পরিধি তবুও গোলাকার

জীবনানন্দ দাশের একটি অপ্রকাশিত কবিতা ও কবিতার ভাষ্য


আমি এই পরিপূর্ণ পৃথিবীর ইশারায় নেমে ঢের দিন . 
দেখেছি আকাশে সূর্য কী ক’রে মাঠের মাঝে একটি বৃক্ষকে .   
ছায়ার শরীরে কালো অকৃত্রিম ক’রে বুনে যায় .     
ধূসর মাটির ’পরে কয়েকটি সাদা ছাগলের .       
শরীরের ’পরে সব রোমশ পাখির মতো পাতার ছায়ারা .   
খেলে যায়। কারা সব? অথবা দেখেছি সূর্য আকাশের প্রান্তে কোথাও .           
নিজেকে লুকায়ে রেখে অসময়ে প্রতিভাত হলে .             
সহসা জলের মুখে বিকেলের নদীর ভিতরে। .               
তারপর ধরা প’ড়ে গিয়েছিল
যদি একে ভুল বলে বিশীর্ণ বিশেষ ভুলে তত্ত্ববিদ .                     
তবুও কবির মন সর্বদাই এই দ্রুত উপচীয়মান নিসর্গের অন্তরঙ্গ জিনিসের মতো .                         
সে-সব কালের সেই দিগুলো এ-সব বিস্ময়ে .                           
অভিভূত হয়ে যেত—তবুও হৃদয়ে সেই মেধা .                           
নেই আর। অতীব সুসাময়িক বিজ্ঞানের হাত .                     
সংশোধন ক’রে গেছে খানিকটা—মনে হয়—তবু পুনরায় .                         
প্রান্তরের পথে হেঁটে ধূসর মাটির ’পরে নুয়ে থেকে ভাবি .                             
হয়তো হৃদয় শঠ—যদিও বিজ্ঞান অকপট .                               
অথবা কপট নয়—যদিও নিসর্গ সত্য সাদা সাধারণ .                             
মানুষের জ্ঞান থেকে উদ্বর্তিত হয়ে চির-কাল .                           
নিজের নিয়মে হেসে—খেলে—জ্ব’লে—টিটকারি দিয়ে .                           
আমাকে সে বানায়েছে নদীর মতন এক—নদীদের কাছে .                                         
 নদীকে সে বানায়েছে ভোরবেলা পূর্ত বিভাগের .           
অথবা বিকেলবেলা আউটরাম ঘাটে—ডাক’এ—ছেনালের চোখে .                           
অথবা গভীর রাতে হাওড়া’র পোলে এক ক্লিষ্ট সন্তানের .                             
বিরক্ত আত্মার কাছে কতগুলো জলাকার গন্ধের মতন .                             
কতগুলো থুপ নিয়ে—নাম নিয়ে—এক-একটি নদী .                         
পৃথিবীর আমাজন—মিসিসিপি—পদ্মা—কর্ণফুলি .                                 
টাইবার—টেমস—লিফি—মিসৌরি—হোয়াংহো .                             
কতগুলো থুপি, নাম, রক্ত, শুঁড়, জলের ভীষণ সমবায় .                                 
এবং এমন আরও ঢের কিছু। তবুও সে-সব জলগুলো .                             
কাঠের পিপায় ক’রে সমাহৃত হতে পারে পৃথিবীর পথে .                                             
প্লাম্বার’এর নলে গিয়ে—অথবা পাইপ’এ .                                               
ফায়ারব্রিগেড’দের—মানুষের উদরের অন্ধকারে .                                                 
তবুও সে-সব সাদা, স্বাদহীন পিচ্ছিলতা ছাড়া .                                                     
কিছু নয়। সর্বদাই প্রবেশের পথ রয়ে গেছে .                                                       
কোটি-কোটি নলের ভিতরে গিয়ে .                                                   
অথবা প্রবেশ ক’রে পুনরায় বাহির হবার .                                       
কোটি-কোটি নলের ভিতর থেকে অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতায় .                     
যখন সবের চেয়ে বেশি প্রয়োজন আসে আমার গেলাসে .                           
অথবা স্টেশনে কিছু সাময়িক ঈষৎ মলিন .               
স্যানিটারি বাথরুম’এ; হিস—হিস—নির্ঝরের মতো শব্দ হয় .                               
কেউ তাহা শোনে না ক। আমি শুনি। আমার হৃদয়ে .                                   
কয়েকটি সহোদর অন্ধকারে মুখ ঢেকে বলে: .                                     
আমাদের কাছে জল—নদী—এ-রকম। .                                   
ঝুর-ঝুর শব্দ হয় বায়ুলোকে নির্ঝরের মতো .                                         
পৃথিবীর জড়বাদী দার্শনিক অজর বিজ্ঞান .                                         
কোথায় বাতাস, অগ্নি, সলিলকে কলের ভিতরে .         
রেখে দেবে? যদিও শঠতা নেই কারু—কেউ অনৃত নয়। .           
তবুও নদীই শঠ—পেঁচা’র মতন কুয়াশায় .               
কখনও পিছল পাখা নীরবে বহন করে ইঁদুর’এর তরে .                 
কখনও-বা বালকের গাল খায় অন্ধকারে ব’সে .                     
কখনও জৈমিনি তার কথা ভেবে তর্কের পরিধি .                       
রাধাকৃষ্ণণ’এর হাতে তুলে দেয়—পরিধি তবুও .                     
গোলাকার—কী নিয়মে তবুও কুঞ্চিত হয়ে ওঠে .                 
সারমেয়দের লেজ সহজেই—আমাদেরও গাঢ় অনুভব?  

বিকল্প : ১. এক দিন;  ২. শব্দের/শুঁড়ের;  ৩. জাম্বেলি;  ৪. চিল/ধোঁয়া/রিশ

 

খ্রিস্টাব্দ ১৯৪০ সেপ্টেম্বর

 

সৌজন্য: অমিতানন্দ দাশ প্রিয়ব্রত দেব, প্রতিক্ষণ

জীবাননন্দ দাশের পাঁচটি নতুন কবিতা পড়বার সুযোগ করে দিলেন কবি ফরিদ কবির ও কবি সাখাওয়াত টিপু। কবিতাগুলো কলকাতার ‘প্রতিক্ষণ’-এর অমিতানন্দ দাশ ও প্রিয়ব্রত দেবের সৌজন্যে পাওয়া। আমি একটি কবিতার ওপর লিখতে আদিষ্ট হয়েছি। নতুন কবিতা পড়তে পারার প্রথম ধাক্কায় যে অনির্বচনীয় অভিজ্ঞতার মোকাবেলা করতে বাধ্য হয়েছি, সেটা হচ্ছে কবিসুলভ অনুভূতি। কিন্তু কবিতা নিয়ে লেখা আর পাঠের অনুভূতি নিয়ে লেখার মধ্যে একটা বড় ধরনের ফারাক আছে। কবিতা নিয়ে আলোচনা আদৌ সম্ভব কিনা সে তর্ক অনেক দিনের। তবুও কবিতার আলোচনা-সমালোচনার দরকার থেকে যায় কারণ ওর মধ্য দিয়েই কবিতার সঙ্গে কবিতাসংক্রান্ত ধারণার ভেদ ও বিবেচনা বিশদ করা সম্ভব। সেটা আলাদা বিষয়। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে কবিতা পাঠের স্বাদকে গদ্যে হাজির বা ব্যাখ্যা করা যায় কিনা। বলে রাখি, সে বিষয়ে আমার ঘোর সন্দেহ আছে। এমনকি একজন কবির পক্ষেও সেটা সম্ভব কিনা সেটাও প্রশ্ন। নিজের কথা যদি বলি তাহলে আমার সেই ‘আমি’র কথা বলছি যে কিনা মাঝে মধ্যে কবিতা লিখতে চেষ্টা করে। এমনকি দুঃসাহসী হয়ে লিখেও ফেলে। কবিতার জন্য সেটা আপদ হয়ে উঠল কিনা সেই বিবেচনা মনে না রেখেই কবিতা হয়তো নিজেই আমাদের দিয়ে কবিতা লিখিয়ে নেয়। এই অনুমান মাথায় রেখে জীবনানন্দ দাশের অপ্রকাশিত কবিতা সবগুলোই পড়বার চেষ্টা করলাম, কিন্তু একটি কবিতা নিয়ে কী লিখব বা কিভাবে লিখব সেই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছি। সততার সঙ্গে আগেই ব্যর্থতা স্বীকার করে নেওয়া ভালো।

ভাবতে চাইলাম কেন এই মুশকিল। মনে হলো, কবিতাটি নিয়ে কিছু লিখতে হবে এই ধরনের একটি নির্দেশ মাথার ওপর তলোয়ারের মতো ঝুলে আছে বলেই কি এই বিপদে পড়েছি আমি? নতুন একটি কবিতা পাঠের কোনো না কোনো অভিজ্ঞতা তো যে কোনো পাঠকের মধ্যেই ঘটতে পারে, পাঠক নিজে কবিতা লিখতে চেষ্টা করেন কি করেন না, তার সঙ্গে তো কোনো সম্পর্ক নাই। কেউ শুধুই একজন পাঠক হতে পারেন তাতেও কিছু আসে যায় না। কিন্তু এটাও ঠিক পাঠের পদ্ধতি ও দেশকালপাত্রভেদে কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতাও ভিন্ন ভিন্ন হতে বাধ্য। কোনো একটি কবিতা নিয়ে লেখালিখি আলোচনা সমালোচনা কঠিন ব্যাপার। ভাষার যে ব্যবহার নিজের গুণে গদ্যে বা পদ্যে কবিতা হয়ে উঠেছে সেই ভাষা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা আদৌ সম্ভব কিনা এই তর্ক বহু পুরানা। সেটা হয়ে উঠতে পারে পাঠকের আগ্রহ, উৎসাহ বা আতিশয্যের ওপর ভর করে বড়জোর একটি কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা, পাঠকের আনন্দ, বিস্ময়, চমক, রুচি বা অরুচি বা নানান কিসিমের পছন্দ ও অপছন্দের মিশেল থাকতে পারে সেখানে।


ভাষার অভ্যন্তরে কবিতা ও গদ্যের একটা লড়াই জারি থাকে। এটা কবিতার সঙ্গে বাইরের কোনো গদ্যের লড়াই নয়, কবিতার নিজেরই ভেতরকার লড়াই, যার মধ্য দিয়ে ভাষা কবিতা হয়ে ওঠে।


ভাষার ব্যবহার যখন নিজগুণে কবিতা হয়ে ওঠে, গদ্য বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি তার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন সেই ভাষা সম্পর্কে গদ্যে আলোচনা কঠিন কেন? কারণ যাকে আমরা ‘গদ্য’ বলে কবিতা থেকে আলাদা করে চিহ্নিত করে থাকি তার সঙ্গে কবিতা বাহ্যিক কোনো সম্পর্কে যুক্ত বা চিহ্নিত হতে চায় না। তার মানে এই নয় যে গদ্যে কবিতা রচনা করা যায় না। অবশ্যই যায়। কিন্তু ভাষার যে ব্যবহারকে আমরা গদ্য বলি, আর কবিতা থেকে আলাদা করি, সেই গদ্যের সঙ্গে কবিতার নিজের একটা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। সেই ‘গদ্য’-কে কবিতা নিজের ভেতর থেকেই সারাক্ষণ মোকাবেলা করে, প্রতিরোধ করে, প্রশ্ন করে এবং উভয়ের ভেদরেখার সীমা ও সম্ভাবনাকে ক্রমাগত এলোমেলো করে দেয়। খেয়াল করতে হবে আমরা এখানে গদ্য বা পদ্যের বাহ্যিক ভেদ নিয়ে মোটেও কথা বলছি না। যেমন কবিতায় ছন্দ থাকে, ধ্বনিগুণ থাকে, উপমা, অলঙ্কার ইত্যাদি থাকে। এসব তো আমরা জানি। কিন্তু কবিতা তো গদ্যেও লেখা হয়, তখন সেটা কবিতা হয়ে উঠল কিভাবে? তার বিষয়ের কারণে? উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ইঙ্গিত বা ইশারার জন্য? গদ্যকেও তো আমরা ছন্দে বাঁধতে পারি। তখন কি তাকে কবিতা বলা যাবে? অর্থাৎ গদ্য ও কবিতা সম্পর্কে আমাদের যে সকল প্রথাগত অনুমান সেই সকল বাহ্যিক বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা বলছি না। ভাষা মাত্রই কবিতা হয়ে উঠতে পারে, যখন সেই ঘটনাটি ঘটে তখন সেই ভাষার অভ্যন্তরে কবিতা ও গদ্যের একটা লড়াই জারি থাকে। এটা কবিতার সঙ্গে বাইরের কোনো গদ্যের লড়াই নয়, কবিতার নিজেরই ভেতরকার লড়াই, যার মধ্য দিয়ে ভাষা কবিতা হয়ে ওঠে।

একালের ভাষার দর্শন দাবি করে যে ভাষা মাত্রই কবিতা, কারণ ভাষা কখনই উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক ইত্যাদি ছাড়া ভাষা হয়ে উঠতে পারে না। কবিতা ব্যাপারটা আসলে কি তাকে নিছকই কবিতার গঠনপ্রণালি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, এই প্রশ্নটা সামনে চলে এসেছে অনেক আগেই। ফরাসি দার্শনিক জাক দেরিদার বরাতে কথা বললে ভাষা মাত্রই কবিতা এই দাবিটা জোরের সঙ্গেই করা যায়। ভাষার অর্থোৎপাদনের সম্ভাবনা যে সব সময় অসীম ও বিচিত্র সেটা আমরা ইতোমধ্যেই শিখেছি। এটাও শিখেছি ভাষা থেকে যে অর্থ আমরা করি তা যে আগে থাকতেই ভাষার মধ্যে নিহিত থাকে এই অনুমান ঠিক নয়। ভাষায় যে অর্থ  নাই বা যা অনুপস্থিত, আমরা তাকেই সন্ধান করি। দেরিদাকে সাক্ষী মানলে কবিতার সঙ্গে সাধারণ ভাষার ফারাক টানা মুশকিল। ভাষার উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক, ইঙ্গিত, ইশারা, অলঙ্কার ইত্যাদিকে ব্যবহার করেই কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে। এযাবৎকাল কবিতাকে যেভাবে আমরা বিচার করে এসেছি এই দাবি আমাদের সেই সকল প্রথাগত বিচারে ঘোরতর গোল পাকিয়েছে বটে, কিন্তু কবিতা ও গদ্যের সম্পর্ক আরো নিবিষ্টভাবে বোঝার ক্ষেত্রে সেটা এখানে আমাদের বিশেষ কাজে লাগে না। যে দিকটার দিকে আমরা ইঙ্গিত দিচ্ছি সেটা অন্য বিষয়। ভাষার অর্থ বিচার থেকে ব্যাপারটা আলাদা। দেরিদাকে আমরা মনে রাখব, কিন্তু কবিতাকে বুঝবার জন্য অন্যদিক থেকে এগিয়ে যেতে চাইছি।

যা ভাষায় আগে ধরা পড়ে নি, কবিতায় সে অধরা ধরা পড়ে, জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগারের বরাতে এইটুকু আমরা জানি। কিন্তু আমরা সেদিকেও এখানে যাচ্ছি না। আমরা দাবি করছি কবিতার বাইরে দাঁড়িয়ে অন্য কোনো মানদণ্ড হাতে নিয়ে কবিতা থেকে আলাদা কোনো গদ্যে কবিতার মাপজোক করা যায় না। কবিতা তার নিজের ভেতরেই নিজেরই একটা গদ্য তৈয়ার করে, যে গদ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক অভ্যন্তরীণ, বাহ্যিক নয়। নিজের চলনের মধ্য দিয়েই কবিতা সে গদ্য থেকে নিজেকে পৃথক করতে করতে অগ্রসর হয়। কবিতার বাইরে এসে ভিন্ন গদ্যে এমন কোনো মানদণ্ড তৈরি করা যায় না যা দিয়ে আমরা কবিতার অভ্যন্তরে কবিতা ও গদ্যের আলাদা হয়ে যাওয়াকে ধরতে পারি, বিচার করতে পারি বা বিশ্লেষণ করতে পারি। কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এই বিভাজন প্রক্রিয়ার কায়কারবারটা আমরা কাব্যরসিক হলে বুঝতে পারি।


ইতিহাসের বহু পথ পাড়ি দিয়ে কোথায় এসে আমরা সামাজিক-ঐতিহাসিক মানুষ দাঁড়ালাম সেই জায়গাটুকু বুঝে নেবার দরকারে কবিতার বিচার বা পর্যালোচনা।


জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে গেলে আমার সবসময়ই এই কথাগুলো মনে হয়। এর কারণ সম্ভবত ছন্দ নিয়ে তিনি বিশেষ কোনো নৈপুণ্য দেখানোর চেষ্টা করেন নি, তাঁর শিথিল অক্ষরবৃত্ত থেমে থেমে চলে, যেন কবিতার মধ্যেই দৃশ্যমানভাবে গদ্যের সঙ্গেই তাকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে, এবং দেখাতে হচ্ছে কবিতা কিভাবে গদ্য থেকে আলাদা, অথচ একই সঙ্গে এই গদ্য কবিতারই অভ্যন্তরীণ কারবার, বাইরের কিছু নয়। জীবনানন্দের অপ্রকাশিত নতুন কবিতা পড়তে গিয়েও একই ভাব মনে এল। কিন্তু আগেই বলেছি কবিতার বাইরে দাঁড়িয়ে কবিতা ও গদ্যের এই আলাদা হয়ে যাবার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা মুশকিল। তার মানে কি আমরা কবিতা নিয়ে কোনো আলোচনাই করব না? নিশ্চয়ই করব। কবিতার গঠনপ্রণালি নিয়ে আলোচনা অপ্রয়োজনীয় কিছু নয়। ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি বা অন্য কোনো পরিপ্রেক্ষিত থেকে সামাজিক মানুষের যে কোনো সৃষ্টির মতো কবিতার বিচার হতেই পারে। সেই চাহিদা কবিতার জন্য নয়, অন্তত যে অর্থে কবিতা নিয়ে কথা বলছি, বরং ইতিহাসের বহু পথ পাড়ি দিয়ে কোথায় এসে আমরা সামাজিক-ঐতিহাসিক মানুষ দাঁড়ালাম সেই জায়গাটুকু বুঝে নেবার দরকারে কবিতার বিচার বা পর্যালোচনা। যদি ওপরের কথাগুলো মনে রাখি, তাহলে আলোচনা হতে পারে যে কোনো দিক থেকেই। বিভিন্ন জ্ঞানশৃঙ্খলার দিক থেকে কবিতা বিচারের দরকার থাকতেই পারে, তার বিপক্ষে দাঁড়াচ্ছি না আমরা এখানে, সেটা বলে রাখা দরকার।

যে কবিতাটি নিয়ে আমাকে কয়েকটি কথা বলতে বলা হয়েছে সেই কবিতা পড়তে গিয়ে প্রথমেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম একটি উপমার ওপর। সেটা হলো ‘সাদা ছাগল’। কবিতার উপমা হিশেবে সাদা ছাগলের ব্যবহার আকস্মিক, চমকে দেবার মতো। ‘...কয়েকটি সাদা ছাগলের/ শরীরের ’পরে সব রোমশ পাখির মতো পাতার ছায়ারা খেলে যায়’। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় এই ধরনের ব্যবহার মোটেও নতুন কিছু নয়। বুদ্ধদেব বসু অনেক অনেক দিন আগেই আমাদের জানিয়েছিলেন, ‘...সংস্কৃত শব্দ যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলে শুধু দেশজ শব্দ ব্যবহার করেই তিনি কবিতা রচনা করতে চাইছেন। ফলে তাঁর diction সম্পূর্ণ রূপে তাঁর নিজস্ব বস্তু হয়ে পড়েছে—তাঁর অনুকরণ করাও সহজ বলে মনে হয় না। ...তিনি এমন সব কথা বসাচ্ছেন যা পূর্বে কেউ কবিতায় দেখতে আশা করে নি—যথা, ‘ফেঁড়ে’, ‘নটকার্ন’, ‘শেমিজ’, ‘থুতনি’ ইত্যাদি। এর ফলে তাঁর কবিতায় যে অপূর্ব স্বাতন্ত্র্য এসেছে সে-কথা আগেই বলেছি; তাঁর নিজের ব্যবহারের জন্য তিনি একটি আলাদা ভাষা তৈরি করে নিতে পেরেছেন, এর জন্য তিনি গৌরবের অধিকারী। (‘জীবনানন্দ দাশ-এর স্মরণে’, বুদ্ধদেব বসুর প্রবন্ধ সংকলন, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা ১৯৬৬)।

‘অপূর্ব স্বাতন্ত্র্য’ বলে যে ব্যাপারটাকে আমরা কোনো কবির কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতার পর অনুভব করি সেটা শুধু বিশেষ ধরনের শব্দের ব্যবহার দিয়ে বুঝব কি? আমার দাবি হচ্ছে, সামগ্রিকভাবে কবিতা শেষাবধি তার অভ্যন্তরীণ ও অন্তর্গত গদ্যের সঙ্গে কিভাবে মোকাবেলা করল সেই মুন্সিয়ানাই আমাদের কবি ও কবিতাকে কাছে টানে। বুদ্ধদেব বসুকে তবু অন্য কারণে প্রশংসা না করে উপায় নাই। ঔপনিবেশিক আমল থেকে গড়ে ওঠা সংস্কৃত-প্রধান ভাষা ব্যবহারের রেওয়াজ পেছনে ফেলে জীবনানন্দ কিভাবে অতি সাধারণ বাংলা ভাষাকে কাব্যে তুলে এনেছেন সেই দিকটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। তাঁর সাক্ষী এই ক্ষেত্রে আমাদের খুবই কাজে লাগে। জীবনানন্দ দাশ যে বাংলা কবিতার এই সম্ভাবনার দুয়ারটা তাঁর শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নির্দেশ করে গিয়েছেন, এই দিকটা চিহ্নিত করতে পারাটা জরুরি কাজ। শুধু শব্দগঠনের কথা বলি কেন, তাঁর শিথিল বাক্য গঠনের মধ্যেও এর ইঙ্গিত মেলে। ভবিষ্যতের বাংলা কবিতার অভিমুখটা কোন দিকে, হয়তো এই মন্তব্যের মধ্যে তার ইশারাও আমরা পেয়ে যাই।

তারপরেও কবিতায় ‘ছাগল’ এত অনায়াসে চলে আসতে পারে ভাবাই যায় না। যদি গদ্যে কয়েকটি লাইন লিখি তাহলে জীবনানন্দ লিখছেন যে সূর্য মাঠের মাঝখানে একটি গাছকে বুনে চলেছে বৃক্ষেরই ছায়া দিয়ে। আর সে বৃক্ষের ছায়ারা খেলে যাচ্ছে এমনভাবে যেন কয়েকটি সাদা ছাগলের শরীরের ওপর রোমশ পাখি খেলা করে চলেছে। এর পরের প্রশ্ন, ‘কারা সব?’; অর্থাৎ এই খেলাটা আসলে কারা খেলে যাচ্ছে? প্রশ্ন করা হলো, কিন্তু উত্তর দিলেন না জীবনানন্দ। এরপর চলে গেলেন অন্য প্রসঙ্গে। সূর্য নিজেকে লুকিয়ে রেখে সহসা জলের মুখে বিকেলের নদীর ভিতর প্রতিভাত হতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিল। সূর্য থেকে চলে গেলেন নদী ও জলের প্রসঙ্গে। সূর্যের এই ধরা পড়াটা ‘তত্ত্ববিদ’-দের কাছে ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু নিসর্গের অন্তরঙ্গ জিনিসের মতো এই ধরা পড়া দেখলে ‘সেসব কালের দিনগুলো অভিভূত হয়ে যেত’। কোন সব কালের দিন? ‘পরিপূর্ণ পৃথিবীর ইশারায়’ যেসব দিনগুলো জীবনানন্দ দেখেছেন। এরপর স্বীকার করছেন, ‘তবুও হৃদয়ে সেই মেধা নেই আর। অতীব সুসাময়িক বিজ্ঞানের হাত সংশোধন ক’রে গেছে খানিকটা’। তবুও যেহেতু এই বিস্ময় হারিয়ে যায় নি, কবির মনে হচ্ছে বিজ্ঞান ‘অকপট’ না হলেও তাঁর নিজের হৃদয়ই হয়তো শঠ। ‘নিসর্গ সত্য সাদা সাধারণ মানুষের জ্ঞান থেকে উদ্বর্তিত হয়ে’ কবিকে হেসে খেলে টিটকারি দিয়ে একদিকে নদীর মতন বানিয়েছে, আর নদীকে বানিয়েছে আউটরাম ঘাটের ডক-এ। কিম্বা নদী হাওড়ার পোলে এক ক্লিষ্ট সন্তানের বিরক্ত আত্মার কাছে ‘জলাকার গন্ধের মতো’ শুধু। বলা বাহুল্য কবিতাকে এভাবে গদ্য করে পাঠ করা যায় না। অথচ কবিতার ভেতর এই গদ্য রয়েছে, এই গল্প কবিতা অবশ্য কবিতার মধ্য দিয়েই বলে, কিন্তু কবিতা নিজেকে গদ্যে বা গল্পে পর্যবসিত করে না, পর্যবসিত হতে দেয় না।


বুদ্ধদেব বসু কি এই তীব্র আকুতির কারণেই জীবনানন্দ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এ-কথা ঠিক যে তিনি [জীবনানন্দ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আগাগোড়া রোমান্টিক’।


আমরা গল্পের আরো ভেতরে যেতে পারি। এই নদীর জল ‘প্লাম্বারের নলে’ প্রবেশ করে, অথবা পাইপে ফায়ারব্রিগেডদের। পানির নল বেয়ে সেইসব জলই মানুষের উদরে প্রবেশ করে। কিন্তু উদরের সেই অন্ধকারে সেইসব নদী ‘স্বাদহীন পিচ্ছিলতা ছাড়া কিছু নয়’। নদীর জন্য অতএব সবসময়ই ‘কোটি কোটি নলের ভিতরে গিয়ে প্রবেশের পথ’ যেমন রয়ে গিয়েছে তেমনি পুনরায় বেরুবার পথও রয়ে গেছে। যখন পিপাসায় (‘অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতায়’) আমরা গেলাসে করে সেই জল পান করি কিম্বা স্টেশনের ‘স্যানিটারি বাথরুম’এ হিস হিস নির্ঝরের মতো শব্দ হয়, কেউ কি তা শোনে? নদীকে কি আমরা শুনতে পারি? কিন্তু জীবনানন্দ দাশ শোনেন। শোনেন বলে তাঁর দার্শনিক প্রশ্ন হচ্ছে, যদিও কারো শঠতা নেই, বিজ্ঞান বা কৃৎকৌশলের, তবুও প্রশ্ন, ‘পৃথিবীর জড়বাদী অজর বিজ্ঞান কোথায় বাতাস, অগ্নি, সলিলকে কলের ভেতরে রেখে দেবে?’ কেন ঘটছে এটা? কবির সিদ্ধান্ত হচ্ছে, ‘তবুও নদীই শঠ’। নদীই আসলে শঠ। একবার তিনি নিজেকে শঠ বললেন, এবার বললেন নদীকে। ফলে আমরা কাব্যিক কুয়াশার মধ্যে ঢুকে পড়ি। কারণ এই নদীই তো কবির মধ্যে প্রবেশ করে নদী হয়ে আছে।

নগরায়ন বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলে পৃথিবী, নদী, প্রকৃতি, পানি ইত্যাদির জীবন যেভাবে ‘নল’-এর ভেতর পর্যবসিত হচ্ছে সেই সম্পর্কে কবির উচ্চারণ অসাধারণ—‘সর্বদাই প্রবেশের পথ রয়ে গেছে কোটি-কোটি নলের ভিতরে গিয়ে অথবা প্রবেশ করে পুনরায় বাহির হবার...’। যদি সতর্ক না থাকি তাহলে মনে হবে নগরায়ন, বিজ্ঞান বা কৃৎকৌশলের বিরুদ্ধে কবির হাহাকার বুঝি শুনছি আমরা। মোটেও তা নয়। আসলে হাহাকার শুনতেই আমরা অভ্যস্ত থাকি। বুদ্ধদেব বসু কি এই তীব্র আকুতির কারণেই জীবনানন্দ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এ-কথা ঠিক যে তিনি [জীবনানন্দ পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত আগাগোড়া রোমান্টিক’। তাঁর এই সিদ্ধান্তে সায় দেওয়া মুশকিল, কারণ নগরায়নের, অজর বিজ্ঞান বা কৃৎকৌশলের প্রতি জীবনানন্দের যেমন কোনো প্রতিবাদ নাই, তেমনি প্রকৃতির এই কৃৎকৌশলগত রূপান্তরেও তিনি যথার্থই ভাবলেশহীন। ‘পরিপূর্ণ পৃথিবীর ইশারা’ নিয়ে তাঁর যে কাব্যদৃষ্টি সেই ইশারায় প্রকৃতি, নদী, অগ্নি, বায়ু ইত্যাদির প্রতি বিশেষ পক্ষপাত নাই, তারা যে বদলে যেতে পারে, রূপান্তরিত হতে পারে সেই বিষয়েও জীবনানন্দ পুরাপুরি ওয়াকিবহাল। ফলে পুরা ব্যাপারটাই একটা ‘কুয়াশা’ হয়ে থাকে, যে কুয়াশা পেঁচার পিছল পাখা বহন করে বেড়ায়। এই তর্ক মীমাংসার নয়, যে কারণে ‘জৈমিনি... তর্কের পরিধি’ একালের ‘রাধাকৃষ্ণণ’-এর হাতে তুলে দেয়। তুলে দিতে বাধ্য হয়। কেন হাহাকার নয় সেটা আমরা বুঝি পুরা কবিতা যেখানে এসে কেন্দ্রীভূত, সেই বাক্যে এসে দাঁড়াবার পর। ‘পরিধি তবুও গোলাকার’। অতএব ‘কী নিয়মে তবুও কুঞ্চিত হয়ে ওঠে সারমেয়দের লেজ সহজেই—আমাদেরও গাঢ় অনুভব?’। যে পরিপূর্ণ পৃথিবীর ইশারার কথা কবিতার শুরুতে আমরা শুনলাম, শেষে এসে দেখলাম সেই পৃথিবীর পরিধি গোলাকার। গোলাকার বৃত্তের মধ্যেই আমরা ‘ঢের দিন’ কাটিয়ে দিচ্ছি যেখানে একই জল একবার নদী আবার কোটি কোটি নলের ভেতরে প্রবেশ করছে আর আবার বের হয়ে  আসছে। কখনো কখনো নগরের পয়ঃপ্রণালির মধ্যে স্যানিটারি বাথরুমে হিস হিস করে নদী, কিম্বা কলের জল হয়ে গেলাসের পানি হয়, অথচ আমাদের উদরে প্রবেশ করে ‘সাদা স্বাদহীন পিচ্ছিলতা’ ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে না।  কিন্তু এই যে ব্যাখ্যা সেটা কবিতার অন্তর্গত গদ্য কি? বরং কবিতার বাইরের বয়ান, বাইরের গল্প। কবিতা নিজের ভেতর এই গদ্যকে কেমন করে আশ্রয় করে করে নেয়, নেবার পরেও নিজেকে কী করে নিজের ঘরের ভেতরেই নিজেকে আলাদা করে রাখে সেটা বোঝার জন্য কবিতাটি পাঠ করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নাই।

 

লেখাটি অধুনালুপ্ত সাপ্তাহিক ‘নতুন ধারা’ পত্রিকায় ২০১১ সালে প্রকাশিত
ফরহাদ মজহার

ফরহাদ মজহার

জন্ম ৯ আগস্ট ১৯৪৭; নোয়াখালি। কবি ও প্রাবন্ধিক, ঔষধশাস্ত্রবিদ, রাজনৈতিক...বিস্তারিত