পর্ব-৪২
পর্ব-৪৩
কবি জীবনানন্দ দাশের মাল্যবান উপন্যাসটি পড়ার পর বেশ কয়েক মাস আমাকে বিক্ষিপ্ত থাকতে হয়েছিল। দিনরাত আমি ভেবে মরছিলাম ‘করুণ-নির্জন-মাল্যবান’-কে নিয়েই। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম, ঘুমন্ত স্ত্রীর পাশে মাল্যবান চুপটি করে চেয়ারে বসে আছে। কাঁচা ঘুম ভেঙে স্ত্রী উৎপলা হতবিহ্ববল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তাঁর দিকে। এত রাতে দোতলার এ ঘরে এসেছে কেন মাল্যবান? এই রাত্তির দ্বিপ্রহরে না ঘুমিয়ে ভুতের মতো কৌচে বসে আছে কেন সে?
আমার ‘বৃক্ষপুরাণ’ গল্পটি বড় যত্ন নিয়ে ছেপেছেন খোয়াবের সম্পাদক মাল্যবান।
‘এমনই অঘ্রাণ মাসের বিশ তারিখে কলকাতা থেকে প্রায় দেড়শো মাইল দূরে বাংলাদেশের একটা পাড়াগাঁয়ে সে জন্মেছিল। সেখানে খেজুরের জাঙ্গাল বেশি, তালের বন কম, সুপুরির গন্ধ হয়তো সবচেয়ে বেশি। এমনি শীতে খেজুরগাছের মাথা চেঁছে একটা নল বসিয়ে গলায় হাঁড়ি বেঁধে দেওয়া হয়, সমস্ত শীতের রাতে ফোঁটা ফোঁটা রস ঝরতে থাকে, মাছি-মৌমাছি ছোট ছোট রেতো প্রজাপতি, বড়গুলোও, সেই হাঁড়ির রসে সাঁতার কাটছে, পাখনা নাড়ছে, মরে আছে; কুয়াশানির্জন ঠান্ডানিবিড় শেষ রাতে দেখা যায় এইসব। এমনই শীতের রাতে ধানের ক্ষেত শূন্য হয়ে পড়ে আছে—হলদে নাড়ার গ্যাঁজে সমস্ত মাঠ রয়েছে ছেয়ে। শীত পেয়ে দু-একটা বাঘ নেমে আসে; এমনই উদাস রাতে ফেউগুলো অন্তত খুব হাঁকড়ায়; শ্মশানে ‘হরিবোল’ যেন কোন দূর কুয়াশাপুরুষদের কলরোল মনে হয়; লক্ষ্মীপেঁচা ডাকতে থাকে, ঘুম ভেঙে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় শীতের কুয়াশার যে কোনো অন্তিম পোচড়ের ফাঁকে ফাঁকে বৃহস্পতি, কালপুরুষ, অভিজিৎ সিরিয়াস যেন লণ্ঠন হাতে করে এখান থেকে সেখানে, সেখান থেকে এখানে কোন সুদূর যানের পথে চলেছে। কেমন একটা আশ্চর্য দূর পরলোকের নিক্বণ শোনা যায়।… [মাল্যবান, জীবনানন্দ দাশ
মাল্যবান পড়ার বেশ অনেক বছর গড়িয়ে যাওয়ার পরও আমি বাস্তবিকই কোনো ‘মাল্যবানের’ দেখা পাব, এমনটি ঘুণাক্ষরেও ভাবি নাই। কিন্তু আমার ভাবনার তোয়াক্কা না করে একদিন কলকাতা থেকে একটা ফোনকল এল, নাম বলল ‘মাল্যবান’! জীবনানন্দের ‘মাল্যবানের’ বাইরে আর একজন বাস্তবের মাল্যবান? আমি স্বভাবতই উৎসুক হলাম। মাল্যবান আমাকে জানাল, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার জন্য আমার একটি গল্পের প্রয়োজনে তিনি আমাকে ফোন করেছেন। আমি তাঁকে জানালাম, আমি এমনিতেই কম লিখি। কিন্তু আমি মাল্যবানকে এনশিওর করি এই বলে—এর মাঝে যদি গল্প লিখতে পারি, তাহলে আপনাকে পাঠিয়ে দিব।
মাল্যবানের সম্পাদিত ওয়েব পোর্টালটির নাম ‘খোয়াব’। এবং মাস খানেক বাদে চোখ ধাঁধানো রূপ আর মন ভুলানো গুণে ওই পত্রিকাটির একটা স্পেশাল সংখ্যা প্রকাশিত হলো। [ প্রথম যে অন্তর্জাল-পোর্টালে আমার গল্প গিয়েছিল তার নাম খোয়াব।
আমার ‘বৃক্ষপুরাণ’ গল্পটি বড় যত্ন নিয়ে ছেপেছেন খোয়াবের সম্পাদক মাল্যবান। আমি যে এজন্য তাঁকে তৎক্ষণাৎ ধন্যবাদ দিব, তেমন কোনো সুযোগই ছিল না। কারণ তখনও এই ‘ফেসবুকীয়-যুগ’ শুরু হয় নাই। তবে ই-মেইল ছিল। ই-মেইলেইর সহজ যোগাযোগে মনের যত কথাবার্তা চিঠির ঝাঁপি হয়ে উড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু একদিন ঠিক-ঠিকই মাল্যবানের সাথে আমার দেখা হয়ে গেল। সার্ক লিটেরারি ফেস্টে অংশগ্রহণের জন্য আমি যখন কলকাতা হয়ে দিল্লি অভিমুখে যাচ্ছিলাম। আমাদের থাকার গেস্ট হাউসে এসে মাল্যবান আমার সাথে দেখা করে গেল। এদিকে সার্ক চেয়ার ও ফাউন্ডার অজিত কৌরজির নির্ধারিত ট্রাভেল এজেন্ট আমাদের নিক্ষেপ করল কিনা মহা-ভুলভুলাইয়ার গহ্ববরে। আমাদের সরল-বিশ্বাসকে পুঁজি করে তারাও টু-পাইস বেশি কামিয়ে নিতে লাগল। ট্রাভেল অ্যাজেন্টদের খপ্পরে পড়ার পূর্বে আমরা আরেকটি ভুল করেছিলাম—তা হলো আমাদের সফর সঙ্গী মাসুদুজ্জামানের [অধ্যাপক ড. মাসুদুজ্জামান সিদ্ধান্তের আগাপাশতলা বিবেচনা না-করেই আমরা হয়েছিলাম কালকা-মেইলের যাত্রী। তিনরাত-তিনদিন লাগিয়ে ওইরকম ভয়ংকর জার্নি আমি ইহজীবনে করেছি বলে মনে পড়ে না। শুধু ভয়ংকর কেন বলছি তীব্র কষ্টকরও ছিল সেই ভ্রমণ। তার উপর ভ্রমণ সঙ্গীরা ছিল প্রচণ্ড হাড়কিপটে ধরনের। [কবি/ লেখকেরা এরকম কিপটে হবে, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু কিপ্টেমি আর ছোটলোকি সমান তালে চললে কেমনে কী করা যায়? তাদের সবকিছু সস্তা খোঁজার ঠেলায় আমাদের দুরাবস্থা চরমে পৌঁছালে আমি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম যে, আমাদের সেই ভয়াবহ-ভ্রমণের বিস্তারিত আমি মাল্যবানকে ইমেইল করে করে জানাচ্ছিলাম। নইলে ফোনটেক্সের মাধ্যমে। সার্ক লিটেরারি ফেস্টে প্রথমবার যাওয়ার সেই দোজখীয়-ভ্রমণের বিস্তারিত কোনো একদিন কোথাও হয়তো বলে যাব।
যেহেতু আমরা ফেরার টিকিটও কালকামেইলেই কনফার্ম করেছিলাম, তাই ফেরার পথেও আমার সেই একই রকমের ভয়াবহ অভিজ্ঞতাই হলো। [চেষ্টা করেছিলাম রাজধানী এক্সেপ্রেসে বা অন্য কোনো উপায়ে ফিরে আসার, কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন নয় বিধায় আমরা অন্য কোনো বাহন আর জোটাতে পারি নাই। আমাদের ফেরার খুঁটিনাটি যা-কিছু সবই মাল্যবানকে জানিয়েছিলাম। আর বলেছিলাম, সে যেন স্টেশনে এসে আমাদের রিসিভ করে। কারণ আমাদের দলের সকলেই নারী, তদুপুরি আমরা কেউ-ই কলকাতা শহর তেমন ভালো চিনি না। আমি যা-ও মাল্যবানকে চিনি, অন্যেরা তো কাউকেই চেনে না।
মাল্যবান বেচারা ভোর রাত্তির থেকে হাওড়াস্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। আর খানিক বাদে বাদেই কালকা মেইলের অ্যারাইভেল টাইম জেনে নিচ্ছিল। সমস্ত ভারত ঘুরেটুরে অবশেষে কালকা যখন হাওড়াতে অ্যারাইভ করল, তখন তার দশা মাথা থেতলে যাওয়া সরীসৃপের মতন। ট্রেন থেকে নেমেই মাল্যবানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার মৃতদেহে যেন প্রাণ এল—এই বিদেশ-বিভূঁইয়ে আমার যেন আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই! আমাদের মালসামান গুছিয়ে রেখে মাল্যবান লাইনে দাঁড়িয়ে গেল প্রিপেইড রিজার্ভ ট্যাক্সির জন্য। আর আমিও তার পেছনে দাঁড়িয়ে গেলাম ট্যাক্সির ভাড়া দেওয়ার জন্য। কিন্তু কিছুতেই মাল্যবানের সাথে পেরে উঠলাম না। সে আমাদের ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো।
একদিন দেখি আইজ্যাক আমাকে তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে।
অজিত কৌরজির ট্রাভেল এজেন্টের বুকিং দিয়ে রাখা গোলপার্ক গেস্টহাউজে মাল্যবান আমাদের সহিসালামতে পৌঁছে দিল। [অমন জঘন্য গেস্টহাউজে আমি ইতঃপূর্বে থাকি নাই, এমনকি পরেও কোনোদিন থাকি নাই আমাদের রিসিভ করার যাবতীয় ব্যস্ততার ফাঁকে মাল্যবান যখনই সামান্য ফাঁক পাচ্ছিল, আমার গল্প নিয়ে পড়ছিল। আদতে সে উন্মুখ ছিল আমার সাথে একটা সাহিত্য-আড্ডা দেবার জন্য। কিন্তু আমার ভ্রমণসঙ্গীরা শাড়ির কেনার জন্য যতটা মুখিয়ে ছিল, সাহিত্য-আড্ডার জন্য ততটা নয় কিছুতেই। ফলত কোনো সাহিত্য-আড্ডা আমাদের মাঝে হলো না। কিন্তু অবাক ব্যাপার, আমি এই প্রথম দেখলাম আমার গল্পের প্রায় প্রতিটা লাইন কেউ একজন মুখস্থ বলে যাচ্ছে! একসময় টের পেলাম দলের প্রায় সকলেই বলছে, মাল্যবান তাদেরই বন্ধু। [অন্যের বন্ধুকে নিজের বন্ধু বলে চালাতে গেলে মাঝখানে বুঝিবা একটা শব্দ থাকে, যার নাম প্রটোকল! আমি বোকা বোকা চোখে এসব দেখতে লাগলাম। এবং জানলাম বাংলাদেশের নারীরা কাঁটাতার ডিঙানো মাত্রই কতটা স্বাধীন হতে পারে? জানলাম, কত দ্রুতই না তারা তাদের এই মেকি রক্ষণশীলতাকে ঝেড়ে ফেলতে পারে!
এরপরে যতবার আমি ভারতের ভিসা নিয়েছি, মাল্যবানের সাথে দেখা করে আসতে চেয়েছি। এবং আমাদের দেখা হয়েছে। আমি একবার মাল্যবানের স্ত্রীর জন্য একটা শাড়ি কিনে নিয়ে গেলাম। আর মাল্যবান নিয়ে এল তাঁর স্ত্রীর আমাকে লেখা একটা পত্র। যে পত্র আমার হাতে দেয়ার পূর্বে মাল্যবান খানিকটা সঙ্কোচ -মেশানো গলায় বলল—
পাপড়ি, তুমি কি জানো যে আমার আসল নাম কি? আমার আসল নাম কিন্তু মাল্যবান নয়?
শুনে আমি বিস্মিত হয়ে তাকালাম। সে তখন নিজেই বলল,
আমার নাম মাল্যবান নয়, আমার নাম আইজ্যাক। আইজ্যাক সাহা।
আমি আইজ্যাকের বিব্রত মুখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে জানতে চাইলাম—
এত নাম থাকতে তুমি মাল্যবান নাম নিয়েছ কেন?
আইজ্যাক মাথা নিচু করে বসে রইল। আমার কথার কোনো জবাবই দিল না সে। ফের আমি জানতে চাইলাম—তোমার জীবন কি কবি জীবনানন্দ দাশের মতো? তাই এই নাম নিয়েছ?
আইজ্যাক আমায় আস্তে করে বলল—পাপড়ি, এ বিষয়ে অন্যদিন কথা বলা যাবে না হয়। কিন্তু আজ কিছুতেই নয়।
কেউ কিছু স্বেচ্ছায় বলতে না-চাইলে পিড়াপিড়ি করা আমার স্বভাব নয়। পিড়াপিড়ি করতে আমি একদম ভালোবাসি নে। খানিক বাদেই মাল্যবান নামকরণের প্রসঙ্গ আমাদের সাহিত্য-আড্ডার তোড়ে ভেসে গেল।
এর মাঝে আমি আরও দুই/একবার ইন্ডিয়াতে গেলাম, কিন্তু আইজ্যাকের সাথে আমার দেখা হলো না। যখনই ফোন করেছি, সে বলেছে যে অফিসের কাজে কলকাতার বাইরে থাকবে।
তবে মাঝে মাঝে সাহিত্যের নানান বিষয় নিয়ে আমাকে সে ই-মেইল করত। আইজ্যাকের গদ্য এতটাই স্ট্রং ও নির্মেদ ছিল যে, আমি তাকে বলতে বাধ্য হলাম—
আইজ্যাক, তুমি লেখাটা কন্টিনিউ কর। প্লিজ কর।
আমার এ কথার কোনো জবাব আসত না। এবং আইজ্যাক ‘খোয়াব’ আর করল না। এমনকি লিখলও না কিছুই। বলছিল, একটা উপন্যাস লিখবার জন্য সবকিছু জোগাড়যন্তর করছে সে। কিন্তু সেই উপন্যাসের কোনো খবরই আমাকে সে আর জানাল না।
হঠাৎ একদিন ফোন করে বলল, আমার সাথে একটা যৌথ গল্পগ্রন্থ করতে চায় সে। আমি বললাম, গল্পগুলি আগে লিখো, করা যাবে গ্রন্থ।
আইজ্যাক আমাকে ওর প্রতিদিনের রুটিন বলেছিল—
ঘুম থেকে জেগেই বই পড়তে বসে সে। তারপর স্নান করে, কিছু খেয়ে কাজে বেরিয়ে যায়। ফিরে জলখাবার খেয়ে ঘুমোবার আগ-পর্যন্ত ও পড়াশোনা করে।
এমন কোনো ভালো বই নেই, যা ওর না-পড়া থেকে গেছে।
একদিন দেখি আইজ্যাক আমাকে তার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্ট থেকে আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে। আমি খানিকটা অবাকই হলাম। কিন্তু কিছুই বললাম না। কতজনই তো অকারণেই আনফ্রেন্ড করে দেয়, এ আবার এমন কী? ভার্চুয়ালি ফ্রেন্ড থাকলেই কী বা না-থাকলেই কী?
কেনই-ব সে এত নাম থাকতে নিজের নামটি আড়াল করে ‘মাল্যবান’ হয়ে বেঁচে থাকতে চাইল?
আনফেন্ড করে দেয়ার কয়েক মাস পরে ওর একটা ই-মেইল পেয়ে ভারি অবাক হয়ে গেলাম। আইজ্যাক আমাকে আনফ্রেন্ড করে দিয়ে ফের মেইল করেছে কেন? বরাবরই দেখেছি, আইজ্যাকের কাছে আমার মতামত অত্যন্ত মূল্যবান। সে নতুন এক নারীলেখকের গল্প পাঠিয়ে জানতে চেয়েছে কেমন লাগল আমার ওই গল্প?
আমি তাঁকে শান্তভাবে বললাম,
তার আগে বল, তুমি আমাকে আনফ্রেন্ড করেছ কেন?
শুনে তো আইজ্যাকের ভিমড়ি খাওয়ার জোগাড়!
সে আমাকে তক্ষুনি ফোন করে বলল যে, এ বিষয়ে সে কিছুই জানে না। আমাকে সে খামাখাই কেন আনফ্রেন্ড করতে যাবে?
আমি আইজ্যাকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পুনরায় অ্যাকসেপ্ট করলাম।
যে নারীলেখকের গল্প ও আমায় পাঠিয়েছিল সেই গল্প নিয়ে আমি মতামত দিলাম—
এমন কোনো আহামরি গল্প সে লিখে নাই। এই গল্পকে আমি মন্দের ভালো বলতে চাই। গল্পের ভাষা অতি সাধারণ। তাছাড়া গল্পে তেমন কোনো টুইস্ট নেই।
আইজ্যাক হয়তো মনে মনে আহত হয়েছিল। কিন্তু আমি তো সত্য-বয়ানই দিব। নাকি? মনরক্ষা করে আমি তো ট্র্যাশ-গল্পকে কালজয়ী বলতে পারি না।
ফের আমি আবিষ্কার করি যে, আইজ্যাক আমাকে ফের আনফ্রেন্ড করে দিয়েছে। দুই-একবার ফোন করে বলার চেষ্টা করেছে নিজের অসহায়-দাম্পত্যের কিছু খণ্ড-চিত্র। কিন্তু সে এতটাই ভদ্র যে, বলতে গিয়েও মুখে আগল টেনে দিয়েছে। আমিও আগ বাড়িয়ে কিছুই শুনতে চাই নি।
সম্প্রতি লোক পরম্পরায় জানতে পারলাম, আইজ্যাক নাকি মানসিক রোগের চিকিৎসা নিচ্ছে!
শুনে আমার সামনে থেকে আইজ্যাক নামটি নিমিষেই যেন মুছে গেল। ভেসে উঠল ‘মাল্যবান’!
করুণ-নির্জন-অধোমুখ-মাল্যবান! বইপড়ুয়া-সাহিত্যপ্রেমী-উদার হৃদয়-বন্ধুবৎসল মাল্যবান। যে ভোর রাত থেকে হাওরাস্টেশনে অপেক্ষা করে তার বন্ধুকে রিসিভ করার জন্য।
আমার ওর কাছ থেকে জানা হয় নাই, কেন সে আর তার স্বপ্নের ‘খোয়াব’ কন্টিনিউ করল না? কেনই-বা সে লেখার এত স্বপ্ন নিয়েও আর লিখল না? কত শত বই বুকে করে এ জীবন সে বয়ে বেড়াল! কত শত বই সে গোগ্রাসে পড়ে গেল! কেনই-ব সে এত নাম থাকতে নিজের নামটি আড়াল করে ‘মাল্যবান’ হয়ে বেঁচে থাকতে চাইল? এসবের কোনো কিছুই আমার জানা হয় নাই!
তারপরও আমার ভাবতে ভয় লাগে, কাল সরীসৃপের মতো টেবিলের উপর ঘুমিয়ে পড়া জীবনানন্দ দাশের মাল্যবানের সাথে আমার বহু বছরের পুরাতন বন্ধু মাল্যবানকে মিলিয়ে নিতে।