নাসরীন জাহানের ৫টি কবিতা

জাদুমাছ-ভয়-রাত্রি

শব্দ পতন শব্দ গড়িয়ে পড়ে 
নগর গেলাম, পালাচ্ছি দূরে আমি,
আমিই না ঠিক মনটাই থরোথরে,
ভেবেই কী হবে জানে কী অন্তর্যামী?

ছায়াবালিকারা দিনরাত্রির ওমে
মন কখনও মায়া মননের ধারা,
রাত ঘুমহীন রূপকথা আধো ঘুমে,
নদীদেহ নিয়ে দ্যাখো না খেলছে কারা?

আগুন শরীর! চিৎকারে ফালিফালি
অসহ্য বোধ! দোদুল্যমান ঋতু,
মর্মবাণীরা অহেতুক লাগে খালি,
উল্লাস মদ! প্রকৃতি এখন ভীতু।

প্রগাঢ় আঁধার দারুণ ভয়ের রাতে
মৃদু তরঙ্গ জাদুমাছ ঘুম জাগে,
কেড়ে টেনে নেয় শব্দ জড়ানো হাতে,
আমার কেমন কুমির কুমির লাগে!

 

ভেসে যাচ্ছি

উড়তে উড়তে সরাইখানা।
বর্ষাতি বগলে নিঃসীম করে সেখানেই সুরভিসন্ধ্যা কামিনী রাত।
হেমন্তবৃষ্টিতে ভেসে ভেসে ভিজেছিলাম মনে পড়ে?

বলেছিলাম,পাখা বানানো হয়ে গেলে না সরাইখানা না নদী কোথাও ফিরব না।
একবার যা দেখা হয়ে গেছে, কী থাকে দেখার?
পৃথিবীর কত নক্ষত্রের নখও দেখি নি যেখানে। 

ফটিকজল পাখির মতো, 
না না হোমা পাখির মতো যাওয়ার আগে শূন্যে ডিম পেড়ে যাব,
তুমি লুফে নিলে মা হবে হে জরায়ুহীনতা,
যাও মাঝরাতের বরফ পাহাড়ের নিচে চলে যাও,

নয় সেই দুপুর কুসুম ছড়িয়ে পড়ুক মৃত্তিকায়,
তাতে জমির আয়ু বাড়ে।

আমি কিন্তু ভেসে ভেসে উড়ে যাচ্ছি
একটু করে, 
আমাদের আকাশ সরোবরে।

 

রক্তফল থেকে যে জন্ম

আকাশ মুছে গেলে রক্তফল জন্মায়,
অশরীরী ওহি বলে এই তো এলাম।

এইসব কল্পনা শুনে চতুরের চক্ষু এড়ায় নি। 

জমতে থাকে আত্মার
মধ্যে মৃত্যুর জবাকুসুম,

টেট্রন আর কেরোলিন কাপড়ে
শৈশব রঙিন,
যত হয় মনে হয়,
জবুথবু মা আর গম্ভীর বাবার মাঝখান দিয়ে কিভাবে এলাম?

কল্পনাকে আফিমের নামে সুন্দরকে শয়তানের নামে ভুল করতে থাকি।

আম্মার চোখের জল প্রভাতের দরজায় উড়িয়ে দিতে চেয়েছি,
পারি নি।
আকাশের আজানে কত থোকা থোকা ফুল, 
পুর্ণিমার প্লাবনে কত
সুদূর পথিকের চলাচল।

যেন সমুদ্র রিমঝিম পায়ে এগিয়ে,
যেন প্রেতযোনি আর ফেরেশতাও আসতে থাকে
বরফের আঁচল উড়িয়ে, আদতে কেবল 
ভ্রমফুল জন্মাতে থাকে। 

ভাগ্যিস, মন উঠে গেছে।
ভাগ্যিস রৌদ্রফুল ফুটেছিল তারপরেই,
জানালার কার্নিশে এসে,
আম্মা বলত, জানস ওহি কিন্তু তোদের বলে, 
সেলাম সেলাম।

ভাগ্যিস ফাল্গুনী রাতে 
পাথর পাহাড়ের ছায়া এসে সাথী হয়ে হাত ধরেছিল।

সেদিন হয়তো জেনেছি,
ভুল আর সত্য
বিপরীত কিছু নয়,

ক্লান্ত হয়ে গেছি। 
তাই বাতাস মুছে দিই,
তার গায়ে আঁকতে থাকি, আ্যাক্রিলিক,

ক্রমশ জেনে যেতে থাকি, একটা পাহাড় মুছে গেলে
জেগে ওঠে নতুন প্রহর।

 

মূলত একা

চলে যাব আমি যেদিকে দু'চোখ যায়
তুমিই বলো না, আসলে কি চোখ পারে?
বিষাদঘোরের আলপিনে নিরালায় 
জ্বলুন-পুড়নে চাঁদ থাকে একাকারে।

প্রতিদিন উড়ি মেঘও পাহাড় ফেলে
হুহু করা মন হাহাকার মনলোকে।
চলে যাব ঠিক একবার তুমি এলে
শিশির হৃদয় বিষণ্ণ সীতা-শোকে।

শূন্য কাটল একাকিনী পিপাসায়
সারাটা জীবন উজাড় ফতুর কোণে,
তারা ঝরে যায় স্বপ্ন অপেক্ষায় 
মন কাঁদে রোজ বাতাসের সেলফোনে।

সয়ে গেছি আমি তুমি হারানোর ঢেউ।
সহিষ্ণুতার অপমান বোধ আছে,
পড়ে আছি খড়, আমি নেই, নেই কেউ
ছায়াকায়াহীন ফসিল বটের কাছে।

 

রৌদ্রকে বানাও মলিন

তুমি সেই,
যে হাতে বাঁশি তুলে 
অন্যকে বাজাও,

তুমি সেই,
যে পরশুর কথা বলে
খুন করো আজকের দিন, 
স্বপ্নের স্বপ্ন দেখিয়ে
রৌদ্রকে টানাও মলিন।

এইদিকে রাত্রি নীলাভ,
তুমি বলো, কই যাব?
কোন পথে গেলে আমার লাভ?

তারার চাটাই বিছিয়ে 
ঢেকে দাও চাঁদের রহস্য,
পুর্ণিমায় দেখা হবে,
এমন প্রলোভনে কেবলই বলে যাও, আজকেই অবশ্য। 

হুঁশ করে উড়াও তুমি অন্ধকার ঝাড়ের বক,
আর সন্তর্পণে সরে গিয়ে  
সামনে বিছিয়ে দাও কাঁটার জমক।

দূরবর্তী দৃশ্যকে দূর থেকে আরো দূরে নাও,
যত ছুঁতে চাই আমি,
ততই কাছবর্তী থেকে দূরবর্তী নিজেকে বানাও, 

যতই আপত্তি থাকুক, যত ক্ষোভ যতই অমত,
বেহেশতি রশ্মির মধ্যে 
আমার প্রদর্শনে উড়াতে থাকো কামনার মদ,

তুমি সেই, যে নিজেকে বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর সুন্দর সমাধি সাজাও,
তুমি সেই, যে বাঁশি হাতে
অন্যকে বাজাও।

রোদের রেলিং উড়িয়ে দিয়ে
ব্যালকনি কাছে টেনে আনো,

তুমি তো সেই মানুষ, 
যে নিজের ক্ষতে ঘা দিয়ে 
অন্যকে ঘা দিতে জানো।

নাসরীন জাহান

নাসরীন জাহান

।জন্ম ১৯৬৪; হালুয়াঘাট, ময়মনসিংহ।  সাহিত্য সম্পাদক, অন্যদিন। লেখালেখিই...বিস্তারিত