার কথা না। মার্ক্স এই রকম কিছু বলে নাই। ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের সময়ে তার দেখা প্রলেতারিয়েত জনগোষ্ঠীর অতিমাত্রায় খ্রিষ্টীয় ধর্মের সাফারিং এবং প্যাশেন্টের নির্যাসকে লালন করার কারণে তাদের মনে একরকম যে বিপ্লব-শিথিলতা আসছিল সেই পরিপ্রেক্ষিতে মার্ক্স বলছিলেন ধর্ম কতটা ব্যথা-নিরোধক। যা হোক, মার্ক্সের ভুল ব্যাখ্যা এবং বাম-রাজনীতির ইসলাম ধর্মবিরোধী প্রোপাগান্ডা মুসলমান কবিদের বিশ্বাসে চিড় ধরাইল। তাই বাংলাদেশের কবিতায় বিজ্ঞানের নাম কইরা নাইমা আসলো অজ্ঞেয়বাদ, প্রশ্ন, সন্দেহ এবং সর্বশেষ নাস্তিকতা! তাই তো দেখি পঞ্চাশের কবি শামসুর রাহমানের হাত ধরে লিখিত হইল আধুনিক কবিতা মানে কিছু ধর্মনিরেপেক্ষ কবিতা তথা ধর্মবিরোধী কবিতা। তখনও কবি আল মাহমুদ সমাজতন্ত্রের ছায়াতলে আছেন। লিখলেন সোনালী কাবিন, কালের কলস এরকম সমাজতান্ত্রিক ধারার কবিতা। আল মাহমুদকে কারাগারে যাইতে হইছে তার বিশ্বাসগত পরিবর্তনের জন্য। তাও অনেকদিন পর। পবিত্র কোরান পইড়া তার মানস-জগতের পরিবর্তন আসলো (বলা যায় তার আনকনশাস জাইগা উঠল) এবং আমরা পাইলাম ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র মতো অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ। এখানে আর একটা ঘটনা না বললেই হয়। ইউরোপ এবং ভারত থেকে আগত জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং দর্শন সম্পর্কিত পুস্তক পঠন-পাঠন হইল, আধুনিকতা তথা ব্যক্তির আত্মিক মুক্তির নাম করে প্রচুর ইসলামবিরোধী ব্যাখ্যা-বয়ান দেওয়া হইল এবং লেখা হইল। একই সাথে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালি মুসলমানের অধিকার আদায়ে বাধ সাধল। ইসলাম এবং পাকিস্তানিদের ধর্ম এক হইল না। পাকিস্তানি শাসকদের জীবনে কোরানিক এবং নবীজির ইসলামের মিল পাওয়া গেল না। ইসলামে যেখানে মুসলমান-মুসলমান ভাই-ভাই বলা হইছে, পাকিস্তানিরা সেই ব্যাখা-বয়ান নষ্ট করে সেখানে বাঙালির ভাষা, বর্ণ এবং সংস্কৃতি বিদ্বেষ জারি রাইখা ন্যায়নীতি থেকে সইরা আসলো। উপরোক্ত ডিসকোর্স-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সৃষ্টি এবং বাঙালি মুসলমানের বাঙালিত্ব অর্জন এবং পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির সাথে দ্বন্দ্ব এবং জুলুম অবসানের কালমিনেশন পয়েন্ট হইল ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রচার এবং প্রচারণা এত হইল যে কবি-সাহিত্যকেরা ইসলামকে বরং প্রতিপক্ষ মনে করল।
৫
বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটা বিরাট ঘটনা। কিন্তু তার চাইতে বেশি বড় ঘটনা হইল ধর্মকেন্দ্রিক পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পরও কেন ইসলাম ধর্ম ঠিক শিল্প-সাহিত্যে তেমন করে জায়গা পাইল না—এই হিসাব। এইটার নিশ্চয় একটা পলিটিকাল এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ আছে। কবি ফররুখ আহমদ, যিনি ইসলামিক আদর্শবাদী রাষ্ট্রের কথা ভারত-ভাগের আগে কল্পনা করতেন এবং তার ‘পাঞ্জেরী’ কবিতায় যা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাও তিনি বুঝলেন যে পশ্চিম পাকিস্তানিরা ইসলামসম্মত ঠিক ধার্মিক নয়। বরং একটা বর্ণবাদী চোখ দিয়া পূর্ব বাংলার মানুষগুলিকে দেখত। ফলাফল কী হইল? সেই উনিশ শতকে সৃষ্ট হিন্দু-ধর্মজাত বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ যেন পুর্ব বাংলার মিডলক্লাস মানুষদের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়া উঠল। এই সমস্ত কিছু হইল বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কারণে। কে এই মধ্যবিত্ত? কী তাদের পরিচয়? তারা সেই মধ্যবিত্ত, যারা বাংলা ভাষাজাত সংস্কৃতিকে তাদের মূল শক্তি বিবেচনা করে পাকিস্তানিদের চাপাইয়া দেওয়া জুলুমের বিরুদ্ধে লড়ছিল। বঙ্কিম এবং রবীন্দ্রনাথ যাদের সাংস্কৃতিক থিঙ্কট্যাংক। তাদের কাছে যাহাই বাংলা, যাহাই বাঙালি সংস্কৃতি তাহাই তাদের পরিচয়। মানে তারা অর্ধেক হইয়া গেল। মুসলমান বাঙালি থেইকা শুধু বাঙ্গালি হইল অথবা জাতে বাঙালি থাইকা কালচারাল মুসলমান হইল। এইটার ঐতিহাসিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ হইতে পারে বাঙালি মুসলমানের ইসলাম ধর্ম এবং ইসলামিক ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি উন্নাসিকতা, যা হইছিল কিছুটা অজ্ঞানতার কারণে এবং কিছুটা ভৌগোলিকভাবে হিজাজ থেইকা দূরে, ভারতীয় হিন্দু সভ্যতার কাছাকাছি থাকার কারণে। হিন্দু সংস্কৃতিঘেঁষা আমাদের যে বাংলা সাহিত্য, তাতেই বাঙালি মুসলমানের অবগাহন হইল, তাতেই তাদের সাহিত্যিক পরিচয় গইড়া উঠল। তাই পঞ্চাশ ষাট এবং সত্তর দশকের কবিতায় ইসলামিক এলিমেন্ট স্বাধীনভাবে ফুইটা উঠল না। বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক সাংস্কৃতিক প্রচার এবং প্রচারণা এত হইল যে কবি-সাহিত্যকেরা ইসলামকে বরং প্রতিপক্ষ মনে করল। তারা সুনীল, শঙ্খ, শক্তি, বিনয় ইত্যাদির মুরিদ হইল। এইসব কবিরা নিজেদেরকে আধুনিক দেখাইল, কিন্তু মেধা এবং মননে, ইতিহাস এবং ঐতিহ্যে ভারতীয়, এবং হিন্দু বাঙালি সভ্যতাকে লালন করল। এই কারণে সেই সময়ের বাঙালি মুসলমান কবিরা তাদের পরিচয় বুইঝা না বুইঝা হারাইল। আর এই ধারাই উত্তরাধিকারসূত্রে পরবর্তী কবিরাও ধইরা রাখল।
এতে যে কুফল হইল তা হইল তারা অধিকাংশই ভারতীয় কবিতা লিখল, নিজেদের খণ্ড পরিচয়ে লিখল। বিশেষ কইরা সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি শোয়েব শাদাব, বিষ্ণু বিশ্বাস, জুয়েল মাজহার, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শান্তনু চৌধুরী, ফরিদ কবির, সাজ্জাদ শরিফ সহ অন্যান্য কবিদের কবিতার নাড়ি ধরে টিপ দিলেই আমার কথার সত্যতা মিলবে।
৬
শুরু করছিলাম বাংলাদেশের আশির দশকের কবিতার কথা দিয়া। এই দশকের কবিতা যে জায়গাটায় জোর দিছিল, মানে এক রকম স্লোগান দিয়া শুরু করছিল সেইটা হইল কবিতাকে তারা কবিতার কাছে নিয়ে আসবে। বুঝলাম ষাট এবং সত্তরের কবিতা বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, উত্তাল রাজনীতিমুখর আর্থ-সামাজিক সমস্যার কারণে কিছুটা আলগা হইয়া গেছিল, মেধা-মননশূন্য, খোলামেলা হইছিল। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নতুন দেশের চেহারা-সুরত তেমনভাবে ফুইটা উঠে নাই, তাই কবিরা বাংলাদেশের একটা স্থির ছবি পাইতেছিল না। তার সাথে ছিল সর্বগ্রাসী প্রশাসনিক এবং রাজনিতিক অনিয়ম এবং অস্থিরতা। সেই মুহূর্তে বাংলাদেশের কবিকুলের ভাষা হইল সময়ের ভাষা, প্রডাক্ট অব ক্রাইসিস। কিন্তু আশির দশকের কবিরা যেইটা করলো সেইটা হইল—তারা ফিরে গেল সেই ভারতীয়তায় তথা সেই হিন্দু বাঙালির ভাব, ভাষা, টোন এবং মন মেজাজ ধরে রাখা পশ্চিমবঙ্গের কবিতার কাছে। তখন উভয় বাংলায় লিটলম্যাগ এবং কলকাতা-ঢাকা যাওয়া-আসার কারণে উভয় দেশের কবিদের মধ্যে যেই যোগাযোগ গইড়া উঠছিল তার ফলাফল হইল বাংলাদেশের নগরভিত্তিক কবিদের এক ধরণের ভারতীয় কবিতা লেখা। তার সাথে সাথে যোগ হইছিল ছদ্ম-আধুনিকতার নামে তাদের ইসলামবিরোধী অবস্থান। কবিদের ছিল এইটা বাঙালি জাতীয়তাবাদ-ভিত্তিক, একটা সাম্প্রদায়িক অবস্থান। পশ্চিমবঙ্গের কবি বিশেষ কইরা মৃদুল দাশগুপ্ত, রণজিৎ দাস, জয়দেব, জয় গোস্বামী, গৌতম বসু, গৌতম চৌধুরী ইত্যাদি যেমন তাদের শেকড় সন্ধান করছিল তাদের হিন্দু ধর্মে ও মিথে, তাদের দেখাদেখি বাংলাদেশের লিটলম্যাগ কবিরাও তাদের পিছু পিছু ছুটল। তাদের চিন্তা, ভাব, ইতিহাস, ঐতিহ্যে একীভূত হইল। এতে যে কুফল হইল তা হইল তারা অধিকাংশই ভারতীয় কবিতা লিখল, নিজেদের খণ্ড পরিচয়ে লিখল। বিশেষ কইরা সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবি শোয়েব শাদাব, বিষ্ণু বিশ্বাস, জুয়েল মাজহার, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, শান্তনু চৌধুরী, ফরিদ কবির, সাজ্জাদ শরিফ সহ অন্যান্য কবিদের কবিতার নাড়ি ধরে টিপ দিলেই আমার কথার সত্যতা মিলবে। অবশ্য কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন। খোন্দকার ফিরে গেছিলেন নিজ দেশের—বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য-আশ্রিত লোকজ ধারাটির কাছে। যেইটা বলছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের সেই সময়ের কবিদের কবিতা ছিল তাদের হিন্দু সংস্কৃতি-ভিত্তিক, তাদের হিন্দু পুরাণ-ভিত্তিক, ছিল ব্যক্তিগত অসুখ, অসুস্থতা, নিউরো ডিসঅর্ডার-ভিত্তিক। যেমন সেই সময়ের পপুলার কবি জয় গোস্বামীর অধিকাংশ কবিতাই ছিল নিউরো ডিসঅর্ডার এবং সেলফ হার্মের কবিতা। বাংলাদেশের আশির দশকের কবিরা যেহেতু আত্মপরিচয়-বিশ্রুত ছিল, ছিল দ্বিখণ্ডিত, তাই তাদের কবিতা বাংলাদেশের না হইয়া হইল ভারতীয় কবিতা।
উত্তর-আধুনিকতার নামে যেইটা হিন্দু ধর্ম এবং পুরাণ-ভিত্তিক কবিতা হইল সেইগুলিরে অঞ্জন সেন, তপোধীর ভট্টাচার্য, ইজাজ ইউসুফী এবং খোন্দকার আশরাফ হোসেন মৌলবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল বইলা ট্যাগ দিল না।
৭
তারপর আসলো নব্বইয়ের দশক। মিলিট্যান্ট একনায়কতন্ত্র, অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, হঠাৎ উদয় হওয়া উদার বাজার অর্থনীতি, পুঁজিবাদী মুনাফালোভী অসৎ মানুষের কাজ, কারবারির ফলে মূল্যবোধহীন, উদ্দেশ্যহীন ব্যাক্তি-মানুষের উত্থান, পারিবারিক ভাঙন, অস্পষ্ট ভবিষৎ—ঠিক এই ব্যাকগ্রাউন্ডে হাজির হইল নব্বইয়ের দশক। কবিরা সমাজবিচ্ছিন্ন নয়, তাই তাদের জ্ঞান, দর্শনে এল সমাজবিচ্ছিন্নতা, আত্মমগ্ন, ফ্রাগমেন্টেটেড জীবন-ধারা। সমাজ এবং রাজনীতি-সচেতনতার বদলে তারা ডুব দিল কিছুটা সিগমুণ্ড ফ্রয়েড কথিত (unconscious mind) অবচেতন মনে। সেই অবচেতন মন যেখানে চিন্তা, স্মৃতি এবং আবেগ ধীরে ধীরে জমা হয় এবং তা এক সময় সচেতন মনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে বিশেষ ভাষায় প্রকাশিত হয়। তাই এই প্রেক্ষিতে, নব্বইয়ের কবিরা সমাজ এবং রাজনৈতিক কমিটমেন্টের ভাষায় না গিয়ে অনেকটা ফ্রাগমেন্টেটেড, কোলাজধর্মী, স্ট্রিম অব কনশাসনেসের ভাষার কবিতা রচনায় হাত দিল। তাদের কবিতা আবার আশির দশকের কবিতার মতো ঠিক ভারতীয় সাইকিরও হইল না। আশির কবিতা যেমন ভাবে এবং ফর্মে কেন্দ্রমুখী, ফিক্সড, নব্বইয়ের কবিতা-ভাবনা বিচূর্ণ করে ছড়িয়ে পড়ল বোধের বিবিধ আয়নায়। জন্ম নিল কেন্দ্রহীন, ডিসেন্ট্রালাইজড কবিতা। তখন বাংলাদেশে উত্তর-আধুনিকতা আন্দোলন প্রবল বেগে চলছিল। একবিংশ, লিরিক, সকাল ইত্যাদি লিটলম্যাগের মাধ্যমে আমরা দেশজ সংস্কৃতি, ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য এইসব কনসেপ্টের সাথে প্রান্তিক তথা সাব-অল্টার্ন মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং পরিপেক্ষিত কবিতায় ব্যবহারের কথা চিন্তা করলাম। বিশ্বাসকে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় যেমন দূরে সরাইয়া দেওয়া হইছিল মূর্খতার কারণে, এপিস্টেমোলজিকাল অজ্ঞতার কারণে, কিন্তু উওর-আধুনিক কবিতাকালে লোকজ বিশ্বাস, বিশেষ করে হিন্দু মিথ, পুরাণ, লোকগাথা কারও কারও কবিতায় আসন গেড়ে নিল। সাথে সাথে কবিতার ভাষা, বিষয়, অনুষঙ্গ তার টেকনিক, রূপায়ণ, ভেতর-বাহির কিছুটা পশ্চিমা পোস্টমর্ডান ঢঙে হইল। তার ফলে একটা নতুন বিপদ দেখা দিল। মানুষ কবিতা থেকে আরও দূরে সইরা গেল, কবিতা কেবল কবিদেরই হইল। এখানে আর একটা কথা বইলা রাখলে মনে হয় ভালো হইব, সেইটা হইল কবিতায় ধর্মীয় বিষয়-আশয় ব্যবহার করা প্রসঙ্গে। উত্তর-আধুনিকতার নামে যেইটা হিন্দু ধর্ম এবং পুরাণ-ভিত্তিক কবিতা হইল সেইগুলিরে অঞ্জন সেন, তপোধীর ভট্টাচার্য, ইজাজ ইউসুফী এবং খোন্দকার আশরাফ হোসেন মৌলবাদী বা প্রতিক্রিয়াশীল বইলা ট্যাগ দিল না। কিন্তু ইসলাম ধর্মকে যারা কবিতায় ব্যবহার করতে চাইল তারা সেইসব কবি বা সংগঠনকে তাই বইলা ট্যাগ দিল। মানে একটা কবিতার রাজনীতিতে এই বড় হিপক্রেসি বা জুলুমটা থাইকা গেল। নব্বইয়ের দশকের কবিরাও তাদের খণ্ড অংশটাই প্রকাশ করল, মানে সে যে বাঙালি মুসলমান তা গেল ভুইলা বা ইচ্ছা করেই দূরে সইরা থাকল। ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, যেমন কবি ইশারফ হোসেন সম্পাদিত ‘রাসুলের প্রতি নিবেদিত’ কবিতা। এইটাকে একটা ব্যতিক্রমী এবং সাহসী প্রকাশ বলা যায়, কারণ এই সংকলনে যারা কবিতা লিখছিলেন তারা প্রায় সবাই ছিল সেক্যুলার ঘরানার লেখক। এই বিষয়টা একটা জিনিস প্রমাণ করে যে মোহাম্মদ (সাঃ) একজন আদর্শ নেতা হিসাবে সব ইজমের লেখক সাহিত্যিকদের মনে আজও বিরাট একটা জায়গা করে আছেন। সেই সময়ে কবি ফরহাদ মজহারের ‘এবাদতনামা’ বার হইছিল। নামে মনে হইছিল এইটা একটা ইসলামিক আদর্শ এবং ঐতিহ্যের কাব্যগ্রন্থ হইতে পারে, কিন্তু আদতে ছিল এক নাস্তিকের জবানবন্দি, তার ইন্টেক্ল্যাচুয়াল ডিসকোর্স। তাই বাংলাদেশের কবিতা দেহ এবং মনে এক হইতে পারল না। সেইটার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হইল আরও কিছু দশক, যেখানে কিছু পুরানা কবি এবং নতুন কবি, ইসলামি ঐতিহ্যের মুসলমানি কবিতা লিখবেন এবং একটা সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করবেন।
আধুনিকতার নাম কইরা কিছু অজ্ঞ, হার্ডকোর বাঙালি জাতীয়তাবাদী-মাইন্ডের কবি-সাহিত্যিক ইসলাম ধর্মের এলিমেন্টস বাদ দিতে চায়। সেইটাও একটা সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা।
৮
শুরুতেই বলছিলাম কবিতার দিন শেষ হইছে, কবিতার দিন শুরু হইছে। এইটার অর্থ আছে। যারা এখনও সেই আশির দশকীয় চেতনায়, ভারতীয় ভাব এবং ভাষাস্নাত হইয়া সেই ধারায় কবিতা লিখতেছে, সেইসব খণ্ডিত দেহ এবং মনের কবিতার দিন শেষ হইছে। সময়ের সাথে সাথে এইসব কবিরা এখন কেউ কেউ মৃত বা স্তিমিত। কবিতার দিন শুরু হইছে, মানে এখন কারও কারও কবিতায় বাঙালি মুসলমানের পালসটাকে পাওয়া যাইতেছে, তার শ্বাস, তার অস্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া যাইতেছে। বর্তমান আর ভবিষতের বাংলাদেশের কবিতা তাই হবে। যারা এরকম কবিতা লিখতেছে তারা বাঙালিত্বকে যেমন ধারণ করতেছে, তেমনিভাবে মুসলমানিত্বকেও ধারণ করতেছে। মানে তারা খণ্ডিত না। তারা দেহ এবং মনে এই দুই পরিচয়কে ধইরা রাখে। তারা জানে কবিতা একটা কমিটমেন্ট, একটা দায়িত্ব। কমিটমেন্ট তার নিজের ভাষা, জাতি এবং ধর্মের কাছে। যে ইতিহাস তাকে হাজার বছর ধইরা বাঙালি বানাইছে, যে ইতিহাস তাকে মুসলমান বানাইছে, তাকে বাদ দিয়া সে কবিতা লিখবে কিভাবে? তাই তো তার কবিতায় বাঙালি এলিমেন্ট থেকে শুরু কইরা মুসলমানের ধর্মীয় এবং ঐতিহ্যিক এলিমেন্টগুলি ভালোভাবেই আছে। অন্যদিকে যারা কবিতার মতো কইরা কবিতা লিখতেছে তারা পশ্চিমবঙ্গের কবিদের কবিতা এখন হয়তো তেমন অনুকরণ করে না। কিন্তু অনুকরণ করে ভারতীয়তা, তার হিন্দুত্ব। এইটা হীনম্মন্য মনোভাব এবং একচেটিয়া বাঙালি জাতীয়তাভিত্তিক সাংস্কৃতিক পিছুটানের জন্য হয়। ভারতীয় সভ্যতা এবং ভারতীয় টেক্সটের পাঠ, পঠনজাত যে সার্বিক লিটেরেরি হেজেমনিক গর্তে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যকেরা পইড়া গেছে সেইটা থেকে বার হওয়া কষ্টের ব্যাপার, বীর্য-বল এবং সাহসের দরকার। কারণ কতক ভৌগোলিক অবস্থান, কতক ভাষা এক হওয়ার কারণে এই ভারতীয়তা—কালচারালি, মেটাফিজিকালি এবং পলিটিকালি আত্মস্থ করা মনে হয় বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের এক ধরনের ‘ইডিপাস’ নিয়তি হইয়া গেছে! সাথে সাথে আবার আধুনিকতার নাম কইরা কিছু অজ্ঞ, হার্ডকোর বাঙালি জাতীয়তাবাদী-মাইন্ডের কবি-সাহিত্যিক ইসলাম ধর্মের এলিমেন্টস বাদ দিতে চায়। সেইটাও একটা সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা। বাংলাদেশের কবিতা যতদিন এই দুষ্ট বলয়ে আবদ্ধ থাকবে ততদিন ভালো কবিতা, নতুন কবিতা লেখা হবে না। যা লিখিত হবে তাতে বাংলাদেশের মানুষের জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিচয় ফুটে উঠবে না। তাই কবিতারও প্রাণও প্রতিষ্ঠিত হবে না। সালাম।