তীব্র ৩০ : কাজল শাহনেওয়াজের বাছাই কবিতা

কাজল শাহনেওয়াজ আশির দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি ও গল্পকার। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কাব্য-আন্দোলনের মধ্যে 'বিকল্প কবিতা' নামে একটি বিশেষ চিন্তাধারার তিনি প্রবক্তা। তাঁর ভাষায় : "এখন সোজা কবিতা লিখতে হবে। পাল্টা কবিতা লিখতে হবে। বিকল্প কবিতা। প্রতিকল্প। এতে যদি সনাতন উপমা কৌশল ভেঙে যায় বা হারিয়ে যায়, যাক। চিত্রকল্প যদি অশুদ্ধ হয় হোক। কারণ হচ্ছে এই অশুদ্ধতার মানে ব্যাকরণ আমাকে ফলো করছে না। ব্যাকরণ চাপে পড়ে ভেঙে যাবে। আমাদের টাই-কোট পরা নব্য ব্যাকরণ-ঋষিরা তড়পাচ্ছে, তড়পাক। তাদের শিষ্যরা ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ ছন্দ-নামতা মুখস্থ করে চোখ উল্টে ফেলছে ফেলুক।"

জলমগ্ন পাঠশালা, রহস্য খোলার রেঞ্চ, একটা পুরুষ পেপে গাছের প্রস্তাব তাঁর উল্লেখযোগ্য কবিতার বই। পরস্পরের 'তীব্র ৩০' সিরিজে পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো কাজল শাহনেওয়াজের স্বনির্বাচিত ৩০টি কবিতা।


সাইবারনেটিক্স

তুমি এলে ট্রাক্টরের কলকব্জা নড়ে ওঠে
নিশ্বাসে কাঁপে ঘাম
তুমি এলে সাইলেন্সার থেকে ভকভক ছোটে

তুমি থাকো যদি চুপচাপ
ধুলো ও কার্বন জমে ইনজেক্টরে
বুজে যায় থার্মোস্ট্যাট ভাল্ব

তুমি না এলে
নড়েচড়ে ওঠে হিসেবের গভর্নর, বিনা তাড়ায়
ধানখেতে কালো ফড়িং পেশী টানটান করে দাঁড়ায়।


হাইড্রলিক

(আব্বার স্মৃতিকে মনে করে)

আমার হাত স্মৃতির পথচলা থেকে নেমে এসে
কণ্ঠরোধ করছে আমাকেই বিশাল
একজোড়া হাইড্রলিক হাত

ভারী হয়ে উঠছে পা যেন বহুদিন
রোপা আমনের খেতে দাঁড়িয়েছিলাম
হতবিমূঢ় একজোড়া কাদামোজা পরে

আজ আমার চোখে কুয়াশা অবিকল
অঘ্রানের খামারবাড়িতে একজোড়া
পুকুরেরই মতো


পরিস্থিতি

আসবে যদি ভাব নিতে তবে পিপা নিয়ে এসো
কালো ওয়েল্ডিং গ্লাস চোখে পরে এসো
সীসার জ্যাকেট পরে এসো
মিলিটারি বুট পায়ে এসো
গ্লাভস নিয়ে এসো

বলা তো যায় না কখন কী ঘটে যায়!


একদিন আনারস

নির্জন জায়গা দেখে আমি একদিন আনারস-ক্ষেতে ঢুকে
চুপ করে একটা আনারস হয়ে গেলাম
অনেকগুলি চোখ দিয়ে এক সাথে অনেক কিছু দেখব বলে।
 
অনেকগুলি বেদনাকে আমি দেখতে পাচ্ছি অনেকগুলি সম্ভাবনা
দেখছি এগারোটার সূর্য একদিকে টগবগ করে ফুটছে
দেখছি একদিকে বাতাস বইছে ফুলের রেণু নিয়ে
একদিকে শালের অরণ্য। একদিকে শব্দ। শো শো। কিসের যেন।
সাবলীল বেদনা যখন সৃষ্টিশীল হয়েছিল
নিশ্চয়ই অনেক কিছু মিলে এমন একটা
মহান একাকিতার জন্ম হয়েছিল
বহুদিকে তাকাতে তাকাতে আমি কেবল একের কথাই ভাবলাম।
 
মনে হয় আমার অনেকগুলি চোখ হলেও একটাই মাত্র চোখ
অনেকগুলি সংবেদন হলেও একটাই মাত্র অনুভব।
 
দেখি উপরের সাথে নিচের কোনো মিল নেই।
কাছের সাথে দূরের কোনো তুলনা হয় না।
দিনের থেকে রাত পুরাটাই আলাদা।
অনেকগুলি চোখ দিয়ে আনারসের মতো দেখলে
অনেক রকম ভাবনাকে রূপ নিতে দেখা যায়।
অনেক রকম দেখা যায়। অনেক কিছু দেখা যায়


পশুপালনের দিন

আমার তো ছিল না পাহাড়ে চড়ার বিদ্যা
তখন আমি নৌকা বাইতে পারতাম
নিজের জন্য একটি খাল খনন করতে করতে
দিন যেত

আমি বৈঠা তুলে মাঝে মাঝে গান গাইতাম
কয়লা দিয়ে ভূতের ছবি এঁকে বশীকরণ চর্চা করতাম
রাতের বেলা পথে নামতাম পরীর পাখা কুড়াতে।
একদিন আমি উটের পিঠে চড়তে শিখব বলে ঠিক করি।

উটের জন্য চাই মরুভূমি যেমন গরুর গাড়ির জন্য হারিকেন।
পড়শির বাড়িতে নাই বাবলার গাছ।
হরিণ পালতে দেখি কেওড়াগাছের প্রয়োজন।
কুমিরের জন্য দরকার চোখের পানি।
তিলে ঘুঘুর জন্য এক বিঘা জঙ্গল।
সাপের জন্য তীব্র যৌনফুল।

ঘুঙুরে রোচে না মন তবু বুকভরা ছোট্ট একটা পা খুঁজি
কিছুতেই দেবে না জানি তবু তার আঙুল কখানি খুলে নিতে
রহস্য থেকে নামি, পকেটে রেঞ্চ, হাতে সৌখিন আঙুলদানি।

প্রান্তরের ডাকবাংলায় খুঁজি শিশিরের নিশীথ
হঠাৎ হঠাৎ পাহাড়ি বরফের ডাক, চিলের চিৎকার
কিন্তু কোথায় প্রকৃতির মুখ চেপে ধরার ক্লোরোফর্ম ভেজানো কাপড়
যাতে শে না চেঁচায়?
শক্ত পাকস্থলি কই যাতে পাথরের গিঁট আর ফুলের তীক্ষ্ণ কামড় হজম করতে পারে?

ক্ষুধার চেয়ে গোল, ক্রোধের চেয়েও আন্তরিক
আনন্দের চেয়েও স্বচ্ছ, ভিখারিনির চেয়েও কপালহারা
কী সে কল্পনা ঘোর গাঢ় জ্যামিতি?
জীবনের কালো উচ্চারণ নিহিত কোন প্রতিতুলনায়?

পাহাড় থেকে যা সহজ উঁচু পাহাড় থেকে তা সহজেই দেখা যায়।
আমি আজো পাহাড়ে চড়িনি
নৌকা বেয়ে বেয়ে
চলে যাই—যেখানে নৌকা নাই সেখানে।
যেখানে আমি নাই সেখানে গিয়ে ঘুরে আসি।


এই শরতে আমাদের নামাবাজার

দু-কদম গেলেই ট্রাকদের অফিস, একটা ছোট বট, 
হুরহুর করে মানুষ আসা-যাওয়া করছে

নামাবাজার পোকায় খাওয়া একটা হলুদ ফল
বাজার করে ভুখানাঙা গরিব করণিক, টেম্পু, হলার, বেড়িবাঁধ
নাস্তা খাওয়া ১২ নম্বর বাস

সবাই যখন ভোরের আজান ফাঁকি দিয়ে গভীর ঘুমে
নামাবাজার তখন জেগে ওঠে, 
ভাদ্র মাসের তালের দোকানি ভোর না হতেই দুয়ার খোলে
স্বপ্ন দেখে পথের ব্যাপারি বাকি খাতায় সস্তা দেবে কে

দোকানগুলি পুরান দিনের ছোট্ট ছোট্ট টিনের হিন্দি ছবি
সারাদিনের বাছাই করা স্বপ্ন ধার করে ঘরে ফেরার সময় 
কাল্পনিক সুপারমলে রিজেক্ট স্টোরে ফ্যাশন হাতরায় খুচরা কাস্টোমার 
সোনার কাচে রুপার-ফিতা পঞ্জের হাইহিল, হাতে ধরে ছোট্ট বোনটাকে
দুচোখভরে রাপাপ্লাজার আধপাকা পেলাস্টিকের সখে
রাজ্যহারা স্বপ্ন থেকে ব্যস্ত হয়ে
ভাতের হোটেল পার হয়ে যায় ছিঁড়া ছাতির ঘর
সারি বাঁধা লুঙ্গি সেলাই মেসিনে এখন ব্লাউজের মাপ

হঠাৎ ফুলকি এসে পড়ে কামারখানা থেকে উড়ে আসা আরিচার খিদার আগুনে
আলুভর্তা ঢেড়শভাজি চিচিংগার ঝোল
কুঁচাচিংড়ি পুঁইশাক ডিমভুনা জাটকা ইলিশের পেটি
আল্লাগো তোমার পেটে এত খিদা, বানাইছো কত খাদ্যখাবার
গরুর ভুনা চাপিলার চচ্চরি পাঙ্গাসের বিরান 
তোমার হাত কত মিঠা, বাবুর্চি তুমি এক পালোয়ান
তোমার ইশারায় কাচকির তরকারি কী সুন্দর ডাক দিয়া যায় 
তোমার চোখ কত না সুন্দর, 
কী সুন্দর তোমার দাঁতফুল 
তোমার চুল মেঘের কাশফুল
সামান্য প্লাস্টিক তোমার হাতে পড়ে হয় যে নাকফুল 
তোমার জুলুসে পচা মাটি বানায় কাঁঠাল
তোমার জসনে চাঙারি-ভরা ভাঙা কাঁচ ফ্যাক্টরি আলো করে
তোমার আদরের ছোঁয়ায় মিষ্টি হয় কাউফল

সবই ঠিক আছে, যেখানে যা যা তুমি দিয়াছো নিজ হাতে
তবে কেন তুমি বানাইলে এ শহরে আমাদের জন্য নামাবাজার?
দুনিয়ার যত রং দেখি চোখে নিত্য পথে যাতায়াতে
আমাদের ফলপাকুড়, মাছগোস, তরিতরকারি, পোলাপানের ভিডিও গেমে 
পাই না তা তো
তোমার সবই তো সুন্দর, কিন্তু হাত দুইটা কেন এত ছোট?


কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোট গ্রহে

কেন যে আমার জন্ম হলো চুপসে যাওয়া এই ছোট গ্রহে
কেন যে দেখতে হয়
মানুষের চোয়ালে রুপার লাগাম তাতে অফুরন্ত হাসি হাসি ভাব

বাকপটুতার অনাবিল যত্নসাজ

কেন যে আজ সংখ্যালঘুরাই আন্তর্জাতিক।


হে সর্বশক্তি

আমরা যেন আগামীকাল থেকে পাশবিক গোস্ত খাইতে পারি
কোনোরকম জেনেটিক সমস্যা ছাড়া
কয়েকটা দিন ভূরি ভূরি

গপাগপ মাংসের টুকরাগুলি যেন গিলতে পারি
আমাদের সেই দাঁতহীন মুখ দাও প্রভু

অনেক গোস্ত আমাদের সামনে 
আগুনে পুড়েছে
সেই ওল্ড টেস্টামেন্টের আমল থেকে 

সবচেয়ে সুন্দরী বাছুরের রান পুড়ে, হে প্রভু
তোমার সাথে সাথে আমরাও যে খাইতে শিখেছি

আমাদের বাৎসরিক গণমাংসের প্রদর্শনী
সফল হোক

কলিজাকে টুকরা টুকরা করে
রেন্ধে খাই

সবচেয়ে নরোম—
পাছার কাছাকাছি পুট-এর বাবু পেশী
কেন এত সুস্বাদু?
মাংসের ভাঁজে ভাঁজে চর্বির পরত
কেন এত লোল ঝরায়?

জীবনের জানিবার শেষ নাহি যেন

যেকোনো দামে উন্নত মানের গোস্ত
আমাদের রক্তের চাহিদা
ছুরি কাঁচি রক্ত
দা কুড়াল লগি বৈঠা
চাপাতি চাপাতি খেলা

এইবার সুলভে পাচ্ছে যারা 
তারা যেন
আগামী বছরও এই সুবিধা পায়

আমাদের মাংস ঠিক রাখো প্রভু
আমাদের রক্ত দেখতে দাও

কলিজা কচকচ করে কাটি
ফুসফুস ফসফস করে ফাটাই
গুর্দা গুরগুর করে চুরাই

চাপাতি দিয়া হাড্ডিকে হাড্ডা হাড্ডা করি
রান কাটি চপাচপ
পাঁজর কাটি পাজাপপ
ঘাড় কাটি ঘ্যাচ্চর ঘজং

চামড়া খসাই ভুঁড়ি ফাঁসাই
পায়ের ক্ষুর নিয়া পর্যন্ত
রাজনীতি করি

সবশেষে 
গরু পুরুষের গর্বের গ্যাজ
ঘ্যাজঘ্যাজ
পেটের ভিতর চালান করে দেই

আমাদের পেটকে সালাম মোবারক!
পেট মোবারক!!
ঈদ মোবারক!!


বুলডোজার টায়ারডোজার রানাপ্লাজা

বুলডোজার,
টায়ারডোজার, ক্যাটারপিলার 
ফর্কলিফটার, 
ক্রেন, ডাম্পার, 
এক্সকেভেটর
ভারী যন্ত্রপাতির
থাবা
যখন দালানটা ভাঙছে, তখন যা হবার তা হয়ে গেছে

ভাঙা হাড়, পা, চোয়াল, দাঁত, পায়ের গিরা, বুকের পাঁজর
নাকের নথ, পায়ের নূপুর দালানের ভাঁজে ভাঁজে
শ্বাস বন্ধ বন্ধ করে... অন্ধকারের মধ্যে হাতড়াতে হাতড়াতে
ব্যথার মধ্যে, তৃষ্ণায় গলার ঢেঁকুর পর্যন্ত শক্ত ধুলা

দালানের শক্ত পিলারগুলি এত নিষ্ঠুর ক্যান
আত্মীয়স্বজনরা কই গেল, ওরা বইসা আছে কেন? 
মালিক কই? সরকার কিছু দেখে না?

মানুষগুলা এইভাবে আড়াল থেকে বাইরে আসলো

তোমরা সস্তায় চাইছিলা বইলাই তো এই
দামি দামি মেশিন চালানোর জন্য গরিব মানুষগুলারে
গ্রাম থেইকা ডাইকা আইনা আমরা কাজে লাগাইছিলাম

তোমরা সস্তায় চাও বইলা আমরা আমাদের
মাস্তানদের দিয়া কোনোরকমে একটা একটা কইরা কংক্রিটের খোয়ার বানাইছি
আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সস্তায় ছাড়পত্র দিছে,
আমাদের এম.পি তার মিছিলের প্রয়োজনে পুকুরকে বানাইছে শ্রমঘন কারখানা
আমাদের ইউএনও তার ওসিকে নিয়া নিরাপত্তা দিছে
তোমরা সস্তায় চাও বলে তোমাদের পোশাকগুলি

সুদূর কুষ্টিয়া থেকে শাহিনা আসছিল বুকের সস্তানকে দেশে রাইখা
ওয়ালমার্ট প্রাইমার্ক মনসুন দ্য চিলড্রেনস প্লেস নামের ট্যাগগুলা সেলাই করার জন্য
তারপর তোমাদের জন্য ১০০ ঘণ্টা আলো-বাতাস-পানিবিহীন নরকে 
একটা পরোপকারী জীবন উৎসর্গকারী হিসাবে পরিচিত হয়ে
আজ কবরে শুতে যাচ্ছে

তুমি কি ওর জন্য এখনি প্রার্থনায় বসছো?

দেখো, তোমাকে সস্তায় কাপড়গুলি দেবার জন্য
আমাদের রাষ্ট্র পর্যন্ত কী রকম বিচলিত হয়ে ওঠে!

আমাদের ম্যাংগো মানুষেরা কী মারাত্মক ঝুঁকি নিয়া
ঐ ন্যাংটা দালানটার ভিতরে আত্মার সন্ধান করছিল

আমরা তোমাদের কাছে সস্তায় পৌঁছাইয়া দিবার জন্য 
আমাদের ব্যাংকের পাছা খুলে দিছি
আমাদের মিডিয়া ২৪ ঘণ্টাই তোমাদের জন্য জাগে

হে হাড্ডি, হে ভাঙাচুরা
হে ফর্কলিফট, হাইড্রলিক ভাই
তোমরা একটু নরম করে হাত লাগাও

শক্ত মানুষেরা তাদের শক্ত হাতে
শক্ত কংক্রিটের ভাঁজে ভাঁজে
আমাদের অনেক অনেক মানুষকে 
ধুলাবালির মধ্যে যে গুঁজাইয়া রাখছে
আমরা ওদেরকে অক্সিজেন দিতে পারি নাই,
পানি দিতে পারি নাই,
বাঁচাইতে পারি নাই
চেহারা রাখতে পারি নাই
নাক পারি নাই
চোখ পারি নাই
শব্দ পারি নাই
চাঁদ তারা আর দিতে পারব না কোনোদিন

ভারী যন্ত্রপাতি, অন্তত তোমরা একটু আদর দাও ওদের


কিভাবে আখ থেকে মদ তৈরি হয়

বিশ বছর পর দেখা হলো কিভাবে আখ থেকে মদ তৈরি হয় 
জীবননগরের ডালে ডালে গরু দর্শনায়
প্রতিবেশিনী উচ্চকণ্ঠে সামনে এসে দাঁড়ান 
কুড়ি বছর পর 

আমাদের ছেলেমেয়েদুটি মথ থেকে প্রজাপতি হয়ে উড়িতেছে
আপনি আখ থেকে ভালো মদ বানাতে পারছেন তো

তাদের যন্ত্রপাতিগুলি পুরাতন
তাদের গাছে ভালো আম হৈবে কিভাবে 
তোমরা আম্রপালী লাগাও

হিজিবিজি জীবনে গরুগুলি পুত্রকন্যার চেয়েও আজো দরকারি
সন্ধ্যায় হুড়মুড় খুরের ফোঁসফোঁসানির
ভিতর থেকে মাথা বের করে
এতটুকু আলস্যের আলো পড়ে চোখে

এতটুকু ছোট ছোট চাকা
ছোট চাকা ছোট ছোট কাজ করে
গরুগুলি বর্ডার পারাপার করি
আমাদের ছোট ছোট হাতে

আমরা দর্শনায় প্রজাপতি উড়িতে দেখিলাম
বুঝিলাম জীবনের সাধারণ আখ থেকে
উৎকৃষ্ট মদ বানানো কত দরকার


সারফেস টেনশন

এক টুকরা মাটির চারা
পুকুরের পানির সারফেস টেনশনের উপর দিয়ে
লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে

একবার টেনশন পাকড়াও করছে
একবার সারফেস উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে

একবার শাদা আসছে জীবনে
আরেকবার কালো এসে চুমু খাচ্ছে

একবার চোখের সামনে সেগুনগাছ
আরেকবার পানিফলের চারা

সন্দেহ এমন একটা পোকা
যে মনের সারফেস টেনশন নষ্ট করে

তোমাকে সে 
সারফেস থেকে
ডুবিয়ে দেয়


একটা হাতির বাচ্চা কিনতে চায় মন

একটা হাতির বাচ্চা কিনতে যে চায় মন
বিকালবেলা আবাহনী মাঠে নিয়া
ফুটবল খেলা শেষে ফুচকা খাওয়াইতাম
সন্ধ্যাবেলা ফুরফুরে হাওয়ায় ঠান্ডা বাতাস খাইতাম বেঙ্গল গ্যালারিতে

হাঁইটা চইলা যাইতাম চারুকলার শুকনা পুকুরে
হাতির বাচ্চাটারে কলাপাতা খাওয়াইতাম আমি 
লালনের নামে মহানাগরিক মাইফেলে গিয়া!

গিয়া বসতাম আজিজ মার্কেটে, 
লিটল ম্যাগাজিনের প্রৌঢ় সম্পাদকের দপ্তরে আসা
বাচ্চা-কবিদের পরিচয় দিতে গিয়া বলতাম তারে
এরা সব পথভ্রষ্ট পাখি, এরা কবিতা চায় না—রুটি চায় নাকি?
ওদের পুরস্কার দাও।
তখন ভদাম করে আমার বন্ধু ছোট্ট হাতি একটা পাদ দিয়া 
ওদের কবিতার খাতা ভরে দিত

তারে নিয়া যাইতাম শিল্পকলা বা পাবলিক লাইব্রেরিতে
সা. জাকারিয়ার লোকবাংলার মঞ্চনাটকে,
তা. মা.-র বাঙালি ফিলিম প্রদর্শনীতে
শ্রেণিভুক্ত কর্পোরেট কালচারে
ফ্রেমকরা আদি হস্তচিত্র প্রদর্শনীতে
সর্বত্র রংবেরংয়ের ফতুয়াপরা এলিট মানুষদের মূর্খ আস্ফালনে...

সে কি বিরক্ত হয়ে এতসব কলার ভিতর তার নিজস্ব কলার খোঁজে
আমাকে অতিষ্ঠ করে তুলত?

আমি হেসে হেসে তাকে নিয়া যাইতাম ছবির হাটে
ওকে দেখে কফিল নিশ্চয়ই হেসে ফেলত
আমাকে বলত, এতদিন একটা কাজের কাজ করছেন
রিফাত অন্ধকার থেকে এসে ওর শুঁড় চাপড়ে বলত
এমন একটা হাতিই তো আশির দশকের স্রষ্টাদের পিঠে উঠাইয়া ঘুরাইতে পারে

আমি একটা ভালো কবিতা ঢাকা শহরকে দেখাইতে চাইবার আগেই
কিনা তথাকথিত মিডিয়াঅলারা কর্পোরেটদের টাকা খাইয়া 
বিরাট বিরাট লম্বা শপথের শতরঞ্চি বোনে
যেন বোনদের সত্যিকারের ছোট ভাই ওরা!

এত বড় মানুষদের এত ছোট ছোট শপথ!

এই শহর বহুদিন বড় জিনিস দেখে নাই
উঁচু জিনিস দেখে নাই
তাই আমি ওদের একটা শুধু বড় জিনিসের বাচ্চাকে দেখাইতে চাই!

একটা বাচ্চা হাতির দাম কত? বলেন তো সুমন রহমান?
সিংগাপুরে কি সস্তা হবে? নাকি শেরপুর? রাইসু, আপনি কি জানেন?
হাতির কথা উঠলেই পিয়াল-এর দরাজ গলায় জালাল খাঁ-র গান মনে হয়

চয়ন খায়রুল কাছে থাকলে জিগাইতাম লন্ডনের চিড়িয়াখানায় কি 
বুইড়া হাতির পেটে জারজ বাচ্চা পয়দা হৈলে কম দামে পাওয়া যায়?
আমার এক ১৮ বছরের কবিবন্ধু, যে প্রতিনিয়ত তার নাম বদলায়,
হে অনীশ বৃক্ষ, বলো তো, হাতির বাচ্চা দিয়া তুমি কি করতা?

সে বলে, প্রথমালোর সম্পাদকের কাছে বাচ্চাটারে পাঠাইয়া কইতাম
এই দেখ সত্যিকারের বড় জিনিস কেমন
চ্যানেল নয়নকেও বলতাম: দেখ, সত্যিকারের চোখ কতই না সুন্দর!

ফাঁপা বুদ্ধিজীবীদের থেকে কত বড় সত্যিকারের হাতির বাচ্চা!


একটা তালগাছের কথা

আমি একটা উঁচু তালগাছ। আমার মাথা একেবারে সব গাছ ছাড়িয়ে বাবুই পাখির বাসার কাছাকাছি। 
বাবুই পাখিরা আমার প্রতিবেশী।
উঁচু থেকে আরো উঁচুতে ওঠার আকাঙ্ক্ষাই আমাকে এত উঁচুতে নিয়ে এসেছে। ভালোই আছি এই উঁচুতে। 
অনেক দূরের অনেক কিছু দেখতে পাই। খোলা মাঠের জন্য আমাকে হা হা করতে হয় না। 
সকাল বা বিকাল দেখার জন্য কোথাও যেতে হয় না।
সত্যি বলতে কি একটা সময় আমার এত উপরে ওঠার কোনো ইচ্ছাও ছিল না, ভালোও লাগত না। 
সবার সাথে মিলেমিশে ছিলাম। অন্যরা যখন হু হু করে বড় হতে থাকত, 
আমি থাকতাম আমার পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা টুনটুনিদের সাথে।
মাটির পোকামাকড়দের গরমের দিনে বাতাস করতাম। 
বৃষ্টির দিনে ছাতি ধরতাম শিয়ালের বউয়ের মাথায়।
একদিন দেখলাম সবার চেয়ে আমার বেশ খানিকটা বাড় হয়েছে। 
কবে যে উচ্চাকাঙ্ক্ষার ডাক এসেছিল মনে নাই, তবে উড়ে যাওয়া 
কাকের আত্মার নীল একটা ঢেউ আমাকে ছুঁয়েছিল
আজ আমি ভালোবাসার ঊর্ধ্বে একটা উঁচু তালগাছ
ভীষণ ফাঁকা উঁচু আর একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকি
আর ছোট ছোট বাবুই পাখিরা আমার প্রতিবেশী
অনেক উঁচু থেকে আর অনেক দূর থেকে
মিষ্টি ধোঁয়া ওঠা ঘাস আর পোকামাকড়কে দেখি
সারাদিন ধরে ভাবি ওদের, শিয়ালের বাচ্চাটাকে ভাবি
কিন্তু ওরা আমাকে ভুলে গেছে
ওরা আমাকে একটা লম্বা গর্বিত একা তালগাছ ছাড়া কিছুই ভাবে না। 


ব্যাঙনি

তুমি সেই প্রাগৈতিহাসিক ব্যাঙনি
যে কিনা বহু ফুট মাটির নিচে সারা বছর বসবাস করো
আর কেবল যৌনমাসে অন্ধকারের উপরে আলোতে উঠে আসো আর 
একটা ছোট্ট পুরুষ ব্যাঙকে পিঠে চড়িয়ে
ঘুরতে যাও প্রান্তরের পথে

তুমি দুনিয়া, আমাকে তুমি দারী দেখাতে দেখাতে
হঠাৎই ফেলে দাও বিগব্যাং খাদে
আমিও চমকে উঠি সেই সংবেদে

আমি নরম ব্যাঙ, তুমি শক্ত নারী
একটা বিশেষ কাজের জন্য তুমি আমাকে পিঠে চড়িয়ে
ঘুরে বেড়াচ্ছ
তোমাকে কি ফেরাতে পারি?


বাঁকা চশমা

তোমার সঙ্গ ছাড়া আর কিছুতেই মন টিকে না। কোনো প্রিয় খাদ্য নাই, পানীয় নাই। 
দোকান নাই, জুতা নাই, জামা নাই, তুমি ছাড়া।

তুমি আবার আসবে, জানি। এসে বলবে অনেক কিছু এনেছি তোমার জন্য। 
ব্যাগভর্তি নানারকম উপহার সংগ্রহ করেছ। কিছু আমাকে দিবে। 
কিছু জমিয়ে রাখবে। কাল দিব, পরশু দিব বলে। আর এভাবেই একদিন
দেখব তুমি আরেক হাতের কাছে চলে যাচ্ছ। 
আর আমাকে তা দেখতে হচ্ছে একটা বাঁকা চশমা পরে।

আবার তোমার সেই রকমসকম। ঘুরে ঘুরে ফতুর হয়ে, আবার আসার পাঁয়তারা। 
অনেকগুলি অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেছ। অনেক ভুল আলিঙ্গন করে এলে।
কিন্তু এবারো কি আমি সেরকম করব?
তুমি যে ফিরে আসবে, সেই অপেক্ষায় পথে বসে থাকব?

মন বানাতে আমি এখন পটু হয়ে গেছি। 
তুমি চলে গেলে মনটা থাকে না
ফিরে এলে
পটাপট তৈরি হয় আমার সেই মন

সেই মনটাই আবার কেমন করে ওঠে।


আমি আমার শত্রুর চশমা

আমি আমার শত্রুর চশমা পরার পর
এখন বেশ আগের চেয়ে ভালো দেখতে পাচ্ছি

শত্রুর চশমায় একটা আলাদা লেন্স লাগানো থাকে বুঝি
ছয়টা ইন্দ্রিয়ের সতর্কতা সেখানে অনবদ্য
অন্য ভাষায় লেখা সব দর্শন
যা দেখি তার অন্যরকম মানে

তুমি যখন আমার সাথে অনর্গল মিথ্যা বানানো কথা বলতে থাকো
আমি তখন সেই বিশেষ চশমাটা চোখে লাগাই
তখন সব ফকফকা। তোমাকে স্পষ্ট দেখতে পাই

এত সব করি কেন? 
কারণ তোমাকে আমি ক্ষমা করতে চাই।
বারবার ক্ষমা করতে চাই।
এতে যদি কিছু শাস্তি পাও, সেটা কি কঠিন শাস্তি হবে না?


তাপদাহের দিন

একটা শাদা ফুল ফোটাব বলে কত যে দিন অপেক্ষা করেছি
ম্যাজিক-হাতে এনে দাও চারা গোড়াশুদ্ধু পুঁতে রাখি

তুমি তো ভুতুরে শহরে ম্রিয়মাণ চড়ুই আর শালিকের তৃষ্ণা
কাতর চোখে দেখতে চাইছ না আর
মোটা কাপড় ঝুলছে চোখের সামনে
গামলা ভরে উঠেছে কান্নার পানিতে
এখন তুমি কার পাশ থেকে উঠে যেতে চাও?

কেউ কাউকে ছেড়ে দিতে চাই না চাই না
ওরে এপ্রিল ওরে বৈশাখ ওরে তীব্র সময় 
বিস্বাদের ছাদে উঠে গিয়ে দেখে আয়
কত দূর চলে গেছে সে

তার পাশে নতজানু হয়ে বসো
বসো পাশে বসো পাশে বসো
হে উড়ন্ত ম্যাজিক!

তোমার জন্য অপেক্ষা করছে
তুমি এসে ভরে দাও তাপদাহের দিন।


ভাবের খোঁয়াড়ে

হঠাৎ হঠাৎ বৃষ্টি এলে
ফিরে এল সারা বছরের প্রেম 
ঠিক তখনই জানিলেম
পদ্মায় আসিল ঢল
মন ভরে গেল জোয়ারে
ভেজালো ঝরোঝরো সকাল 
পাঠালো ভাবের খোঁয়াড়ে।

বৌ যেন এই বর্ষার দিনে
বৃষ্টিতে গেছে ছনচা-তলে
কচুশাক আজ রান্ধবে ইলিশে
প্রেমের কানশা দিয়ে!

আবার দিনটা মেঘকালো
নিবিড় ডাহুক নিবেছে আলো।

সন্ধ্যা হয়ে এল চলে যায় দিন
চল রেডি হই—হইতে বিলীন
প্রভুর বিছানায়।

পড়ে থাক সব 
সুখাদ্য আর ধৈঞ্চার কলরব।


তুমি অক্টোপাস

তুমি অক্টোপাস, তুমি আমার টিচার
তুমি গণপাঠাগার থেকে আনা বই,
তুমি আমার রেডলেটার ডে 
রাত্রেই পড়ে শেষ করতে হবে তোমাকে।

বুকভরা সহমর্মিতা নিয়া
বুঝি পদ্মায় ডুব দিলে তোমার দেখা পাব

আমরা যারা অনেকরকম বানান লিখি
এ জীবনের বিভিন্ন সময় থেকে
আমাদের বিভিন্ন বানানে লিখতে দাও
আমরা দেশের সকল জেলায় গেছি, গেছি ৭০ ভাগ উপজেলায়ও
অনেক রকমসকম দেখার অভ্যাস আমাদের আছে
অনেকরকম রান্না ও পরিচারিকার ঘর পরিষ্কার করানোর
অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে
আমাদের কাছে জীবনের অনেকরকম বানান
পছন্দ হয় খুব
নানানরকম আমের মুখ
অনেকরকম পেয়ারার খির
কিশোরীর ভুরু
শ্যামলা নাকের উপর সোনার নাকফুল

কিশোরীর মস্তানি দেখতে ভালো লাগে
রোদে পোড়া মাসল
রেস্তোরাঁয় বসে এখনো কি কিশোর-কিশোরী
তর্কে মেতে ওঠে?
ঘুমের বড়ি দিয়ে হ্যান্ডব্যাগ ভরে রাখে?

জানালায় দাঁড়িয়ে তিমির স্বপ্ন দেখি
ভেসে আসে সেই তিমির বমি বা অ্যাম্বারগ্রিস
একটা স্পার্মতিমি সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ডে এসে কয়েক কেজি অপরূপ বমি করে দেয়
সে বমি তো না, সমুদ্রমন্থনের স্বর্গীয় সুগন্ধ
সে রাত ছিল পূর্ণিমার
তিমির লেজের ইশারায় সাগর থেকে উড়ন্ত মাছেরা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিল গা
একটা পানির ঘুড়ন্ত টানেলের মাথায় ডলফিন হাসতে থাকল।

দুনিয়ার সবচেয়ে ছোট তিমি বামন কোগিয়া দেখা যায় বঙ্গোপসাগরে
শে দুইটা বাচ্চা নিয়া মারা গেছে
কিন্তু কোনো অ্যাম্বারগ্রিস দিতে পারে নাই
ছোট তিমির সুগন্ধ নাই। তার শুধু মৃত্যু আছে। সে গরিব।

বিশাল উপসাগরের সাথে বাঙালির তেমন মিতালি নাই
শুধু দুবলার চরে গিয়ে বছরে একবার সূর্যকে সালাম জানাতে যায় মানুষেরা
তিমির সাথে দেখা হয় নাকো!

স্বপ্নে দেখেছিলাম এরকমই হবে
সূর্যাস্তের সময় আকাশ ভরে উঠবে বিদায়ী আলোতে
কিন্তু আমার তা দেখার চোখ তখন থাকবে না
আমি তখন ঘরে বসে তিমির বমি করা ভাবব।

আমরা যেসব ফুল অকারণে ভালোবেসে ফেলে দিয়েছিলাম
আমাদের শিশুরা তাই পরম আদরে কুড়িয়ে নিয়ে বড় হতে থাকবে
হয়তো একদিন তারা পেয়ে যাবে সমুদ্রমন্থনের ফল
বঙ্গোপসাগর খুলে দেবে তাদের জন্য নতুন স্বপ্নের একটা দেশ
সেদিন আমরা থাকব না
আমরা তিমির অ্যাম্বারগ্রিস হয়ে বাতাসে সুগন্ধ ছড়াব।


হাসপাতালে

ভালোবাসি তাই বশ্যতা স্বীকার করতে দ্বিধা নাই 
হাসপাতাল ছাড়ার আগেই মহাশূন্যের চিত্রময় সর্বশেষ ছবিটা প্রকাশ পেল 
আমি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিলাম না বলে

তুমি মন খারাপ করে আমার সাথে জেমস ওয়েবে চোখ পেতে ছিলে আর ভাবছিলে 
আমি কি আর দম ফিরে পাব না? 
তোমরা মহানগরে উল্লসিত তুমি গ্রামে বসে লাল রঙের জাল ফেলতে দেখছ
আমি এর মাঝখানে পড়ে আছি হাসপাতালে

আমি কবি 
আমার কোনো বন্ধু নাই 
আমি বহুদিন ধরে একা 
শৈশব থেকে 
অনেক নির্জন উপকূলে নায়িকার রূপ দেখে কেটে গেছে বেলা 
আমার দুই ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে 
আজ ক্লান্ত হৃদয়
মৌসুমি হাওয়া দোলা 
কালের গালে একটা চুমু দিতে তৎপর 
সর্বদা শুধু বেদিশা 

হাসপাতালে 
কেন গো আল্লা কিছু ঘাস পাঠালে 
এ ধরণীতে আজ সকালে 
একটা ইন্দুর কাটে কুট কুট পরমায়ু 
আমি হেসে উঠি
ঘাস খাই
তারপর চিবুকের দাড়ি কেটে ফেলি!


আমাদের বৌদি

একবার আমি আমার প্রতিবেশী বৌদির মোবাইল ফোনে একটা হোমস্ক্রিন হয়ে 
ঘুরে এলাম কলকাতা, বেড়াতে
মৈত্রী ট্রেনে উঠেই কী যে স্বাধীনতা আমার ভিতর টের পেলাম
বোতলের পানি খেতেই মনে হচ্ছিল গঙ্গাজল খাচ্ছি ঢকঢক করে

কোলকাতা স্টেশনে গিয়ে সোজা চলে গেলাম দমদম
প্রতিবেশী বৌদির বোনের বাড়িতে
বোনটি হুবুহু দেখতে বৌদির মতো
শুধু আরো বেশি ধর্মপরায়ণ আর হিন্দু হিন্দু

গড়িয়াহাট বুলেভার্ড গিয়ে সেই মোবাইল ফোনটা মন ভরে শাড়ি কিনল কয়েক দিন
আর মোড়ে মোড়ে দেবতার থানে নমস্কার জানালো ইচ্ছামতো
ইচ্ছামতো কালীঘাটে গিয়ে কালীমা’র সামনে চোখের জল ঝরালো
দক্ষিণেশ্বর গিয়ে সারদা দেবীর কথা স্মরণ করে সারা দুপুর ঘুরে বেড়ালো
বৌদির স্বামী খুব ‘বিবেকানন্দ’-ভক্ত
তাই গঙ্গা পার হয়ে বেলুরমঠ ঘুরে এল
চোখে পড়ল কত ঘাট কত পথের নিশানা

তারপর সিনেমা হলে প্রসেনজিতের অভিনয় দেখে চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে
মনে মনে চলে গেল পুরী জগন্নাথদেবের মন্দিরে
গয়ায় পিণ্ডদান দিল, তারপর বৃন্দাবন, গেল কাশী
সিনেমার সাথে

বেলুরমঠে সান্ধ্য প্রার্থনা ইচ্ছা হলে দক্ষিণেশ্বরে পূজা 
চলে যাও কৃষ্ণনগর জংশন হয়ে নবদ্বীপ, সোনার গৌড় মূর্তি দেখে
ইসকনের মায়াপুর ঘুরে ঘুরে সারাদিন 
গোশালা দেখে কিছু গোমুত্র পান করে
ফিরে আসো 

দমদমে বোনের বাড়িতে ফিরে গিয়ে শাড়ি রেখে ফতুয়া আর ঘাগরা পরে
ঘুরে বেড়াচ্ছিল যখন বৌদি
তখন মনে পড়ল তার ঢাকার কথা 
মোবাইলে নাতনির পিক বের করে মনে পড়ল 
গত ঈদের ছুটিতে নাতনি নেচেছিল রবিঠাকুরের পাগলা হাওয়ার ছুটির গানে

তখন দেখল বৌদি, তার থলিতে টাকা প্রায় শেষ হয়ে গেছে
মনে যদিও তার কাশ্মীর হয়ে অমরনাথ/কেদারনাথ দর্শনের আশা ছিল
তদুপরি ফিরে এল শে
আবার ঢাকায়, বাংলাদেশে
চরম হিজাবপরা নারীদের দেশে
ভিন্নরকম বাংলা ভাষায়
ভীষণ মন খারাপ করে
সুটকেস ভরা শাড়ি নিয়া।


আমাদের পাটখেত

আমাদের সম্পর্ক ছিল পাটখেতের মতো 
অফুরান ভিটামিন ভরা
তাতে ভালোবাসার অনেক বায়োআঁশ 
কিন্তু হালকা পাটখড়ির মতো পলকা 

আমরা এখন
সম্পর্কের আঁশ ছাড়াতে 
জুটমিল বন্ধ করে 
পাটশাক খাই দুইবেলা

আর সারাবেলা পরস্পরকে উস্কানি দেই।


দুর্ভিক্ষ

দুর্ভিক্ষ জিজ্ঞেস করে, আমি কি আসব?
তখন আমি বলি, না এখনো সময় হয় নাই

সাতটা তাজা আর সাতটা রোগা গরুর স্বপ্ন দেখা এখনো শেষ হয় নাই
এখন দেশে কিভাবে ভোট হবে তা নির্ণয় চলছে
এখন আমাদের গরুর হিসাবে সময় নাই।


শৈশবে

স্কুলে থাকতে নাকি আমি এক বন্ধুকে
পানি থেকে তুলে
ডুবে মরা থেকে বাঁচিয়েছিলাম। 

ভুলে গেছিলাম সে কথা কিন্তু আমাকে অনেক দিন পরে 
ও তা মনে করিয়ে দিল।

ওর চোখে ছিল বিমূঢ় কৃতজ্ঞতা 
ও কি জীবন ফিরে পেয়ে সুখী হয় নাই?

তারপরেও আমার চোখে 
আমি সে বন্ধুর চোখজোড়া চাই।


আমার সোনার ধান

আমার সোনার ধান আমি 
টিয়াপাখির দল ডেকে 
তাদের খাওয়ায়ে দেই

হুশ হুশ
ডাইনে
বায়ে
যাহ যা

তদন্তকারী
যখন গল্প বানায়
ভিক্টিম ছেলেটা যেহেতু পড়েছিল
নিৎসের রচনা
জীবনানন্দ দাশের কবিতা
তাহলে তো সে
করতেই পারে
আত্মহত্যা
ব্রিজ থেকে লাফিয়ে
শীতলক্ষ্যায়
এদিকে তার ফোনেরও
জিপিএস ডাটা
সাক্ষ্য দিচ্ছে
ঘুরেছিল সে সারাদিন
শহর জুড়ে
এদিক সেদিক
নীলক্ষেত বইয়ের দোকানে
যাত্রাবাড়ি চনপাড়া

নিন্দুকেরা বলেন
যুবক যায় নাই
হয়তো তার ফোনটাই
নিয়ে গিয়েছিল কেউ
সেদিন
তাদের হাতে করে
আর যখন তার
ফোনে ফেসবুক
ঘুরছিল শহরময়
ঠিক তখনই
তাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে
তক্তা বানাচ্ছিল তাদের আরেক দল
আরেক জায়গায় হতে পারে
যারা তাকে মেরে ফেলে
আত্মহত্যা বলে
চালিয়ে দিতে চায়
তারাই সংগঠিত করেছিল
সবকিছু

আমার সোনার ধান আমি 
টিয়াপাখির দল ডেকে 
তাদের খাওয়ায়ে দেই
হায় রে আমার বুয়েট
হায় রে আমার মেধাবী
হায় রে যুবক
হায় রে আমার দুঃখী 
মনমরা দেশ!


ভোলা নদী বা লোয়ার মেঘনা

ভোলা নদীতে গেলে হঠাৎ করে মনে হবে, এ কী কোথায় আমি? কই আমি! 
নিজের ভাষা এলোমেলো হয়ে যায়। প্রমিত ভাষা লোকভাষায় পরিণত হয়।

সামান্য বাতাসেই ভোলা নদী টলমল করে ওঠে। বিলিয়ন বিলিয়ন পানির কণা নেচে ওঠে এক মুঠায়। 
এই পানিটাই হয়তো লাখ লাখ আবর্তনে এখান দিয়ে বয়ে গেছে। 
বাষ্প হয়ে আকাশে উড়েছে, পাহাড়ে গেছে, আবার ভোলা নদী হয়ে
সাগর মোহনা হয়ে নোনা জলে মিশেছে। 

দুই বন্ধু মনপুরায় বেড়াতে আসে। দুইজনাই পুলিশ। 
বেড়ানো শেষে কর্মস্থানে ফিরে গেলে একজনের মনপুরার বৌ প্রেগনেন্ট হয়। 
তখন সেই বন্ধু বলে, বেড়াতে গিয়ে ও তো আমার বৌকে লুকাইয়া লাগাইছে। 
বাচ্চাটা ওর। 
মিথ্যা গল্পে সফিক কাতর হয়ে পড়ে। বাড়িতে টাকা পাঠানো বন্ধ করে।

রফিক পুরাটা ভুলে যায়, কিন্তু সফিক দেওয়ানা হয়ে 
পুলিশলাইনে বাঁশি বাজায় আর গান গায়।

পুরাটা বানানো গল্প, কিন্তু নারীটা বাচ্চা হবার পর নাম রাখে জাকির। নানাবাড়িতে জাকিরকে খুব সংগ্রাম করে পালে তার মা। সে বড় হয়ে গল্প লিখবে। তখন তার খুব নাম হবে। 
একদিন ভোলা নদীতে বেড়াতে এসে তার সব মনে পড়বে। তখন সে খুব কষ্ট পাবে ও কানবে। তারপর আরেকটা গল্প লিখবে। তাতে রাজনীতি থাকবে।


আমি তার মাথার দিকে তাকালাম

মাথার পেছনটা থেবড়ে দিয়েছে
ভোঁতা কিছু দিয়ে
সেখান থেকে মগজ গড়িয়ে পড়ছে
পিঠের দিকে চারপাঁচ জনে পিটিয়ে
ভর্তা করে ফেলছে
তাকে মেরে ফেলে
লাশটাকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিয়েছে

তীব্র রাগে
ওর হত্যার বিচার আমি চাই
আমি খুঁজে বের করবই
কারা আমার ভাইকে মেরেছে
মেরেছে মেরেছে মেরেছে
শব্জিক্ষেত থেকে এনে

রোদ্রে বসে থাকি
রোদ্র থেকে
গড়ায় বিজ্ঞান
ইতিহাস
এবং পৌরনীতি
রোদ্র থেকে
নেমে এসে
আইনস্টাইন
জানায়
আমরা ভালো নাই
এবং রোদ্র থেকে
মাথা নাড়ায় বলে
ব্যাংকে টাকা রেখে
এখন লাভ নাই
এডাম স্মিথ হেসে বলে
ডলার যদিও চাঙ্গা
কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই দেখো
আসবে নতুন মুদ্রা

রোদ্র থেকে যখন
শরীররটা গরমে আনচান
তুমি এসে দেখা দাও
খুলে তোমার চুল
কত দিনের আগের কথা
কিন্তু এখনো সমুজ্জ্বল
এই তো সেদিনের কথা
বলেছিলে প্রথম ভালোবাসি
রোদ্র ছিল সেদিন এমন
মেঘলা দিনের দুপুরে
উপুড় করে দিয়েছিলে
প্রাণটা মুচড়িয়ে
নিষ্কাম সে চুমু
মুহুর্মুহু
জাগিয়ে দিয়ে গেল বিজ্ঞান
আর জগতের অর্থনীতি
আর ইঞ্জিনিয়ারিং
আর নৃতত্ত্ব
তুমি নেই, তবে রোদ্র এলে
তুমি ফিরে আসো
ইতিহাস ধরে
আমার ধড়ে ও নিশ্বাসে!


হে পিংক, হে ছোটকাল

আমাদের ঘরে একটা শঙ্খ আছে, তার গায়ের রং শাদার মধ্যে হালকা গোলাপি। 
তার গা মসৃণ নয়, কুঁচকানো, ঢেউ খেলা। আমি এর নাম দিয়েছি শৈশব।

হে স্বপ্নময়, হে চূড়া
তুমি সূর্য
সাক্ষাৎ অনিবার
মহিসোপানের ঢাল

সমুদ্রকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি
তিমিকে বমি করতে দেখেছি
খরগোসকে ঘাস খেয়ে নাচতে দেখেছি
আর তখনই তুমি বলেছ:
সৃষ্টি একটা মায়া ছাড়া কিছু নয়
ব্ল্যাকহোলের কাছে কিছুই টিকবে না

জাফরি-কাটা মুঘলদের ইতিহাস
হিন্দু সভ্যতার পাশে 
ঠিকই দাঁড়ায়ে থাকলে
তুমি কাউকে তুচ্ছ করতে পারবে না
তোমাকে শেষ পর্যন্ত
ক্ষমা করে দিতে হবে
পাশাপাশি দাঁড়ায়ে থাকতে হবে
হু হু করতে থাকবে
তোমার সংগ্রাম তোমার ভাষা

তোমার চেতনা ঠুনকো হয়ে উঠবে
আরেকটা চেতনা কাছে।


এখন সবকিছু খুব হিসাব

এখন সবকিছু খুব হিসাব করে চলতে হয়। শরীরের প্রতিটা অঙ্গ তার নিজস্ব স্বাভাবিক মাত্রার সামান্যতম হেরফের হলে তার হিসাব কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে। একটু বেশি জাগলে বেশি ঘুমাতে হয়, বেশি হাঁটলে শরীর ব্যথা করে। একদিন মাস্টারবেট করলে মনে হয় দেহের ক্যালসিয়ামে ঘাটতি পড়ে যাচ্ছে, পায়ের জয়েন্টে কামড়ায়।

হয়তো এর রিমেডিও আছে। নতুন অনুসন্ধান বলছে, মানুষ চেষ্টা করলে তার জিনের পরিবর্তন করতে পারে। বার্ধক্য-জিনকে বদলাতে পারে। কিছু থেমে যাওয়া জিনকে চালু করে দিতে পারে। কেমনে? নিয়মিত ব্যায়াম করে, বাছাই করা খাবার খেয়ে, বিশেষ কিছু খাবার না খেয়ে এ পরিবর্তন করা যায়।

আমি কী খাচ্ছি, কতটা স্ট্রেস দিচ্ছি শরীরকে, কতটা সক্রিয় থাকছি জীবনাচরণে আর আশে পাশে কতটা নির্মল প্রকৃতিকে পাচ্ছি তা দিয়ে ঘুমন্ত জিনকে সক্রিয় করে তো যায়।

নাট হাউস বা পাগলা গারদ বা এসাইলামে জেগে উঠতে পারি
আমাদের প্রতিটা ঘর এখন একটা একটা নাট হাউস
প্রতিটা ছাদ এখন এসাইলাম—রিহ্যাব
ঘরে ঘরে মানসিক ব্যস্ততা
আমরা বারবার পড়ে যাইতেছি
বারবার আমাদের রিলাপস হচ্ছে।
আমাদের মুক্তি চাই
এই পাগলা গারদ থেকে
এটাই আমার কবিতা।


তুমি যদি বলো

তুমি যদি বলো
তাহলে আমি
বদলে যাব

আমি গ্রামে চাঁদ উঠতে দেখেছি
সে ছিল দলবল নিয়ে
দলবল নিয়ে সে চাঁদের দলে
ছিল
করুণ সুরে গান গাওয়ার দল
তারা মাটি খুঁড়ত
দেহতত্ত্বের
গান দিয়ে

সে চাঁদ গোরস্তানের প্রহরী
তোমাদের উন্নয়নের গল্প
শুনতে শুনতে
ঘুমিয়ে গেছিলাম
আর এক সময়
স্বপ্ন দেখতে শুরু করি
দেখতে কি চাও
ঘুম ভেঙে গেলে
আমি কেমন করে
আশাহত হলাম?

কেন এসেছিলে
প্লট বেচতে স্বপ্ন দেখাতে
কেন এসেছিলে

উচ্চকণ্ঠে শব্দ মেলাও
মানুষ মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু
জিরো কার্বন
ক্লাইমেট চেইঞ্জ
নারায়ে তকবির
জোরসে বল
আমাদের গ্যাস শেষ
বিদ্যুৎ নাই
তেল নাই
আমাদের জ্বালানি নাই
আমাদের ভোট দিন
আমাদের ব্যালট বাক্স ফাঁকা

আমরা অনেক আশা 
নিয়ে বসে আছি
রক্তে কার্বন মিশে গেছে
ডলার কমে যাচ্ছে
বিলিয়ন বিলিয়ন
পদ্মাব্রিজ
টানেল
মেট্রো
স্বপ্ন ধরা দিয়ে
হারায়ে
যায়
কবিতার লাইনগুলি
ছোট ছোট
কোনো স্পষ্ট
অর্থ নাই
ভরসা সুদূর
ভোটের উপর ভরসা
করতে পারছি না
পানির উপর
চেহারা ভাসছে না
হত্যা না আত্মহত্যা
সব গুলিয়ে যাচ্ছে
পুলিশগুলি
ঠিকই
তদন্ত করে
গুবলেট পাকায়ে ফেলছে

আমরা জানি
কার জন্য কেন এসব হচ্ছে
কিন্তু কিছু করতে পারছি না
অসহ্য লাগছে
গুম হতে ইচ্ছ করতেছে না।

কাজল শাহনেওয়াজ

কাজল শাহনেওয়াজ

জন্ম বিক্রমপুরের লৌহজং থানার দিঘলী গ্রামে (এখন পদ্মাগর্ভে বিলীন); ১ জুন,...বিস্তারিত