শাফিনূর শাফিনের এই কবিতাগুলো পড়লে কিছু স্তব্ধ বিস্ময়চিহ্নের ভাষ্য মনে আসে। মনে হয় সেই বিশ্রুত ক্ষতের কথা যা ব্যথাহীন। কিছু কবিতার দিকে তাকালে আঙ্গিক ও বিষয়গত বিবেচনায় এপিগ্রাম কবিতার গড়ন উঠে আসে। এবং হ্যাঁ, মনোগত চরিত্রেও তারা কিছুটা সংক্ষিপ্ত, আকর্ষণীয়, স্মরণীয় এবং কখনোবা তির্যক। কিন্তু কবিতার যে নতুন নন্দনতত্ত্ব এখানে পরিলক্ষিত, তাতে ফেনোটাইপ তার এক বিশেষ প্রকাশপথ খুঁজে নিতে চায়, কেননা এখানে পরিস্থিতির সন্ধিক্ষণ রূপান্তরের আবেশকে তুলে ধরার ধরতাই খোঁজে। কবিতা এখানে রচনা করে ব্যক্তিক উপলব্ধির স্লাইড শো, যা বিচ্ছিন্ন হয়েও ক্রমপর্যায়ী।
ভালো কবিতা যখন লেখা হয় তখন চারিদিকে প্রতিভাত হয়ে ওঠে সত্তা এবং অসংখ্য ছায়ার পৃথিবী। স্পর্শকাতর পৃথিবী হারিয়ে যায়, সেখানে থাকে না কোনো দৃঢ় ভূমি, জলভূগোল; না থাকে কোনো স্পর্শাতীত মূর্ততা। ভয়ংকর আনন্দও হয় উধাও। সংরাগ, অধরা সত্তার জন্য ভালোবাসা―সে যেই হোক না কেন তার জন্য যে আকাঙ্ক্ষা, তারও খামতি। প্রকৃতির সাথে অস্পষ্ট ভ্রাতৃত্বসুলভ অনুভূতি: বৃক্ষ, মেঘ, পাথর, সব অপস্রিয়মাণ, এক ক্ষণস্থায়ী শূন্যতায় সব মুলতবি হয়ে আছে। আর কিছু যেন হারিয়েও যাচ্ছে। কোথায়? হয়তো অনুস্মরণে, হয়তোবা পরিবর্তনশীল প্রতিক্রিয়ায়। বস্তুর অবাস্তবতা, আমাদের নিজস্ব অবাস্তবতার এক প্রতিফলন। এখানে রয়েছে প্রত্যাখ্যান, নিঃশেষিত হওয়া, শোকাহত হওয়া। এসবকে নিয়ে অপ্রচল অনুদ্বিগ্ন সন্ত্রাসের উঁকিঝুঁকি।
তাঁর কবিতার স্বর এক নিরুদ্বেগ নিস্পৃহতায় মনোনিবেশ করতে চায়, চায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতেও, কিন্তু তা অবশেষে বিপজ্জনক হয় না, আশ্রয় নেয় শীতল নিরাসক্তিতে। কিন্তু এই নিরাসক্তিও কোনো উদ্ভাবনপটুত্বকে উসকে দেয় না। ফলে কবিতার স্বাভাবিক প্রাকৃতায়নে অযথার্থতা আর থাকে না। কবিতার আবেগ কী ধরনের জায়গা নেয়? বস্তু আর ভাষার মধ্যে যে শূন্যতা, সেখানেই কি তার প্রকৃত স্থান! কবিতার সুপার রিয়ালিটি কি বাস্তব, অবাস্তব, ধ্যান ও ক্রিয়ার মিলেমিশে থাকা! এইসব অলৌকিক স্বীকারোক্তির বাইরে এসে এই কবি যা বলতে চেয়েছেন তা হলো এক পার্থিবের বেদনা, আর যা আঁকতে চেয়েছেন তা হলো কোনো অপার্থিবের রং। শেষ ভোজে জিশু যেমন বলেন, ‘আমার রক্তই প্রকৃত পানীয়’, তেমনি এই কবিও বলতে পারেন, ‘আমার কবিতাই আমার প্রকৃত স্নায়ুর গান’।