আবং

তার হ্যাংলা-পাতলা শরীর, লম্বাটে গড়নের ফর্সা মুখটা খোঁচা খোঁচা দাড়িতে ভরা। তাই বলে ভাববেন না, ঘনঘন দাড়ি কাটলে চোখের জ্যোতি নষ্ট হয়ে যায়, এইরকম একটা হুঁশিয়ারি চিন্তা থেকে সে সপ্তাহে কিংবা মাসে একবার দাড়ি কাটে। না। আসলে দাড়িকাটার কথা তার মনে থাকে না। তাছাড়া এখন আর সে নিজেকে ফিটফাট করে রাখার প্রয়োজনও বোধ করে না। কিন্তু গাল ভরতি খোঁচা খোঁচা দাড়ির কথা মনে হলেই লুকা পাশের সেলুনে গিয়ে ওঠে। যৌবনের দিনগুলাতে সে ছিল আমোদ প্রিয়, ভবিষ্যৎ ভাবনাহীন এক উচ্ছল তরুণ। কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে গ্রামের সব নারী-পুরুষকেই আপনজন ভাবতে লুকার ভালো লাগত।

পর ভাবলেই পর, দুনিয়াটাই স্বজনের ঘর।

এইরকম একটা অস্পষ্ট বোধ থেকেই তার জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে। আজ এই বাড়িতে বিয়ে তো লুকাকে ডাক। সবার সাথেই লুকার সমান খাতির। তাই ডাক পেলেই সে ছুটে আসে। এই খবর নিয়ে সেই বাড়িতে যা, সেই জিনিস কিনতে বাজারে যা। বিয়ে উপলক্ষ্যে লুকার ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। তো ওমুক মরেছে, তমুক আত্মীয় বাড়ি খবর নিয়ে ছুটে যা... ইত্যাদি ইত্যাদি জটিলতায় লুকার নিজের দিকে তকাবার সময় কই?


চারপাশে হাজার হাজার মুখ। কিন্ত এই সংসারে তার নিজের বলে কেউ নাই।


এই করে করে গরিব চাষার ছেলে লুকার বয়স তিরিশ হয়ে গেলেও বিয়ে করার সময় পায় না সে। ততদিনে বুড়া বাপটা মরল। তার তিন বছর আগে মা-ও মরেছে। গ্রামদেশে একটা কথা চালু আছে, ভাই হলেই ঠাঁই ঠাঁই। যেহেতু লুকা সবার ছোট তাই তার বড় ভাইয়েরা বাপ-মা থাকতেই বিয়ে করেছে আর যুদা হয়েছে। তো বাপকে কবর দিয়ে গাঙপাড় থেকে ফিরতে ফিরতে সেদিন রাত হয়ে গেছিল। লুকার ভাইয়েরা এসে যার যার ঘরে বউ-বাচ্চাদেরকে নিয়ে খিল দিয়ে বসে। কিন্তু লুকার ঘরে মানুষ তো মানুষ একটা বাতিও নাই। খালি অন্ধকার আর অন্ধকার। সেই অন্ধকার ঘরের চৌকির কোনায় বসে লুকা চোখ বন্ধ করে দেখে, তার চারপাশে হাজার হাজার মুখ। কিন্ত এই সংসারে তার নিজের বলে কেউ নাই।

কবরের মতো নির্জন অন্ধকার ঘরের দরজায় খিল দিয়ে লুকা বিছানায় মরার মতো পড়ে ছিল। ভাই-ভাবি কেউ তার খোঁজ নিল না। এতটা বছর ধরে যে পড়শি ভাই-বন্ধুদের গলায় গলা মিলিয়ে ছুটেছে আজ কিন্তু কেউ তার তালাশে এল না। এইভাবে লুকা দুই দিন ঘরের বিছানায় মরার মতো পড়ে থেকে বাপ মরার দুঃখের চেয়েও গভীর এক দুঃখে নিজেকে কিছুটা চিনতে চেষ্টা করে। এবং তারপর নিরুপায় হয়ে এই টি স্টল। মানে ‘লুকা টি স্টল’ লেখা সাইনবোর্ডটা প্রাণ কোম্পানি তাদের চানাচুরের বিজ্ঞাপন হিসাবে বিনা পয়সায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। গরুর খোঁয়াড়ের মতো ছোট্ট একটা একচালায় চার জোড়া বেঞ্চ আর একটা নড়বড়ে টেবিল নিয়ে চা’খানাটা নতুন বাজারের কোনার দিকে একলা দাঁড়িয়ে আছে। লোকজনের চাপ কম থাকায় চারপাশের অলস বুড়ারা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গপসপ করে। এতে আড্ডাপ্রিয় লুকার ভালোই লাগে।

রাত দশটা-এগারোটার পর বাজার ঠান্ডা হলে লুকা চা’খানার ঝাপটাপ ফেলে দুইটা বেঞ্চ এক করে বিছানা পাতে। তারপর ঘুম। স্টলের সে মালিক, সে-ই বাবুর্চি কাম বয়। বিকালে লুকার স্টলে ডালপুরি আর পেঁয়াজুটা খুব চলে। বাজারের তরুণরা সব গপ্প করতে করতে দলে দলে এসে তার স্টলে সেঁধিয়ে পড়ে, লুকা ভাইয়োর বিরাট খবর আছে...।

লুকাকে কিছু বলতে হয় না। সে চুলার পাড়ে দাঁড়িয়ে কড়াইয়ে পেঁয়াজু ভাজায় ব্যস্ত। হ্যাঁ ব্যস্ত কিন্তু লুকা ছেলেদের দিকে কান খাড়া করে রাখে এবং একটু ফুসরত পেলেই মুখের সরল হাসিটা ওদের দিকে ছুড়ে দেয়। চ্যাংড়াদের প্রতি তার কী-বিশ্বাস, ভালোবাসা! আবার বুকের মাঝে খুব গোপন একটা সন্দেহও ত্যাজি পায়রার মতো বাকুম বাকুম করে ওঠে। তবু লুকা ওদের দিকে মায়ার চোখে, প্রশ্রয়ের হাসিতে তাকিয়ে থাকে। তাই দেখে পাশ থেকে একজন লাফ দিয়ে ওঠে, কী খবর?

দারুণ খবর!

একজন মোবাইলে ফেসবুক ওপেন করে দেখায়, এই দেখ কী সুন্দরী মেয়ে লুকা ভাইয়োরে প্রেমের প্রস্তাব দিছে!

সবাই একটা মোবাইলের উপর হামলে পড়ে। একজন ফেসবুকের ছবিটার উপর চোখ রেখে বানিয়ে বানিয়ে চেঁচিয়ে পড়ে, প্রিয়সী বেগম ওরফে দসী লে লে...।

লুকার স্টলে হাসির লহর ওঠে। লুকা গর্ববোধ করে, তৃপ্তিপায়, একটু একটু শরমও পায় কি?

লুকার চোখ কড়াইয়ের ডালপুরির দিকে। সে শুনে কিন্তু বিশ্বাস করে না।

না। আবার ষোলআনা অবিশ্বাসও করে না। তার কত বয়স? সে দেখতে কি খুব খারাপ?


একটা নারীকে ভালোবাসার জন্য পাওয়া হলো না। জীবন বড় প্রতারক! বড় নিষ্ঠুর!


কোনো হিসাবেই তার বিশ্বাস পোক্ত হয় না। আবার অবিশ্বসটাও জোরাল হয়ে ওঠে না। এইসব দোলাচলের মাঝেই লুকার মনটায় ফুরফুরে হাওয়া বয়। ছেলেরা দুমছে ডালপুরি-পেঁয়াজু খায়। সুড়ুত সুড়ুত করে কনডেন্স মিল্কের ঘন-দুধ-চা টানে, পরস্পর মামু মামু বচন দিয়ে আলাপের খেতাঝারে কিংবা, অই শালা মাদারচুদের কতা কৈছ না! এইরকম বাণী দিয়ে আলাপের মাঝে প্যাঁচ মারে। সব শেষে বিল। লুকা সঠিক হিসাব দিতে পারে না। তাই তিরিশটা ডালপুরি আর সত্তরটা পেঁয়াজুর হিসাব এসে চৌদ্দ চৌদ্দ আটাশে দাঁড়ায়। তবে চায়ের বিলটা ঠিক ঠিক পাওয়া যায়। এই চা দিয়েই সে বেঁচে আছে। তার দোকানের চা’টা ভালো হয় বলে কাটে খুব। চায়ে লাভটাও বেশি। কিন্তু সব মিলিয়ে হাতে টাকা জমে না। তাই বাপের ভিটাতে ভেঙেপড়া ঘরটা মেরামত করা হয় না, বিয়ে করা হয় না। বাড়িতে লুকার থাকার ঘর নাই। পাত্রী দেয় কে?

এইসব দশ-পনেরো বছর আগের আলাপ। এখন লুকার বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। গত ইউপি নির্বাচনের সময় গ্রামের ফাও মজা লুটার তালে থাকা আধাবুড়া আর তরুণরা সব লুকাকে চেপে ধরল, চাচা এইবার মেম্বারিত খাড়ইতে অইবে।

চাচা শব্দটা লুকার মনে কামানের শেলের মতো আঘাত করে। কয় বছর আগে ছিল লুকা ভাই। এখন লুকা চাচা। আর কিছুদিন পর লুকা দাদা। হায়! এই জীবনে তার কিচ্ছু হলো না। তার বুকের ভিতর কত ভালোবাসা দিনে দিনে জমতে জমতে পাথরের পাহাড় হয়ে গেল! তবু বউ বলে একটা নারীকে ভালোবাসার জন্য পাওয়া হলো না। জীবন বড় প্রতারক! বড় নিষ্ঠুর!

লুকার হ্যাঁ-নাতে কী আসে যায়? দশ টাকা-বিশ টাকা করে জামানতের টাকা কয়টা ছেলেপেলেরাই বাজার ঘুরে তুলে ফেলে। নমিনেশন দাখিলের দিন সকাল থেকেই লুকার দোকানে ভিড় বাড়তে থাকে। গরম গরম পুয়ারুটি-হালুয়া সবাই দেদারছে গিলেটিলে লুকাকে একমত কাঁধে করেই তারা একটা ট্রাকে চড়ে। পেছনের দিক থেকে লুকাকে ঠেলেঠুলে সামনে নিয়ে যাওয়া হয়। দশটা-বিশটা হাতের টানাটানিতে লুকার পুরাতন পাঞ্জাবিটা প্রায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে অবস্থা। অকর্মা আধাবুড়া আর গরম রক্তের তরুণদের কী আমোদ! ট্রাকের গতি বাড়তেই তারা হাতে হাতে লুকাকে কাঁধে তুলে লয়, লুকা ভাই, জিন্দাবাদ...।

প্রতীক বরাদ্দের আগের দিন মহাজন তাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিল। মহাজনের এক কথা, তুমি শালা আবং, আগের বাকি শোধ করো তারপর ময়দা, তেল, চিনি...। লুকা কী দিয়ে শোধ করবে? সে ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে তাই সব ভোটাররা দোকানে এসে যা সামনে পায় তাই খায়। সে বিল চাইবে না ভোট চাইবে? লুকা সব বুঝে কিন্তু জবান খুলে বলতে পারে না। এই অস্থির সমাজ ও সময়ে বড়লোক হওয়ার যে নীরব যুদ্ধ, বড়লোকি দেখাবার যে বিকট বিকার আর অহংবোধ তাড়িত নিঃসঙ্গতার বিষাক্ত জারকে দেশের ছোটবড় সবাই মানসিকভাবে অসুস্থ। সেই অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথ না পেয়ে এই বেকার ও অকর্মা মানুষগুলা তাকে খেলিয়ে আমোদ পাচ্ছে। এইসব সুবেশধারী টাকাওয়ালার ছেলেপেলেদেরকে সে ভয়ে না লজ্জায় কিছু বলতে পারে না। তাছাড়া সে-ও কি এই সমাজ ও সময়ের ফসল না?

লুকার আরেক মন বলে, না। সবাই তাকে ভালোবাসে। জীবনে ভালো ছাড়া কোনোদিন তো কারও দুই আনার অনিষ্ট করে নি। এই যে রোজ রোজ দশে-বিশে তরুণরা তার দোকানে এসে হল্লা করে ডালপুরি-পেঁয়াজু লুপাট করে যায় এদের অনেকের বড় ভাই কিংবা চাচা এককালে লুকার পরানের বন্ধু ছিল। সেই সুবাদে সে এদের অনেকেই শিশুকালে কোলে-কাঁধে নিয়েছে দুই-চারদিন। আদর করে শিশুর তুলতুলা গালে চুমা খেয়েছে। আর আজ কোন পরানে সে এদেরকে খারাপ ভাবে?

তো প্রতীক বরাদ্দের দিন সকাল থেকেই তার দোকানে ভিড় জমতে থাকে। তরুণরাই ভাড়া করে একটা ট্রাক আনে। তারপর ‘লুকা ভাই জিন্দাবাদ...’ স্লোগান দিতে দিতে লুকাকে কাঁধে করে ট্রাকে উঠে এবং একটু পরেই শুরু হয়ে যায় সেই পুরান খেলা : একজনের কাঁধ থেকে আরেকজনে এইভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে ট্রাকের সামনে চলে যাওয়া। তারপর স্লোগান আর স্লোগান।

প্রতীক নিয়ে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। সে প্রতীক পেয়েছে মোরগ। কিন্তু ট্রাকে উঠেই ওরা স্লোগান দিতে থাকে :

‘লুকা ভাইয়ের মার্কা কী? মুরগি ছাড়া আর কী।’


লুঙ্গিছাড়া লুকা পাঞ্জাবি পরেই গাঙপাড়ের দিকে ছুটে পালিয়ে মানুষগুলার হাত থেকে জানটা বাঁচায়।


লুকা ট্রাকে উঠেছে সবার শেষে। তাই সে ছিল পিছনে। তাকে দুই-তিনজনে টেনে, হিঁচড়ে কাঁধে তুলে নেয়। হিংস্র বাঘের মতো নির্দয় হাতে হাতে কাঁধ থেকে কাঁধে চলান হতে থাকে লুকার একহারা শরীরটা। এর মাঝেই কার হাতের টানে ফাৎ করে ছিঁড়ে যায় পাঞ্জাবির একটা পকেট। তারপর খুলতে খুলতে পরনের লুঙ্গিটাই খসে পড়ে। ছেলেরা আমুদে আত্মহারা হয়ে আরো জোরে জোরে লুকার দেহটা নিয়ে লুফালুফি শুরু করে দিলে সে আসল ঘটনা বুঝে ফেলে। টানাটানিতে তার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখন নিজেকে সামলানোর কোনো পথ না পেয়ে লুকা মরার মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ওঠে, আমি আগবাম (হাগবে)।

এই সব্বনাশ! এই সব্বনাশ! চিৎকার দিতে দিতে ওরা ছুটন্ত ট্রাকটা থামায়। তারপর লুকাকে লুঙ্গি ছাড়াই রীতিমতো আছড়ে ফেলে দেয় নিচে। পথের এইদিকে কারেন্টের বাতি নাই। তাই থিকথিকে অন্ধকারে লুঙ্গিছাড়া লুকা পাঞ্জাবি পরেই গাঙপাড়ের দিকে ছুটে পালিয়ে মানুষগুলার হাত থেকে জানটা বাঁচায়।

সেই থেকে লুকার দোকানে শুধু চা বিক্রি হয়। আর তার ফাঁকা ফাঁকা দোকানটাতে অলস, অকর্মণ্য বুড়ারা চায়ের কাপ সামনে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গফায়। প্রতিদিন শুনতে শুনতে আলাপের বিষয়গুলা লুকার প্রায় মুখস্থ। তবু নতুন করে শুনতে তার খুব আমোদ লাগে। তাই বুড়োদের রসাল কথায় মাঝে মাঝে সে ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে উঠলে দেখা যায় তার সামনের দিকের দুইটা দাঁত নাই। লুকাকে যারা চিনে, তার আজব জীবনটা-বিষয়ে জানে, তাদের যে কেউ লুকাকে এই ভাবতে হাসতে দেখে ভাবতেই পারে : কমিনের লয় যায় না মরলে, শুঁটকি মাছে বয় যায় না ধোইলে।

শেখ লুৎফর

শেখ লুৎফর

জন্ম ১৯৬৬, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। স্নাতক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : শিক্ষকতা।...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা