পুতুলওয়ালি

পুতুল তোমার জনম কিরূপ কে জানে
আলোক লতায় বাঁইন্ধা সুতা সে টানে

‘পুতুল নেবেন, পুতুল! দেশি পুতুল, বিদেশি পুতুল! আরো আছে মোবাইলে ঝুলাবার নানান রকম পুতুল, পুতুল নেবেন পুতুল! হরেক রকম পুতুল!...’

সূর্য না ডাকলেও কিছু মানুষ বাইরে বের হয় জীবনের তাগিদে আর কিছু বের হয় শখে, বাজার করতে, শপিং করতে অথবা সন্তানদের স্কুলে দেয়া-নেয়ার কাজ করতে এসে স্কুলের পাশের রাস্তায় বসে আষাঢ়ে গল্প জুড়ে দিতে, এবং একটা শ্রেণিতে নিজেদের আবদ্ধ করে তৈরি করে গসিপ ক্লাব। স্বামীর গর্জিয়াস ফ্ল্যাট এবং লাক্সারি গাড়িতে করে স্কুলের সামনে এসে সেসব মানুষেরা নারী থেকে আরো নারীতে পরিণত হওয়ার শ্লোগান তুলে। কেননা তাদের কাজ নেই কিন্তু সময় অনেক। তাই কাজ নাই তো খই ভাজ। তাদের পা এবং চুলের বাহার প্রমাণ করে বেশির ভাগ সময় কাটায় পার্লারে। এবং পোশাকের বাহার বলে দেয় প্রতি চারজনের ঘরে একটি করে বুটিক হাউসের কথা। এরাই গাড়ি থেকে নেমে র‌্যাম্পের মডেলের মতো ক্যাটওয়াক করে বাতাসে দামি পারফিউমের সুবাসে জানান দেয় আধুনিকতার।

রাস্তায় সেসব অতিরঞ্জিত মানুষগুলোকে পাশ কাটাতে গিয়ে চোখের পর্দা ঘামে নভেম্বর মাসের গরমে। গাড়িতে ফুল এসি ছেড়ে স্কুল ছুটি হওয়ার পনেরো মিনিট আগে পৌঁছে ঘামতে থাকি। বাজারের গরমে-ঘামে শরীরের আলুথালু অবস্থা থেকে নিজেকে ফাঁকে গুছিয়ে নিতে নিতে পৃথিবীর জলবায়ুর পরিবর্তন মনকে চিন্তিত করে তার উপর দুধের ভাবনাও। নিডো দুধ কিনতে কাঁচা বাজার সেরে আগরায় যাই। নিডোর সাপ্লাই বন্ধ শুনে মাথায় রক্ত উঠলে তারা জানায় প্রসিদ্ধ আটটি ব্রান্ডের দুধে মেলামিন ধরা পড়ায় সেগুলো বিক্রি নিষেধ করেছে কর্তৃপক্ষ। সন্দিহান মন আরো সঙ্কিত হয়, এতদিন তাহলে পিউশকে ওসব দুধ খাইয়েছি! পিউশ আড়াই বছর পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি ল্যাকটোজেন খেত। তারপর থেকে নেসলে কোম্পানির নিডো খেয়ে আসছিল। কয়েকদিন ধরে দুধে মেলামিন আছে ব্যাপারটা টিভিতে দেখলেও সিরিয়াল নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম বলে কেয়ার করি নি। তাছাড়া ঘরেও দু’মাসের দুধ সংরক্ষণে ছিল। ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিছক গুজব। আজ জেনে উদ্বিগ্ন হই। পিউশকে তাহলে কী দুধ খাওয়াব? অনেকে গরুর দুধ আরম্ভ করলেও তাতে কতটা ভরসা করা যায়! গরুর দুধেও তো নিম্নমানের গুঁড়ো দুধ, ফর্মালিন মেশাচ্ছে যেটা শরীরের জন্য আরো ক্ষতিকারক! সায়েন্স নিয়ে পড়ার কারণে জানতাম, মেলামিন হচ্ছে একটি কেমিক্যাল যৌগ, যার ভেতর প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেন থাকে। সাদা পানির মতো এই যৌগটি প্লাস্টিক, আঠা, লেমিনেটিং এসব বানাতে কাজে লাগে, সেটা কী কারণে দুধে মেশায়?


পুতুলের প্রতি আকর্ষণ নাকি সময়কে কিল করার জন্য মহিলার সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাই।


মানুষ কিভাবে বাচ্চার খাবারের সঙ্গে ওসব মেশাতে পারে! স্কুলের গেটের কাছে দু’এক জনকে দেখা গেলেও নামি না। তাদের সঙ্গে তেমন একটা মেশা হয় না। স্কুলে প্যারেন্টসদের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপ আছে। এদের মধ্যে অনেকের অনেক টাকা কিন্তু শিক্ষা নাই, অনেকের টাকাও আছে শিক্ষাও আছে কিন্তু ম্যানারস জানে না। অনেকের সবই আছে। আমার গ্রুপের কাউকে দেখতে না পেয়ে বসে বসে গৃহপালিত পশুদের বিড়াল হাঁটা উপভোগ করি। আমিও এক প্রকার গৃহপালিত মনে হলে এখন আর ফিলিং হয় না। আয়নার সামনে দাঁড়ালে কেমন একটা পুতুপুতু নাদুসনুদুস পুশি বেড়ালের মতো দেখায়। স্বামীকে দেখলে মাথাটা অতি আহ্লাদে গলে পড়ে। লেজ নেড়ে নেড়ে মেও মেও করলে স্বামীও সোহাগে কোলে তুলে নেয়। স্বামীর কোলে আরামে মাথা ঘষতে থাকলে হঠাৎ গাড়ির গ্লাসের কাছে অপরিচিত একটা মুখ দেখে চমকে উঠি। এসির ঠান্ডায় চোখ লেগে এসেছিল। অকস্মাৎ মহিলাটিকে না চিনলেও পরে ভালো করে তাকাতেই চিনে ফেলি। ক্ষণিক আগে মহিলাটিকে বিডিআর মার্কেটে দেখেছি। বিডিআর কাঁচা বাজার থেকে রিকশা-গাড়ি-লোকজন ডিঙ্গিয়ে এত দ্রুত এল কিভাবে! গ্লাসের সামনে কয়েকটি অদ্ভুত আকৃতির পুতুল মেলে ধরে বলে, ‘আপা, আপনার সোনামণির জন্য একটা পুতুল দেই!’

কিছুটা চমকে উঠলেও ঘুম থেকে পরিত্রাণের আশায় গাড়ির গ্লাস নামাই তাতে মহিলার কথা স্পষ্ট হয়। ততক্ষণে এসির শীতল হাওয়ায় মাথা থেকে দুধের চিন্তা দূর হয়।

পুতুলওয়ালি আবারও বলে, ‘আপনার সোনামনির জন্য একটা পুতুল দেবো, আপা!’

হাঁপ ছেড়ে মহিলার দিকে তাকালে কেমন জানি একটা আগ্রহ জন্মায় তার পেশার প্রতি। ছোটবেলা থেকে পুতুলের প্রতি অনেক আকর্ষণের কারণে হয়তো সম্মোহিত হই। মহিলার চেহারায় কিছু একটা ছিল। মহিলার কালো স্লিম দেহ বিখ্যাত সব মডেলদের ম্লান করে দিত হয়তো। হঠাৎ মনে হলো বিশ্বখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ মডেল নওমি পুতুল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দড়ি দিয়ে ঝোলান অদ্ভুত আকৃতির পুতুলগুলোর চেহারাও অদ্ভুত। ছোটবেলার পুতুলগুলোর মতো সুন্দর না হলেও পুতুলগুলো ছুঁয়ে দেই। ভালোলাগার সঙ্গে অদ্ভুত অনুভূতি হয়। মনে হয় হাতের নিচে টানটান শরীরের কোনো রাবারের পুতুল যেন রক্ত মাংসের শরীর হয়ে যাচ্ছে। পুতুলের অথবা পুতুলওয়ালির বডি ক্যামেস্ট্রির সঙ্গে এক হয়ে মিশে যাচ্ছে আমার বডি ক্যামেস্ট্রি। অতি নীরব দুপুরে পুতুলকে জড়িয়ে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে শরীর পুলকিত হতে থাকে। শরীরের গভীরে পুতুলকে ঢুকিয়ে দিতে দিতে তন্দ্রাচ্ছন্নাভূতিতে শরীর ভার হয়। তবুও পুতুলকে আরো চেপে ধরি আরো ভেতরে ঢোকাতে থাকি। সেই দুপুরে গোপন এক খেলায় অনুভূতিগুলো এক ধরনের নেশায় মত্ত হলে ঝড়ের গতিতে মা এসে পুতুলকে ছুড়ে দিয়ে আমার কান ধরে ছাদের উপর চেঁচায়, ‘তোমাকে না বলেছি বারবি নিয়ে না খেলতে! ওটা বড়দের পুতুল।’ আট-নয় বছরের আমি লজ্জায় অপমানে মনে হচ্ছিল ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ি...।

পুতুলওয়ালির ডাকে সম্বিত ফিরে এলে দেখি তার হাত ধরে আছি। হাতের নিচে স্পর্শ কেমন খসখসে। দ্রুত হাত সরিয়ে ফেলি।

‘আপা নিয়া যান একটা পুতুল। পুতুলগুলা কাপড়ের হইলেও বেশ নরম। বাচ্চারা খেলে মজা পাবে।’

বুঝতে পারি অতি শুদ্ধ কথা বলে সে আমাকে কনভেন্স করতে চাচ্ছে। পুতুলের প্রতি আকর্ষণ নাকি সময়কে কিল করার জন্য মহিলার সঙ্গে আলাপ চালিয়ে যাই। প্রশ্ন করি, ‘আচ্ছা এত পেশা থাকতে তুমি এই পেশা বেছে নিলে কেন?’

প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে মহিলা চোখের পানি আড়াল করার জন্য ব্যস্ত হলে অপ্রস্তুত হয়ে বলি, ‘সরি! সরি! তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য বলি নি!‘

‘না আপা কষ্ট পাই নাই!’ দক্ষ অভিনেত্রীর ভূমিকা নিয়ে বলে, ‘আমাদের কথা কেউ জানতে চায় না তো তাই চোখে পানি আইসা গেল!  তারপর শিশুর মতো কোনো রকম ভণিতা না করে মহিলা কথা বলে যাচ্ছে—সরল রেখার মতো তার কথা প্রবাহিত নদীর মতো। মাঝে মাঝে এমন কথাও বলছে তার জীবনকে অতিরঞ্জিত বলে মনে হচ্ছিল। ‘কথায় বলে না অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়। আমি হইলাম সেই অভাগা! তা না হইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরব ক্যান! কত বড় মাপের সিনেমার এক্সট্রা থেকে আজ পুতুলওয়ালি।’ মহিলা আমার ফিলিং-এর প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ না করে এক মনে বলতে থাকে। মনে হচ্ছিল যুগ যুগ ধরে সে কোনো শ্রোতার অপেক্ষায় ছিল। ‘...মাইয়াগো একমাত্র পেশা হইব স্বামী সংসার করা, মুরুব্বিগো কথা মতন  সিনেমার জগৎ ছেড়ে সেই পেশাই বাইছা নিলাম। সিনেমা ছেড়ে দিলাম। শিক্ষাদীক্ষা তেমন নাই যে চাকরি করব। ক্লাস ফাইভ পাশ করলে আব্বা মারা গেলে মা ঢাকায় এফডিসির বস্তিতে আইসা ওঠে। সেখানে মার এক ধর্মভাই আমার চেহারা ভালো দেইখা সিনেমায় নামায়া দিল। মারে দিল কাজের বুয়ার রোল। সিনেমায় আমার পজিশন একেবারে খারাপ ছিল না। নায়িকাদের বান্ধবীর রোল বেশি করতাম। যাকে বলে সাইড নায়িকা।’ হঠাৎ উৎফুল্ল হয়ে বলে, ‘আপা, আনারকলি সিনেমাটা দেখছেন! সেখানে আমি চম্পা ম্যাডামের বান্ধবী ছিলাম। আমার অপজিটে ছিল টেলিসামাদ ভাই। ছবিটা অনেক হিট হইছিল...’


নানুর আব্বাজান তারা ফতোয়া দিত ইসলামে সাত বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের পুতুল খেলা নিষেধ।


মহিলার দিকে তাকিয়ে একটু আগে ছলছল করা দুটো চোখের স্থলে জ্বলজ্বল করা দুটো তারা দেখতে পাই। আকাশে বহু তারার মধ্যে যে তারাগুলো খালি চোখে দেখা যায় না সেই তারা। তাদের দেখতে টেলিস্কোপ লাগে। স্কুলের গেটের কাছে পরিচিত সার্কেলের মধ্যে সবাই এসে পড়েছে দেখে গাড়ির দরজা খুলে আগালে সেও আগায়। আমাকে দেখে কয়েকজন ভাবি উৎফুল্ল হয়ে বলে, ‘কী ব্যাপার ভাবি! আপনি কি পুতুলের শো রুম দিয়েছেন নাকি!’

তাদের কথায় হেসে বললাম ভাবতে পারেন সেইরকম ব্যাপার। জীবন সম্পর্কে উদাসীন এসব সুখী মানুষদের এরকম করে বলাটা অস্বাভাবিক ঠেকল না। কেননা প্রতিদিনই ভাবিদের মধ্যে একজন না একজন কিছু একটা নতুন খবর দিচ্ছে। কেউ পার্লার দিচ্ছে, কেউ বুটিক হাউস, কেউ ক্যাটারিং অথবা কেউ খুলছে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল অথবা কোচিং সেন্টার।

‘ভাবছি একটা শোরুম দিলে মন্দ হয় না, কী বলেন আপনারা! তাই স্যাম্পল এনেছি পুশিং সেল করাতে, বলে, সবাইকে এক প্রকার জোর করে একটা করে পুতুল কিনতে বাধ্য করাতে সেটা ম্যাজিকের মতো কাজে লাগে। কৌতূহল প্রিয় মানুষগুলো মুহূর্তের মধ্যে পুতুলওয়ালির সব পুতুল শেষ করে ফেলে। উৎফুল্ল বাচ্চারা অদ্ভুত আকৃতির পুতুলগুলো পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাড়ি ফিরে যায়। আমার কিছুটা দেরি হয় ড্রাইভারের জন্য। তাকে ধারে কাছে কোথাও দেখতে না পেয়ে প্যারেন্টস ওয়েটিং চেয়ারে বসলে মহিলাও পাশে দাঁড়ায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য। পিউশও পুতুল পেয়ে মহাখুশি। ছেলে হলেও সে আমার মতো পুতুল পাগল হয়েছে। হবে না ! জন্মের পর থেকে ঘর ভর্তি পুতুল দেখে আসছে। বিয়ের পর আমার গার্মেন্টস মালিক স্বামী যে দেশে ব্যবসার কারণে যেত আমার অনুরোধের ঢেকি গিলে সেখান থেকে বাহারি সব পুতুল নিয়ে আসত। নিজের ফ্ল্যাটের একটা রুমে সেসব পুতুল দিয়ে সাজিয়ে এক প্রকার তৃপ্তি পাই।

বারবি, ব্রাট্জ, গ্রোভি গার্লস, স্যান্ডি, জিসিলা, লুসি, সামার গার্ল, ইকরি, টুকটুকি, গায়ের বধূ, বেবে গি, গু গু ডল, কারিটো কিডস, টেডি বিয়ার-এর সঙ্গে আম্মুর হাতের এমনকি নানুর হাতের বানানো পুতুলগুলোও আছে। তবে সবচেয়ে বেশি আছে বারবি কালেকশন। এশিয়ান, আফ্রিকান, আমেরিকান নানান দেশের ডাক্তার, বিমানবালা, জিমন্যাস্ট, অ্যাসট্রোনাট বারবি রয়েছে। বারবির প্রিয় রং গোলাপি। তাই রুমটির আসবাবপত্র থেকে শুরু করে বারবির ব্যবহৃত জিনিসপত্র সবকিছুতে গোলাপি রঙের প্রাধান্য আমাকে প্রশান্তি দিত। আব্বু-আম্মু পুতুল দিয়ে সাজাবার কারণে আমার ফ্ল্যাটে তেমন একটা আসত না। শ্বশুর-শাশুড়ি তো না-ই। নির্জন দুপুরে অখণ্ড অবসরে পুতুলঘরে যেয়ে তাদের আকৃতি-গড়ন-পোশাক-ঠান্ডা চোখ দেখে সম্মোহিত হতাম। পার করে দিতাম অগণিত মেয়েবেলা। ছোটবেলায় আম্মু নিজ হাতে কাপড়ের পুতুল বানিয়ে দামি শাড়ির ব্লাউজের পিস দিয়ে শাড়ি বানিয়ে দিত। জুতার বাক্স দিয়ে পুতুলের ঘর বানিয়ে দিত। আম্মুকেও নানু পাটখড়ি দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিত। নানুকেও বড় মা মাটি দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিত। ছোটবেলা থেকে আম্মু ছিল নানুর অনুকরণীয় আদর্শকাঠামো। বড় হতে হতে আমিও আম্মুকে অনুকরণ করতে থাকি।

ছোটখালা আমার পুতুল প্রীতি দেখে লন্ডন থেকে একটা বারবি পাঠিয়েছিল। সব সময় আধুনিক সেই সুইটি খালাই বলেছিল, তোদের বাবারা পুতুল খেলা পছন্দ করে না। অথচ পশ্চিমে ছোট মেয়েকে মায়ের অনুকরণ করে কাগজের বানানো পুতুল দিয়ে খেলতে দেখে রুথ হ্যান্ডলার নামের এক বাবা ১৯৫৯ সালে মেয়ের জন্য বড়দের মতো করে একটা পুতুল বানিয়ে দিলেন। যার নাম দেন বারবি। সারা বিশ্বের শিশুদের জনপ্রিয় খেলনা সামগ্রীর মধ্যে বারবি ডল অন্যতম। বাস্তবে বারবির কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও বহু মানুষের কল্পনায় এটি মনোমুগ্ধকর এক চির তরুণীর চরিত্র। প্রতিবছর বাচ্চারা ফ্যাশন ও স্টাইলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী বারবির ৯ মার্চ বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে জন্মদিন পালন করে। সুইটি খালার পাঠানো বারবিকে নিয়ে দিনের দীর্ঘ সময় ভাবনাগুলো ঘুরঘুর করত। স্কুল থেকে এসেই বসে পড়তাম পুতুলঘরের সামনে। মা তার ছোটবেলার পুতুল বিয়ে দেবার মজার সব কাহিনি বলত। আমার বারবিকেও পাশের বাড়ির মিথিলার ছেলেপুতুল ‘কেনে’র সঙ্গে বিয়ে দেবার অনুষ্ঠান করেছিল। আম্মু সেদিন অনেক সুন্দর করে সেজেছিল। মা ছিল অবিকল বারবির মতো দেখতে। কিন্তু আমি ছিলাম আব্বুর মতো অসুন্দর, কালো ও মোটা। তাই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরে ঘুরে নিজের ছবি দেখতে দেখতে বারবিতে রূপান্তরিত হতাম। বারবি-রূপী নিজের সঙ্গে সৃষ্টি হতে থাকে বন্ধুত্ব এবং পরিণত হতাম একটা জীবন্ত পুতুলে। নিজের প্রতিফলন দেখার জন্য পুতুলকে সঙ্গী করে আরম্ভ হয় পুতুলের সঙ্গে সময় কাটানো। কিন্তু আমাদের বাবারা কেউই পুতুল খেলা পছন্দ করত না। আব্বু যে কেন আমার পুতুল খেলা পছন্দ করত না, বুঝতাম না! রাগ হলেই আমার পুতুলঘরটা ধরে ডাস্টবিনে ফেলে দিত নয়তো পুড়িয়ে ফেলত।  আমার আব্বু, আম্মুর আব্বা, নানুর আব্বাজান তারা ফতোয়া দিত ইসলামে সাত বছরের বেশি বয়সী বাচ্চাদের পুতুল খেলা নিষেধ।


তুমি না সিনেমার এক্সট্রা ছিলে। তোমার আবার টাকার অভাব কিসের!


‘আপা আজকে আমার অনেক উপকার করলেন। টেস্টগুলা করতে পারব। ডাক্তার বলছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টেস্টগুলা করাতে। কিন্তু টাকার অভাবে করাতে পারছিলাম না।’

মহিলার অস্ফুটস্বরে বলা কথাগুলো আমাকে বাস্তবে ফেরত আনলে নস্টালজিয়ার সঙ্গে গরম-ঘাম-রাগ-পিউশের গোসলের সময় পার হয়ে যাওয়া ইত্যাদি আমার অস্থিরতাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। বিরক্তি মিশিয়ে বললাম, তুমি না সিনেমার এক্সট্রা ছিলে। তোমার আবার টাকার অভাব কিসের!

‘আপা ঠিকই বলছেন!’ শাড়ির আঁচল ধরে আবেগভরে মহিলা বলতে লাগল। ‘এক সময় আমার টাকা মানুষে খাইত। নিউমার্কেটের সব চাইতে প্রভাবশালী, বড় দোকানের মালিক আমার প্রেমে হবুডুবু খাইয়া বিয়ের প্রস্তাব দিলে না করার সাহস হয় নাই। বিয়ের পর পুনরায় সিনেমা করতে চাইলে সে বলত, মেয়েদের মহত্তম কাজ, প্রসব করা ও মন দিয়া সংসার করা।’ অথচ বিয়ের আগে প্রতিজ্ঞা করেছিল সিনেমায় অভিনয় করতে দিবে। আমার শাশুড়ি বলত, মেয়ে মানুষ যত বেশি জানে, তত কম মানে।’ আমাকে ঘরের থেকে বের হতে দিত না। বাচ্চা নেওয়ার জন্য পাগল কইরা দিত। আপনি বলেন, আল্লাহ না দিলে কী করব বলেন? অবশ্য এর পিছনে একটা কারণও  ছিল। সেইটা কাক-পক্ষিও জানত না। আইজ আপনারে বলি, সন্তান না হবার গোপন কাহিনি বুকের মধ্যে পাথর চাপা দিয়ে রাখলাম। সিনেমায় অভিনয় করার সময় এক পরিচালকের কামনার তৃপ্তি মেটাইতে যাইয়া প্রেগন্যান্ট হই, মারে লইয়া গোপনে অ্যাবরশন করাই। তখন থেকে রোগের সূচনা। কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি এই পাপ করতে চাই নাই।

দু’পক্ষ কিছুক্ষণ চুপচাপ। আমার সন্দিহান মনে হাজার প্রশ্নের উদ্ভব হচ্ছিল। মহিলা কি সত্যি বলছে নাকি আমাকে বোকা বানাচ্ছে! স্বাভাবিক কণ্ঠে বললাম, ‘অ্যাবরশন তো অহরহ মানুষ করাচ্ছে। তাদের তো বাচ্চা হচ্ছে।’

মহিলার প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আস্থা তৈরি হচ্ছে না দেখে সে প্রায় কেঁদে ফেলে। দুপুরের রোদের তেজ ও আমার নিস্তব্ধতা আরো বেশি করে যেন মহিলার বিমূঢ়তা বাড়িয়ে দিল। মহিলা আমার ভাজ করা হাঁটু ধরে কাঁদো প্রায় কেঁদে দিল। কান্নামিশ্রিত কণ্ঠে বলতে থাকে। ‘বিয়ের পর বাচ্চা হয় না দেখে শাশুড়ি হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার ব্যাপারটা বুঝে আমাকে প্রশ্ন করলে সব খুলে বলি। এমন কথা শুনলে কোনো মানুষ বউ ঘরে রাখে! আপনিই বলেন! সিনেমা ছেড়ে দিলাম, চিন্তায় চিন্তায় রোগে-শোকে গোলগাল নাদুস-সুদুস শরীরটা আমার হারগিলার মতো হয়ে গেল। রূপ যৌবন শেষ হয়ে গেলে কেউ পাত্তা দেয় না। আমারে ছাইরা দিয়া সে জুনিয়ার এক সাইড অ্যাকটররে বিয়া করল। সিনেমা জগতে তখন আর আমার মতন শুকনা কাঠির কোনো জায়গা হইল না। সেই দুর্দিনে আমার সৎ বাপ মানে মার সেই ধর্মভাই আমাকে পুতুল বানানো শেখাল। সৎ হলেও সে নিজের বাপের মতো আদর করত।’

মহিলার চেহারায় আবার সেই দ্যুতি ফুটে ওঠে। ‘পুতুলের প্রতি আকর্ষণ দেইখা সে স্পঞ্জ দিয়া পুতুল বানাই দিত। জানেন আপা, সবার হাতে পুতুল সুন্দর হয় না। হাতের গুণে পুতুল সুন্দর এই সত্য তখন থেইকা জানতে পারি। আমার সেই সৎবাবার পুতুলগুলো ছিল অতুলনীয়। ছোটবেলা মা-ও পুরান কাপড় দিয়া সুন্দর সুন্দর পুতুল বানিয়ে দিত। মার মাথার লম্বা চুল কেটে পুতুলের মাথার চুল বানিয়ে দিত। মার হাতের পুতুলও খুব সুন্দর হতো। আসলে আপা আমার কী মনে হয় জানেন, আমরা সবাই এক একটা পুতুল। বিশেষ করে আমরা মেয়েরা। আমরা নিজেরাই পুতুল হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। কে কত সুন্দর পুতুল! কেউ স্মার্ট, কেউ আনস্মার্ট। দেশি আর বিদেশি। ঠিক বাস্তাব মানুষগুলার মতন।’ ভ্রুর মাঝে ভাজ ফেলে বলে, ‘পুতুল বেচি মনে হয় যেন এক একটা মানুষ বেচি। পুতুল বেচতে বেচতে নিজের শরীরটা পুতুলের মতো প্রাণহীন হয়ে গেল। রোদে ঘুরে বৃষ্টিতে ভিজে খেয়ে না খেয়ে শরীরে রোগ বাসা বানাইল। ডাক্তার বলেছে, জরায়ুতে ইনফেকশন, আবার কিডনিরও সমস্যা। তাই টেস্ট করাতে দিছে।’ অসহায় দৃষ্টি মেলে দিয়ে বলল, ‘চিকিৎসা করাতে অনেক টাকা লাগবে। এত টাকা কিভাবে জোগাড় করব বলেন!’

মনে মনে ভাবলাম, এ তো দেখি রীতিমতো দার্শনিক! ভারি সমস্যায় পড়লাম তো! এর মধ্যে ড্রাইভার এসে পড়লে তাকে একদফা ঝারি দিলাম। ড্রাইভারটা চেঞ্জ করা দরকার। ব্যাটার বেশি তেল হয়েছে। মহিলার কাছ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য পার্স থেকে ১০০ টাকা বের করে হাতে দিয়ে পিউশকে নিয়ে গাড়িতে উঠলাম।

দ্রুত গতিতে মহিলাও গাড়ির দরজার কাছে এসে পা জড়িয়ে ধরল। ‘আপা আমার একটা ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ আপনাকে অনেক দিবে।’

‘পা ছাড় ‘ রাগান্বিত হয়ে বললাম, ‘আমি কি দাদা হাতেম তাই! এর চেয়ে বেশি আমি আর কী করতে পারি!’

‘আপনাকে পুরা টাকা দিতে হবে না, আপনি শুধু সব ম্যাডামদের বলে কিছু সাহায্যর ব্যবস্থা করে দেন। আমি আগামী দিন আবার আসব। প্লিজ আপা, আমার জন্য এই উপকারটা করেন।’


আমারা সবাই এক একটা পুতুলে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছি। দেশি-বিদেশি, স্মার্ট-আনস্মার্ট পুতুল...


ঠিক আছে! বিড় বিড় করে বলি, আমি চেষ্টা করব। পরিত্রাণের জন্য ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে নির্দেষ দেই। মহিলা তো ভারি সমস্যায় ফেলল! ভাবিদের কিভাবে ব্যাপারটা বলা যায়। যারা প্রয়োজন ছাড়া দুটো টাকা পার্স থেকে বের করে না তাদের কাছ থেকে কতটুকু আশা করা যায়! তাছাড়া তারা আমার বন্ধুও না যে অধিকার নিয়ে কিছু বলব।

বন্ধুদেরও কোথায় পাব? ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে একটা স্ট্যাটাস দিলে মন্দ হয় না! কিন্তু ওরা তো কেবলই ফেসবুক বন্ধু! ছোটবেলা থেকে আমার কোনো বন্ধু সার্কেল গড়ে ওঠে নি যে তাদের কাছে সাহায্য চাইব! নিজেকে অসহায় মনে হলো। পুতুল ছাড়া আমার কোনো বন্ধু নাই। হঠাৎ পুতুলদের কথা মনে হতেই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাদের বেচে দিলে আমার স্বামী কী ভাববে!..

গাড়ি চলা শুরু হলে রিয়ার ভিউতে মহিলার করুণ চেহারার দিকে তাকাতে পারি না। মহিলা খালি ঝোলা হাতে অবিক্রিত ছোট আকৃতির পুতুলগুলো তুলে ধরে ব্যস্ত রাস্তার মুখের উপর। পিউশও পুতুলটার মাথায় বাঁধা উলের দড়ি ধরে আমার মুখের উপর ঝুলিয়ে বলে, ‘দেখো মাম, পুতুলটা কেমন উইয়ার্ড! ইজেন্ট ইট!’

পুতুলের দিকে তাকিয়ে আমি চমকে উঠি! মনে হলো পুতুলওয়ালি তাকিয়ে ব্যঙ্গাত্মক হাসছে। পিউশকে ধমক দিতে সে হতভম্ব হয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকে। আজ বুঝতে পারলাম আব্বু কেন পুতুল খেলা পছন্দ করত না। পুতুল খেলে পুতুল নিয়ে!... মনে হলো, আমারা সবাই এক একটা পুতুলে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছি। দেশি-বিদেশি, স্মার্ট-আনস্মার্ট পুতুল...। প্রাণহীন দেহগুলোকে মাথার উপরে একটা করে দড়ি ঝুলিয়ে পুতুলওয়ালি রাস্তায় ঝোলাচ্ছে। আর বলছে, পুতুল নেবেন! পুতুল! হরেক রকম পুতুল...

জেসমিন মুন্‌নী

জেসমিন মুন্‌নী

জন্ম ২৪ অক্টোবর, ঢাকা। রক্তের গ্রুপ ‘বি’ নেগেটিভ। শিক্ষা : বিএ [অনার্স, এমএ...বিস্তারিত