১. ২১ আগস্ট ১৯৭০, মুক্তি পেল ‘সাগিনা মাহাতো’। বাঙালির জন্য খুব আনন্দদায়ক এ সময়কাল। দিলীপ কুমার অভিনীত বাংলা ছবি এটি। উত্তর-পূর্ব ভারতের একজন চা শ্রমিক চা বাগানের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তারই বর্ণনা রয়েছে এই ছবিতে। অর্ধশতাব্দী আগে তৈরি এই চলচ্চিত্রটি মূলত রাজনৈতিক। যা সে-সময়ে বেশি দেখা যেত না। রাজনৈতিক বলে আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
যেকোনো পরিচালকই তার পছন্দের কাহিনি চিত্রায়িত করেন। ‘সাগিনা মাহাতো’ কাহিনি কেন তপন সিংহের ভালো লেগেছিল, তার আভাস দিচ্ছি—‘সত্যি বলতে, গোষ্ঠীবদ্ধ লড়াইয়ের প্রতি আমার কোনো দিনও আস্থা ছিল না; আজও নেই। এই লড়াই হয়তো সহজে জেতা যায়, কিন্তু পরে মানুষে মানুষে মতান্তর হয়, মতান্তর পরিণত হয় কলহে। ফলে লড়াইয়ের অন্তর্নিহিত আদর্শবোধও হারিয়ে যায়। দেশে কিংবা বিদেশে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস এই সাক্ষ্য দেয়। অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন না, পাল্টা যুক্তি ও দৃষ্টান্ত দেখাবেন; তাতে ব্যক্তির গরিমা, সাহস, সততা সম্পর্কে আমার ধারণা পাল্টাবে না।’
এ ছবিটি অভিনয় করে ভালো লেগেছিল দিলীপ কুমারের। তাঁর অনুরোধে হিন্দিতে রিমেক—‘সাগিনা’। ছবি করে তপন বকুনি খেলেন একজনের কাছে। তিনি হলেন সত্যজিৎ রায়। বললেন, ‘জীবনের এত মূল্যবান সময় কেউ একই ছবি দু’বার করে নষ্ট করে!’
‘সাগিনা মাহাতো’ চলেছিল, ‘সাগিনা’ চলে নি। তখন কলকাতা যতটা রাজনীতিতে ডুবে ছিল, মুম্বাই ততটা ছিল না। অনেকের একটা ভুল ধারণা আছে, দীলিপ কুমার অভিনীত প্রথম বাংলা ছবি ‘সাগিনা মাহাতো’। কিন্তু তারও পাঁচ বছর আগে তৈরি হয়েছিল জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত ‘পাড়ি’ নামের একটি ছবি। আন্দামান জেলের প্রেক্ষাপটে তৈরি এই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন দিলীপ কুমার। এই ছবিতে দিলীপ কুমার অভিনয় করেছিলেন জেলার বিজয় উপাধ্যায়ের ভূমিকায়।
দিলীপ কুমার অভিনেতাটি অনন্য। মেথড অ্যাকটিংয়ের চর্চা করে গেছেন।
২. দুই ব্যক্তিত্ব গৌরকিশোর ও তপন সিংহ মেশালে কী হয়? ‘সাগিনা মাহাতো’ ফিল্ম। বন্ধুর লেখা ‘সাগিনা মাহাতো’ পড়ে মুগ্ধ তপন। অনেক দিনের সাধ ছবি করবেন। টাকা?
সুযোগ এল হঠাৎ। তপনের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবির প্রযোজক হেমেন গঙ্গোপাধ্যায় রাঁচি-নিবাসী বিরাট ধনী। ছাত্রজীবনে সংস্কৃত ও ইংরেজি এমএ-তে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট। বাড়িতে বিরাট লাইব্রেরি। খুবই সংস্কৃতিমনস্ক। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ ছবি করতে টাকা ঢেলেছিলেন শুধু এই মিথ ভাঙতে যে, রবীন্দ্রনাথের কাহিনি পর্দায় দর্শক নেয় না। তাঁর জিদ, তপন ছাড়া অন্য পরিচালককে দিয়ে ছবি বানাবেন না। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর পর প্রায় দশ বছর অপেক্ষা, ‘ভালো’ গল্পের জন্য। তপন ‘সাগিনা মাহাতো’-য় আগ্রহী জেনে এক কথায় রাজি। তপনের পরামর্শ, সাগিনা চরিত্রে বলিউডের এক নম্বর (পারিশ্রমিকের হিসেবে) অভিনেতা দিলীপ কুমার। তপনকে অনেক বার জানিয়েছেন, বাংলা ছবিতে অভিনয় দীলিপের আকাঙ্ক্ষা। হেমেন উৎসাহী।
৩. দিলীপ-সায়রা বানুর শুটিং চলছে মাদ্রাজে। হেমেন যোগাযোগ করলেন। তপন পরিচালক শুনে দিলীপ আগ্রহী। তাঁদের যেতে বললেন মাদ্রাজে। তপনকে সঙ্গে নিয়ে হেমেন মাদ্রাজের ফ্লাইটে। পৌঁছে দু’জনে বিরক্ত। শোনা গেল, দিলীপ-সায়রা নাকি শুটিং শেষ করে মুম্বাই চলে গেছেন।
হেমেন আর তপন ঠিক করলেন, স্বামী-স্ত্রী জুটি বাদ। কলকাতা থেকে কাকে নেওয়া যায় তা নিয়ে যখন আলোচনা, তখন হোটেলের ঘরে দরজায় টোকা। দিলীপ হাজির। চোখে দুষ্টুমি—‘কেমন মজা করলাম!’
দিলীপ কুমারের আড়ালে এই ইউসুফ খান মানুষটি বিচিত্র। পেশোয়ারে থাকতেন। এই বাড়ির ছেলে কলেজে দাবা চ্যাম্পিয়ন। ফুটবলে রোভার্স কাপ খেলেছেন। বাবার সাথে মন-কষাকষির জেরে বাড়ি ছেড়ে পালান। নিয়তি তাকে টেনে নিয়ে যায় পুনেতে। কিছু টাকা জমে গেলে পাড়ি দেন মুম্বাই। দিলীপ কুমারের জীবনী এখানে বলার কোনো প্রয়োজন নেই, যারা এ লেখা পড়ছেন, তাঁরা সবাই জানেন দিলীপের জীবনেতিহাস। এখানে সে-কথাই বলার চেষ্টা করছি, দীলিপ কামু-কাফকা পড়েন। উর্দু ও ইংরেজিতে বক্তৃতা শোনার মতো।
‘সাগিনা মাহাতো’ মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত। টিমের সবাই তখন মস্কো শহরে। টেলিভিশন এল সাক্ষাৎকার নিতে। দিলীপ অল্প কথায় ওদের বোঝালেন ভারতে ফিল্ম তৈরির প্রেক্ষিত। যে দেশে কোটি কোটি মানুষ গরিব ও অশিক্ষিত, সেখানে প্রযোজকেরা তো অলীক ও সস্তা ছবির পিছনেই টাকা ঢালবেন! ব্যতিক্রম তাই হাতে-গোনা।
দিলীপ বাংলা পড়তে পারেন না। মাদ্রাজ যাওয়ার আগে তপন ‘সাগিনা মাহাতো’-র কাহিনি ইংরেজিতে দু’পাতার মধ্যে লিখেছিলেন। পড়ে দিলীপ তৎক্ষণাৎ অভিনয়ে রাজি। জানানো হলো, পারিশ্রমিক মুম্বাইয়ের মতো দেওয়া মুশকিল। শুনে দিলীপ রাজি,—‘কে বলল আমি শুধু টাকার জন্য অভিনয় করি?’
৪. দিলীপ কুমার অভিনেতাটি অনন্য। মেথড অ্যাকটিংয়ের চর্চা করে গেছেন। কিন্তু বলিউডের প্রথা মানেন না, এক সঙ্গে একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন না। সংখ্যার চাইতে তার প্রাধান্য কোয়ালিটি আর বৈচিত্র্যে।
যে দিন কাজ করার ইচ্ছে থাকে না, সেদিন তাঁকে দিয়ে কাজ করানো মুশকিল।
একদিন। ‘সাগিনা মাহাতো’র শুটিং চলছে। দিলীপের দেখা নেই। জানা গেল, শরীর ভালো নেই। আসবেন, তবে শুটিং করবেন না। এলেন। এসেই আরাম কেদারায় শুয়ে পড়লেন। বললেন, ‘কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা’। তপনও কম যান না। বললেন, ব্যথা তো একটু হবেই। নার্গিস, মীনাকুমারী, বৈজয়ন্তীমালা প্রমুখ কত নায়িকা ওই কাঁধে মাথা রেখে অভিনয় করেছে যে!
ব্যঙ্গ শুনে তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন এ অভিনেতা—চলো বাবা শুটিং করবে চলো। আমি এক্ষুনি মেক-আপ করে আসছি। বাঙালিদের সঙ্গে পেরে ওঠা দায়!
আধ ঘণ্টার মধ্যে লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন।
৫. ছবির শুটিং যখন চলছে, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তাল। রাজ্যে দ্বিতীয় অ-কংগ্রেসি যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে গেছে, বাংলা কংগ্রেস এবং সিপিআই (এম)-এর মতানৈক্য-র ফলে। মন্ত্রিসভার দুই নেতা অজয় মুখোপাধ্যায় এবং জ্যোতি বসুর মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে চালু হয়েছে রাষ্ট্রপতি শাসন। কলেজে কলেজে নকশালপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন। এলাকা দখল নিয়ে সিপিআই (এম), নকশাল ও নব কংগ্রেসিদের মধ্যে কলকাতার অলিগলিতে বোমা এবং গুলি। খুনোখুনি। বাস-ট্রাম পোড়ানো।
শুটিং চলাকালীনই তপনকে রাজনৈতিক হুমকি। সে-সব তোয়াক্কা না করে ছবি তৈরি। তা সেন্সর সার্টিফিকেটও পেল। এবার অন্য হুমকি। ‘সাগিনা মাহাতো’ রিলিজ করতে দেওয়া হবে না। হলের সামনে পিকেটিং হবে। তপন আয়োজন করলেন ছবির স্পেশাল শো। শুধু রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের জন্য। দেখে নকশাল যুবকদের আপত্তি দূর হলো। তাদের মত, এ ছবি ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টের মুখোশ খুলে দিয়েছে।
মুক্তির দিনে নকশাল যুবকেরা ঘিরে রাখল তপনকে। যদি কেউ অ্যাটাক করে!
গল্পের মূল দৃশ্যপট অবশ্যই বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন। ঘটনাকাল ১৯৪৪-৪৫। মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
৬. লেখালিখি শুরু করার আগে জীবনকে গৌরকিশোর যেভাবে দেখেছেন, দেখার সুযোগ পেয়েছেন, তা কম লেখকের ভাগ্যেই জোটে। আইএসসি পাশ করার পর অর্থাভাবে কলেজে পড়ার সুযোগ মেলে নি। শুধু বেঁচে থাকার জন্য, পরিবার প্রতিপালনের জন্য এমন কাজ নেই যা তিনি করেন নি, ১৯৪১-৫২ সাল পর্যন্ত তাঁর পেশা ছিল—প্রাইভেট টিউটর, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, ফিটার, ও-আর-পি রেস্কিউ সার্ভিসের খালাসি, রেস্তোরাঁর বয়, কাঠের কনট্রাক্টর, রোড সরকার, বিমান জাহাজের ফিটার, ট্রেড ইউনিয়ন অর্গানাইজার, রেশন দোকানের কেরানি, স্কুল মাস্টার, ওষুধ কোম্পানির এজেন্ট, ভ্রাম্যমাণ নৃত্য-সম্প্রদায়ের ম্যানেজার, ল্যান্ডকাস্টমস ক্লিয়ারিং কেরানি, প্রুফরিডার, সর্বোপরি মোসাহেব—কী নয়! কোথাও যে বেশি দিন টিকেছিলেন তা নয়, দারিদ্র্য কাকে বলে তা তিনি হাড়ে হাড়ে জানতেন। আর তাই অল্প বয়স থেকে জীবনসংগ্রাম শুরু হয়ে গিয়েছিল। আপসহীন আদর্শবাদী সত্যনিষ্ঠ মানুষ এবং লেখক। তাঁর জীবনের মন্ত্র ছিল ‘বন্দে মানবম’। তিনি লিখেছেন, ‘I believe in love, for love and only love makes a man human’ (সোহিনী ঘোষ, ‘লোকটা’, দেশ, ২০ জানুয়ারি ২০০১)। এই বোধ তিনি অর্জন করেছিলেন তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা থেকে। বিভিন্ন পেশায় অংশগ্রহণ করে খুব কাছ থেকে নানা রঙের নানা বর্ণের মানুষকে দেখেছেন, তাদের ভালোবাসা পেয়েছেন, ভালোবাসা দিয়েছেন। এ-কারণেই ‘বন্দে মানবম’ তাঁর জীবনের মন্ত্র হয়ে উঠেছে।
সেই লেখকেরই ছোটগল্প ‘সাগিনা মাহাতো’। অনেকে এটিকে উপন্যাস বলে ভুল করেন। ভুলের কারণ, ওই নামে গৌরকিশোরের একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে। তার আগে ১৯৫৮ সালে ছাপা ‘চেনামুখ’ বইয়ে অন্তর্ভুক্ত ছিল গল্পটি। ১৮ জানুয়ারি ১৯৫৮ তারিখের ‘দেশ’ সাপ্তাহিকে ওই ছোটগল্পের প্রথম মুদ্রণ। ‘সাগিনা মাহাতো’ বইতে মোট ছ’টি গল্প। ‘বসন্দা’, ‘দিন্দা’, ‘করবীদি’, ‘শরৎদা’, ‘কমরেড নির্মলা সেন’ এবং ‘সাগিনা মাহাতো’। সব কাহিনি রাজনৈতিক। বলা ভালো বাম রাজনীতির। তার মধ্যে সাগিনা উপাখ্যানই সরাসরি তার মর্মমূলে প্রবেশ।
গল্প বলা উত্তম পুরুষে। যেন লেখক বর্ণনা করছেন নিজের অভিজ্ঞতা। তা কেমন? উত্তর দেওয়ার আগে জানানো ভালো এই তথ্য যে, এক সময় রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে গৌরকিশোর লালমনিরহাটে রেলকর্মী ইউনিয়ন পরিচালনা করেছেন। সাগিনা তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। তিনি নিজেই লিখেছেন, ‘মজা এই যে, সাগিনার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় আমারই ছিল। তপন বা দিলীপ তাকে চোখেও দেখেন নি। সৃষ্টি যে কোথায় কেমনভাবে হয় সেটা আমার কাছে রহস্যই থেকে গিয়েছে।’ (গৌরকিশোর ঘোষ, ‘জীবন, সত্য, সাহিত্য’, জিজ্ঞাসা, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৯০, পৃ ১১৩)
লেখক গৌরকিশোর বলেন, ‘আমরা এদেশে যতই শ্রমিকের নেতৃত্ব বলে চেঁচাই না কেন, বরাবর দেখেছি, নেতৃত্বটি মধ্যজীবীদের হাতের মুঠোয় শেষ পর্যন্ত থেকে যায়। আর মজদুর ভাইরা কলে কারখানায় যেমন মনিববাবুর হুকুম তামিল করে, তেমনি ইউনিয়নে তামিল করে কমরেডবাবুর হুকুম।
‘বই পড়ে কত কী শিখেছিলাম। সর্বহারাই পারে বিপ্লবকে ডেকে আনতে, কারণ সে মরিয়া, তার হারাবার কিছু নেই। শ্রেণি-সংগ্রামের সেরা সৈনিক তাই মজদুর। ওদের নেতৃত্বেই একদিন সারা দুনিয়ায় পতপত করে উড়বে লাল ঝান্ডা । কিন্তু লেবার ফ্রন্টে কাজ করতে এসে দেখি নেতৃত্বের উপর একচেটিয়া অধিকার রয়েছে শুধু মধ্যবিত্তের। যে পাতি বুর্জোয়া শ্রেণির উপর আস্থা না রাখবারই তামিল পেয়ে এসেছি পার্টি সাহিত্যে—কারণ পাতি বুর্জোয়া নাকি সব চেয়ে সুবিধাবাদী, শিবির বদলাতে তারা মুহূর্তের বেশি সময় নেয় না, বিপ্লবকালে এরাই দল ত্যাগ করে মালিকের পা-চাটা গোলাম বনে যায়—যাদেরকে ঘৃণা করতে শিখেছি, এখন দেখি লেবার মুভমেন্টের তাবৎ লিডার তারাই।’
৭. গল্পের মূল দৃশ্যপট অবশ্যই বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন। ঘটনাকাল ১৯৪৪-৪৫। মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ বলে ভারতে বামপন্থীরা তখন অত্যাচারী ব্রিটিশ শাসকের প্রতি সহৃদয়। এমত অবস্থায় কার্শিয়াঙে তিনধারিয়া এলাকায় রেল শ্রমিকদের বারোমাস্যা। দীনহীন মানুষগুলোর বরাদ্দ রেল সাহেবদের লাথিঝাঁটা। অত্যাচার আরো। সাহেবদের লালসায় বলি দিতে হয় ঘরের বউ-বেটিদের। কথার অবাধ্য হলে কারখানায় মজদুরি খতম। খিদের জ্বালায় শ্রমিক সব মুখ বুজে সয়। এই পরিস্থিতিতে ওদের নেতা হয়ে ওঠে সাগিনা মাহাতো। শ্রমিক বটে, তবে তাগড়া জোয়ান, যে কোনো অজুহাতে মদ খায়, বিশ্বাস করে—মরদ যখন, তখন নারী এক গেলে আর এক আসবে। এই সাগিনা চালু করে নতুন জমানা। লাথিঝাঁটার বদলা সাহেবদের আড়ংধোলাই। অত্যাচারের বদলা কাম বন্ধ। অচিরে সাগিনা পদদলিত শ্রমিকদের লিডার।
এবার আসল খেলা। রাজনীতির চালবাজি। কলকাতার বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন নিজের দখলে আনতে চাইল তিনধারিয়ার রেল শ্রমিকদের। সহজ পথ কি? সাগিনাকে দলে টানা। পার্টি নেতা চতুর বিজন দত্ত এ কাজ সমাধা করতে কলকাতা থেকে পাঠালেন হোলটাইমার লেখককে। এমনকি নিজের বোন ও পার্টি কর্মী বিশাখাকে লেলিয়ে দিলেন সাগিনাকে আকৃষ্ট করতে। এরপর সাগিনা দাবার ঘুঁটি। শেষ চাল দিলেন বিজন। গোরা রেল কোম্পানির যোগসাজশে সাগিনাকে বানিয়ে দিলেন লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার। একরোখা সাগিনা এবার স্যুট-টাই পরা ‘সাহেব’! ঘোষিত উদ্দেশ্য, সাগিনা শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার দেখবে। যাদের চোখের মণি ছিল সাগিনা, তাদের থেকেই তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। পার্টির দামি (!) নেতা সাগিনা। তার কি তিনধারিয়ায় পড়ে থাকলে চলে? যেতে হলো মুম্বাই, মাদ্রাজের শ্রমিকদের ওয়েলফেয়ার দেখতে।
আর তিনধারিয়া? সেখানকার শ্রমিকরা যে-অন্ধকার সে-অন্ধকারই। রেল কোম্পানির অত্যাচার আগের মতো। মজুররা বিক্ষুব্ধ, বহুধাবিভক্ত। পার্টির নির্দেশ, শ্রমিকদের সাগিনার বদলে এবার পার্টির অনুগত করে তুলতে হবে। সে আশায় ছাই। ভুখা-পেট মজুররা কারো দাস হতে চায় না। তাদের বিশ্বাস, আবার কষ্টের মূলে সাগিনা।
বিক্ষোভ অসন্তোষ যখন চরমে, তখন পার্টির চাল বুঝতে পেরে সাগিনার তিনধারিয়া প্রত্যাবর্তন। সামনে মারমুখী জনতা। সাগিনাকে বেদম প্রহার তাদেরই, যারা একদিন ছিল তার অনুগত। আলুথালু বেশ, মারের চোটে সংজ্ঞাহীন সাগিনা। জ্ঞান ফিরতে তার মন্তব্য, পুরানো সঙ্গীরা ঠিক কাজ করেছে।
গল্পের শেষ তিন লাইন : ‘পরদিন শুকনা ফরেস্টে তার রেলে কাটা দেহটা পাওয়া যায়। রেল লাইনের পাশেই উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। কেউ বলে—সে খুন হয়েছে; কেউ বলে আত্মহত্যা করেছে’।
৮. চিত্রনাট্য লিখলেন তপন সিংহ। গল্পটাকে একটু বদলালেন। সাগিনার খুন বা আত্মহত্যা নয়, ছবির চরম মুহূর্তেই সাগিনার বন্ধু অমলকে খুন করতে গিয়ে তার সহযোদ্ধাদের হাতে নিজেই খুন হলেন ক্ষমতার অধিকারী হওয়া উচ্চাবিলাসী বিজন দত্ত (ছবিতে নাম অনিরুদ্ধ)।
ছবি এগোয় অতীতে। শুরু হয় গেরিলা কমিউনিস্ট কায়দায় সামারি ট্রায়াল দিয়ে।
জীবন্ত ছোঁয়া আছে সাগিনা চরিত্রে। এই চরিত্রটি সেই সময় শহুরে মধ্যবিত্ত বামপন্থী নেতার রাজনীতির ফাঁদে পড়ে যায়। তাকে ওয়েলফেয়ার অফিসার বানিয়ে মূল শ্রমিকদের থেকে আলাদা করে দেওয়ার নোংরা রাজনীতি শুরু করে তারা। সাগিনা সেই ফাঁদে পা দেয়। পরে যখন সে বুঝতে পারে বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা শহুরে বামপন্থীরা আসলে তলায় তলায় হাত মিলিয়েছে সাহেব মালিকদের সঙ্গে, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। তখন শ্রমিকবন্ধুরা তাকে আর বিশ্বাস করে না। তাদের চোখে সে বেইমান। শ্রমিকদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে জনতার আদালতে সাগিনার বিচার। তার জন্য গাছে ঝোলানো ফাঁসির দড়ি। অনিরুদ্ধ দত্তের পাশা। চাল উল্টে গেল।
দিলীপ-সায়রা ছাড়াও এ ছবিতে ছিলেন স্বরূপ দত্ত, অনিল চট্টোপাধ্যায়, সুমিতা সান্যাল, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, চিন্ময় রায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ।
এ ছবির মধ্য দিয়ে দিলীপ কুমার তার চিন্তাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় নতুন মাত্রা দিয়েছেন।
৯. ইউনিটের সবাই লোকেশনে পৌঁছে গেছে। দিলীপ কুমারও গেছেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, স্ক্রিপ্ট ফেলে এসেছেন, যেখানে তিনি উঠেছেন। গাড়ি পাঠিয়ে আনতে শুটিংয়ে দেরি হয়ে যাবে। দিলীপ কুমার হিন্দি লিখতে পারেন না বলে সংলাপ লিখে রেখেছিলেন উর্দু অক্ষরে। সেই খাতা নেই। কী করা! হঠাৎ এগিয়ে এলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়, যিনি ছবিতে ডিক্টেটর বামপন্থী নেতা অনিরুদ্ধ চরিত্রে অভিনয় করেছেন। বাড়িয়ে দিলেন নিজের খাতা। দেখুন তো, এতে চলবে কি না! দীলিপ কুমারের চোখ কপালে। অনিল চট্টোপাধ্যায়ের মুক্তাক্ষরে উর্দুতে লেখা সংলাপ।
—‘করেছ কী অনিল! আমার উর্দুতে বানান ভুল হয় দু-একটা। তোমার দেখছি তাও নেই!’
এক সময় অনিল চট্টোপাধ্যায় উর্দু শিখেছিলেন। সেটা দীলিপ কুমার জানতেন। খাতার সেই পাতাগুলো তিনি অনিলকে ফেরত দেন নি, নিজের সংগ্রহে রাখবেন বলে।
আউটডোরে দিলীপ কুমার দিনে ১৮টা আপেল খেতেন। সেই নিয়ে ইউনিটের সকলের বিস্ময় ছিল। চিকেন তন্দুরি খেতেও খুব ভালোবাসতেন। তখন কলকাতায় তন্দুরি মেশিন পাওয়া যেত না বলে মুম্বাই থেকে আনানো হয়েছিল।
১০. ‘সাগিনা মাহাতো’ গল্প কিংবা শুধু একটি চলচ্চিত্র নয়। এটি একটি রাজনৈতিক বিবৃতি। এ ছবির মধ্য দিয়ে দিলীপ কুমার তার চিন্তাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় নতুন মাত্রা দিয়েছেন। ‘সাগিনা মাহাতো’ চরিত্রটিই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জটিল চরিত্র। এই ছবিতে অভিনয়ের আগে তপন সিংহ তাঁকে বলেছিলেন, ‘আপনি যে ধরনের মেথড অ্যাকটিং করেন সেইখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে’। পরিচালকের এই রকম অনুরোধ শুনে দিলীপ কুমার যে তাঁর অভিনয়ের স্টাইলে যতটা পরিবর্তন আনবেন ভাবা গিয়েছিল, ততটা কিন্তু তিনি করেন নি। কিন্তু করেওছিলেন এমনভাবে যাতে মনে হয় তিনি বুঝি কিছুই বদলান নি। গভীরভাবে দেখলে এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন ধরতে পারা যায়। এটা তপন সিংহকে বিস্মিত করেছিল। তিনি আর অন্য কিছু করতে বলেন নি তাঁকে।