অণু’র সাথে মিশুর পরিচয় খুব বেশিদিনের নয়। এই তো সেদিন হুট করেই ফেসবুকে পরিচয়। মিশুই প্রথম বন্ধু হবার অনুরোধ পাঠায়। অচেনা কাউকে বন্ধু বানাবার ব্যাপারে অণুর সবসময় দ্বিধা কাজ করে। টাইমলাইন ঘেঁটে প্রাইভেসি সেটিং থাকায় মিশুর কিছুই জানতে পায় নি। তবুও কী মনে করে অণু বন্ধু হয়ে যায় মিশুর। এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই নিয়মিত কথা বলছে তারা।
মিশু সন্ধ্যা থেকেই অপেক্ষা করছে নস্টালজিক রেস্তোরাঁয়। আজ অণু আসছে। দু’জনের দেখা হবে। প্রথম দেখা। গত রাতে মেসেঞ্জারে আলাপচারিতায় নস্টালজিকে দুজনের দেখা হবার কথা বলে চ্যাট শেষ হলেও মিশুর রাত কাটে অণুর ভাবনায়। বিকেল হতেই ছটফট করছিল মিশু। না দেরি করা যাবে না। অণু আসবার আগেই তাকে পৌঁছাতে হবে। নাখালপাড়া থেকে ধানমন্ডি। উবার নিয়ে পৌঁছে যায় মিশু।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। ঝুম বৃষ্টি। মিশুর ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায়। স্কুলের মাঠে বৃষ্টিতে ভিজে খেলার কথা। ছেলেবেলার বন্ধুদের কথা। রুবেল, হাসান, ভুট্টু, রাহেলাদের কথা। বহুদিন ওদের সাথে কোনো যোগাযোগ নেই। একবার তাও প্রায় দশ বছর হবে হঠাৎ রুবেলের সাথে দেখা হয়েছিল আড়িয়ালখার ঘাটে। জড়িয়ে ধরেছিল। চিৎকার করে বলছিল আমারে চিনতে পারছোস? মিশুর অবশ্য চিনতে কষ্ট হয় নি। এরপরই জোর করে নিয়ে যায় চা খাওয়াতে। ঘাটের টং এর মতো রেস্তোরাঁর বাঁশের বেঞ্চিতে বসে দুই বন্ধু গরম সিঙ্গারা আর লেবু চা খেয়েছিল সেদিন। চা খেতে খেতেই রুবেল বলছিল মনে আছে একবার বৃষ্টিতে ভিজে ফুটবল খেলে জ্বর আইছিল আর তিনদিন ইস্কুল আইতে পারোস নাই। বলেই হাসছিল ও। আক্কাস স্যার আমাদের মারছিল তোর জন্য। আমরাই নাকি তোকে জোর করে খেলায় নিয়ে জ্বর বাধাইছিলাম।
আচ্ছা অণু কি বৃষ্টি ভালোবাসে? বৃষ্টিতে ভিজতে? নাকি ওর জ্বর ঠান্ডার ভয়? এসব নানা ভাবনা ঘুরপাক খায় মিশুর মনে। এখন তার মনে হচ্ছে অণুকে নিয়ে যদি ভিজতে পারত। বিস্তীর্ণ মাঠে সবুজের মাঝে অণুর সাথে হাতে হাত রেখে আনন্দে ভাসতে পারত। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে মিশু দেখছে চল্লিশ মিনিট পেরিয়ে গেছে এখনো অণুর দেখা নেই। মেসেঞ্জারে অণু নেই। ফোন নম্বরও নেয়া হয় নি। মিশুর নিজেকে খুব বোকা মনে হচ্ছে।
আপনি যখন নস্টালজিকের কথা বললেন তখন ধরেই নিয়েছিলাম এই ডিশ পছন্দ হবে, কেননা এটা ওদের স্পেশাল!
অনেকক্ষণ বসে থাকতে দেখে একজন এসে জানতে চায় কিছু লাগবে কিনা। মিশু একটা লেমন স্কোয়াশ দিতে বলে আবারও মেসেঞ্জারে অণুকে খোঁজে। কিছুটা অস্থির লাগে তার। গলা শুকিয়ে আসে। টেবিলে রাখা লেমন স্কোয়াশে গলা ভেজায়। চারদিকে তাকিয়ে মিশু দেখছে নানা বয়সী মানুষ। যুগলদের দিকে তাকিয়ে শুধু অণুর অভাব বোধ করছে। হাতে হাত রাখা উচ্ছলতায় ভর যুগলেরা যেন ঢেউয়ের মতো পরস্পরকে ছুঁয়ে দিচ্ছে।
ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। মিশু ভাবছে অণু হয়তো কোনো অসুবিধায় পড়েছে। আসতে পারছে না। কিন্তু মেসেঞ্জারে কি একবার জানাতে পারত না। এসব ভেবে অণুর ওপর অভিমান হয় মিশুর। বারবার দরজার বাইরে লিফটের দিকে তাকায়। এই বুঝি অণু এল। লিফটের দরজা থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের দিকে তাকায়। অণুর দেখা নেই। লিফটের ওপর-নিচ আসা-যাওয়া দেখতে দেখতেই আবার লিফট থামে নস্টালজিকের দরজায়। দরজা খুলতেই দুজন নারীকে ঢুকতে দেখে। অণুর সাথে আবার কে এল। মিশু কিছুটা অপ্রস্তুত কিন্তু সাথের জনকে স্মোকিং জোনে ঢুকতে দেখে সব শঙ্কা মিলিয়ে যায়। অণু এসে সরি বলে দাঁড়ায় মিশুর পাশে। অপেক্ষা করতে তার ভালোই লাগছিল এমন একটা ভাব করে অণুকে বসতে বলে।
মিশু গত একমাস শুধু অণুর ছবিই দেখেছে। ফেসবুকে অণুর নানা জায়গায় বেড়াবার ছবি। প্রকৃতির কাছে অণুকে বেশ লাগে । ছবিতে অণুর টানা টানা চোখ কতভাবে যে দেখেছে। কাজল দেয়া অণুর চোখ ভীষণ ভালো লাগে মিশুর। মনে মনে চোখে চুমু খেতে ইচ্ছে করে তার। একদিন মিশু অণুকে লিখেছিল এ চোখে সমুদ্র দেখি। অণু হাসির ইমো দিয়ে বলেছিল বিনে পয়সায় সমুদ্র দর্শন! ভালোই তো। আজ অণুকে এত কাছে পেয়ে শুধু চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
নীরবতা ভেঙে অণু বলল, সমুদ্র দেখছেন? মিশু বেশ লজ্জা পেল। কিন্তু পরক্ষণেই সামলে নিয়ে বলল আজ কিন্তু বিনে পয়সায় নয়। দুজনেই হেসে উঠল। অণু একটু আহ্লাদ করে বলল, আমি দেরি করে এসেছি প্যানাল্টি আমার। বলুন কী খাবেন বলেই ম্যানু মেলে ধরল মিশুর সামনে। প্যানাল্টি কি শুধু খাবার খাইয়ে দিবেন? মিশুর এমন প্রশ্নে অণু বলল তাই তো চেয়েছিলাম। মিশু বলল আজকের ট্রিট আমার, তা কিন্তু বলাই ছিল। তবে প্যানাল্টি আছে, আর তা হবে... দুচোখে চুমু খেতে দিতে হবে, ফিসফিস করে বলে মিশু।
অণু মিশুকে বলে কবিতা লিখেন? বেশ কাব্যিক, রোমান্টিক। এমন করে কেউ কোনোদিন বলে নি।
মিশু খানিকটা অবিশ্বাসের সুরে বলল তা কী করে হয়। কেউ কোনো দিন আপনার প্রেমে পড়ে নি?
পড়েছিল, কিন্তু বলেই কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল অণু।
মিশু আর এগুতে চায় নি। বেয়ারাকে ডেকে খাবারের অর্ডার বুঝিয়ে দেয়।
অণু বলল, আমি তো কখনোই পছন্দের খাবারের কথা জানাই নি। অথচ কী আশ্চর্য, যা অর্ডার করা হলো সব তো আমার প্রিয় খাবার। কী করে বুঝলেন যে আমি এই খাবার ভালোবাসি।
আপনি যখন নস্টালজিকের কথা বললেন তখন ধরেই নিয়েছিলাম এই ডিশ পছন্দ হবে, কেননা এটা ওদের স্পেশাল!
অণু বলল, আপনি এখানে খুব আসেন বুঝি? মিশু বলে, ঠিক তা নয়, তবে আমার এক বন্ধু আসে এখানে প্রায়ই। জায়গাটা ওদের খুব পছন্দের। আমাকেও একদিন নিয়ে এসেছিল। এই ডিশ সেদিন খেয়েছিলাম। ভালো লেগেছিল, বলেই থামে মিশু।
অণু বলে, আমি তো পাশেই থাকি। মাঝে মাঝে আসা হয়। এখন তো ধানমন্ডিতে অনেক রেস্তোরাঁ নানা সময়ে নানা জায়গায় আড্ডা হয়। আড্ডা, গল্প বেশ ভালো লাগে আমার। আর এখনকার আড্ডা মানেই তো রেস্তোরাঁ। আর এই পাশে থেকে আসতেই আপনার এত দেরি?
হট টমিয়াম স্যুপ আসে। অণু যত্ন করে তুলে দেয়। দুজনে খেতে খেতে কথা বলে। অণু জানতে চায় আচ্ছা আপনার ফেসবুকে তো কোনো পারিবারিক ছবি নেই। কে কে আছেন পরিবারে?
অণুর একটু অস্বস্তি হয়। মিশুকে এভাবে বিব্রত করায় তার খারাপ লাগে। সরি বলে অণু। তাও যেন আরও জানতে চায় সে। মিশু বলতে থাকে এরপর আর বাড়ি যাওয়া হয় না। কাজের মাঝেই ডুবে থাকতে হয়। মিশু বুঝতে পারে অণু যেন আরও কিছু জানতে চাইছে। ব্যাচেলর জীবন। কোনো রকমে এক বন্ধুর আত্মীয় বাড়ির ছাদের ছোট দুই কামরার এক চিলেকোঠা ভাড়া পেয়েছি। ব্যাচেলরদের কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না, তাই তো এই ব্যবস্থা। এ এক অদ্ভুত শহর বলে থামে মিশু। অণুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। বেয়ারাকে ডেকে খাবার সার্ভ করতে বলে।
খেতে খেতেই কথা বলতে থাকে অণু। মিশুকে অনেক বন্ধু-বৎসল মনে হয়েছে তার। অনেকদিন পর যেন অণুর কথা বলার নেশা পেয়েছে। আজ যেন সবকিছু বলে একটু হালকা হতে চায়। তিস্তার চরে আমার বেড়ে ওঠা। আমাদের সচ্ছলতা ছিল না। দশম শ্রেণিতে পড়তে পড়তেই বিয়ে হয়ে যায়। জামাই সৌদি আরবে থাকে। দুই মাসের ছুটিতে এসেছে। তাদের কোনো ডিমান্ড নেই, শুধু একটা সুন্দরী মেয়ে চায়। গরিব বাবা আর দিনমজুর ভাই কোনোরকমে পার করতে পারলেই যেন বাঁচে। পাশের গ্রামে সাদ্দামের সাথে বিয়ে হয়ে যায়।
সে আমায় শরীর চেনায়। তার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। মনে হয় সারাক্ষণ তাকেই চাই।
মিশু চোখ তুলে তাকায়। বিস্মিত মিশুকে অণু বলে গল্প এখানেই শেষ হতে পারত। আমি ঘরকন্না করে আর দশটা মেয়ের মতো দাসীবান্দির জীবন পার করে দিতে পারতাম। কিন্তু তা হলো না। বিয়ের পর পরই স্বামী সৌদিতে ফিরে যায়। জীবন কেমন শূন্য লাগে। সারাদিন ঘর-গেরস্থালীর কাজ করে রাতে ঘুম আসে না। সাদ্দামের কথা মনে পড়ে। পড়তেও মন বসে না। তবুও সাদ্দামের কথায় পড়াশোনাটা চালিয়ে যাই। পরীক্ষায় ভালো ফল করলে শাশুড়ির কথায় কলেজেও ভর্তি হই। এভাবে বছর দুই কেটে যায়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাও শেষ হয়। সাদ্দামের আর দেশে ফেরা হয় না। সাদ্দামের দীর্ঘ অনুপস্থিতি আমায় ব্যাকুল করে তুলে। ভালোবাসার কাঙ্গাল হয়ে অপেক্ষায় থাকি। সেই সময় মুকুল আসে আমার জীবনে।
মুকুল সাদ্দামের খালাত ভাই। পেটানো শরীর। ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। মুকুলের চোখের দিকে তাকিয়ে তার আকাঙ্ক্ষা টের পাই। নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে কাটে দিন। একসময় তাকে কাছে আসতে দেই। তার প্রতি দুর্বল হই। এক রাতে মুকুল আসে আমার ঘরে। হাতে হাত রাখে। শরীর কেমন অবশ হয়ে আসে, শিহরন বয়ে যায়। সাদ্দামের কথা মনে পড়ে। সাদ্দামকে কি ঠকাচ্ছি এই ভাবনায় যখন আমি নিশ্চুপ তখন মুকুলের উষ্ণ আলিঙ্গন মোমের মতো গলিয়ে দেয়। চুমোয় চুমোয় আমায় জাগিয়ে তুলে মুকুল। আদর ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয়। আনন্দে ভেসে যাই।
মুকুলের ভালোবাসা আমায় সাদ্দামের কথা ভুলিয়ে দেয়। সে আমায় শরীর চেনায়। তার জন্য অস্থির হয়ে উঠি। মনে হয় সারাক্ষণ তাকেই চাই। মুকুলকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকি। একদিন ওকে বলি চল আমরা পালিয়ে যাই। মুকুল হাসে। এরপর থেকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। কিন্তু আমার তো ওকে ভুলে থাকার সুযোগ নেই। বুঝতে পারি শরীরী চাওয়া পূরণে মুকুলের আপত্তি নেই। আমিও তো পরিতৃপ্ত হতে চাই। তাই নিজেকে সামলে নিয়ে শুধু মুকুলকে গ্রহণ করতে থাকি।
সেদিন পূর্ণিমা ছিল। ভরা জোছনায় ঘরে থাকতে মন চাইছিল না। মুকুল এল। জড়িয়ে ধরে চুমু খেল। আমিও। শক্ত করে মুকুলকে চেপে ধরি। আস্তে করে বলি দেখ কেমন ভরা জোছনা। আজ চল বাইরে যাই। তিস্তার পাড়ে ঘুরে আসি। মুকুল কিছুটা ভয় পেলেও রাজি হয়। সেই ভরা জোছনায় নরম ঘাসে বসে হাতে হাত রেখে কিছুটা সময় কাটায়। মুকুল অস্থির হয়ে ওঠে। আমিও। খোলা আকাশের নিচে নরম ঘাসের বিছানায় আমরা এক স্বর্গীয় সুখ অনুভব করি। জোছনার নরম আলোয় আমাদের নগ্নতা বেশ ভালো লাগে। এক ঘোর লাগায় মুকুলকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সেই সুখ গায়ে মেখে মুকুল আমায় বাড়ি পৌঁছে দিয়ে চলে যায়।
খাওয়া শেষ হতে হতে মিশু কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মিশু ভাবতে থাকে তার কৈশোরের কথা। এসএসসি পরীক্ষার পর দুর্সম্পর্কীয় রুনু খালার বাড়িতে বেড়াতে যাবার কথা। মিশুকে রাতে ঘুমাতে হয় তার এক ছোট খালার সাথে। ছোট খালা বয়সে মিশুর চেয়ে বছর তিনেকের বড় হবে। মিশু এসএসসি দিয়েছে আর খালা কলেজে পড়ে। বড় খালা-খালু দুজনেই ব্যাঙ্কার। ছোট্ট মেয়েকে শুধু কাজের মানুষের কাছে রেখে ভরসা পায় না বলেই ঝুনু খালাকে এনে কাছে রাখছে। রাতে হঠাৎ মিশু অনুভব করে কেউ যেন তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। ঝুনু খালা মিশুকে চুমু খেতে থাকে। মিশুর একটা হাত জামার ভেতরে নিজের বুকের ওপর রাখে। মিশুর ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে ঝুনু খালা বলতেই ও শুনতে পেল শুধু ঝুনু বলো সোনা। কাছে আসো, বলেই মিশুকে বুকে টেনে নেয়। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খায়। সেই প্রথম জীবনে কোনো নারী শরীরের ঘনিষ্ঠতায় শরীর জেগে ওঠে । এক নতুন জীবনের আনন্দে ভরে ওঠে মন। অণুর কথায় যেন কিছু হয় নি এমন একটা ভাব করে মিশু বলে আইসক্রিম কিংবা কফি?
অণুর আইসক্রিম খুব পছন্দ। কিন্তু কেন যেন আজ তার কফি খেতে ইচ্ছে করল। তাও সৌজন্য করে বলল আপনি যা খাবেন তাই খাব। তা আপনার দেরি হয়ে যাবে না তো?
আমি তো একাই থাকি। দেরিতে কী যায় আসে। বরং আরও কিছুটা সময় আপনার সাথে থাকা গেল বলে মিশু এক রহস্যের চোখ নিয়ে অণুকে দেখে।
তাই নাকি? আমার সান্নিধ্য ভালো লাগছে আপনার। আমার তো মনে হয় সৌজন্য করছেন। আপনাদের কর্পোরেট সৌজন্য অবশ্য আমার ভালোই লাগে বলে থামে অণু।
আচ্ছা তবে কফিই দিতে বলি। কী কফি পছন্দ আপনার। আমার এমেরিকানো বলে মিশু অণুর উত্তরের অপেক্ষায় থাকে।
আমার ক্যাপাচিনু বা হ্যাজেলনাট পছন্দের। কিন্তু আজ এমেরিকানোই খাব। বলেছি না আপনি যা খাবেন তাই খাব। দুজনেই হেসে উঠল। মিশু দুটো এমেরিকানোর অর্ডার করে একটু ঝুঁকে অণুকে বলল, এরপর কী হলো বলুন।
এত কিছু শোনার ধৈর্য থাকবে না আপনার। এছাড়া ছেলেরা এসব জেনে গেলে অনেক সময় নানা কিছু ভাবনার শাখা প্রশাখা ছড়ায়। নানা সুযোগ খোঁজে। অবশ্য আপনাকে ঠিক ওইরকম মনে হয় নি। তাই অনেক কিছুই বললাম।
আমার শোনার ধৈর্য আছে। আর শুনতেও চাই। অবশ্য যদি আপনার আপত্তি না থাকে। এর মাঝেই কফি আসে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে অণু বলে এই গল্প তো শেষ হবে না। ওরা বন্ধ করে দেবে কিছুক্ষণ পর। আজ না হয় থাক। অন্য কোনোদিন না হয় শুনবেন। মিশুর নাছোড় বান্দা ভাবটা অণুর বেশ ভালো লাগে।
কৈশোরের ঝুনু, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাদিয়া আর আজকের অণু সব যেন কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়।
অণু বলতে শুরু করে। পূর্ণিমা সুখের পরের মাসেই মুকুলের বিয়ে হয়ে যায়। আমাদের কিছুটা বিচ্ছেদ ঘটে। যন্ত্রণা বাড়ে আমার। কিন্তু মুকুলকে আর কাছে ডাকতে ইচ্ছে হয় না। এভাবেই আমি অন্যরকম অনুভব করতে থাকি। আমার পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়। মুকুল এর মাঝে আবার আসে। আদুরে ভাব নিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে তোমার সুখ আমি পারুলের কাছে পাই না। সেদিন আমি মুকুলকে বিষয়টা জানাই। ও ভয় পেয়ে যায়। আমার চরম ইচ্ছে হলেও মুকুলের বেলে মাছের মতো ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখ আর শরীরের উত্তাপহীনতায় আমরা আর মিলিত হই নি।
পরের সপ্তাহে মুকুল জানায় শহরে এক চেনাজানা ডাক্তারের সাথে গর্ভপাত করার ব্যাপারে কথা হয়েছে। আমিও রাজি হয়ে যাই। গর্ভপাত ঘটাই। কিন্তু বিষয়টা আর গোপন থাকেনি। সৌদি থেকে সাদ্দাম ফোন করে যা তা বলতে থাকে। রসুলের পবিত্র মাটিতে বইসা আমি তোমাদের জন্য দোয়া করি যেন ঈমান-আমানের সাথে থাকো। আর তুমি কিনা জেনা করতে গেলা? আমি শইল্যের রক্ত পানি কইরা তোমারে টেকা পাঠাই আর সেই টাকা নিয়ে রং তামাসা? সইল না তোমার? আমি তো চইলাই আইতাম। কত অশ্রাব্য কথা। যা মাগি তুই মুকুইল্ল্যাইর লগেই থাক। আমি তরে তালাক দিলাম। আইজই তোর বাপ-ভাইগো জানাই দিতাছি তরে যেন আমার বাড়ি থেইকা নিয়া যায়। কালকের মধ্যে ওরা তোরে নিতে না আইলে তুই বাড়ি ছাইড়া চইলা যাইবি। দ্রুতই তালাক হয়ে যায় আমার।
কফি শেষ হয়। এবার উঠতে হবে। কিন্তু কথা যেন শেষ হয় না। বিল মিটিয়ে দিয়ে ওরা বাইরে এসে দাঁড়ায়। মিশু একটা উবার ডাকে।
উবার আসা পর্যন্ত দাঁড়াই, আপনাকে তুলে দিয়ে একটা রিকশা নিয়ে চলে যাব। অণুর এমন সহজ কথায় মিশুর ভালো লাগে। মুহূর্তেই উবার চলে এল। দুজনে বিদায় নিল।
উবারে উঠেই মিশু এক গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। নস্টালজিক থেকে বেরিয়ে কী যেন এক নস্টালজিয়া পেয়ে বসেছে তার। কৈশোরের ঝুনু, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাদিয়া আর আজকের অণু সব যেন কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে মাথায়। এসব ভাবতে ভাবতেই উবার নাখালপাড়া পৌঁছে যায়। গাড়ি পার্ক করতেই মিশু যেন বাস্তবে ফিরে আসে। এক নিশ্বাসে ছয়তলার ছাদের ডেরায় ঢুকে পড়ে।
অণু বাসায় ফিরে সোজা স্নান ঘরে ঢুকে। গান শুনতে শুনতে উষ্ণ জলে স্নান করতে বেশ ভালো লাগে ওর। স্নান সেরে বেরিয়েই মেসেঞ্জারে নক করে মিশুকে। হোপ ইউ হ্যাভ রিচড হোম সেইফলি। মিশু যেন অপেক্ষায়ই ছিল।
অণু এতক্ষণ ভালো করে খেয়াল করে নি। জামান সাহেব অনেকবার কল করেছিলেন। বেশ কয়টা মিসড কল। ভাবল একবার ফোন করা দরকার আবার কী ভেবে যেন আর ফোন করতে চাইল না। এখন তার মিশুর সাথে কথা বলতেই ভালো লাগছে।
মিশু লিখছে, কথা তো শেষ হয় নি। এরপর কী হয়েছিল।
অন্য একদিন সময় নিয়ে বলব, তোমার কথা বলো মিশু। হঠাৎ তুমি সম্বোধনে বেশ খুশিই হয় মিশু। মিশু যেন কিছু বলতে গিয়েও আটকে যায়। কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। মিশুকে সহজ করে দিয়ে অণু বলে তোমার জীবনে প্রেম, নারী এসব নিয়ে বলো। শুনতে ইচ্ছে করছে।
মিশু কিছুটা এড়িয়ে যায়। বলে ব্যাচেলর জীবনে নারী? অণু হেসে বলে কেন, থাকতে নেই? অফিসে কিংবা অফিসের কাজে বাইরে গেলে কাউকে কাছে পেতে ইচ্ছে হয় না। মিশুর জবাবে অণু বুঝতে পারে মিশু বেশ আড়ষ্ট বা নিজেকে মেলে ধরতে চাইছে না। প্রসঙ্গ পাল্টে অণু বলে আচ্ছা আমায় কেন ডেকেছিলে তাই বলো।
তোমার সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। গত একমাস প্রতিদিন কথা বলতে বলতে তোমায় ভীষণ দেখতে ইচ্ছে হলো। তাই আসতে বলা। অণু হেসে বলে ও আচ্ছা আমি ভেবেছিলাম তুমি মনে হয় আমার প্রেমে পড়েছ। মিশু ঠিক বুঝতে পারছে না এর কী উত্তর হয়। অণুর প্রতি ওর কিছুটা প্রেম জন্মেছিল কিন্তু অণুর সাথে কথা বলে ওকে জানার পর সে কিছুটা বিভ্রান্ত। তাই অনেকটা ঘুরিয়ে বলল প্রেমে পড়া ছাড়া বুঝি নারী-পুরুষের দেখা হতে পারে না। তারা আড্ডা দিতে পারে না। একসাথে বেড়াতে পারে না? অণু বলে খুউব হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে তা এত সহজ নয়। জীবন দিয়ে তা বুঝেছি আমি। এই বলে শুভ রাত্রি বলে অণু।
পরদিন জামান সাহেবকে ফোন দেয় অণু। অনেকদিন পর ফোন দিয়েছিলেন। ফোন সাইলেন্ট ছিল তাই বুঝতে পারি নি। রাত করে বাসায় ফিরে আর ইচ্ছে হয় নি আপনাকে বিরক্ত করার। এছাড়া এত রাতে ফোন দিলে আপনি ফোন ধরতে পারবেন না সেটাও জানি। একনাগারে এসব বলে যায় অণু। জামান সাহেব ওই প্রান্ত থেকে বলেন, তোমাকে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে হচ্ছিল অণু। তোমাকে পান করতে ইচ্ছে করছে, আজ আসতে পারি অণু? ঠিক আছে, সন্ধ্যায় আসুন বলে ফোন রেখে দেয়।
জামান সাহেব বড় সরকারি আমলা। বউকে ভীষণ ভয় পায়। আবার বউয়ের বাইরে অন্য নারীর সাথে বন্ধুতায় তার আগ্রহের ঘাটতি নেই। লোকটা ভীষণ খোলামেলা। হুইস্কি খেতে ভালোবাসেন, তবে শীতের দিন ছাড়া অন্য সময়ে তিনি রেড ওয়াইনের বাইরে কিছু খেতে চান না। অণু রেড ওয়াইনের দুটো বোতল জামান সাহেবের জন্য আলাদা করে রাখে। সন্ধ্যায় জামান সাহেব আসেন। ডোর বেল বাজাবার আগেই দরজা খুলে অণু তাকে স্বাগত জানায়। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই জামান সাহেব বলেন বাহ বেশ বদলে ফেলেছ দেখছি। তোমার রুচিই আলাদা। এই যে এত সুন্দর করে ফুল দিয়ে সাজিয়েছ। একটা অন্যরকম অনুভূতি। মিলা কখনো বাসায় এমন একটা অনুভূতি তৈরি করতে পারে না। অণু এই প্রশংসায় খুশি হলেও ঠাট্টা করে বলে, মিলা ভাবিও করে যখন তার বয়ফ্রেন্ড আসে।
মিশু কি তার স্তনযুগল দেখেছে? তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ?
জামান সাহেব আর কথা বাড়াতে চায় না। দেয়ালের দিকে তাকিয়ে নতুন লাগানো পেইন্টিংসগুলো দেখতে থাকে। গোধূলিলগ্নে এক যুগল কাশবন ছাড়িয়ে নদীতীরে এই ছবিটার দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে থাকে। গ্লাসে রেড ওয়াইন ঢেলে দিয়ে অণু ভেতরে যায়। জামান গ্লাসে চুমুক দেয়। অণু চলে গেলেও তার খোঁচাটা কেমন যেন খচখচ করছে, পোড়াচ্ছে। মিলাকেও দোষ দেয় না জামান। মনে মনে ভাবে মিলার তৃষিত শরীর যা চায় সেখানে আজ সে কেমন যেন বেমানান। মিলা যখন প্রচণ্ড কামনায় জামানকে চায় ততক্ষণে জামান ক্লান্ত হয়ে শরীর ছেড়ে দেয়। মিলা কেমন যেন ছটফট করতে থাকে। জামান কী হয়েছে তোমার? দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে তুমি কেমন যেন আমায় ভালোবাসতে পারছ না। তোমাকে এখন সপ্তাহেও একবার পাই না। কিছুটা জোর করেই তোমাকে যখন পেতে চাই তখনও তুমি আমায় নিয়ে ভাসতে পারো না। তুমি কি আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছ? কারো প্রেমে পড়েছ? নাকি তোমার শরীর তোমাকে আমার পর করে দিচ্ছে। কতবার বলেছি তুমি একজন ভালো ডাক্তার দেখাও, তাও করছ না। অণুর খোঁচায় মিলার এসব কথা মনে পড়ে যায়।
বিয়ের প্রথম দিনগুলোতে মিলা যেন ভেসে বেড়াত। জামান কখন অফিস থেকে ফিরবে সেই অপেক্ষা। সেইসব সন্ধ্যা আর রাতের কথা মনে পড়লে মিলার কোনো দোষ দেখে না জামান। জামানের নিস্পৃহ ও নিষ্প্রভ উপস্থিতি ক্রমেই মিলার কাছে পানসে হয়ে যায়। জীবনের এত রং এরকম বিবর্ণ হয়ে যাবে মিলা তা মেনে নিতে পারে নি। ধীরে ধীরে বন্ধু বলয় বাড়ায়। উপভোগ করতে থাকে পার্টি, ক্লাব। সামাজিক অনুষ্ঠানে এখন তার সরব উপস্থিতি। বদলে যাওয়া জীবনে মিলা নিয়মিত জিমে যায় ক্লাবে কিংবা পাঁচতারকা হোটেলে। নিজেকে ফিট রাখে। বন্ধুদের একান্ত সান্নিধ্যে নিজেকে প্রজাপতির মতো লাগে। নিজেকে পরিতৃপ্ত করতে এখন আর জামানের দিকে তাকিয়ে থাকার ইচ্ছে নেই মিলার। একই ছাদের তলায় থেকেও তাঁরা কেউ কারোই থাকেনি। নিজের অক্ষমতা বিবেচনায় মিলার সবকিছুই নীরবে মেনে নেয়। এসব ভাবতে ভাবতেই গ্লাস শেষ করে আরেকবার ঢেলে নেয় জামান।
অণু পোশাক বদলে ড্রয়িংরুমে আসে। মুখোমুখি বসে। জামান তন্ময় হয়ে অণুকে দেখে। হালকা ফিনফিনে গোলাপি টপসের নিচে কালো নেটের ব্রা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গায়ের রঙের সাথে টপস যেন একাকার হয়ে গেছে। ঘাড় বেয়ে ডাই করা সোনালি-কালো চুল পিঠে, বুকের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে। জামান যেন প্রতিবারই অণুকে নতুন রূপে পায়। অণুকে পাশে বসতে বলে জামান। অণু মনে মনে ভাবে জামান তাকে টেনে পাশে না বসালে নিজ থেকে জামানের পাশে এসে বসবে না সে। জামান গ্লাস খালি করে উঠে দাঁড়ায়। গভীর দৃষ্টিতে অণুকে দেখে। ধীরে ধীরে অণুর কাছে যায়। হাত ধরে টেনে তোলে । চুমু খায়। অণুও আবেগে জড়িয়ে ধরে জামানকে। ঠোঁটের উপর-নিচ চুমু খেয়ে জামান অণুকে টেনে পাশে বসায়। হাতের ভেতর হাত রেখে অমৃত পান করতে থাকে। জামানের হাত ক্রমশ অণুর পিঠে, ঘাড়ে, চুলের ভেতর খেলা করে। আবেশে চোখ বুজে আসে অণুর। দুজনে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। জেগে ওঠে অণু। জামানকে জড়িয়ে ধরে বেডরুমে নিয়ে যায়। শক্ত করে বুকে চেপে ধরে চুমু খায়। জামান টপস খুলে নেয় অণুর।
নিজেকে আরও মেলে ধরে অণু। উজার করা ভালোবাসার জোয়ার আর উত্তাল ঝড়ে নিজেকে সমর্পিত করে জামান। অণু গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে থাকে জামানের সাথে। ধীরে ধীরে অণুর বাহুডোর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফ্রেশরুমে যায় জামান। অণু বিছানায় কাতরাতে থাকে। জামান বাইরে এসে জামাকাপড় পড়ে। অণু জামানের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে, এভাবে ঝড় তুলে দিয়ে চলে যাবে তুমি। আজ রাতটা আমার কাছে থেকে যাও না, আমায় ভালোবাসার বাণে ভাসিয়ে দেবে, সুখের বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দেবে সোনা। কিন্তু জামানের তা হবার নয়। জামান আবার আসব বলে অণুর বাসা ছাড়ে। ফিরতে ফিরতে ভাবে মিলার মতো অণুও উজাড় করা সুখ চায়। জামান চাইলেও মিলার কাছে যেতে পারছে না। নিজের সুখের জন্য তাই তাকে অণুর কাছে আসা ছাড়া উপায় নেই। অণুও যদি বন্ধু জুটিয়ে নেয় তবে তো এখানেও আর আসা হবে না। এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফিরে জামান। মিলা বাসায় নেই। একটা বই নিয়ে নেড়েচেড়ে রেখে দেয়। ফেসবুকে সময় পার করে। বাইরে কারো গলার আওয়াজ পায়। ডোর বেল বাজতেই দরজা খুলে দেয় জামান। কোনো কথা না বলেই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মিলা।
অণুর হ্যাংওভার কেটে যায়। উষ্ণ গরম জলে দীর্ঘ সময় নিয়ে স্নান করে। মনে হয় যেন শরীর থেকে সব ক্লেদ-ক্লান্তি মুছে দিতে হবে। বড় আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই মুচকি হাসে। উন্নত স্তনযুগল আর বৃন্তে হাত বুলিয়ে আঙুলে চেপে ক্লিন করে। শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় জল-মোছা তোয়ালের আলতো ছোঁয়ায় শিহরন অনুভব করে। তোয়াল ছাড়িয়ে শুকনো খোলা শরীরটা আবারও দেখে অণু। আঙুল দিয়ে চুল পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে হাত প্রসারিত করে নিজেকে দেখে। চোখের দিকে তাকায়। আসলেই কি তার চোখ দুটি এত সুন্দর, যেমন করে মিশু বলে? মিশু কি তার স্তনযুগল দেখেছে? তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ? এমন কিছু ভাবতে ভাবতে মিশুকে কাছে পাবার ভীষণ বাসনা নিয়ে স্নানঘর ছেড়ে আসে অণু।
রাতের পোশাক পরে চুল ঠিক করে নেয় । ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের সরোদ ছেড়ে লিভিং রুমের ডিভানে এসে গা এলিয়ে দেয়। আরেক পেগ হুইস্কি ঢেলে চুমুক দিতে দিতে অনলাইনে আসে। দীর্ঘক্ষণ অনলাইনে না থাকলে মোবাইল খুলতে সব মেসেজ যেন ছোটাছুটি শুরু করে দেয়। এই সময়টা বিরক্তিকর লাগে অণুর। এজন্য মোবাইল সাইলেন্ট করে অনলাইনে আসা ওর অভ্যাস। অণু মেসেঞ্জারে মিশুকে খুঁজে পেতে চায়। মিশুর বেশ কয়টা মিসড কল দেখে মনে মনে বেশ খুশি হয়। মিশু তবে তাকে খুঁজছিল । অন্যকিছু না দেখেই মিশুকে কল করে অণু। হাই মিশু। অনেকক্ষণ অনলাইনে ছিলাম না। তুমি ফোন করেছিলে? সরি ধরতে পারি নি, বলো।
অণুর তুমি সম্বোধনে মিশু মনে মনে বেশ খুশি হয়। না, তেমন কিছু নয়। তোমার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, বলে থামে মিশু।
এই তো আমি এসে গেছি। এবার বলো। অণুর এমন প্রশ্নে মিশু কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। তাও বলল, কী করছ? সরোদ শুনছি ওস্তাদ আমজাদ আলী খানের, সংক্ষেপে জানায় অণু। বাহ! তুমি সরোদ শুনো? না না শুধু সরোদ নয় সেতার, বাঁশি, বেহালাও আমার পছন্দের। মাঝে মাঝে যন্ত্রসংগীতের মূর্ছনায় হুইস্কি খেতে ভালো লাগে।
অণুর কিছুটা নেশাগ্রস্ত কণ্ঠ টের পায় মিশু। তুমি ড্রিঙ্ক করো অণু?
হুম করি তো। হুইস্কি খেতে ভালোবাসি। তুমি করো না? তোমার অপছন্দ? জানতে চায় অণু।
নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মিশু বলে আই এম আ সোশ্যাল ড্রিঙ্কার। অফিসের পার্টিতে খাই। বাসায় খাই না।
এতকাল যে পুরুষ তার অতলে নেমেছে শুধুই নিজেকে তৃপ্ত করতে তা ভুলিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে জামান।
আমি বাসায় খাই, পার্টিতে খাই, বন্ধুদের সাথে খাই, যখন মন চায় তখন খাই বলে থামে অণু। মিশু ঠিক বুঝতে পারছে অণু একটু বেসামাল। অণুকে উসকে দিয়ে বলে সেদিন তো কথা শেষ হলো না। এরপর কী হলো তা তো আর বলো নি। এরপর তো ঢাকায় চলে এলাম, জানায় অণু।
তোমায় দেখতে ইচ্ছে করছে অণু। অণু কিছুটা ঠাট্টা করে বলে ভীষণ ইচ্ছে করছে আমায় দেখতে? হুম বলে মিশু।
তবে চলে আসো।
এত রাতে? তুমি কি ঠাট্টা করছ অণু? ঠাট্টা কেন হবে, আমি তো জেগেই আছি, চলে আসো না, অণুর কণ্ঠ জড়িয়ে যায়। মিশু কেমন যেন মোহগ্রস্ত হয়ে ওঠে। কিছুটা উদ্বেগ নিয়ে বলে, তবে কাল আসি?
ঠিক আছে। কাল বিকেলে আসো। বাসার ঠিকানা টেক্সট করে দিচ্ছি। চারটার মধ্যে আসো। শুভ রাত্রি বলে কথা শেষ করে অণু।
ঝিমুনি ভাবটা বাড়ছে। শরীরটা একটু ভারী ঠেকছে। উঠে দাঁড়ায় অণু। একটু হেঁটে বেড়ায়। পাটাও ভারী লাগছে। এই অনুভূতিটা বেশ ভালো লাগছে। অণু আরেক পেগ ঢেলে নেয়। এবার বাঁশি ছেড়ে দেয়। চৌরাশিয়ার বাঁশি। এক অন্যরকম ভালো লাগায় ডুবে যায়।
অনেকদিন পর আজ জামান এসেছিল। জামানের প্রতি অণুর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। স্কুলের বান্ধবী রেণুর সহায়তায় যখন কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিল তখন কি ও জানত জামান তার জীবনে এমনভাবে আসবে। এখনো মনে পড়ে বিসিকের মেলায় রেণুদের স্টলে অণু বিপণন কর্মী। পরনে মণিপুরি শাড়ি। খোঁপায় ফুলের মালা ঝুলানো, হাতভর্তি চুড়ি আর অন্য হাতে বেলি ফুলের ব্রেসলেট। দূর থেকেই অণুকে আলাদা করা যায়। তাই তো অণুর স্টলে এমন ভিড়। জামান সাহেবকে সাথে নিয়ে বিসিকের কর্মকর্তারা স্টল ঘুরে দেখছিলেন। অণুদের স্টলে এসেও খোঁজ-খবর নিয়েছিলেন।
জামান সাহেবের চোখ যে অণুকে কেমন করে দেখছে তাও টের পায় অণু। জামান সাহেবকে আকৃষ্ট করতে একটা শাড়ি তুলে ধরে অণু বলেছিল স্যার এই শাড়িটা নিন, ম্যাডামের জন্য। বেশ মানাবে। জামান অণুর চোখে চোখ রেখে বলেছিলেন তাই? সে ভাষা পড়তে কষ্ট হয় নি অণুর। খানিকটা জোর করেই জামানকে শাড়িটা দিয়েছিল অণু। বলেছিল এটা ম্যাডামের জন্য আমাদের হাউসের গিফট। জামান সাহেব কথা না বাড়িয়ে বিল মিটিয়ে চলে যায়। স্যার আবার আসবেন বলেছিল অণু। জামান সাহেবও অণুর ভাষা বুঝে নেয়। মেলা শেষে রেণুদের স্টল পুরস্কৃত হয়। সেরা বিপণন কর্মী হিসেবে অণু পুরস্কার পায়।
অণু তো মেলাতেই বুঝেছিল জামান তার ঘনিষ্ঠতা প্রত্যাশী। মেলা শেষে একদিন সচিবালয়ে দেখা করতে চাইলেই অণুকে স্বাগত জানায় জামান। সচিবালয়ে বেশ কিছুক্ষণ দুজনের একান্ত কথা হয়। অণুকে বেশ লাগে জামানের। জামান সাহেবের কাছে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দেয়ার অনুরোধ জানাতেই মনে মনে ভাবে মেয়েটাকে কিছুটা সহায়তা দিলে ওর কাছে অনেক কিছু পেতে পারে জামান। কিছুদিনের মধ্যেই অণুকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে মহিলা হোস্টলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয় জামান। সেই শুরু জামানের সাথে অণুর যোগাযোগ। মাঝে মাঝে বাইরে খেতে যাওয়া, গিফট পাওয়া আর হোস্টেলে পৌঁছে দেয়ার সময় ঘনিষ্ঠ স্পর্শ থেকে অণু টের পায় জামান তার একান্ত সান্নিধ্য চায়। একটা অদৃশ্য দেয়াল দিয়ে জামানের সংস্পর্শে থাকার কৌশল নেয় অণু। কিন্তু বেশিদিন তা পারে নি অণু। এর মাঝে একদিন গাড়িতে হোস্টেলে ফেরার পথে জামান অণুর গা ঘেঁষে বসে। হাতে হাত রাখে, আঙুলে আঙুল বুলাতে থাকে। ভেতরে ভেতরে অণুর তা ভালো লাগলেও কিছুটা নিস্পৃহ থাকে।
জামান অণুর আঙুলে চুমু খায়, মুখের ভেতর আঙুল নিয়ে চুষে দেয়। অণু কেঁপে ওঠে। জামান আরও ঘনিষ্ঠ হয়, পিঠে ও পেটে হাত বুলিয়ে দেয়। খুব কষ্টে নিজেকে সামলে নেয় অণু। আশানুরূপ সাড়া না পেয়ে জামান কিছুটা সময় নেয়। ধীরে ধীরে অণুকে তৈরি করে বাইরে বেড়াতে যাবার কথা বলে। অণু মজা করে বলে আমার তো পাসপোর্ট নেই। জামানের সহায়তায় পাসপোর্ট করে অণু। অফিস থেকে ছুটি নেয়। বাইরে বেড়াতে যাবার আগে অণুকে শপিং ও পার্লারে নিয়ে যায় জামান। অণু বুঝতে পারে বাইরে যাবার আগে তাকে আরও আধুনিক ও পরিপাটি করে জামান কী বার্তা দিতে চায়। এরপর তারা নেপালে বেড়াতে যায়। এই প্রথম দেশের বাইরে অণুর বেড়াতে যাওয়া। জামান অণুকে বলে এই প্রথম তোমার অনেক কিছুই হবে, আশা করি তুমি সব মানিয়ে নিয়ে ছুটির সময়টা উপভোগ করবে। আমিও তোমার একান্ত সান্নিধ্য উপভোগ করতে চাই। অনেকদিন পর এমন আনন্দের সুযোগ অণুকে ভেতরে ভেতরে আরও আগ্রাসী করে তুলে।
নেপালে বেড়াতে গিয়ে দুজনেই অনেক সহজ হয়। জামানের সান্নিধ্যে লাল মদ, বিয়ার হুইস্কির স্বাদ পায় অণু। ঘোরাফেরা, খাওয়াদাওয়া আর আনন্দ ফুর্তিতে কেটে যায় পাঁচ দিন। জীবনে মধুচন্দ্রিমার স্বাদ পায় অণু। অণুর শরীর, আদরে সাড়া দান সবকিছু মিলিয়ে জামানের ঘোর কাটে না। মনে মনে ভাবে ওর সান্নিধ্য পেতে হলে হোস্টেলের বাইরে ওকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আরও স্মার্ট করে তুলতে হবে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেছে অণু। মাস্টার্স করছে। ইংরেজি স্পিকিং কোর্সেও ভর্তি হয়। অণুকে তার পাশে মানানসই করতে আর নিজের করে রাখতে সবকিছুই করে জামান। ঐশ্বর্যের ছায়ায় এক সচ্ছল জৌলুসপূর্ণ জীবন আর অতৃপ্ত শরীরী চাহিদা দুটো মেটাতেই জামানকে পাটাতন হিসেবে পেতে চায় অণু।
অণুকে নিজের করে রাখতে জামান সবকিছু উজাড় করে দিয়েছে। অণুও কম দেয় নি। যখন যেভাবে বলেছে সব করেছে। জামানকে ভরিয়ে রেখেছে। মিলার তাচ্ছিল্য ভুলে ভালো থাকতে সব কিছু নিয়ে অণু দাঁড়িয়েছে জামানের পাশে। জামানই অণুর জীবনে প্রথম পুরুষ যার কাছে সে সম্মান পেয়েছে। ভালোবাসা আর যৌনতার রসায়নে পরিতৃপ্তি বুঝতে শিখিয়েছে। এতকাল যে পুরুষ তার অতলে নেমেছে শুধুই নিজেকে তৃপ্ত করতে তা ভুলিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে জামান। শরীরের স্বাধীনতা, জীবনকে উপভোগ করার ব্যাপারেও অনেক কিছু বুঝতে পেরেছে অণু। শুধু কি তাই? তার প্রতিষ্ঠা, মাথার ওপর এই ছাদের ব্যবস্থাও হয়েছে জামানের সহায়তায়।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে যেতে হবে, বেদনার সুর মিশুর কণ্ঠে স্পষ্ট।
জামান সাহেব তখন যুগ্ম সচিব। এই অ্যাপার্টমেন্টের জায়গা নিয়ে জটিলতা হচ্ছিল। জামানের সহায়তায় তা মিটিয়ে দিয়ে ডেভেলপারের কাছ থেকে এই ফ্ল্যাট পায় অণু। পুলিশ প্লাজায় দোকান, ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা এবং ব্যবসা দাঁড় করতে নানা পরামর্শ দিয়ে পাশে ছিল জামান। সব স্বপ্নের মতো লাগে অণুর। এসব ভাবতে ভাবতে আই লাভ ইউ জামান বলেই বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্প্রিংয়ের ম্যাট্রেসের এই দোলনিটা বেশ ভালো লাগে অণুর। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
সকালে বেশ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠে। ফ্রেশ হয়ে ডাইনিংয়ে আসে। এক গ্লাস কমলার ফ্রেশ জুস খেয়ে দুধ কলা দিয়ে ওটস খায়। এরপর গ্রিন টি। হালকা নাশতাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। ছোটবেলার ভাত খাওয়ার কথাও মনে পড়ে তার। বিশেষ করে পান্তা খাওয়ার কথা। এখনো মাঝে মাঝে পানতা খায় গরুর মাংস আর আলু ভর্তা দিয়ে। খেতে খেতেই পেপারে চোখ বুলিয়ে নিয়ে পার্লারে ফোন দিয়ে বুকিং করে দশটায়। পার্লার কর্মী রিংকি চাকমা আর শুক্তি সাংমা অনেক দিনের চেনা। মাঝে মাঝে ওদেরকে বাসায়ও নিয়ে আসে। কিন্তু আজ অনেকক্ষণ পার্লারে থাকবে অণু। সর্বাঙ্গ সেবা নিবে। হাসান রেন্ট এ কারকে ফোন করে একটা প্রিমিয়ো গাড়ি পাঠাতে বলে সারাদিনের জন্য। সিনেপ্লেক্সে দুটো টিকেটও বুক করে সন্ধ্যা ছয়টায়। ফুলের দোকানে ফোন করে কিছু গোলাপ পাপড়ি আর ফুলের অর্ডার করে অণু। এরপর তৈরি হয়ে পারসোনায়। বেলা আড়াইটায় বাসায় ফিরে এসে সোজা স্নানঘরে। স্নান শেষে দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় গড়াগড়ি করতে করতেই শুক্তি বাসায় আসে। শুক্তি খুব সুন্দর করে শাড়ি পরাতে পারে। একজন গারো মেয়ে কত সুন্দর করে শাড়ি পরাতে পারে অথচ বাঙালি হয়েও অণু তা পারে না বলে আক্ষেপ হয়। মনে মনে ভাবে শুক্তির কাছে শাড়ি পরার প্রশিক্ষণ নেবে।
আজ আমি একটা জামদানি পরব সাথে স্লিভলেস এই বলে শুক্তিকে ড্রয়ার খুলে দেয় অণু। শুক্তি পছন্দ মতো জামদানি আর দুটো স্লিভলেস বের করল। একটা বেছে নিয়ে পছন্দ মতো ব্রা-পেটিকোট পরে নিজেকে দেখে নেয় অণু। শুক্তি সব ঠিক-ঠাক করে দিয়ে অণুকে শাড়ি ব্লাউজ পরিয়ে দেয়। এরপর আইশেড, কাজল আর যুতসই লিপস্টিক লাগিয়ে দেয়। মানানসই জুতো বাছাই করে নেয় অণু। খেয়াল রাখে যেন হিলটা বেশি উঁচু না হয়, যাতে মিশুর উচ্চতা ছাড়িয়ে না যায়। শুক্তিকে টিপস দিয়ে বিদায় দিতেই ইন্টারকমে কল, মিশু সাহেব এসেছেন বলে জানায় দারোয়ান। মিশুকে ওপরে পাঠাতে বলে দরজা খুলে দাঁড়ায় অণু।
মিশু বেশ ফরম্যাল এসেছে। পরনে স্ট্রাইপ সাদা শার্ট আর ডার্ক-ব্লু প্যান্ট। মৃদু হেসে ঘরে ঢুকেই সোজা ড্রয়িংরুমে। এলে তবে? চিনতে অসুবিধা হয় নি তো? এরকম সাদামাটা কথা বলেই অণু মুখোমুখি বসে মিশুর। মিশু যেন কতদিন পর দেখছে অণুকে। তোমাকে অনেক ভালো লাগছে অণু। শাড়িতে বেশ মানিয়েছে। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। স্লিভলেস পরাতে অণুর পেলব মসৃণ হাত মিশুর নজর কেড়েছে। চোখে চোখ রেখে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মিশু অণুর চোখের গভীরে নামতে চায়। মিশুকে বসতে বলে ভেতরে যায় অণু। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে টেবিলে খাবার সাজায়। জুস, ফল আর পায়েশ। খেতে খেতে কথা হয় দুজনার।
কোথাও যাচ্ছ মনে হয়? আমাকে আসতে বলে তুমিই বাইরে যাচ্ছ একটু অনুযোগের সুরে বলে মিশু। কিছুটা রহস্য করে অণু বলে হ্যাঁ বাইরে যাব বলেই তো তোমাকে চারটায় আসতে বলেছি। বাইরে তো যাব সাড়ে পাঁচটায়। মিশু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে আর তো মাত্র এক ঘণ্টা। তুমি কি আরও বেশি সময় কাটাতে চাচ্ছিলে জানতে চায় অণু? সেরকম ভেবেই তো এলাম, এখন দেখছি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ফিরে যেতে হবে, বেদনার সুর মিশুর কণ্ঠে স্পষ্ট। তবে আমার সাথে চলো, আমার তো কোনো অসুবিধা নেই, অণুর এমন কথায় সৌজন্য আছে কিন্তু অণুর সাথে কোথায় যাবে মিশু এমন ভেবে বলে, না তা কী করে হয়? তুমি তোমার মতো করে যাও আমি আরেকদিন আসব। আমার সাথে যেতে কোনো আপত্তি আছে তোমার? মিশু একটু সহজ হয়ে বলে আজ তোমার সাথে নরকে যেতেও আপত্তি নেই, তবে তোমার পাশে আমাকে ঠিক মানানসই লাগবে না। আপত্তি যেহেতু নেই তবে চলো একটু আগেই বের হই, সাড়ে পাঁচটা তো প্রায় বেজেই গেল।
ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলে দুজনে নিচে নেমে আসে। গাড়িতে বসেই মিশু জানতে চায় এবার বলো যাচ্ছ কোথায়? গেলেই তো দেখতে পাবে জবাব দেয় অণু। গাড়িতে বেজে চলছে তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা... কবে তোমায় দেখেছিলেম আঁখিপানে চেয়েছিলাম ভুলে গিয়েছি। গান শেষ হতে হতেই গাড়ি সীমান্ত স্কয়ারে ঢুকে পড়ে। মিশু ভাবছে কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান নয়তো? কী ভাববে লোকজন অণুর সাথে তাকে দেখে? অণু রহস্য করে আমি কী বলে পরিচয় করিয়ে দেবো তোমায়? আমার বন্ধু? লিফটে তাঁরা ফুডকোর্টে গিয়ে ওঠে। এবার মিশু হেসে বলে বুঝেছি, তুমি রান্না করতে পারবে না বলে আমায় এখানে খাওয়াতে এনেছ। তুমি বুঝি খুব রান্না করে খাওয়াতে পারবে আমায়? আমি তো তোমার জন্য পায়েশ রেঁধেছি, বললে না তো কেমন হয়েছে? কতদিন পর নলেন গুড়ের পায়েশ খেলাম, অমৃত, জবাব দেয় মিশু। বাসায় তো চা-কফি কিছু খেতে দেই নি, এখানে কফি খাব বলে।
মিশুর জন্য এমেরিকানো আর নিজের জন্য হ্যাজেলনাট নিয়ে ফিরে আসে অণু। মিশুর কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়। সাদিয়ার কথা মনে পড়ে। সাদিয়া কখনোই এমন করত না, মিশুকেই নিয়ে আসতে হতো। অণু ঠিক তার উলটো। এক কোণে বসে কফি খায় ওরা। এ যেন লোকের হাট। কোথাও বসার জায়গাও নেই। কেউ উঠে দাঁড়ালেই যেন অন্য কেউ এসে দখল নেবে। মানুষের মাঝে অণুর ভালোই লাগে। কিন্তু মিশু এত হট্টগোলে স্বচ্ছন্দ নয়। অণু বেশ বুঝতে পারে তা। কফি শেষ হতেই বলে চলো এখানে আর নয়, বেশ বুঝতে পারছি জায়গাটা তোমার পছন্দ হয় নি। মিশু ঠিক বুঝতে পারে না কী বলবে। একটু আমতা আমতা করে বলল, না না ঠিক আছে। কত মানুষ বসে আছে, গল্প করছে, আড্ডা দিচ্ছে আমরা উঠে যাব কেন? আমার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না অণু। অণু উঠে দাঁড়ায়। মিশুকে হাত ধরে টেনে উঠায়, অনেকটা টেনেই নিয়ে চলে।
সে কি অস্বীকার করবে ঝুনু খালার সাথে তার কৈশোরের নাটকীয় শরীর বিনিময়ের প্রথম অভিজ্ঞতা?
অণুর হাতের স্পর্শ মিশুর বেশ ভালোই লাগছে। কিন্তু একটু পরেই হাত ছেড়ে দিল। মিশু অণুকে অনুসরণ করল। একি সিনেপ্লেক্সে ঢুকে পড়েছ যে। মুভি দেখবে নাকি? অণু বলল, তোমার আপত্তি না থাকলে চলো দেখি। মিশু কেমন করে যেন তাকিয়ে থাকে অণুর দিকে। অমন করে কী দেখছ, না দেখলে চলো চলে যাই, অণুর এমন প্রশ্নে মিশু চুপ করে থাকে। অণু হেসে বলে তোমাকে মুভি দেখাব সে-জন্যেই তো এলাম, বলেই মিশুর হাতে টিকেট ধরিয়ে দেয় অণু। এবার মিশুও দুষ্টামি করে বলে হাত ধরে ছিলে ভালোই তো লাগছিল ছেড়ে দিলে কেন? অণু সহজেই মিশুর হাতে হাত রেখে এগিয়ে যায়। সবচেয়ে পেছনের সারিতে মাঝামাঝি ওরা আসন খুঁজে পায়। হল অন্ধকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে।
অণুর হাতে হাত, আঙুলের ভেতর আঙুল রেখে উষ্ণতার ছোঁয়া নেয় মিশু। অণু দুষ্টামি করে সুধায় এই প্রথম কোনো নারীর হাতে হাত রাখলে তুমি? মিশুর না সূচক জবাবে অণু বলে শরীরে শরীর? এবার মিশু কি বলবে বুঝে পায় না। সে কি অস্বীকার করবে ঝুনু খালার সাথে তার কৈশোরের নাটকীয় শরীর বিনিময়ের প্রথম অভিজ্ঞতা? পাশ কাটিয়ে যাবে সাদিয়ার সাথে রোমান্সের কথা? ঝুনুর সাথে প্রথম অভিজ্ঞতার পর বিভিন্ন সময়ে মিশু নারীসঙ্গ পেয়েছে। সাদিয়ার সাথেই কেবল দীর্ঘ সময়ের প্রেম ও রোমান্সের স্মৃতি হৃদয়ে গভীর চিহ্ন রেখে গেছে। সাদিয়াকে নিয়ে জীবন সাজাবার কত কল্পনা করেছে কিন্তু তার সামাজিক জীবন, পারিবারিক স্ট্যাটাস সেই স্বপ্ন পূরণের অনুকূলে ছিল না। সব জেনেও সাদিয়া তাকে কেন গ্রহণ করেছে? দিনের পর দিন এমন যৌথ যাপনে কেন বাঁধা হয় নি? একি তবে সাদিয়ার খেলা ছিল? সাদিয়ার সাথে ভেসে বেড়াবার স্মৃতি এসব অস্বীকার করা ঠিক হবে না। মিশু আবারও হ্যাঁ বলে সেক্স নিয়ে যে তার কোনো ট্যাবু নেই তা অণুকে জানিয়ে দেয়।
ডুব মুভিটা যে আশা নিয়ে দেখতে গিয়েছিল তেমন মনে হয়নি। তবে দুজনের বেশ চমৎকার সময় কেটেছে। মুভি দেখে লাইট স্ন্যাক্স নিয়ে বাসায় ফিরে মিশুকে ড্রিঙ্কস অফার করে অণু। দুজনেই হুইস্কি নেয়। গলা ভিজিয়ে স্ন্যাক্স খেতে খেতে রাত ১১টা বাজিয়ে দেয়। মিশু এবার উঠতে চায়।
ইচ্ছে হলে থেকেও যেতে পারো, রাতভর গল্প করে কাটিয়ে দেবো অণুর এমন কথায় মিশু কোনো কৃত্রিমতা দেখে না। আজ থাক, অন্য কোনোদিন এসে সারাদিন রাত গল্প করব এই বলে বিদায় নেয় মিশু।
অণু মিশু দুজনেই আজকের দিনটাতে খুব তৃপ্ত। দুজনেই পরস্পরের সম্পর্কে জানতে পেরেছে, অনেক সহজ হতে পেরেছে। অণু ভাবছে মিশু হয়তো ভালো বন্ধু হতে পারে। মিশুর প্রতি একটা টান অনুভব করে অণু। গাড়িতে বসেই মিশু ভাবতে থাকে অণুর আন্তরিক ছোঁয়া। ওর রুচি, আতিথ্য, সুন্দর সময় কাটাবার পরিকল্পনা সবকিছুই ছিল মনোলোভা। অণুর অতীত নিয়ে যদিও কিছুটা সংশয় আছে মিশুর। মিশুও তো অনেক নারীর নিবিড় সংস্পর্শে এসেছে। কেউ তো তার জীবনের অংশ হয় নি কিংবা তাদের জীবনও তো তাতে কোনো বাঁধা পড়ে নি। পারস্পরিক সম্মতি ও বোঝাপড়ার মাঝে তারা জীবনকে রাঙিয়ে নিয়েছে তা নিয়ে তবে সংশয় কিংবা উদ্বেগ কেন?
ঝুনু খালা, সাদিয়া, মুকুল যদি বিয়ের আগের এত কিছু গোপন করে সহজেই অন্যকে সুখী করতে পারে বা নিজেরা সুখী হতে পারে তবে মিশু ও অণুর ক্ষেত্রে তা বাধা হবে কেন? বাধা হলো সংস্কার। বাধা হলো সামাজিক প্রথা। যে প্রথা বিধি নিষেধের আড়ালে নারী-পুরুষের সহজাত নির্মল ভালো লাগার সম্পর্ককে মিথ্যা দিয়ে ঢেকে দিতে বাধ্য করে তা বদল করা জরুরি। একজন আধুনিক মানুষ হিসেবে এসব ভাবনায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর বেশ খারাপ লাগছে। নিজের জীবনে যেসব অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে সেসবের বিবেচনায় অণুর জীবনের এই সম্পর্কগুলোও তো স্বাভাবিক।
অনেকদিন কোনো আলোচনায় না থাকলে চেনাজানা অনেক কিছুই ভুলে যায় মানুষ। যেমনটি হয়েছিল ঝুনু খালার ব্যাপারে। অথচ ঝুনু খালাই তো মিশুর পৌরুষকে জাগিয়েছে, তার সংস্কারের ভিত নড়বড়ে করে তাকে অন্য মানুষ বানিয়েছে। পাপাচারের ভয়ের বাইরে এনে তাকে জীবন উপভোগ করতে শিখিয়েছে। এরপর তো কলেজে পড়ার সময় শ্যামল গাঙ্গুলি স্যারের স্ত্রীর সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক হয়েছে। একবার স্যার বাইরে গেলে শ্যামা বউদি তাকে বাসায় ডেকে নিয়েছিল। গান শুনিয়েছিল। মিশু ফিরে যেতে চাইলে তাকে পথ আটকে কাছে টেনেছিল। বউদির গভীর চুম্বনে মিশু ঘন হয়ে এলে তাঁরা পরস্পরের গভীরে নেমেছিল। মিশুর আদরে বউদি আনন্দে কেঁদেছিল সেদিন। বলেছিল, শ্যামল স্যারের অক্ষমতার কথা। মানুষটি ভালো। সম্পদ, স্বাচ্ছন্দ সব দিতে পেরেছে কিন্তু সুখ দিতে পারে নি। সন্তান দিতে পারে নি। বউদির কথায় মিশুর কেমন যেন মায়া পড়ে যায়। এরপর থেকে কলেজে পড়ার পুরো সময় সুযোগ পেলেই বউদির কাছে গিয়েছে। বউদির শরীর তখন তার নেশায় পরিণত হয়। ভয়, শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে দিনের পর দিন সে ছুটে গেছে, বউদিও তাকে গ্রহণ করেছে।
একদিন বিকেলে গিয়ে শোনে স্যার গ্রামের বাড়ি গেছেন, তিনদিন পর আসবেন। বউদি মিশুকে এই তিনদিন তার কাছেই রেখে দেয়। সে কী আনন্দ মিশুর। সে-রাতে তারা ঘুমায় নি। কত কথা আর কত ভেসে যাওয়া। মিশুর আবেগী কথায় বউদি হাসত। নিঃসন্তান বউদির সন্তানের প্রতি আগ্রহ ছিল কিন্তু মিশুর সন্তান যেন তার গর্ভে আসতে না পারে সে-ব্যাপারেও সতর্ক ছিল। সেই শ্যামা বউদির কথাও ভুলে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর সাদিয়ার সাথে পরিচয়, প্রেম। অফুরান স্বাধীনতায় সারাদিন একসাথে কেটে যায়। বন্ধুত্ব ভালোবাসায় তাকে একান্তভাবে পাবার পর যেন এক অনাবিষ্কৃত খনির সন্ধান পায়। শ্যামা বউদি এরপর বিস্মৃত হয়ে যায়। আজ অণুর একটা ছোট্ট প্রশ্নে সব যেন সিনেমার গল্পের মতো মনের পর্দায় ভেসে আসে। এতকিছুর পরও কি তার সংস্কার দূর হয়েছে? হয় নি তো।
সবাই বিবাহিত, কিন্তু অন্য নারীর বন্ধুতা চায়।
অণুকে নিয়ে ভাবতে থাকে মিশু। ঘটনাবহুল আনন্দ বেদনার এই জীবনের স্মৃতি আজ তাঁকে এক দ্বান্দ্বিক অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয়। অণু যদি তার সবকিছু এমনভাবে না বলত তবে কি অণুকে কাছে পেতে, তাকে নিয়ে সংসার গড়তে কোনো দ্বিধা থাকত? জীবনে নারীর উপস্থিতি যা সব সময় উপভোগ্য মনে করেছি তা যদি অণুর ক্ষেত্রেও একইরকম হয় তবে তা অসহনীয় হবে কেন? নিজের সাথেই যুদ্ধ চলে মিশুর। অণুর প্রতি তার ভালোলাগাকে ভালোবাসায় কিংবা কোনো সামাজিক সম্পর্কে রূপ দিতে তবে আড়ষ্টতা কিসের? সিদ্ধান্ত নেয় অণুর আপত্তি না থাকলে সে তার সাথে জীবন বাধতে চায়।
অণু মিশুকে নিয়ে ভাবতে চায় না তবুও কেন যেন ঘুরেফিরে মিশুই আসছে মনে। মিশু কি তবে ভালোবাসে আমায়? নাকি ভাব জমাতে চায় আর বন্ধুতা চায়। মিশুর বন্ধুতায় কি কোনো বাধা আছে? জামানের সাথেও তো তাঁর কোনো ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল না। জামান তাকে সহায়তা করেছে বিনিময়ে সান্নিধ্য পেয়েছে। দুজনের বন্ধুতা হয়েছে। পরস্পর কাছে এসেছে কিন্তু কোনোদিনই তা শরীরী সম্পর্কের বাইরে অন্য কিছু কেউ ভাবে নি। জামান তাঁর সঙ্গ চেয়েছে। অণুও চেয়েছে জামানের সান্নিধ্যে এক অন্যরকম আনন্দময় ও উপভোগ্য জীবন। জামানের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে গিয়ে আরও কিছু বন্ধু পেয়েছে অণু। সবাই বিবাহিত, কিন্তু অন্য নারীর বন্ধুতা চায়।
জীবনকে উপভোগ্য করতে জামানের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেই অণুর আরও কয়েকজন আমলা, ব্যবসায়ীর সাথে পরিচয় হয় যাদের দু’জনের সান্নিধ্যও ভালো লাগত অণুর। কিন্তু জামানের মতো আন্তরিকতা নিয়ে তাঁর পাশে আসে নি ওরা। ওরা শুধুই পানাহার আর শরীর ভালোবাসে। তাই কারো সাথেই জীবনঘনিষ্ঠ হতে মন চায় নি, শুধুই জামানের সাথে অণুর দীর্ঘ মেলামেশা। কিন্তু জামানকে তো আর তার ইচ্ছে মতো পায় না। অণুরও তো ইচ্ছে করে কেউ তার ইচ্ছের দাম দিক, ইচ্ছে মতো তার কাছে আসুক। মিশু কি তার ইচ্ছে মতো কাছে আসার কেউ হবে? পাশে থাকবে সবসময়? যদি তাই থাকে তবে মিশুর সাথে জীবনটা অন্যভাবে গড়তে চায় সে। এসব ভাবতে ভাবতে নিজে নিজেই হেসে ওঠে অণু। এরপরও অণুর ইচ্ছে হচ্ছে মিশুকে অনেক কাছে পাবার। মনে হচ্ছে মিশুর জন্য সে অনেক কিছু করতে পারে। সব কিছু জেনে মিশু কি স্বাভাবিকভাবে তাকে ভালোবাসতে পারে? আমাদের দেশের ছেলেরা তা পারে না কেন? সামাজিক রীতির ভয়ে সত্য গোপন করে অণু কোনোভাবেই কোনো সম্পর্কে জড়াতে চায় না। নিজেকে স্বচ্ছ রেখেই অণু মিশুকে কাছে পেতে চায়। তা সে প্রেমিক হিসেবেই হোক, বন্ধু কিংবা স্বামী হিসেবেই হোক।
এসব ভাবতে ভাবতেই মিশুকে ফোন দেয় অণু। হাই মিশু কেমন আছ?
ভালো, তোমার কথাই ভাবছিলাম অণু। তুমিই আগে কল দিলে। তোমার সাথে অনেক কিছু বলার ছিল কিন্তু সেদিন তো আর হলো না। তোমার প্রশ্নের উত্তরও দেয়া হয় নি।
আরে না, ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে না। আর তুমি যদি এমন কিছু শেয়ার করতে চাও, শুনতে আপত্তি নেই আমার বলে অণু।
তবে চলো কোথাও যাই, সারদিনের জন্য। কোথায় যাওয়া যায় বলো তো? তোমার কোনো পছন্দের জায়গা আছে? জানতে চায় মিশু।
কোথাও যাওয়ার দরকার নেই, তুমি আমার বাসায় আসো। বাসায় অনেক স্বচ্ছন্দ আমি, জানায় অণু।
মনে মনে মিশুও তাই চাচ্ছিল। অণুর বাসা অনেক নিরাপদ। তাই মিশু রাজি হয়ে বলল আসছি তবে, কাল সকালেই।
অণু বলল, আরে না সকালে কেন, বিকেলে আসো। রাতে আমার এখানেই থাকবে, অবশ্য তোমার যদি আপত্তি না থাকে। কোনো আপত্তি নেই, তোমার যত্নে আমি ভালোই থাকব, এই উইকেন্ড তবে তোমার কাছেই কাটিয়ে দেই, কী বলো। বলেই হাসল মিশু। হাসছ কেন, তোমার সঙ্গ আমার ভালোই লাগবে। যত্ন করতে হয়তো পারব না তবে অযত্ন হবে না এটুকু বলতে পারি। তবে কাল আসো, উইকেন্ড কাটাবার জন্য। শুভ রাত্রি বলেই ফোন রাখে অণু।
বিকেল থেকেই অপেক্ষা করছে অণু। আজ তার ওয়েস্টার্ন এটায়ার। মিশু চলে এসেছে খবর পেয়েই দরজা খুলে দাঁড়ায় অণু। ঢুকতেই অণু বলে, বাহ আজ যে একেবারে কাউবয়। মিশুও কম যায় না। উইকেন্ড কাটাতে এলাম, কোনো কনফারেন্সে তো আসি নি। মিশু যেবার প্রথম এসেছিল অণু কিন্ত তাকে সারা বাড়ি ঘুরে দেখায় নি। সেদিন মিশুও শুধু অণুকেই দেখছিল দেয়ালের পেইন্টিংসেও চোখ পড়ে নি তার। আজ দেয়ালে চোখ রেখে পেইন্টিংসগুলো কার জানতে চায় মিশু। পেইন্টিংসগুলো কোনো নামি শিল্পীর নয়, জানায় অণু।
মিশু বলে, আসলে আমি হচ্ছি চাকর আর তুমি হচ্ছ মালিক।
পেইন্টিংস দেখাতে দেখাতে মিশুকে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে যায়। সারা বাড়ি ঘুরে দেখায়। এত বড় বাড়িতে একা থাকো অথচ কত সুন্দর পরিপাটি করে রেখেছ। আমার ঘরে ঢুকলে তোমার তো দম বন্ধ হয়ে আসবে, এতটাই অগোছাল। মিশুর কথা কেড়ে নিয়ে অণু বলে, আমায় একটা কনসালটেন্সি দাও আমি সব গুছিয়ে দিয়ে আসব। তা সেই গোছানো তো আর থাকবে না, ক’দিনেই আবার যাচ্ছেতাই হয়ে যাবে। তবে একটা বউ নিয়ে আসো যে গুছিয়ে রাখবে সব। এবার চুপ করে যায় মিশু।
লিভিংয়ে মিশুকে বসিয়ে বাঁশি ছেড়ে দিয়ে রান্নাঘরে যায় অণু। মিশু বাঁশি শুনছে আর শেলফে বই দেখছে। গল্প, উপন্যাস, কবিতা আর ফ্যাশনের বই। একটা কবিতার বই হাতে নিয়ে সোফায় বসে মিশু। মহাদেব সাহার প্রেমের কবিতা... আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলো টেপ করে রাখলে পৃথিবীর যে-কোনো গীতি কবিতার শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন হতে পারত। অণু নাশতা নিয়ে আসে। পিঠা, চপ, কাবাব আর পায়েশ। সাথে ফ্রেশ জুস আর গুড়ের সন্দেশ। খাবারের প্রতি নজর নেই মিশুর। অণুর দিকে চেয়ে থাকে সে। কী দেখছ অমন করে? খাও। মিশু অণুর খুব কাছে এসে বলে তোমার চোখে চুমু খাই? অণু কিছুই না বলে ঘনিষ্ঠ হয়। দুচোখেই গভীর চুমু খায় মিশু। কেঁপে ওঠে অণু। চোখ বুজে আসে। সারা দেহে শিহরন খেলে যায়। মনে হচ্ছে মিশু যদি জড়িয়ে ধরে আদরে ভরিয়ে দিত কিন্তু মুখে বলছে ঠিক আছে, আর না, এবার বসো গল্প করি। তোমার কথা শুনি। নিজেকে সামলে নিয়ে কথা বলতে থাকে। রাত গভীর হয়, মিশু বলেই চলে। এবার ফ্রেশ হয়ে ঘুমাতে যাও বলে অণু উঠতে চায়।
তোমার ঘুম পাচ্ছে অণু? বসো না গল্প করি।
ঠিক আছে ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করো। আমিও চেঞ্জ করে আসি। তুমি কি বাথটাবে স্নান করবে? জল ছেড়ে আসব? জানতে চায় অণু।
মিশু বলল, হুম, উষ্ণ জলে।
জলে ভরা বাথটাবে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেয় অণু। মিশু আসো, সব রেডি। মিশুকে ডেকে দিয়ে অণুও স্নান সারতে যায়।
বাহ! ঈষদুষ্ণ জল। জলে ভাসছে হলুদ আর লাল গোলাপের পাপড়ি। দেখে অবাক হয়। অণুর এমন আতিথ্যে মন ভরে ওঠে। মিশু ভাবে অজপাড়াগায়ের এক মেয়ে যার জীবনে এত ঝড়ঝাপ্টা সে এত শিল্পবোধ পেল কিভাবে? অণুর বাসার সবকিছুতেই যেন একটা শিল্পের ছোঁয়া আছে। জীবনে প্রথম এমন স্নান করছে মিশু। আজই অণুকে বলবে তার অনুভূতি। অণুকেই তার চাই ।
স্নান শেষে দুজনেই গল্প করে কিছুক্ষণ। মিশু যেন কী বলতে চায় কিন্তু কিভাবে শুরু করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। অণু তা টের পায়। তাই আলাপ দীর্ঘ না করে ঘুমাতে যাবার তাড়া দেয়। মিশুকে গেস্টরুমে শোবার ব্যবস্থা করে দেয়। শোন, কোনো সমস্যা হলে ডাক দিও, দরজা খোলা আছে বলেই ঘুমাতে যায় অণু।
মিশুর ঘুম আসে না। এর মাঝে দুবার উঠে জল খেয়েছে। অণু ঘুমিয়ে পড়েছে, এসব কিছুই টের পায় নি। মিশু ভাবে নতুন জায়গা বলে হয়তো ঘুম আসছে না। কিন্তু তার তো এমন হয় না। অফিসের কাজে দেশে বিদেশে কত জায়গায় যায়, কখনো এমন হয় না তার। তবে আজ কেন হচ্ছে? অণু দরজা খোলা রেখে ঘুমাচ্ছে। কত নির্ভার ও। ক’দিনের পরিচয়ে একা বাড়িতে থাকতে দিয়েছে, নির্ভয়ে দরজা খুলে ঘুমাচ্ছে। কতটা বিশ্বাস রাখছে আমার ওপর। এসব ভাবতেই অণুর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে ভোরবেলায় ঘুম আসে।
অণু সকালে উঠে নাশতার আয়োজন করে কিন্তু মিশুকে ডাকে না। অনেক বেলা হয়ে যায় তাও মিশুর ওঠার নাম নেই অথচ ওর অনেক ক্ষুধা পেয়েছে। মিশুকে রেখে খাবে? এসব নানা কিছু ভেবেও কিছু একটা খেয়ে নেয় অণু। এরপর পেপার পড়তে বসে। মিশুর আড়মোড়া ভাঙে। ঘুম ঘুম চোখেই ঘড়ির দিকে তাকায়। ধড়ফড় করে উঠে বসে। বেলা এগারোটা। কিছুটা লজ্জা পায়। হাত-মুখ ধুয়ে বেরুতেই সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। এর মধ্যেই টেবিলে নাশতা সাজায় অণু। মিশু, আসো খাবে। মিশু টেবিলে আসে। অনেক দেরি হয়ে গেছে, তুমি খেয়ে নিলেই পারতে। তোমাকে ছাড়া কী করে খাই বলো? আমিও বেলা করে উঠি, এত রুটিন মেনে চলি না, তোমার মতো অফিস নেই আমার। মিশু বলে, আসলে আমি হচ্ছি চাকর আর তুমি হচ্ছ মালিক। তোমাকে কারো কিছু বলার নেই, ইচ্ছে মতো চলতে পারো। আর আমাকে চলতে হয় বসের ইচ্ছায়। এখনই ডাকলে চলে যেতে হবে। সবকিছুরই সুবিধা অসুবিধা আছে। বহুজাতিক কোম্পানির চাকরি, শান-সৌকত আলাদা। আর আমার ছোট ব্যবসা। এসব খুনসুটি করতে করতে খাওয়া শেষ হয়।
মিশু বলে আজও কি ঘরে বসে থাকবে? চলো বাইরে যাই। কোথায় জানতে চায় অণু। দুজনে মিলে ঠিক করে পূর্বাচলের পাশে মাটির ঘরে খেতে যাবে। দুপুরে খেয়ে বিকেলটা পূর্বাচলে কাটিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসবে। মাটির ঘরে ফোন দিয়ে দুজনের জন্য খাবারের অর্ডার করে মিশু। রেডি হয়ে বেরিয়ে যায়। মাটির ঘরের খাবার বেশ ভালো লাগে অণুর। রিসোর্টের খাবার থেকে আলাদা। পাহাড়িদের রান্নার পদ অণুর বেশ লাগে। তিনশো ফুট রাস্তার শেষ প্রান্তে কাঞ্চন ব্রিজের বিপরীত রাস্তায় পুবাইলের দিকে কিছুটা পথ এগুলোই গ্রামীণ এক বাড়িতে এই খাবার ঘর। গাছপালায় ঘেরা এই বাড়িটির গাছে গাছে দড়ির দোলনা। কেউ শুয়ে থাকে। কেউ দোলনায় দোলে। অণু দোলনায় বসে। মিশু পেছন থেকে দোল দেয় আর অণুর চোখে ভালো লাগার আবেশ দেখে আনন্দ পায়।
বিকেলে পূর্বাচলে নদীর পাশে যায় ওরা। একটা নৌকা ভাড়া করে ঘুড়ে বেড়ায়। অণুর পাশে বসে বাতাসে ওর চুল উড়া দেখে মিশু। অণু জলে পা ডুবিয়ে আনমনা হয়ে যায়। মিশুর ইচ্ছে হয় অণুর হাতে হাত রাখতে। কিন্তু কী এক দ্বিধা কাজ করে। অণু এবার পা উঠিয়ে নাও, পড়ে যেতে পারো বলে অণুকে সাবধান করে মিশু। তুমি আমার হাত ধরে থাকো, আমি আর কিছুক্ষণ জলের স্পর্শ নেই। বেশ ভালো লাগছে। কতদিন পর নদীর জলে পা ডুবালাম। অণু যেন কৈশোরে ফিরে গেছে। নৌকা ভ্রমণ শেষে পূর্বাচলের নকশি পল্লি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে বাসায় ফিরে আসে ওরা।
মিশু মনে মনে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল তা জানাতে চায় অণুকে। কিন্তু কিভাবে শুরু করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না। আজকের সুন্দর একটা দিনের জন্য মিশুকে ধন্যবাদ দেয় অণু। অনেক দিন পর নদীতে একান্ত সময় বেশ ভালো লেগেছে। জানো ছোটবেলায় নদীতে গোসল করেছি। আজ জলে পা ডুবিয়ে আমার শৈশবের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলাম। তোমার নির্ভরতার হাত আমাকে ভয়মুক্ত করে এই জলের শীতল পরশ নিতে দিয়েছে। মিশু এবার যেন তার মনের কথা বলার সুযোগ পায়। আমি কি এই নির্ভরতার হাত তোমার হাতে রেখে একসাথে পথ চলতে পারি না? আমরা কি আমাদের যুগপৎ ভবিষ্যৎ একসাথে গড়ার কথা ভাবতে পারি না? তোমার শিল্পী মন দিয়ে এই ঘরকে যেমন সাজিয়েছ সেই ঘর কি আমাদের প্রশান্তির ঘর হতে পারে না?
শুধু এই সংস্কার আমাদের সেতুবন্ধনের অন্তরায় হতে পারে না।
মিশুর এতসব প্রশ্নের কী উত্তর দেবে অণু? তাও শান্ত গলায় বলে যে আবেগ নিয়ে তুমি আজ এই কথাগুলো বলছ তা কতটা ভেবে বলেছ জানি না তবে এরকম সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে তোমাকে ভাবতে হবে আমার সব কিছু জেনে তুমি আমায় ভালোবাসতে পারবে কিনা? আমরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারব কিনা? জীবন সম্পর্কে আমার যে বোধ তা হলো ব্যক্তির স্বাতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে মূল্য দেয়া। তাই একসাথে পথ চলার মানে আমার কাছে এমন যেখানে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ চলে গেলেও যুগল জীবন বয়ে না চলা। অন্য কারো প্রতি তোমার কিংবা আমার কোনো ভালো লাগার সম্পর্ক তৈরি হলে তা নিয়ে স্বচ্ছ থাকা। আমি জানি বিয়ে নামক সামাজিক চুক্তি নারীকে সেই স্বাধীনতা ও মুক্তি দিতে অক্ষম। তাই এমন চুক্তিবদ্ধ না হয়েও যদি শুধু ভালোবাসা, সম্মানবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখতে আমাদের সম্মতি থাকে তবে আমরা একসাথে থাকতে পারি।
অণু আমি শুধু আবেগতাড়িত হয়েই এসব বলছি না। সবকিছু জেনে বুঝে, যুক্তি বুদ্ধি বিবেচনায় নিয়েই আমি তোমার সাথে পথ চলতে প্রস্তুত। আমাদের দুজনের জীবনেই নারী-পুরুষ নানাভাবে এসেছে। শুধু এই সংস্কার আমাদের সেতুবন্ধনের অন্তরায় হতে পারে না। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সন্তানের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় সামাজিক চুক্তি দরকার। এরপরও তুমি যদি এই চুক্তি না চাও আমি জোর করব না, তোমার কথাই মেনে নেব অণু। আচ্ছা আমরা ক’টা দিন সময় নিই, সামনের মাসেই না হয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিই মিশু? অণুর এই মতের প্রতি মিশুও সম্মতি জানায়।
অণু বিষয়টি নিয়ে জামানের সাথে আলাপ করতে চায়। জামান অণুর জীবনে অভিভাবকের মতো। জামানের অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতাপ্রসূত পরামর্শ তাঁর খুব দরকার। মিশুর সাথে যৌথ সামাজিক জীবন শুরু করলে জামান কি অখুশিহবে? তা কেন হবেন? যে অণুকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে, সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে এতটা সহযোগিতা করেছেন সেক্ষেত্রে ওর সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার সময়ে তিনি কখনোই অন্তরায় হবেন না। এসব ভেবে জামানকে ফোন করে অণু। কিন্তু ফোন বন্ধ পায়। জামান কি তবে দেশের বাইরে? হোয়াটসঅ্যাপে কল দেয়, তাও বন্ধ। সন্ধ্যায় টিভিতে আপডেট স্ক্রল দেখে অণু হতবাক হয়ে যায়। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। নেপালে প্লেন ক্রাশে বাংলাদেশি কর্মকর্তা মোর্তজা জামান নিহত। একি জামান কবে নেপাল গিয়েছিল। কিছুই তো জানি না। কেমন একটা অস্বস্তি বোধ করে। ফেসবুকে কোনো খবর আছে কিনা দেখে। সংবাদপত্রের আপডেট পড়ে নিশ্চিত হয় জামান আর নেই। জামানের সাথে তাঁর নেপাল বেড়াতে যাবার আনন্দঘন সময়ের কথা মনে পড়ে। জীবন থেকে পালিয়ে বেড়াতে চাইছিল জামান। তাই বলে এমন প্রস্থান? জামানের মতো একজন সুহৃদ হারানোর বেদনায় অণু কিছুটা মুষড়ে পড়ে।
মিশুকে ফোন করে অণু। ফোন বেজে চলেছে। একবার নয় কয়েকবার। মিশু ফোন ধরছে না। ঘণ্টাখানেক পর অণুকে ফোন করে মিশু। কী হয়েছে অণু? বেশ ক’বার ফোন দিয়েছিলে। ফোন রুমে রেখেই মিটিং এ ছিলাম। ফোন হাতে নিয়েই দেখি তুমি বেশ ক’বার ফোন করেছিলে। তুমি তো অফিস আউয়ারে ফোন দাও না। কোনো সমস্যা? এক নাগাড়ে বলে যায় মিশু। অণুর কোনো শব্দ নেই। মিশু আবার বলে অণু শুনতে পাচ্ছ? সরি অণু, কথা বলো। মনটা ভীষণ খারাপ। আজ একটু বাসায় আসতে পারবে? অণুকে খুব ম্রিয়মাণ শোনায়। এখনই আসছি। এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই, অফিস শেষে আসো বলে ফোন রাখে অণু। এই প্রথম অণুকে বেশ বিষণ্ন মনে হয়েছে মিশুর।
সন্ধ্যায় বেলা ইটালিয়া থেকে পিৎজা আর ক্রিম অ্যান্ড ফাজের আইসক্রিম নিয়ে অণুর বাসায় আসে মিশু। অণুকে বেশ বিষণ্ন লাগে। প্যাকেট হাতে তুলে নিয়েই অণু বলল বাইরে থেকে খাবার নিয়ে এসেছ কেন? ফ্রেশ হয়ে মিশু এসে অণুর পাশে বসে। কাঁধে হাত রেখে বলে কী হয়েছে অণু। নেপালের বিমান দুর্ঘটনায় যে জামান সাহেবের মৃত্যু হয়েছে তিনি আমার অভিভাবকসম ছিলেন। জীবনের কঠিন সময়ে তিনি আমায় সাহস জুগিয়েছেন, একটা কাজের ব্যবস্থা করেছেন। গভীর সান্নিধ্য ও নতুন জীবনবোধ দিয়েছেন। দুঃসময়ে আমার পাশে ছিলেন। আগেও তোমায় তা বলেছি।
আমার আজকের এই অবস্থানের পেছনে উনার অবদানের কথা মনে করে খুব বিপন্ন বোধ করছি বলতে বলতে অণুর চোখের কোণে জল জমে ওঠে। মিশু অণুকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু নিবিড়ভাবে কাঁধে হাত রাখে। অণু মিশুর কাঁধে মাথা রেখে কেমন যেন নিথর হয়ে আছে। ওর চোখের কোণ থেকে জলের ধারা চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। মিশু ওকে জড়িয়ে রাখছে। কিছুক্ষণ পর অণু উঠে বসে। মিশুকে বসিয়ে রেখে ফ্রেশ হতে যায়। আয়নায় চোখ পড়তেই চিবুকে শুকিয়ে যাওয়া জলের রেখা দেখতে পায়। কিছুটা বিব্রত হয় কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে মিশুর সাথে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করে। আমি তোমার মনের অবস্থা বুঝতে পারছি। স্বজন হারাবার বেদনা সান্ত্বনা দিয়ে ভুলিয়ে দেয়া কষ্টকর। কিন্তু এই সময় তোমার পাশে আছি। আগামীকাল ছুটি নিয়েছি, এরপর উইকেন্ড মিলিয়ে তিনদিন। তুমি চাইলে কোথাও ঘুরেও আসতে পারি বলে অণুর মতের অপেক্ষায় থাকে মিশু।
অণু কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বলে চলো আমরা সিলেটে যাই। সিলেটে কোথায় থাকবে কী কী দেখবে এসব ঠিক করে নেয় মিশু। পরদিন সকালে রওয়ানা হয়ে দুপুরে এসে পৌঁছায় নাজিমগড় রিসোর্টে। মিশু এর আগেও এখানে এসেছে অফিসের প্রোগ্রামে। জায়গাটা ওর অনেক পছন্দের। চেকইন করে কটেজে পৌঁছায়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকায় অণু। কী চমৎকার। চারপাশ সবুজে ঘেরা। উঁচু-নিচু ভূমি বিন্যাসে এক অপূর্ব স্থাপত্য শৈলী এই রিসোর্ট যেন একটা দ্বীপের মতো। সবকিছু ভুলে দূরে কোথাও তাকিয়ে মেঘের ভেসে যাওয়া দেখছে অণু। পছন্দ হয়েছে? মিশুর এমন প্রশ্নে চমকে ওঠে অণু। আর মুখে বলে অপূর্ব! আমার তো এখনই বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। ঠিক আছে আগে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে নাও তারপর যাব।
জীবন তো এমনই বয়ে চলে। নানা বাঁকে নানা টানাপোড়েনে এগিয়ে যায়।
অণুর চোখে অস্থিরতা দেখে ভালো লাগে মিশুর। এই বুঝি সহজ হতে চলেছে অণু। বিকেলে অণুকে নিয়ে বের হয় মিশু। রিসোর্টের স্পিডবোটে চড়ে সারি নদী হয়ে লালাখাল। সেখানে রেস্টুরেন্টে বসে কফি খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখে। গোধূলির রঙে মন রাঙিয়ে ফিরে আসে। নদীতে ঘুরে এসে দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি মুছে গেছে। খাওয়ার পর অণুকে ঘুমাতে বলে মিশুও ঘুমাতে যায়। কাল সকালে উঠতে হবে, যেতে হবে বিছানাকান্দি, রাতারগুল। সকালে নাশতা সেরেই বেরিয়ে পড়ে রাতারগুল। নৌকা করে রাতারগুলের বনে ঘোরাঘুরির মজাটাই অন্যরকম। এই জলবনে হিজল করচের সারি প্রাকৃতিকভাবে গড়ে উঠেছে। প্রকৃতির কোলে হিজল ছায়ায় বেশ রোমান্টিক একটা আবহ তৈরি হয়। অণু মোবাইলে গান ছাড়ে, ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যেজন খুঁজি তারে আমি আপনায়।’
এটা বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলবন জানায় মিশু। এরপর যাত্রা বিছানাকান্দি। দুপুর দুইটা নাগাদ বিছানাকান্দি পৌঁছে যায়। দূরে চেরাপুঞ্জি আর মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়ে মেঘের উড়ে চলা, নেমে আসা ঝরনার জল জীবনের গতিময়তা দেখিয়ে দেয় অণুকে। জীবন তো এমনই বয়ে চলে। নানা বাঁকে নানা টানাপোড়েনে এগিয়ে যায়। জলে হাত-পা ডুবিয়ে অণুর মন শীতল হয়। পাথরের বিছানার ওপর বয়ে চলা জলে শুয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়। অণু’র উচ্ছ্বাস মিশুকে আনন্দ দেয়। সন্ধ্যায় কটেজে ফিরে এসে দেখে আকাশে মেঘ জমেছে। মনে হয় বৃষ্টি নামবে। বারন্দায় বসে দুজন। অণু উঠে গিয়ে চা বানিয়ে নিয়ে আসে। মিশু যেন চায়ের অপেক্ষায় ছিল। কী করে বুঝলে আমার চায়ের তেষ্টা পেয়েছিল? আমারও ইচ্ছে হচ্ছিল, তাই করে আনলাম। চা খেতে খেতে দিনের ভ্রমণানন্দ নিয়ে বলতে থাকে অণু। অণুর এই স্বাভাবিক হয়ে আসাটা মিশুর বেশ ভালো লাগে।
কাল তো চলে যাবার কথা আমাদের। তুমি কি আরও কয়টা দিন থাকতে চাও অণু? থাকতে ভালোই লাগছে তবে তোমার অফিস আছে। কাল চা বাগানে ঘুরে এসে দুপুরের পর চলে যাই এবার। তুমি চাইলে এই সপ্তাহটা ছুটি নিতে পারি।
না না এতদিন এখানে কেন থাকব? এতদিন হয়তো ভালোও লাগবে না। মিশু বলে তুমি চাইলে আমরা সিলেটে দুদিন থেকে সুনামগঞ্জে আরও তিনদিন কাটিয়ে ঢাকায় ফিরে যাব। অণু বাধা দিয়ে বলে, না এবার থাক। এরপর না হয় আবার আসব।
রাতের খাবার খেতে খেতেই বৃষ্টি বাড়ছে। খাওয়া শেষে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে দুজন। অণু গান ছেড়ে দেয়, চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে... মিশু অণুর দিকে তাকিয়ে বলে এই রাতে তোমার বৃষ্টিতে ভেজার ইচ্ছে হচ্ছে? অণুর সংক্ষিপ্ত জবাব, হুম। মিশু যেন এটাই চাইছিল। হাত ধরে বলে এসো তবে বাইরে যাই। গানটা শেষ হোক বলেই ঘনিষ্ঠ হয় ওরা। গান শেষেই অণুর হাত ধরে বাইরে আসে মিশু। হাত ধরে হেঁটে চলে। কিছুক্ষণ হেঁটে এসে কটেজের সামনের গাছতলায় দাঁড়ায় ওরা। অণুর ঠান্ডা লাগছে। কিছুটা কাঁপছে। ভেজা চুল গড়িয়ে পড়ছে মুখের ওপর। জলে ভেজা মুখে এক স্নিগ্ধতার ছাপ। অণুর থুতনিতে হাত রেখে মুখ তুলে ধরে মিশু। চোখে চোখ রাখে। মিশুকে জড়িয়ে ধরে অণু। মিশু চুমু খায়, চোখে। এরপর ঠোঁটে ঠোঁট রাখে ওরা। দীর্ঘ চুম্বন শেষে কটেজে ফিরে আসে। স্নানশেষে গোছগাছ করে ঘুমাতে যায়।
সকালে উঠে চা বাগান হয়ে খাসিয়া পুঞ্জিতে যায় ওরা। ঘোরাফেরা শেষে ফিরে আসে। দুপরের খাবার খেয়ে চেকআউট হয়ে ঢাকায় রওয়ানা হয়। সারাটা পথ অণু মিশুর হাতে হাত আর কাঁধে মাথা রেখে নতুন পথচলার অভিপ্রায় জানিয়ে দেয়। বাসায় ফিরে অণু তার উচ্ছলতা ফিরে পায়। এই ক’দিন তুমি পাশে থেকে তোমার ওপর অনেক নির্ভরশীল করে তুলেছ আমায়। তোমার অনুপস্থিতির শূন্যতা আর চাই না। তুমি আমার কাছে আমার পাশে এমনি করে সবসময় থাকবে মিশু? মিশু অণুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে বলে তোমার মাঝে অনন্তকাল বসবাসের ইচ্ছে আমার। এভাবেই দুজনে একসাথে থাকার, একসাথে পথ চলার কথা পরস্পরকে জানিয়ে দেয়। পরদিনই বাসা ছেড়ে অণুর কাছে চলে আসে মিশু। অণু আজ হাতে মেহেদি পরেছে। মেহেদিপরা অণুর হাত ছুঁয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে মিশুর। ভাবছে, অণু কি আজ থেকে তাকে একান্ত নিজের করে চাইছে? অপেক্ষা করতেই মিশু টের পেল অণু অনেক বেশি সহজ হয়ে উঠছে। হাতে হাত রেখে অণু বলছে আজ থেকে তুমি আমার ঘরেই থাকবে মিশু। হেসে বলল এজন্য আমার কোনো চুক্তির দরকার নেই। তোমাতে যে বিশ্বাস আমার জন্মেছে তা আমাদের একসাথে বসবাসের জন্য যথেষ্ট। মিশু অণুর হাত ধরে গোলাপ পাপড়িতে ঢাকা বিছানায় এসে বসে। হাতে হাত রেখে চুপ করে থাকে। অনাগত ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে কথা বলতে বলতেই ভোরের আলো ফুটে ওঠে।