১.
পেশা যাদের অধ্যাপনা তাদের জন্য কবিতার আলোচনা করাটাকে জীবনানন্দ দাশ কঠিন কাজে পরিণত করে গেছেন। সেই যে মোক্ষম চ্যালেঞ্জ রেখে গেছেন 'সমারূঢ়' কবিতায়, 'বরং তুমি নিজেই লেখো নাকো একটি কবিতা' বলে, পিঁচুটি-পড়া গাল-তোবড়ানো অধ্যাপকের ভূমিকায় সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাটা সব সময় আমার কাছে দুরূহ কাজ বলে মনে হয়েছে। জ্যোৎস্নাসম্প্রদায় গ্রন্থ সম্পর্কিত এই লেখাটিকে সমালোচনার পরিবর্তে পাঠ-প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
২০২০ সালের নভেম্বর মাসে 'জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়' শিরোনামে কবি জাকির জাফরানের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। অতিমারী-আক্রান্ত সেই বিভীষিকার কালে প্রান্তিক হাওরাঞ্চলে বসে তিনি ফিরে যেতে চেয়েছেন যান্ত্রিক সভ্যতাপূর্ব আদিম প্রকৃতিনির্ভর পৃথিবীতে, চর্যাপদের জগতে। ব্যক্তি-জাকিরের জীবন তার পেশাগত পরিচয়ের বাইরে গান, কবিতা, অনুবাদ—সব মিলিয়ে শিল্পময় যাপনের স্বাক্ষর রাখে। কাব্যগ্রন্থটির নামকরণ নিয়ে কবি নির্মলেন্দু গুণ যথার্থই লিখেছেন জ্যোৎস্নাকে বহু কবি বহুভাবে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু সপ্রাণ সম্প্রদায় হিসেবে একটি জনপদকে চিহ্নিত করাটা এই প্রথম।
জাকির জাফরানের এই গ্রন্থের কবিতাগুলোতে বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ, হাওরের জল আর জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়-চিহ্নিত কৃষক ও বাউল জীবনের সহজাত যাপনের নানা বর্ণের ছবি জুড়ে এক নতুন পৃথিবীর মানচিত্র তৈরি করেছেন, যেখানে একবার প্রবেশ করে ফেললে আর ফেরার পথ থাকে না।
২.
পৃথিবীর আদিমাতারূপী নারী জাকিরের কবিতার মূল প্রেরণা। যে নারী শুশ্রূষা দেয় আপন সহজাত প্রবৃত্তিপ্রসূত হয়ে, যে নারী প্রকৃতিরই আরেক রূপ।
নারী এক নিস্তরঙ্গ জলাশয়, তাতে সব ছায়া—
তাতে বৃক্ষ, পাখি, তারা, অন্ধকার অবলীন হয়ে
দিকে দিকে ফুটে আছে, মোহপাশে, নারীর নিয়মে (৩৩)
তার কবিতা পড়তে পড়তে আমার অন্তত মনে হয়েছে 'জাকির জাফরানের কবিতায় নারীর প্রতিচ্ছবি' শিরোনামে আলাদাভাবে প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে। গত শতাব্দী থেকে সমালোচনা শাখায় যুক্ত হয়েছে একটি নতুন ধারা—ফেমিনিস্ট লিটারারি ক্রিটিসিজম। জাকিরের কবিতাকে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করাটা অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হবে না।
ইকোফেমিনিজমের মূল কথা হলো যুদ্ধ ও অস্ত্রনির্ভর পেশিশক্তিতে বলিয়ান পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার বিপরীতে প্রকৃতিনির্ভর জীবনে ফিরে যাওয়া—যেখানে সমাজ, পরিবার তথা সভ্যতা মাতৃতান্ত্রিক কোমলতায় ধ্বংসের পরিবর্তে সৃজনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে। মা যেমন সন্তান ধারণ করে পৃথিবীর বংশরক্ষা করে চলে তেমনিভাবে অধিকাংশ পরিবারের জীবিকা পুরুষপ্রধান হলেও মায়েরাই পরিবারের খাদ্য ও পুষ্টির যোগান নিশ্চিত করে থাকে, কোনো মুনাফা লাভের আশা বা ধ্বংসযজ্ঞের আয়োজন ব্যতিরেকেই।
ধানের দুহিতা তুমি নারী, আমি রাতের সন্ন্যাসী—
তোমার পালঙ্ক দেখি ভরে গেছে ধানভেজা ঘ্রাণে।
দাও কিছু বোরোধান তোমার কোমর থেকে এনে,
তাতে শান্তি, তাতে দেখি অনাগত শিশুর স্বপন। (৫৩)
বিশ্বজুড়ে সভ্যতার ইতিহাস থেকে জানা যায়, কৃষির সাথে নারীর সম্পর্ক চিরায়ত। নারীই প্রধানত প্রকৃতিলব্ধ জ্ঞানে গাছপালা ফসলফলাদি ও বীজের সংরক্ষণ প্রতিপালনের মাধ্যমে পৃথিবীর খাদ্যচক্রকে জিইয়ে রাখে।ব্যবসায়িকভাবে নারীর কম এগিয়ে আসার কারণে বিষয়টি অত বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য হয় নি কারো কাছে।
সুরমার তীরে দেখো আজো সেই যুবতী চাঁদ আমায়
প্ররোচিত করে—তুমি দাও কিছু অনুকূল বীজ,
ক্ষয়িষ্ণু পাথর থেকেও আমি জন্ম দেব ধানগাছ (১১)
ভারতীয় পরিবেশ নারীবাদী অ্যাক্টিভিস্ট বন্দনা শিবা জানান, পৃথিবী থেকে প্রায় ৯৪ জাতের বীজ বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। বিশ্বজুড়ে বীজের মার্কেটকে দখল করে ফেলেছে বহুজাতিক কোম্পানি। অল্প সময়ে অতিদ্রুত অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে নতুন প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে চরমভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে। একটা উদাহরণে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে। দেশি জাতের বীজ থেকে উৎপাদিত ফসলে পোকামাকড় কম হয় বলে কীটনাশকের ব্যবহারও কম হয়, তাই সেই ফসল যে মানবজাতির জন্য স্বাস্থ্যকর তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এতে করে মুনাফালোভী ব্যবসায়ী আর কীটনাশক প্রস্তুতকারী কোম্পানি উভয়ই অন্যায্য লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। তাই কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনের মূল জায়গা থেকে নারীকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে সুকৌশলে। ইতিহাস বলে, খনার বচনের মাঝে টিকে আছে শত বছর আগেকার কৃষি, জল, মাটি, ফসল আর মানুষের গন্ধমাখা জ্ঞান।
ক.
লক্ষ্মীমাতা জেনে রাখো বীজ যদি দুঃখ পায় তবে—
আমি খনা, তোমার ভবিষ্যে দেখি কৃষির রোদন। (৩১)
খ.
বালিকা আকন্দ ফুল হাতে
কয়েক বছর ধরে একা একা দাঁড়িয়ে রয়েছে,
তাকে দাও মূলধন, বীজের ব্যবস্থা করো তার, (৩৩)
গ.
তুমি চারা, তুমি বৃক্ষ, তুমি অন্তহীন বীজখলা (১১)
নারী, প্রকৃতির মতো কেবল শুশ্রূষা আর প্রাণদায়িনী নয়, প্রণয়িনী রূপে পৃথিবীর বংশপরম্পরা বহনের ইতিহাস রচয়িতা। নরের সঙ্গে নারীর আদিম সম্পর্কের রূপায়ণ তার কবিতার আরেকটি পুনরাবৃত্ত বিষয়।
অদ্ভুত এ সমাপ্তির পর, প্রিয় কবুতর, রাতে,
অনন্ত নখের দাগে এই দেহ হাঁড়ি ভরে গেছে। (০৯)
এসব কবিতায় শব্দের ব্যবহার তীব্র ঘ্রাণযুক্ত ফুলের মতো, রীতিমতো ইন্দ্রিয়কে জাগিয়ে তোলে।
ক.
অনাবৃত নাভীমূলে দেখো ঝিঙেফুলের উচ্ছ্বাস—
ছায়াবতী, করতলে মুখ গুঁজে পড়ে আছে এক
দুরন্ত পায়রা, তাকে নখ দিয়ে কৃষিতে জাগাও। (০৬)
খ.
বর্তনে জ্যোৎস্নার মদ নিয়ে, একা,
অপেক্ষায় কাতর হয় তনুমধ্যা নারী, ধীরে ধীরে,
দ্বিপ্রহরে, দেহবিষ মিশে যায় ধনুকের তূণে। (২৯)
নারী, পুরুষের কাছ থেকে বীজ নিয়ে ফসল ফলায়, জন্ম দেয় নতুন প্রজন্মের। জীবনচক্র পূর্ণতা পায় নারীর শুশ্রূষা আর প্রেমে। প্রথম সনেটেই আছে সেই বংশগতি রক্ষার শিল্পরূপ।
ক.
বেহালার ব্যথা এলো দোচালা ধানের ঘরে এসে
প্রজননের সংকেত রেখে গেলো দুইটা জোনাকি
খ.
অতঃপর বুক থেকে খুলে দাও খেজুর-কলস
সারারাত কৃষি হোক, কৃষির অঞ্জলি হোক আরো...
কিষাণীর জরায়ুতে আমি হবো ধানের জমজ। (৪৬)
কেবল কৃষিই না, মাছ ধরা বা তাঁত শিল্পের মতো বিশুদ্ধ জীবিকার প্রতি কবির নন্দিত বন্দনা লক্ষ্য করা যায়।
ক.
আমি মহিমল, আমি জলদাস, জলফসলের
দীপ্ত প্রজনন ছাড়া আর কোন উপাসনা নাই। (৪২)
খ.
ঠাণ্ডা দিনে পথে পথে রৌদ্রহীন তাঁত পড়ে আছে।
কুয়াশার কন্যা হয়ে তাঁতিদের বউ হয়ে এসো
প্রিয় অন্ধকার হয়ে ফুটে রবো পাটের পিনোনে। (৬৩)
কিন্তু কেবল বন্দনা করেই কি ক্ষান্ত হওয়া যায়? এসব বিশুদ্ধ জীবিকা এককালে এদেশের মানুষের জীবন যাপনের অংশবিশেষ ছিল, অর্থাৎ বাঙালির আবহমান সংস্কৃতি। লোকে পবিত্র ধর্মপালন জ্ঞানে কর্ম সম্পাদন করত। কালে কালে প্রযুক্তি এসে বেনিয়াদের প্রবাদ শিখিয়েছে, টাইম ইজ মানি। গতি বাড়াতে নৌকায় ইঞ্জিন লেগেছে, নদীতে ট্রলার চলছে, ব্যবহার হচ্ছে কারেন্ট-জাল। যত গতি, তত লাভ, তত শব্দ, তারও চেয়ে অধিক মাছ ও মাছের খাদ্যের ধ্বংস।
ধৃত মাছ, বলো দেখি
দাদন-দুঃখের দিনে কারা শোনে ধর্মের কাহিনি?
বালিয়াড়িতে বিধবা নারী পায়চারী করে, দেখে—
সমুদ্র দিগন্তে ভাসে এক দূর বিপন্ন ট্রলার,
জালে বাঁধা নিয়তির রাতে, নিকারির লাল চোখে
দেখে ফেলে সে—মৎস্য বহির্ভূত বণিক-জগৎ। (৪২)
কৃষিপ্রধান দেশ, অথচ আছে দাদনের শোষণ, আছে চিরকালের ঋণগ্রস্ত গণি মিয়া।
শোনো, একটি কবর
আরেকটি কবরকে জিজ্ঞাস করছে ম্লানমুখে—
ফসলের দানা দেখে এখনো কি কান্না করো তুমি?...
স্বপ্ন প্রলম্বিত হয়,
দেখে শালিধানে ভরে গেছে পিতার কবর, আর
পিতামহ মাপছে সে-ধান; কতটা রাজস্ব বাকি! (৩৮)
পেশাগত কারণেই হয়তো কবি জাকির বিশুদ্ধ জীবিকার ক্রমবিলুপ্তি এবং এর সঙ্গে দেশীয় আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত। তাই বন্দনার পাশাপাশি কবিতায় বেদনার্ত সুরও প্রবহমান থাকে পাশাপাশি। যেমন, পুরো গ্রন্থ জুড়ে নারীর দেবীরূপ চিত্রায়িত হলেও সোনার বাংলায় কন্যাফুল বখাটেদের হাতে আর নিরাপদ নয়, এ বিষয়ে তার সতর্ক বার্তা পাওয়া যায় ৬৫ নং সনেটে।
৩.
এই গ্রন্থের ছেষট্টিটি সনেটে বাঙালির নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সাথে সাথে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের গৌরবগাথাকে তুলে ধরে কবি জাকির তার পূর্বপুরুষের ঋণ স্বীকার করেছেন। কবি নগরের পথে চলতে গিয়ে অবচেতনে ইতিহাসের কালপুরুষ হয়ে ওঠেন। সিরাজ সিরাজ বলে তাকেই ডেকে ওঠে কেউ। যদিও পলাশীর ইতিহাস কবির শব্দে এখন পোকা-ধরা আমের মতোই। তবু সেই পোকায় ধরা ইতিহাসের পথ বেয়ে দলবেঁধে মীরজাফর মীরনেরা নেমে আসতে থাকে বারবার এই বাংলায়। (৩৪)
৪০ নং সনেটে ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের রক্তাক্ত অধ্যায় উন্মোচিত হয়েছে প্রীতিলতা-সূর্যসেন-ক্ষুদিরামের নামোচ্চারণে।
সূর্যসেন তীব্র হেঁটে যাক অনন্ত সূর্যের দিনে...
স্বপ্নের আগুনে লেখা নাম, ক্ষুদিরাম...
আজো দেশে দেশে
কিছু গাছ আজো নাকি বেড়ে ওঠে প্রীতিলতা হয়ে (৪০)
কৃতজ্ঞচিত্তে কবি স্মরণ করেছেন অখণ্ড ভারতবর্ষের দুই মহান নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং ফকির মজনু শাহের কথা। আছে হাজী মোহাম্মদ মহসিন, কাজী নজরুল, এসএম সুলতানের নাম। ৫৭ নং সনেটে আছে একুশে ফেব্রুয়ারি আর তার সঙ্গে অবধারিতভাবে জড়িত রফিক-বরকত-সালাম-জব্বারের নাম। বাংলাদেশ নামটির সঙ্গে যে গৌরবজনক অথচ নৃশংস ইতিহাস জড়িয়ে আছে সেই মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে অনুপস্থিত থাকতে পারে? 'কুয়াতে মানুষ ঘুমে'—মাত্র তিন শব্দে বধ্যভূমির নীরব ভয়াবহতা প্রকাশিত। ৫৮ নং সনেটে বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত ছয় দফা দাবির প্রসঙ্গটি উপস্থাপিত হয়েছে দারুণ ভঙ্গিমায়।
নিজস্ব মুদ্রার দেশে হরিণের ঘুম, কে ভাঙাবে?
দাবায়া রাখবে কোন ইবলিশ? ছয়টি তিরের ঘায়ে
হুড়মুড় ভেঙে গেলো দাজ্জালের অভেদ্য প্রাসাদ।
৬০ নং সনেটে মাত্র ১৪ পঙ্ক্তির মধ্যে যৌথভাবে প্রকাশিত হয়েছে যুদ্ধের ক্ষমাহীন নির্মমতা আর অশেষ গৌরবজনক নামসমূহ। সিতারা বেগম আর বিবি তারামন তারা হয়ে জ্বলে গাছে গাছে। কদমবনই তখন গেরিলার আশ্রয়। চাঁদ আর জ্যোৎস্না তখন ভিন্ন উপমায় কবিতায় উপস্থিত। কারণ চাঁদের আলো মুক্তিযোদ্ধার চলার গোপন পথকে উন্মুক্ত করে দেয় শত্রুর কাছে। তাই কবির কাছে চাঁদ এখন হানাদার, জ্যোৎস্না কাঁটার মতো পথের বাধা।
চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মুকুন্দরাম, বে
৪.
তবে কবিতায় ইতিহাসের হুবহু প্রতিফলন আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কবিতার রহস্যময়তাকে কিঞ্চিৎ দুর্বল করে তোলে কিনা কবি ভেবে দেখবেন। বিশেষত এই গ্রন্থের ষাটটি সনেটের মধ্যে অধিকাংশ কবিতা যে পৃথিবীর ছবি তুলে ধরে তা চর্যাগীতিকার চন্নিজল-দোচোয়ানি-সাংগ্রাইয়ের জগৎ, বাউলের মরমি সুরের ভুবন, কৃষকের মলন দেয়া ধানের সুবাস বয়ে যাওয়া অঞ্চলের গল্প।
৫২ নং সনেটে কবি ঘোষণা দেন—
একদিন এ পৃথিবী বাউলের হবে—জানো নাকি?
নিথুয়া চোখের জলে বাস করে লালন হাছন—
ষাটটি সনেটের এই সমধর্মী সুর-তাল-লয়ের মধ্যে আচম্বিতে প্রবেশ করে একগুচ্ছ মন্ময়ধর্মী সচেতন কবিতা। কবি আমাদের ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের গল্প বলেন, ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বজায় রেখে। হয়তো চর্যাগীতি থেকে যে জনপদের গল্পের প্রারম্ভ, তিনি সেই সোপান বেয়ে এগিয়ে যান।
কিন্তু ব্যক্তিগত উপলব্ধি থেকে মনে হয়, এই গ্রন্থটি একটি বিশেষ সময়চিহ্নকে ধারণ করে কেবল নির্দিষ্ট কবিতাগুলোই পাঠকের কাছে পৌঁছানো যেত হয়তো।
৫.
জাকির জাফরানের কবিতার জগতে অধিকাংশ শব্দ যেন সত্যি সত্যি জাফরানের সুবাস ছড়ায়। সেইসব শব্দেরা দূরগ্রহ থেকে আসে না, তিনি তাদের সংগ্রহ করেছেন হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ আর নদী-মাঠ থেকে। প্রেমিকা সেই জগতে ধান আর বৃষ্টির মতো। চোখ তার নীল সুপারির মতো, হৃদয় যেন জামদানির মতো অপরূপ শৈল্পিক। কচু আর লাউয়ের মতো তাদের প্রেম বাড়ে । তাদের আকাশে চাঁদ ওঠে ফর্শা ভাতের মতো। তার কবিতায় চন্নিজল, বিটিছানা, গাওয়াল, নিকারি
জাকিরের কবিতায় প্রকৃতি ও লোকজ উপাদানের প্রয়োগ, মিথের বহুল ব্যবহার দেখলে অবধারিতভাবে জীবনানন্দ দাশের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। কিন্তু পার্থক্যটা আসলে খুবই স্পষ্ট। জীবনানন্দ দাশের নির্মাণ-ভুবনের মূল গন্তব্য অ্যাবসার্ডিটি। এদিকে জাকিরের কবিতা আমাদের জাগিয়ে রাখে, উদ্যম আনে, সাহস জোগায়। নিজেদের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ আর ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে ও ধরে রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। বিতর্ক উঠতে পারে, এইসব জাতীয়তাবাদী পরিচয়, ঘটা করে বাঙালিয়ানা উদযাপন আজকের বিশ্বায়নের যুগে কতটা প্রয়োজনীয়। বিস্তারিত আলাপে না গিয়ে শুধু বলা ভালো, পৃথিবীর ইতিহাসে স্বজাতির নৃতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ছাড়া কোনো জাতিই আজ পর্যন্ত সগৌরবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে নি। সময়ের প্রয়োজনে বিশ্বমানব হয়ে উঠতে হবে বৈকি, কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বজাতির ইতিহাসটুকু সগর্বে তুলে দেয়ার জন্য জাকির জাফরানের মতো প্রতিনিধিরা সেই পাথেয় আমাদের কাছে সঞ্চিত রেখে যাচ্ছেন।
৬.
তার কবিতা পাঠ করতে করতে কোনো অবোধ পাঠকচিত্ত ভাবতেই পারেন কবিতা ঠিক ঠিক কখন কবিতা হয়ে ওঠে, আমাদের মতনই ডাল-ভাত খাওয়া মানুষ কিভাবে কোন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কবি হয়ে ওঠেন? কবিতাতেই আছে সেই আভাস—
অতঃপর, একদিন সত্যি সত্যি।
পথে পথে চর্যা কুড়াতে কুড়াতে দেখি সামনেই
কান্নার কৈলাশ। দেখি কবি হতে চলেছে বালক।
হাতে ফুল। হাতে অস্ত্র। সন্ত্রাস নীলিম স্তব্ধতায়। (০৩)
তারাশঙ্করের বিখ্যাত উপন্যাস 'কবি'তে পড়েছিলাম ডাকাত পরিবারে বড় হয়েও নিতাই কেমন করে কবি হয়ে ওঠে, তার আর সংসারে থেকে সংসার করা হয় নি। প্রকৃত কবি এক অনন্ত পরিব্রাজক পৃথিবীর পথে, তার কবিতা জুড়ে থাকে সাধারণ মানুষের জীবন-নিংড়ানো অভিজ্ঞতার গাথা। কিন্তু কবির দৃষ্টি থাকে জীবনের অন্তহীন রহস্যের দিকে।
জোয়ালের ক্ষতে জ্বলা
নিযুত নক্ষত্র দেখে দেখে আজ জেগে থাকে কারা!
আমি তো তাদেরই লোক। তাদের মাথায় দেব বলে
সোনালু ধানের শীষ ছিঁড়ে আজ বানাই মুকুট...
আমি দলিতের তল্পিবাহক (০২)
কবিতা কী তার চেয়ে জানা জরুরি আমাদের মতো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে দরকারি জিনিসপত্রের সাথে কবিতারও প্রয়োজন পড়ে কিনা। কবিতার ওপর চিরকালীন এক বদনাম আরোপিত আছে যে, কবিতা দুর্বোধ্য। আমরা রাজনীতি-ব্যবসা-চাকুরি-ক্রিকেট-
আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে গদ্যের যুক্তি আর স্পষ্টতার কাছে সৃষ্টিরহস্য, প্রকৃতির অতিপ্রাকৃত রূপ—সবকিছু যেন দুর্বোধ্য হেঁয়ালির মতো ঝাপসা হয়ে গেছে আমাদের কাছে।
লেখা শেষ করার আগে 'জ্যোৎস্নাসম্প্রদায়ে'র ৬০ নং সনেট থেকে কিয়দংশ—
মনে হয় আমিই ব্রহ্মাণ্ড,
এই ধানভানা নারী যেন খরস্রোতা মহাকাল।
যেদিকে শ্যামলা নারী ধান্য পায়ে নিত্য হেঁটে যায়,
ওগো সাঁই, প্রেমের মোকাম জানি সেই মথুরায়।
কবি জাকির জাফরান কবিতার ভেতর দিয়ে তার কাঙ্ক্ষিত মোকামে পৌঁছে যাবেন বলে আশা করা যায়।