চেতনা, যেখানে ছায়া পড়ে, বিম্বিত হয়, বা ধরা দেয় সময়, তার বহির্দেশ যেমন দেখতে পাই, অন্তর্দেশও আছে সুনিশ্চিত জানি। সেই অন্তর্দেশে ভাবুক বোঝাপড়া করে চলেন নানা রকমের। দ্বান্দ্বিক বা এমন নানা প্রক্রিয়া বা কাণ্ড ভাবুকের অন্তর্দেশে নিরন্তর কাজ করে চলে। সবার বেলায়ই একরকম করে এমন নয়। কারো কারো বেলায় করে থাকে, এবং তারা অন্তর্দেশে চলমান সেই কাণ্ডগুলো থেকে কী রস নিংড়ে নেন তার ওপর তার ওপর ভর করে শিল্প বা চিন্তার অভিব্যক্তি গড়ে ওঠে, এমনটাই আমি বুঝি। শামশাম তাজিলের বেলায় এই কাণ্ডের ছাপ পরিষ্কারভাবেই দেখা গেল তার আদম পাহাড়ের পাণ্ডুলিপিতে। শুকিয়ে যাওয়া নদী বা আত্মার নানা সংকটের সাথে বোঝাপড়া করে পড়ন্ত আধুনিকতার পাপ ক্ষয় ইত্যাদিকে মেনে নিয়েই শামশাম আধ্যাত্মিকতার ছায়া ও ছোঁয়া চান। যে পথে চান তা বাংলার চিরায়ত বিমিশ্র সুরের—যা পুরাণ-কুরান-বাউলের ধারার। তবে গোপন কথার দিকে যেতে গিয়ে কথা যে বলা যায় না, এই সময়ে তাও তিনি ভুলতে পারেন না। কেননা, সময়কে তো সমঝেই চলতে হয়। চোখে দেখা কামসম্ভব প্রপঞ্চে তিনি মূক-ধ্যান, বস্তুখণ্ডের মাঝে জগতের ছায়া খুঁজে পাওয়া তথা প্রেমের নানা আনাগোনা বুঝিয়ে দেন আমাদের। কিন্তু যা ঘটে এইসব বোঝাপড়ায়, তার ছাপ শামশাম তাজিলের কাব্য-অভিব্যক্তির শরীরে আমরা বেশ টসটসে হয়ে ফুটতে দেখি। ভাষাকে যেই অন্তরপ্রবাহ গড়ে দেয়, তার রেখাবিন্যাস দেখবেন আপনারা এই কবির ছন্দে মতি হওয়া—আবার কথ্যে ঢলে যাওয়াতে। আমি যাকে ঢলে যাওয়া বললাম, তাকে কেউ যদি একটু পরোয়া না করে চলা বলে ফেলেন, তাতে শামশাম হয়তো অখুশি হবেন না। স্বপ্নেও যদি দূরত্ব পার না হওয়া যায়, এমন সংকটের ভাষ্য গড়তে একটু শিলাময় ভাষা, কিঞ্চিৎ অনিয়ত অমসৃণ ত্বকের ভাষারই তো দরকার হয় প্রায়ই। পাঠকও অখুশি হবেন না এতে, বুঝতে পারি। পাঠক প্রায়ই সময়কে চান। কিন্তু, প্রত্যর্পিত প্রেমে সয়লাব যখন বাজার, তেমন কালপরিধির গ্রাসে হারান নি তো শামশাম—তিনি কিন্তু বাজারে নেই, প্রেমে আছেন। তিনি বুঝে নিয়েছেন ও বুঝিয়ে দিয়েছেন নিদ্রা থেকে মৃত্যুকে, আমি বলি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বকে—আলাদা করে সেই মুহূর্ত ভূর্জপত্রে আমরা যখন নিজেদের গড়ে নিই। এই তো প্রত্যয়।
আদম পাহাড় পাণ্ডুলিপি থেকে
শামশাম তাজিল
দূরত্ব
ব্যস্ততার ভেতর কেটে যাচ্ছে সময়,
কিন্তু গন্তব্য বহুদূর।
—তাই স্বপ্নের ভেতর দৌড়াতে শিখছি।
এই কথা মাকে বলতেই মা বললেন,
‘রাতের যে-পাশ ফিরে ঘুমোস, সেই পাশ ফিরেই জাগিস।’
স্বপ্নেও কি তবে কোনো দূরত্ব হই না পার?
বিপরীত কামশাস্ত্র
ভরাপেটে মিলন হানিকর।
—বলেছেন বাৎস্যায়ন।
একথা শুনে কলিমুদ্দিন কয়:
আমাগো ঘরে ভাত নাই,
তাই
বউরে ঠাপাই।
হাড়জিরজিরে বউ আমার
একান্ত আহার।
স্নান
বৃষ্টি থেমে গেছে। সিগারেটে পুড়েছে সন্ত্রাস।
কেবল একবার তাকালে—স্নানের ঘরে নগ্ন দু’টি চোখ।
বাসি খোঁপায় ঘুমোয় সংসারি চড়ুই
যেই মাত্র শরীর থেকে খুলে দিলে লাজ—চড়ুইছানার স্বরতন্ত্রী ছিঁড়ে—সেও নির্মোক।
শঙ্খ
বুকের ভেতর শঙ্খ বাজে
রাত্রি ঘনায় চোখের কোণে
বৈতরণি মাঝির আড়াল
পলক ভোলে নারীর লাজে
দৃষ্টি গাঁথা চোখের আড়ে
বিধুরতা ছড়ায় খেয়াল
কুজ্ঝটিকার অলীক বেণী
তুলছে ফণা রঙবাহারে
শাখের ডংকা যত্রতত্র
লক্ষ্মী পাওয়া এতই সহজ?
নিদ্রা থেকে এ মৃত্যুকে
আলগা করে ভূর্জপত্র
সরস্বতী মন্ত্র দিলো
কুলায় ফেরে মুগ্ধ গরুড়
বিষ্ণু বাজায় সারেগামা
স্মৃতির সঙ্গে অন্তমিলও
শঙ্খে বাজে বজ্রনিনাদ
শব্দ হলে গর্ভবতী
ক্রৌঞ্চী কাঁদে ব্যাধের শরে
সরস্বতী বাড়ায় দু’হাত
যেই বেদনা তাহার বুকে
অনপনেয় দাগ ফেলেছে
কবির মর্মে ঐ শরাঘাত
কাব্য দিলো বল্মিকে
দুর্ঘটনাপ্রবণ কবিতার উৎস
হাত তো গুনবে গুনিন।—আসলে গুনার নামে ছুঁয়ে দেখে স্বপ্ন।
আমি হাত গুনি না, গুনি পায়ের পাতা।
মেধাবী পায়ের মসৃণতায় ছবি আঁকে সলাজ কবিতা।
ফিতে ছিঁড়ে গেলে তোমার হাতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলে অলৌকিক জুতো।
ইচ্ছে হলো খুলে ফেলি আমার জুতো মুজো
নিজেকেই গলিয়ে দেই তোমার পায়ে।
ভগবান অনেক পেয়েছেন, এবার পায়ের পূজো হোক।
—এই কথা কাউকে বলি নি, তবু জেনেছো শিক্ষিত চোখে।
মাঝে মাঝে জুতো জোড়া ছিঁড়ে যাওয়া ভালো।
জুতোর সনির্বন্ধ আলিঙ্গনে পায়ের পাতার চুমো পৌঁছায় না চোখে।
তোমার পা দেখার অবসর তো পেলাম।
ভালো তো কবেই বেসেছি, আজ থেকে পায়ের গোলাম।
আদম পাহাড়
আদম হাওয়ার কাছে ফেরত চেয়েছিল বুকের হারানো পাঁজর
হাওয়া দিয়েছে গোপন বিদ্যা শিকারের: ছুড়েছে পাথর
সেই থেকে পাথর চুম্বন, হাজরে-আসওয়াদ স্মৃতি হয়ে আছে তার
এখনো পুরুষের বুকে ব্যথা হয়ে বাজে আদম পাহাড়
মানুষের পাপের ভারে পাথরে জ্বলে ওঠে অগ্নি, বুকে তার রৌরব
সে স্বয়ং আগলে রাখে নরকের দ্বার—
আদমের বুকে ব্যথা হয়, হাওয়ার বক্ষে কাঁদে আদম পাহাড়