দি অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার ও অন্যান্য কবিতা

দি অ্যানসিয়েন্ট ম্যারিনার

কেশর-ফুলানো সমুদ্রতল ডুবোজাহাজের খবর ভুলে এগিয়ে দিলে বালির সুড়সুড়ি অ্যালবাট্রসের শোকগাথা ছাড়া আর কী সংবাদ তুমি আনলে নাবিক বিবর্ণ মলিন পোশাকে? ‘Alone, alone, all, all alone, Alone on a wide, wide sea!’ ভোজ ও বাজি জ্বলে উঠল চতুদ্দিস চার্চ ইয়ার্ড তোলপাড় করা নাচে আজ মাতায় ভেতরের উলুধ্বনি পাতলুন গুটানো ধূসর বুড়ো তবে মুখোমুখি তাদের কাউকে থামাও শুনাও ওদের—একেকটা হিংস্র দিন কেটেছে কী দুঃসহ অহর্নিশ—ত্রস্ত তুমি অভিশাপ ঝুলিয়ে গলায়—পিপাসার্ত নাবিক—ভয় ও ঘোরের ভেতর কিভাবে শুনেছিলে দুই দেবতার স্বর খুনের পর যখন কেউ ভালোবাসতে শুরু করে তুচ্ছ-খুটিনাটি; প্রেরিত সকল জীবে স্বয়ং অ্যালবাট্রস বয়ে দেয় ছায়া ও অনুকূল হাওয়া `All things both great and small For the dear God who loveth us’ যদি জানতে সঞ্জীবের মতো কোনো পুনরুজ্জীবক মন্ত্র অথবা শাস্তা যিশুর ন্যায় হতো যদি পয়গম্বর শেষ অ্যালবাট্রসের রেজারেকশন রোহিণী রোহিণী—ডাকে যদি একবার কামদগ্ধ প্রিয়তমার পাশে অন্তত সমুদ্রভেদে কাটত কিয়দংশ! পৃথিবীজুড়ে আজ কত না আয়োজন ভেস্তে যাচ্ছে নিরর্থ—নিঃসঙ্গ অবর্তমানে এক ভুতুড়ে জাহাজে যদি একবার খসে পড়ে অভিশাপ সমস্ত গান লুটাবে কণ্ঠ ছিঁড়ে লং শটে স্থির জাহাজ; পাল যার ভেঙেছে তুমুল বাতাস আর রাগী সুয্য। সমাধানহীন সময় যেন দিন-রাত্রি ছাড়া কিছুই কোথা  করে না অনিয়ম। জলও অবিচল। সন্ত নাবিকগণ—সারথি তোমার শ্মশ্রূমণ্ডিত বিধ্বস্ত নাবিক সমস্ত চতুরাশ্রম ক্ষয়ে যারা অতঃপর দেহ করে নিথর নিজেদের শিয়রে এসে দাঁড়ায়—নিজস্ব দেবদূত। তখন তোমার ধনুকে নেই বিগত টঙ্কার। বায়ুবিরুদ্ধ স্যাটায়ার শরীরের দ্বিগুণ দৈর্ঘ্যের অভিশাপ ঝুলিয়ে নিশ্চল শুয়ে আছ পাটাতনে একা—বয়স্ক করুণ শীতমুদ্রায় দুই দেবদূত নিঃশ্বাস ভাঙে ঘাড়ে তুমি তাদের জেনেছ পাপ ও পুণ্য ধর্মের ম্যাটাফর।  

কালকেতুকে

ফিরে যাব কালকেতু পুন তপোবনে নিষাদবৃত্তি ছেড়ে পারব না আমি চাঁদ হয়ে ভাসাতে বাণিজ্যবহর ফিরে যাব ব্যাধযুগে; গুহার আঁধারে আয়ুরেখা ধরে এই দূর বনে যদি মুগ্ধ হই গেংখুলিদের গানে—সারা রাত তবে কেটে যাক মিথে আর মদে—হরিণীর শীৎকারে। জেনেছি পৃথিবী বহুদূর চলে গেছে আরো এক নক্ষত্রের কাছে; আরো বহু প্রেম তাকে চুরমার বাণে করেছে অস্থির ফের অধীত জ্ঞানে বহু জলে ভেসে বেহুলা পরনে থান ম্লান করে ইন্দ্রের সভা পূর্বে যারা সময়কে বেঁধেছে কাঁটায় কথাকে দিয়েছে যন্ত্ররূপ তার গুম হয়ে যাওয়া গানের দরজা নাড়াতে আমার ভেতর জ্বলছে জুমপাহাড় নাকশা ফুলের দেশ—যেখানে পুরুষ মূর্চ্ছা রবে আর নারী হবে ধনপুদি চুঙুলাং দিনে জেগে উঠবে চোলাই জুমক্ষেত জুড়ে উল্লাসরেণু বাতাসে এহেন মহোৎসবে মেঘডুমুর বনে গোত্রপ্রধান ছুটবেন শিকারে ধনু সহকারে—আগুন সহযোগে পুরুষ ও নারী—নারী ও পুরুষ গেংখুলির গানে মাতোয়ারা হবে নাচে আগুনের কাছে। এমন জীবন ছেড়ে বলে দেবী ফুল্লরা—আমার রাগী ও র‌্যাগা জীবন কিভাবে মেলাবে সালসার রিদম!  

আয়ুফল

বিসংজ্ঞ দিন আজ লুটায় ধুলোয় মিথ মুলা মদে চুরমার চোখ; তবু আমাদের নিয়ে চলে বয়োজীর্ণ বায়ু জাহাজ—নেক্রোপোলিস নগরে। ফারাও আর ফরা অভিমুখে মুখর বন্দরে কত মাতাল সাধু পেয়ে গেল বাহু-বন্ধনী; টিকা-টিপ্পনি—ভালগার জীবনের। দৈনন্দিন খেরোখাতায় ব্যস্ততা ফুলে ফেঁপে দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে শার্টের কলার; নড়বড়ে ব্যাকবোন দুই কাঁধে কত সহজে দুই পা নেড়ে চলেছে বাদী-বিবাদী দুই টিকেট চেকার। গুহার ভেতরে আর গুহা কতদূর ঘুরে ঘুরে তোলপাড় করা মধুবন তুমি তা জানো না জয়লতা; প্রতিটি সন্ধ্যা শেষে কিভাবে বাঁচে ডন জুয়ান। আমাদের আয়ুফল শেষ হয়ে আসে দ্বিধাযুক্ত জ্ঞানে যদিও ব্রহ্মবিহার পেতেছি অমরাবতী তীরে অতঃপর তক্র ছেড়ে আমারো চাই রিপুর দমন। প্রত্যেকে একা একা প্রত্যেক বুদ্ধ নিজেরে আকাশমার্গে করে উৎক্ষিপ্ত। আমার মতোই হুবহু এক ডামির হাতে নাম-রূপ-সংজ্ঞার পার্চমেন্ট হুইসেল শোনার মুহূর্তে ছাড়তে হবে জেতবন; মৌন স্যানাটোরিয়াম।  

চক্রব্যূহ

পাসওয়ার্ড ভুলে যাওয়া সন্ধ্যাকাল যেন আমি পার হয়ে এসেছি বিধ্বস্ত শস্যক্ষেত—যেন বিভ্রান্ত সরীসৃপ গুণে দেখে নিজ পায়ের আঙুল পুনঃ পুনঃ প্যারানয়াকালে—তেড়েফুড়ে ফোটে রাগফুল—চুরমার করে নিদ্রাবন ধাতব তালে; টুটাফাটা হৃদয় যদি হয়ে উঠে নিজেরই প্রতিদ্বন্দ্বী; গুম করে যাবতীয় সংকেত ডাকে মন সন্ন্যাসে কোন এক টিলার ভেতর বিক্ষিপ্ত করে সেঁটে দেয় বিজ্ঞপ্তি তখন সন্ধ্যার গান ঘোরতর ঘোরে গোঙায় আর যাত্রী-ছাউনি ফেলে এসে টর্চলাইট মেলে নিজেদের খুঁজে ফিরে একা একা হিম করা আলোয়—উপেক্ষা আর অপেক্ষার ভেতর হারিয়ে ফেলা নির্ঘণ্টহীন জীবন আমাদের বলে— উদয়ে যাহা জেনেছ সত্য পরক্ষণে তাহাই কর্তব্যদোষে বিলীয়মান!  

জেরির সাইকেলে

এই প্যাটাফিজিক্যাল রাতে আমাদের ভেতর আরো শরীর এসে ডুবে যায় ফিল্মি ভাষায় গালাগালি ছোড়ে আর ভুল করে নাচের মুদ্রায়। হাতঘড়ি থেকে খুলে ফেলে কাঁটা তারা নিজেদের চোখ ঠোকরাতে থাকে। গলা ছিঁড়ে তুলে আনে গান, তোলপাড় করে গোঙায়। যেন জীবন এক পরিহাসপ্রিয় ভাঁড় ভাঁড়ারের দরজা খোলা রাখে তাত্ত্বিক কূটাভাসে।
উপল বড়ুয়া

উপল বড়ুয়া

জন্ম ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৮। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। প্রকাশিত বই : কানা...বিস্তারিত