আমার একলা পথের সাথি : ১৫

পর্ব-১৪

পর্ব-১৫

আজিজ মার্কেটে গিয়ে বইপত্র কেনার পাশাপাশি অবধারিতভাবে প্রচুর লিটল-ম্যাগও কেনা হতো। তখন বই যত না খুঁজে কিনতাম, তার চাইতে বেশি খুঁজে কিনতাম মানসম্মত ছোটকাগজ। ওই সময়ে মীজানুর রহমান মীজানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা নিসর্গ, ক্যাথারসিস, একবিংশ, অনিন্দ্য, বিপ্রতীপ, দ্রষ্টব্য, গাণ্ডীব, নিরন্তর, শিরদাঁড়া, ব্যাস, সূচক, অলক্ত, লিরিখ ইত্যাদি কিনতামই। যদিও সেসবের বেশির ভাগই ছিল গোষ্ঠীদ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন যেমন বেশিরভাগ অনলাইন পত্রিকাও সেই পথেই হাঁটছে। কিন্তু আমার কথা হলো, নিজের দল বা বন্ধুকৃত্যের বাইরে অন্যদের লেখা প্রকাশ না করলে ‘পত্রিকা' করার দরকার কী? পরবর্তীতে আমি যখন ‘ধূলিচিত্র’ সম্পাদনা করি তখন এই দলবাজির বাইরে থেকেই পত্রিকা সম্পাদনা করার চেষ্টা করেছি। আমি চেয়েছি সত্যিকার অর্থেই ভালো লেখকটিকে আবিষ্কার করতে। একেবারে নিভৃতচারী যে লেখক, মফস্বলের জলার্দ্র-হাওয়ার ভেতর বসে বসে আপন মনে লিখে যাচ্ছেন নিজের লেখাটি—আমি তাঁকেই ছাপতে চেয়েছি এবং ছেপেছিও। একেবারে আনকোরা কোনো লেখককে আবিষ্কার করতে না-পারলে লিটল-ম্যাগ সম্পাদনা করার কোনো দরকার ছিল বলে মনে করি না। আজ অনলাইন সাহিত্য-পত্রিকাগুলোর বেলায়ও একই কথা বলতে চাই—লেখক হওয়ার সামান্য স্ফুলিঙ্গ যার মাঝে আছে, তাকেই প্রমোট করা উচিত। তাকেই পাঠকের সামনে নিয়ে আসা দরকার। অখাদ্যদের প্রমোট করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। যে সত্য-সত্যই ভালো লিখে তার লেখাটিই যত্ন করে প্রকাশ করা উচিত। মধ্যম ও নিম্নমানের মেধাবীদের নিয়ে খামাখাই ফালাফালি করার দরকার কী?


গল্পটি কুয়াত উল ইসলাম কিছুতেই ছাপেন নাই এবং আমার নাকের জল, চোখের জল একাকার করে বসে থাকার পরও ‘শৈলীর’ কোনো সংখ্যাতেই গল্পটি প্রকাশিত হয় নাই।


শুধুমাত্র বাংলাদেশের লিটল-ম্যাগ-ই কিনতাম এমন নয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত ছোট কাগজগুলোরও দিকদিশা খেয়াল রাখতাম। এবং বিশেষ করে পুজো সংখ্যাগুলোর জন্য অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষমাণ থাকতাম। অনুষ্টুপ, মুসায়েরা, তীব্রকুঠার, রক্তমাংশ, কৌরব, পরমা, জারি বোবাযুদ্ধসহ আরো কিছু মানসম্মত পত্রিকা খুঁজে খুঁজে কিনে আনতাম। এরই মাঝে একদিন কী মনে করে ‘তীব্র কুঠারের’ ঠিকানায় আমার ‘মেঘহীন রাত ছিল, পূর্ণগ্রাস চাঁদ ছিল’ নামের গল্পটি পাঠিয়ে দিলাম। [যে গল্পটি কুয়াত উল ইসলাম কিছুতেই ছাপেন নাই এবং আমার নাকের জল, চোখের জল একাকার করে বসে থাকার পরও ‘শৈলীর’ কোনো সংখ্যাতেই গল্পটি প্রকাশিত হয় নাই তখন এমন একটা সময় ছিল যখন আমার নামে প্রতিদিনই এন্তার চিঠিপত্র আসত। আমি যখন ‘ধূলিচিত্র’ সম্পাদনা শুরু করি,  তখন এই চিঠি প্রাপ্তির সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০/৭০-এর অধিক ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এত চিঠি আসত আমার নামে যে, ডাকবিভাগের লোকজনের কাছে আমি পরিচিত হয়ে গিয়েছিলাম। পোস্টম্যান শুধুমাত্র আমার নাম পড়েই চিঠি দিয়ে যেত। এমনকি আমার বাড়ির ঠিকানা দেখারও দরকার হতো না তার। এর প্রমাণ আমি পেয়েছিলাম, একদিন শুধু ‘পাপড়ি রহমান, সম্পাদক ধূলিচিত্র, মিরপুর’ খামের উপর এমন ঠিকানা লেখা একটা চিঠি আমার হাতে এসে পৌঁছেছিল বলে। মিরপুর তো আর ছোট্ট কোনো এরিয়া নয়, এত বিশাল মিরপুরে সাকিন-রাস্তার হদিসবিহীন চিঠি হাতে আসা, আমার কাছে ছিল বিস্ময়ের চাইতেও অধিক বিস্ময়কর।

শত-চিঠির ভিড়ে বিদেশ থেকেও কিছু এয়ারমেইল আমার নামে উড়ে আসত। কিন্তু একদিন ইন্ডিয়ার-স্ট্যাম্প সাঁটানো একটা চিঠি পেয়ে একটু ধাক্কাই খেলাম। খামের উপর যাঁর নাম লেখা তাঁর নাম আমি ইতঃপূর্বে কখনো শুনেছি বলেও মনে হলো না। কৌতূহল নিয়ে সে-চিঠি খুলে দেখি পত্রলেখক আমার সত্যিই একেবারে অপরিচিত। নাম সুরঞ্জন প্রামাণিক। তিনি চিঠি শুরু করেছেন ‘কল্যাণীয়াসু’ বলে। তাঁর চিঠির সারমর্ম, ‘তীব্রকুঠারে’ পাঠানো আমার গল্পটি নিয়ে। তিনি লিখেছেন ওই পত্রিকার প্রুফ-রিডিং করতে গিয়ে তিনি আমার একটা গল্প পড়েছেন। গল্পটি উনার অত্যন্ত ভালো লেগেছে। ভালো লাগার একটি গল্প পড়তে পেরে অভিনন্দিত করার লক্ষ্যে তিনি আমাকে এই চিঠি লিখেছেন। এবং আমার ঠিকানা পেয়েছেন গল্পের পেছনে লিখে দেওয়া ঠিকানা থেকে। ওই অচেনা কথাকারের চিঠি পড়ার পর আমি একেবারে তব্দা মেরে বসে রইলাম। আমি তখন থেকেই জানি, এই পৃথিবীতে অদৃশ্য কোনো গভীর-চক্র রয়েছে। যে চক্র ভালো-মন্দের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারক। এবং ওই অদৃশ্য চক্রের কাজ হলো মানুষের কাছে খুশির বারতাগুলো পৌঁছে দেয়া। সান্তাক্লজের ঝোলার মতো পিঠে একটা করে ঝোলা নিয়ে সেই চক্রের সদস্যরা দুঃখী বা অত্যাচারিতদের খুঁজে খুঁজে ‘খুশিয়া’ উপহার দিয়ে বেড়ায়। তাদের কাজই সৎ মানুষদের খুশি করে বুঝিয়ে দেয়া—দেখ, তুমি যা ভাবছ তা সঠিক নয়। তোমার অন্তর্লোকের খবর অন্তর্যামী ঠিকই জানেন।

সুরঞ্জনদার সঙ্গে আমার পত্রযোগ শুরু হলো। এবং একদিন ‘তীব্রকুঠারের’ একটি সংখ্যা ডাক-মারফত আমার হাতে চলে এল। আমি পত্রিকা খুলে দেখলাম—প্রথম গল্পটাই আমার সেই গল্প। সম্পাদক বীরেন শাসমল অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে, যত্ন সহযোগে একেবারে নির্ভুল বানানে আমার গল্পটা তাঁর পত্রিকার একেবারে প্রথম-গল্প হিসেবে ছেপে দিয়েছেন!


নিজেকে তারা প্রায় সকলেই মার্কেজ বা বোর্হেস নয়তো মুরাকামি গোত্রের লেখক মনে করেন। তাদের হিংস্র আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম।


পরবর্তীতে সুরঞ্জনদার সঙ্গে আমার সাহিত্যের নানান বিষয়আশয় নিয়ে পত্র যোগাযোগ চলতে থাকে। আমি ক্রমে জানতে পারি যে, তিনি ক্ল্যাসিক-ঘরানার একজন কথাসাহিত্যিক। পরিচয় শুরু হওয়ার অনেক পরে সুরঞ্জনদার সঙ্গে আমার দেখা হয়। ততদিনে আমাদের পত্রবন্ধুত্বের ইতি ঘটে গিয়েছে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রায় ১০/১২ বছর বাদে ছিল সেই সাক্ষাৎ। এক সার্ক লিটারারি ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ শেষ করে ফেরার পথে কলকাতায় এসে। দিল্লি থেকে ভয়ংকর ক্লান্তিকর ও মনখারাপ করা এক জার্নি করে এসে কফিহাউসের সামনে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ হলো। সুরঞ্জনদাকে দেখেই আমি অত্যন্ত ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম। আমার চোখ বারংবার জলে ভরে উঠছিল। কারণ পারিবারিক বাঁধার কারণে আমাকে সবার সঙ্গেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হয়েছিল। ফলত সুরঞ্জনদার সঙ্গে আমার আর কোনোদিন যোগাযোগ হবে বা দেখা হবে তা আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারি নাই। সেদিন কলকাতার লেখক-বন্ধুরা আমাকে যেভাবে সম্মানিত করেছিলেন তা আমার স্মৃতিতে আজও অমলিন হয়ে আছে! আর আমার যাঁরা সহযাত্রিণী ছিলেন আমি তাদের ক্রমাগত নাক ফোঁসফোঁসানি শুনছিলাম, ক্রোধে-রাগে দুই-একজনের নাকমুখ জবাফুল হয়ে উঠছিল—কারণ নিজেকে তারা প্রায় সকলেই মার্কেজ বা বোর্হেস নয়তো মুরাকামি গোত্রের লেখক মনে করেন। তাদের হিংস্র আচরণ দেখে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মতোই আমার বন্ধু মাল্যবান, এমনকি সুরঞ্জনদাও সেইদিন কম বিস্মিত হন নাই। সেদিন কফিহাউসে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সামনের কোনো এক পর্বে বয়ান করার ইচ্ছা রইল।

সুরঞ্জনদা অত্যন্ত ভদ্র, মৃদুভাষী ও নিভৃতচারী মানুষ। কারো সঙ্গেই তেমন কথাবার্তা প্রায় বলতেই চান না। নিজের কাজে নিজেই নিমগ্ন থাকতে ভালোবাসেন। অবশ্য এটাও তো সত্য, একজন প্রকৃত-লেখকের নিজের লেখাপড়ার বাইরে আর কিছু করার বা ভাবার অবসরই-বা কোথায়? প্রচণ্ড-রকম জীবনানন্দ দাশ-প্রেমী এই কথাসাহিত্যিক কবির জীবনকাহিনি-নির্ভর এক উপন্যাস লিখেছেন। সুরঞ্জদার উপন্যাসের নাম—‘সোনালি ডানার চিল’। ২০০৯ সালে ‘উবুদশ’ থেকে বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এ উপন্যাসের কাহিনি বস্তুনিষ্ঠ—ইতিহাসনিষ্ঠ, একই সঙ্গে তথ্যনিষ্ঠ। উপন্যাসের পরতে পরতে উঠে এসেছে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, স্বাধীনতা আন্দোলন, দাঙ্গা, বাঙলার প্রকৃতি ও তার অনুপম মুখাবয়ব। ‘সোনালি ডানার চিল’ উপন্যাসের ব্যাকপেইজে কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা রয়েছে—ইতিহাস সচেতন এই কবি বস্তুত তিমিরবিলাসী কবি নন—তিমিরবিনাশী এক শান্তবিপ্লবী। আলোর সন্ধানে যারা আছি , এ উপন্যাস হয়তো তাদের সেই পথে আলো ফেলবে।

সুরঞ্জনদা তাঁর ‘সোনালি ডানার চিল’ উপন্যাসটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন ১৮ চৈত্র, ১৪১৬।

বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় লিখে দিয়েছিলেন—

‘পাপড়ি, আপনাকে জীবনানন্দ দিলাম। —সুরঞ্জনদা'


‘তীব্রকুঠার’ ও ‘জারি বোবাযুদ্ধে’র দুই-সংখ্যাতেই আমিই একমাত্র বাংলাদেশি লেখক ছিলাম।


সুরঞ্জন প্রামাণিক ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ ‘বাংলা আকাদেমি’ পুরস্কার লাভ করেছেন। কোভিড-১৯-এর অতিমারী শুরু হওয়ার মাস তিনেক আগে তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন মাত্র ৩/৪ দিনের জন্য। অত্যন্ত হৃদয়বান দাদাটি তখন পদধূলি দিয়ে গিয়েছেন এই অধমের দরিদ্র-কুটিরে। সে-আনন্দ-সম্ভার অন্যখানে অন্য কোনো সময়ে সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেবার ইচ্ছে রইল।

পশ্চিমবঙ্গের ‘জারি বোবাযুদ্ধেও’ আমার একটা গল্প প্রকাশিত হয় । ওই পত্রিকা ‘আন্তর্জাতিক সংখ্যা’ নামে একটা স্পেশাল-ইস্যু প্রকাশ করেছিল। আমার একটা স্যাটায়ার-গল্প ওতে প্রকাশিত হয়। ‘চরভদ্রাসনে পরীকাহিনী’ নামক গল্পটি ‘জারি বোবাযুদ্ধও’ অত্যন্ত মর্যাদা দিয়ে তাদের পত্রিকা শুরুর গল্প হিসেবে ছেপে দিয়েছিল।

আজ বহু বছর পর এ কথাটা অত্যন্ত উচ্চকণ্ঠেই বলতে চাই—‘তীব্রকুঠার’ ও ‘জারি বোবাযুদ্ধে’র দুই-সংখ্যাতেই আমিই একমাত্র বাংলাদেশি লেখক ছিলাম।

পরবর্তীতে আমার বহু গল্পই পশ্চিমবঙ্গের বহু পত্রপত্রিকায় অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছে। এবং কিছু কিছু গল্প তারা নিজেরাই ইংরেজিতে অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ করেছেন। অবশ্য এসব নিশ্চয়ই সেই ‘রহস্যময় অদৃশ্য চক্রের সদস্যদের কাজ’—যারা অসহায়, নিপীড়িত, পিউরসোল মানুষদের অকারণেই ‘খুশিয়া’ বিলিয়ে চলে…!


পর্ব-১৬
পাপড়ি রহমান

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা