কবি স্বদেশ সেনের প্রধান সঙ্গ তাঁর কবিতায়। তাঁর জীবনের (১৯৩৫-২০১৪) প্রায় সবটাই কেটেছে প্রবাসে, বিহারের জামশেদপুরে। সেখানে 'কৌরব' পত্রিকার অনুজ কবিরা তাঁকে নিয়ে কবিতার ক্যাম্প পেতেছিলেন শহর থেকে দূরে, জঙ্গলে পাহাড়ে সমুদ্রতীরে, গত শতাব্দীর আশির দশক জুড়ে—ওঁর কবিতার প্রধান অংশ যে সময়ে রচিত হয়েছিল। প্রথম কবিতা বেরিয়েছিল 'পরিচয়' পত্রিকায়। সাত বছর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। পরে পার্টির সাহিত্য-সংস্কৃতির ছুঁৎমার্গ থেকে স্বাধীনতা দাবি করে পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। সেসময় দীর্ঘদিন কবিতা লেখা থেকে দূরে ছিলেন। পরে কৌরব পত্রিকার সাথে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে নতুন করে লেখায় ফিরে আসেন। কোথা থেকে এসেছে ওঁর কবিতা? কিভাবে নির্মিত হয়েছে তার আশ্চর্য স্বতন্ত্র শব্দ-শরীর? জন্মভূমি বরিশালের খাল-বিল-নদী, নাকি কর্মভূমি সিংভূমের পত্রমোচী বন? ভারতবর্ষীয় প্রবচন, না ইউরোপীয় অ্যাবস্ট্রাকশান?
নিজের কবিতা নিয়ে স্বদেশ সেন বলেছেন :
আমার কবিতায় এক ধরনের বিষাদ কাজ করে। কেউ যদি গভীরভাবে ভালবাসার কথা বলতে চায় তবে তার ভেতরে একধরনের বিষাদ উঁকি দেবে,—এই বিষাদ ভালোবাসার অনিশ্চয়তা, দ্বিধা ও ভঙ্গুরতার প্রচ্ছন্নবোধ থেকে হয়। আমার কবিতা অদার্শনিক। মানুষের ছোট ছোট চাওয়া-পাওয়া, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, আদর আর আবদারের কথাই আমার কথা। বিষাদই এই কবিতার নিয়তি ও নিয়ন্ত্রক। কবিতায় সাবজেক্ট আমি প্রেফার করব। অন্য একটা আধুনিকতা বরাবর চেয়েছিলাম। চাইলেই তো হলো না। এলিয়ট আমায় আজও ধরে রাখে। উপমা থেকে তুমি রিলিজ পাবে না। উপমার প্রকৃতিগত রূপ বদলাবে। নতুন কবিতা মানে নতুন abstraction... অন্য জটিলতা। ওর প্যাটার্নটাই অন্যরকম। একটা শব্দের পরে আর একটা অবধারিত শব্দ আসতে চায়, প্রত্যেক ভাষাতেই এটা একরকম সেট হয়ে থাকে। এর থেকে মুক্তি চাই।... রচনার সময় সাবজেক্ট এবং অবজেক্ট একটু আলাদা থাকলে দেখাটা ভালো হয়। ঘর সংসার জরুরি। সংসারে জড়িয়ে থাকাও দরকার। ‘Center can not hold’ লিখতে গেলে জড়িয়ে থাকতে হয়। আজ আর তন্ময় হয়ে কবিতা লেখা যায় না। উচিত নয়। তন্ময়তা খুব মিসলিড করে। পাঠকও মিসলিড করে, সেটা হয়তো অজ্ঞানে। এস্টাব্লিশমেন্ট কিন্তু মিসলিড করে সজ্ঞানে। এক সময়ে তো দুজনকেই ভুলতে হবে। আমাকে সময় নেবে কি না এটা কোনো ভাবনার ব্যাপার নয়। ...কোথাও কোনো স্টেক নেই আমার। বিজনেস উইথ প্লেজার।
জীবন ও কবিতার ব্যাপারে তাঁর একান্ত উচ্ছ্বাস, প্রেম, ক্রোধ, বিশ্বাস, বেদনা ও নিভৃত বৈপরীত্যের উজ্জ্বল সম্ভার নিয়ে নির্মিত হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যচিত্র। তাঁর কয়েকটি কবিতার অনুবাদ হয়েছে রাশিয়ান, ইংরেজি ও এস্প্যানিওল ভাষায়।
শংকর লাহিড়ী
কাব্যগ্রন্থ : রাখা হয়েছে কমলালেবু [কৌরব প্রকাশনী, ১৯৮২
হে অনেক
হে অনেক আমগাছের দেশ তোমার এক মুহূর্ত ভালো লাগছে ভালো লেগেছিল তোমার সদাসর্বদা। এই সেই কখনো সখনো সময় ভালো লাগছে এর পরিমাণ ও আয়তন সব রকমের মাপ ও বায়ুসহিত জল আরো অনেকদিন ধরে বরাবরের ফুল তোমার। নদী নামের কাছেই দেখো ভালো আছি এই আবার ভালো আছি, হে অনেক আমগাছের দেশ।মনোবাসিনী দিন
ফুটকি নয় এই বেশ এই আমাদের সূর্য খর বন্যার চেয়ে আরো দ্রুত আজ মনোরথ কথা বলো, বেশিটাই আজ খুলে বলো অপাপবিদ্ধ আমরা যে আজ। পাহাড়ের ভরে নামছে ছলছলানো ঝর্না সুন্দর অদ্ভুত করে এনেছে আজকের জনমানুষ সোজা ঠান্ডা কৃমিহীন এদিকের শিশু চা পান—সুন্দর কাপ—আজ বড় দেবতার হাত। গায়ের মাজন পেয়ে রূপ বাড়াচ্ছে গাছ ও মনোবাসিনী আমাদের—দিন যে তিমিরান্ত ওড়া পাখি সেও বলছে, মা, ও মা কোথায় কী বিশ্বাসে কে বলছে, কারে ভালো হবে দিনকে দিন, দিনকে দিন।পিছু ডাক
ওই দেখো ময়মনসিং-এর ছেলে চলে যাচ্ছে গরম বালি যেন টেনে নিচ্ছে গায়ে পড়া জল ওর হেরে যাবার স্টাইল—ওর হারিকেনের মুখ এখন ময়লা . উত্তরে হেলে আলো দিচ্ছে দক্ষিণে। যে নদীর পরে নদী সাঁতরে যায় সে যে হারে না এ জীবনে . এ আগুনে পোড়ে না দুধ তোমার জন্য এই কথাই আমি লিখছি এখন। . ঘুরিয়ে পড়ো তোমার পায়ের পাতা আমগাছ জামগাছ টপকে ফিরে আসছে পাথর . ফিরে আসছে নৌকোডুবির নৌকো। শিলবাটা নারকেলের গন্ধ উঠছে পাকা লিচুর গড়ানো রসের গন্ধ আটকে আছে বেলতোড়ায় বেলতোড়ায় আটকে আছে . খোকন একটি বাতাবি ফল . ফিকা রঙের জামা নেমে যাচ্ছে, মাসকলাইয়ের ক্ষেতে, কেমন একটা ডাক . পোষা বাদামগাছটা ডাকছে।কবিকণ্ঠে পাঠ
তুমি সেই
কী ঠান্ডা ঘরের মেঝে, কী সুন্দর পরিষ্কার ছাদ আনা দু’আনার মালা ফুটিয়ে তুলেছে চারপাশ সারাদিন কাজ করো, সারাদিন তুমি ভালো থাকো। যখন ফুলেল ঢালো, যখন সাবানে হাত ধোও ঠুংরিগুলি ঠুং ঠাং করো . উড়িয়ে তাড়িয়ে দাও পাখি টানানো তারের থেকে, জানালার লোহামুঠি থেকে বেজে ওঠে লাল চুড়ি, জ্বলে ওঠে এক কণা চাঁদ চুলের গুমটির মধ্যে, . মেহেদি ফুলের মত নখগুলি কাটো ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে কথা বলো, মৃদু শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণে গান করো হাজার তারিফগুলি, তামাম তারিফ ঝরে যায়।ব্রীজ পার হয়ে
ব্রীজ পার হয়ে যাবো—সুদূর অক্ষরে কাঁপা পথ ঝুমকা থামো, আমি সাইকেলে চড়েছি দূরে যাবো বলে। দুষ্টু পাতা কেন ডাকো? কী কারণে জল তুমি শিশিরের মতো নীরবতা! আকাশের কোণে কোণে পাখি নিয়ে খেলা আকাশের। মেঘের মতন যাওয়া—এই যাওয়া ভালো। আমার দুচোখে আর এছাড়া কোথাও ভালো নেই শুধু এই চলে গিয়ে থেমে যাওয়া কোনো সবুজ পোলের কাছে; এক মনে ঝরে যাওয়া ভালো।একদা ডালিম গাছ
তোমাকে জ্যৈষ্ঠ মাসে পেয়েছে . এখন সেই আশ্চর্য রস হবে তোমার তুমি ছুটবে কালভার্ট ডিঙিয়ে, দ্রুত ঘন এবং ডাঁটো হবে, ঠান্ডা অহংকারে আলোকিত রাত্রে জানালার নয় বর্গফুট আলোর মতো . চন্দনার কলুদ ফুলের মতো তুমি এখন বুঝবে কী করে আখের আঁশ ভিজে যায় কাবেরীর জলে। একদা ডালিম গাছগুলি বড় জব্দ . কেননা সে ডালিমের ভার ডালিমের ভার নামে একদিন ডালিমের ডালে। এই তো সময়— . তুমি কাদার ভেতর শুনবে ডাকছে কত মেঘ গরম বুকের দুধ কার যেন প্রসবপ্রয়াসী ডাক কার যেন এবং কোথায় যেন বুলবুল বুলবুল শব্দে . দুধ ফেটে যায়।হাজার দুয়ার
না উড়ে থেমেছ পাখি, সমস্তটা ওড়ো কিভাবে উড়ছ না তুমি, কী রকম বন্ধ হয়ে আছ এভাবে পালকে ওড়ো . নানান আকারে একবার বল্লী বাঁকা, ভরা খোল . গরম রোদের ওই দিকে মেরুচুম্বকের কোন টানে উঠে পড়ো . হাওয়া খোলা, ওপরে সমস্ত ডানা আনো। একবার ভালোবাসা ভালোবেসেছিলে . সমস্ত সময় থেকে খুলে পড়েছিলে সঠিক ডাকের তুমি পাখি— এক পাখি ওড়ো, তুমি আর পাখি, . ফিরে ওড়ো হাজারের দিকে।কবিকণ্ঠে পাঠ
নতুনের কোনো দুঃখ নেই
নতুন কোথায় থাকে . নতুনের কোনো দুঃখ নেই? মানুষ যেমন করে কুসুম পাতার ঠোঙা বাঁধে সেভাবেই বাঁধো তুমি মেঘ থেকে জল নামানো পাতা? তুমি সেই পাতা যার আকার ভরেছে চুয়াগন্ধ সেই অপরূপা যার চুড়ি বাজে আর চোখ হাসে? কখনো বাসনা হয়—মেয়ে হলে ব্রোচ দেবো তাকে কখনো সুবর্ণগুল দিয়ে খোঁজে মোমের আরক রাঙা ঠোঁট, মাজা দাঁত, নবনিযুক্ত ডুরে শাড়ি . সম্পূর্ণ পশমে রাখো পা স্তরে স্তরে নির্জনতা তোমার চিবুকবিন্দু . হাতে ধরে থাকে . নাকি কোনো প্রকৃত উন্মাদ ঋতুভাঙা কোয়া কুরে খায় . প্রিয় তারপলিন ছেঁড়ে . কামড়ে ধরে বীজের পাহাড় তার দুঃখ অবেলায়, তার দুঃখ সমস্ত পল্লীতে। নতুন কোথায় থাকে, নতুনের কোনো দুঃখ নেই?রাস্তায় যদুনাথ
দু’একটা অদ্ভুত রাস্তা থাকে . দু’একটা ফাঁকা বহির্ভূত রাস্তা দু’একজন ধু ধু করা লোক থাকে সেই রাস্তায় যারা ফেরে না, ফোকরে তাকায় না . যে পায়ে কাদা সেই পায়ে কাঁকর এমন মরিয়া ম্লান, মায়াতুর, চালতার পচা... জমা পড়ার একটা পাহাড় আছে দূরে মরা ঘুঘুর একটা দরজা আছে... একটা কার কুকুর যায়—পেছনে পেছনে লোক মাঝ-বালতিতে যা নেই সেই মৃদু জলের শূন্য ফাঁদে পড়া ষাট বছরের এখন কেবল মধ্যে মধ্যে ফাঁপ কেবল ধুলো কেবল লালচে ধুলো ওই অনিলের জং এবং ওই অনিলার জং দু’একজন হাটুরে লোক ওই রাস্তায় দু’একটা গরদ আর গামছার ছায়া যদুনাথের ওই মৃত্যু যদুনাথের ওই সুশীলা মা।আপেল ঘুমিয়ে আছে
আপেল ঘুমিয়ে আছে ওকে তুমি দাঁত দিয়ে জাগাও নতুন ছালের নিচে রক্ত চেপে খেলা করে দাঁত সহজে, আপন মনে, চরাচর শান্ত দেখে খুন হয়ে যায় আপেল ফুলের দিন শেষ হয়, বেড়ে ওঠে নির্বিকার দাঁত। পৃথিবীতে আদ্যোপান্ত ভূত বলে কিছু নেই—সমস্ত মানুষ শুধুই উপোসী লতা নেই আজ হদ্দ অমানুষিক দুধের মুকুলগুলি ঝরে যায়—গাভী আর জল পড়ে থাকে আকাশে আপেলটা শুধু জেগে উঠে আবার ঘুমায়! ওকে তুমি খুন করো, টুকরো করো, লেই করে আনো চিহ্নহীন করে ভাঙো—কাজে লাগো ফলিক অ্যাসিড রেশমকীটের মতো আত্মপ্রতিকৃতি ভাঙো আর সুস্থ হও আপেল ঘুমিয়ে আছে ভোরবেলা—ওকে তুমি দাঁত দিয়ে জাগাও।ভেতরে শীত
উড়েছে পায়রাপাখি এক ডাকে নীলের ওপরে বাইশ দিনের মাঘে পড়েছে অনেকখানি রোদ হাসিয়ে মানুষ চলো যেখানে যাবো না কোনোদিন। বেরিয়ে পড়েছে বেশ হলুদ সবুজ হয়ে কোনো কোনো বউ গরম জলের ধোঁয়া তাও আজ বেরিয়ে গিয়েছে যেখানে শীতের লেপ ফুটে প্রকৃতির হয়ে আছে। তোমার রেশম পাঁজা আর সাজ দেবে না এবার— মাঝে কিছু ছাড়ো তবে পারো আজও কিছু রেখে দিতে বনবিভাগের শীতে কার গাড়ি খালি গাড়ি যায়। রাজি হয়ে বসে আছি স্বভাবে ধরেছে এসে শীত চোখ ভরে পড়ে আছে নবীন নরম নীল টান আসি বলে সেই যাওয়া যখন কোথাও যাওয়া নেই।রাখা হয়েছে কমলালেবু
সমস্ত ঘরের সেবা এই আমার শরীর মনের এই আমার আজকের সেবা অতি সমতল শীত স্নানে লেগে আছে আজকের ফুল তার এক রান্নায় ফল হয়ে এসেছে ধীরে। লোহায় মাখানো কিছু টিন খনিতে খনন বেজে উঠল একটা ব্যবহার হয়ে উঠল ভালো অনুকে কে ডেকে গেল অনুপম। একজন সারাদিন ও সব জায়গার মানুষ ছাল মাংস নয় সকালবেলার শরীর এখানে জল, এখানে আরেকবার জল এক ওষুধ ও গোটা জামা . আস্তে ধীরে আনন্দ গলগল শব্দ আজ আমার এক ঘরে সমস্ত সেবা আমার রাখা হয়েছে কমলালেবু আজকের আলোয় দেখে আজকের লেখা।এসে যাওয়া
সমস্তও হতে পারে—জানি না, তবুও কিছু চুরি আমাদের এ জীবনে এসে পড়ে। এক রকমের এসে যায় আমরা তখনই দূরে যেতে চাই—দূরের মাপেরও বড় দূরে হয়তো মিলনে নেই, ভালোবাসবার মুখে নেই। আমাদের ভালোবাসা ধরা থাকে বড় হাতে হাতে এমন দাগের মতো ভালোবাসা কিছুতে থাকে না এত কাছে এসে পড়া—অতি দূরে ঝরে-পড়াগুলি কেবল গাছের ফল, পাখি ডাকা পাখি ওড়া থাকে। আমরা কি এভাবেই যাবো, ওই ভাবে চলে যাবো আমরা কি সেই আখ মাড়িয়ে স্রোতের দেখা পাবো সমস্ত দেখার দেখা, শোনার সমস্ত কিছু শোনা আবার একটুর জন্যে মরে যাবো—আমাদের মতন মানুষ! একা একা কাঁপ আসে গোটা আকাশের দিক থেকে অতীতের মতো যেন জীবনের নিধি কেঁপে ওঠে মনে পড়ে দূরে যাবো—উড়ে থাকা ময়ূরের দূরে থাকে যত ভালোবাসা দূরের মাপেরও কিছু দূরে।দূরে এবার
নীল রবারের থাবা পড়ে গেছে এইসব আকাশের গায়ে কিভাবে যে খেলে গেছে শরতের যত ভালো . যত কিছু আলো ধামাচাপা ছুটি এসে খাড়া হও . আমাদের বেড়ানোর একশেষ করো পাহাড় দেখাও, জল, বেহালা কাঠের গাছগুলি। কিছুই ছিলো না কোনো—দেখি নি শুনি নি কিছু কানে আমাদের এই জন্ম—এই কি সাধের জন্ম—পড়ে গিয়ে আছে প্রথমেই সব ভাব চটে যায় . প্রথমেই শত কাতরতা কী যে যা-তা হয়ে গেল হলো না তো বুক থেকে, চোখ থেকে . ভারী জল থেকে কিছু পাওয়া। আমাদের দিতে থাকো এইসব—নতুনের থেকেও নতুন একবার ছাড় দাও—আবার নজর দাও আমাদের দিকে একমাস চাপা খুশি একমাস যেন বড় সুখ . রোগা মানুষের আমি চারিদিকে আজকাল, আরো কত দিন।
এসেছি জলের কাছে
এসেছি জলের কাছে কথা নিয়ে। জীবন পর্যন্ত স্নান যেখানে সেখানে আমি গা রেখে দিয়েছি এসেছি জলের কাছে। সুদূর গলির থেকে ছেলেমানুষের ঢেউগুলি রূপের বাহান্ন হাত ছায়া তার গায়ে পড়ে যায় মহানদী পার করে, একদিন সম্পূর্ণ বেরিয়ে এসেছি জলের কাছে জানি। জলের ওপরে এক জাঙ্গিয়া রঙের সূর্য ওঠে দেখা গেল যা কেবল সবেমাত্র ভোর এ পর্যন্ত ভেঙে গেছে, ছিঁড়ে গেছে, হীরা হীরা ঢেউ। মনেও পড়ে না বনে রতনের সাথে কাঠ কাটা বড়ো ডাক্তারের গাড়ি—কে কবে এসেছে কোন দিনে . জ্বলজ্বলে জলের কাছে . ছোট হয়ে আসি নি এবার। মানুষের হাতে আমি কখনও দিয়েছি ধরে ধরে বালুপোঁতা সেই গাছ এ রকম গায়ে লম্বা ঝাউ হয়ে আছে মনে হয় যেন কেউ; . মনে হয় লিও . যেন মনে হয় রবিঠাকুরের প্রাণপণে ছবিগুলি জল ও রোদ্দুরে এসে গেছে। মেঘের জন্মের ছবি বানানো দেখেছি আমি অনেক ভেতরে শেকলে দেখেছি কত এক শূন্যে উড়ে পড়া পাখি আমি কিছু দেখতে চাই, কথাগুলি ছেড়ে যেতে চাই ছায়ার সাবান যেন শক্ত হয়ে পড়ে আছে সেই কত কথা এসেছি জলের কাছে, জল নিয়ে।যে তুমি মেরেছ
চলেছ আমাকে মেরে, চলে গেছ একটা ছুরি খুব মেরে গেছ লক্ষ করেছি তুমি ছুটে গিয়ে পলাতক হলে। বসন্তপর্যায় গেল, আমাকে করলে না তুমি ভালো ভালোবাসলে না সে রকম—দশা তাই মারাত্মক হলো ছিল আরো কত গান দু’মিনিটে সেগুলি হারালো। কোনো কোনো চোট আমি অনেক সারিয়ে নিতে পারি সমস্ত মৌরির মতো আমিও অনেক সইতে পারি শুধু উপলক্ষ চাই একটু দূরে যদি আমি একা। যে তুমি চলেই গেছ সে কি জাজ্জ্বল্যমান হতে পারে নিজের হত্যায় এসে সহমত হয়ে যেতে পারে এতটা সম্ভব হলে ভালো হতো—এত ভালো হতো।দেখা হবে, বাদাম
তোমাকে নিয়েছি আমি, আমাকে নিয়েছে আজকাল দেখা হবে। সঠিক বর্ণের মধ্যে শব্দের মৌলিক ধ্বনি ধরে প্রবাহে, কুয়োর কেন্দ্রে, অথবা সমস্ত বর্ণফলে; মনে মনে জেনো হয়তো তখনো নয় গুঞ্জনের গায়ে পড়ে থেকে নবীকরণের মধ্যে প্রোটিন পর্যায়ে নতুন ও অন্য ব্যবহারে ভরা চুলে করবীর মতো দেখা হবে। আমাদের কত গাছে ধরেছিল গাছের বাদাম দেখা হবে।কাব্যগ্রন্থ : মাটিতে দুধের কাপ [কৌরব প্রকাশনী, ১৯৯২
বিষয়
সাদা-সাপ্টা কথার জোরই আমার জোর আমার বিষয় বলতে তোমার বিষয় মাত্রাহীন অসীম আবার কিসের বিষয় আমার বিষয় টাট্টুর বাজারে টাট্টু। তোমার পুঁজি ভাঙা আর দেনাশোধের কষ্টই এক বিষয় আমার বিষয় আমার অঙ্গুলি হানি শুকনো জলের শুকিয়ে আসাই এক বিষয় আমার বিষয় মৃত্যু।ভাইরে ভাই
একদিন নিম গাছের ওপর টি পড়লো টিয়ার আলসের ওপর কা ডাকল নিয়মের কাক একদিন আস্তে আস্তে এমন রোদ হলো যে নিজেই টুকরো টুকরো তার ছায়ায়। সামনে থেকে নামলো শূন্যের শীত আর পাহাড়ি মেড়া কী দেখে কোথায় ঘুরে গেল। তবু কেউ বড় হতে পারল না দশাশই, উদোম আর ডাকসাইটে তবু বেঁচে থেকে সফল হলো না বন্ধুজন ভাগে ভাগে নানারকম হলো না কেউ। বোঝা গেল কেউ আর সহ্য করবে না সাধবে না আর একবারও চলতে ফিরতে পড়ে থাকবে আপনা-নাম আর নম্বর। হাওয়ায় তোলা বাঁশ দু’ দিকে ঢ’লে কোথাও দাঁড়াল না। কারো দোষ নেই গোপনে মারে নি কেউ তবু, ভাইরে ভাই মেঘে-শীতে জড়িয়ে শীতের আমতলা একলা একা ছোট হয়ে গেল।অস্থায়ী
পায়রা পিছলে যাবে এমনি হয়েছে আকাশ রোদ এমন যে কাগজে ছাপানো যায়। যত ছোট বড় করেই তাকাও আর ধরে রাখো নিজেকে মনে হবে এই ছড়িয়ে গেল এই কেঁপে উঠল বুক। এমন এমন লোক এখন বাইরে এমন সব মাতোয়ারা গেছে ভেতরে ওড়িশীপাক দিয়ে মেয়েরা এমনভাবে হাঁটছে এমনভাবে সিঁদুর রাখছে কপালে যে বুঝতে পারবে না কেউ কিছুই বুঝতে পারবে না। এমনকি বুঝতে পারবে না আমাদের আর স্থায়ী চাকরি নেই।সমস্ত দিকের টান
ফুলকে অবশ্য করে ফুটতে হয় তবে ফুল; তবে বোঁটা ভারী হয়ে ওঠে। তা বলে কিছুই বুঝি সোজা নয় পদার্থে ও প্রকৃতিতে মিলিয়ে যে মাঝামাঝি ফোটা অত সোজা নয়— আসল ঘিয়ের রঙ মেরে আনা এখনো কঠিন। সমস্ত দিকের টান এক করে যদি ধরা যায় সম্পর্কে, স্বভাবে, লোকাচারে তবে তা জটিল রেখা—বরাবর এই পৃথিবীতে যা নাকি কঠিন ভল্ল, দু’দিকে কঠিন। জীবন কোথায় ছিল সোজা! মিয়া যে বিবির চোখে ফেলেছে অস্থায়ী তার রঙ তাকে ঠিক স্থায়ী করা এখনো কঠিন।অক্ষর নেবে না কিছু
ধরেই নিয়েছি আর অক্ষর নেবে না কিছু তোমাকে আমার বলা হয়েও তা হবে না আমি যে থমকে গেছি তার চিহ্ন এই দেখো সামগ্রিক রঙ থেকে খোয়ানো আসল রঙ। দু’একটা যদিও হয় তাও হবে অন্য আরো হয়তো নিশ্চিত ফুলে সেও হবে অন্যরকম গুমোট জানালা তার বাইরে আটকে যাবে অবাক করবে না আর অবাক কাণ্ডের ফুল। মুখের নিশ্চয় দাগ তা হলে তবু তো দাগা তুমি যাকে মস্ত বলো তা-সে কে বানাবে ধরেই নিয়েছি আর অক্ষর নেবে না কিছু অযথা তাড়িত হবে হাতছুট লেখার হাত। তোমার খাবার ঠিক পাতের মাঝখানে দিতে পারব না এ বিষাদ জেনে বলে রাখি হাঁপিয়ে ওঠার এই অতি-চিহ্নগুলি দেখো জেনো একজন গেছে, খুবই সে হাঁপিয়ে গেছে।তবুও জোনাকি
যেখানেই থেকে যাই মনে হয় সংকটে রয়েছি ছোট পাদ্রি যেন কোনো বড় গির্জা ধরে বসে আছে ঝুঁকির ভেতরে থাকা, থ্রিলারের মধ্যপথ দিয়ে যেখানে যাবার যেন সেখানেই ঝটিকা-পুলিশ। পরিবর্ত বলতে ছিল দু’এক অঙ্কিত মুদ্রা অথবা নরুণ ছিল ধুম করে বলা ‘মরতে মরতেও মজা হোক’ ধন নয় মান নয় কবে কেউ ভেবেছিল বুঝি কবি যে মরেছে তার ফাল্গুনী মরেছে একেবারে। এই যাচ্ছেতাই মার্কা সংকটে অমল-নাম রূপে সমস্ত মানিয়ে কেউ মান্যবর এমন কোথায়? তুমি কতক্ষণ আর আমি কতক্ষণ ভেবে বলো নদীতে ঢেলেছ আলতা যে বাবদে থাকে যতক্ষণ। যেখানেই যাই দেখি পথে যেতে হুংকারে পড়েছি ঝুঁকির ভেতরে আছি, থ্রিলারের মধ্যে পথ দিয়ে ফেরে না গো-ধন আর লাগে না কমলারঙে ছুট অন্ধকারে ঘষা লেগে দেখো যদি জোনাক উঠেছে!
স্বদেশ সেনের বই
কাব্যগ্রন্থ : ছায়ায় আসিও [কালিমাটি প্রকাশনী, ১৯৯৮
দধির অগ্র
আমাকে ছুড়ে দিতে পারতে খুলতে খুলতে খোলা পাখির মতো আকাশকে মহাশূন্য করে বেরোতাম। ভাসতে ভালো লাগে আমার ভালো লাগত তুমি চাইলে আমি ভাসতাম। আমাকে আগুনে দিতে পারতে পাতা আগুন থেকে গোলা আগুনে দিতে পারতে আগুনের সুখ— অহঙ্কারকে ফুঁ দিয়ে আগুনে চালিয়ে দিতে পারতে। রাখতে পারতে বাতাবিপাতায় লেবুগন্ধ করে গুঁজে দিতে বাতাবিলেবুতে ঠেলে দিলে রস হয়ে যেতাম। তুমি আমাকে দধির অগ্রে রাখলে না করলে না ঘোলের শেষ তুমি আমাকে জানালে না কিছু।ঘুঙুরতলা
একটা সব থেকে বেশি সৌন্দর্য দেখেছিলাম মনে নেই কবে এক ঝিলিকে দেখেছিলাম। চোখে খুব লেগেছিল তবু। হ্যাঁ গো লেগেছিল। দৃশ্যকে বাঁচিয়ে তুলে দু’হাত বাড়িয়ে তবু দেখেছিলাম সায়া-স্রোত, বেনারসীধারা। এত দূর বড় হয়ে মনে পড়ে, বলা যায়, এক-ধার কুড়ুল একটা দেখা হলো ঘুঙুরতলায়।
এক ফোঁটা
পাতার ওপরে এই এই এই পড়ল এক ফোঁটা আর ওই যে সারি এক, সারি দুই দিয়ে দাঁড়ানো সুপুরি গাছের সারি দিয়ে বাইরেটা সাজিয়ে আর এই আমি ভেতরে তৈরি হলাম বরং নীল বরং দুঃখী। এ দিকের সমুদ্রপার, তিন ঝড় চার কম্প পার হওয়া আমার কত যে দেখা শোনা বোঝা ছিল। আজ ভাব-গম্ভীর আলোড়ন, যাই বলো তাই বলো করে মাথায় মাথায় দুলছে গণসুপুরির সারি যার পাতার ওপরে ওই ওই ওই পড়ল আমারই এক ফোঁটা।
খেলা
একটা খেলা ছিল মেয়েলি চুল নিয়ে আবদার নিয়ে কত খেলা সুখের নামে চোখ বেঁধে একটা থাকে একটা থাকে শুধু আঙুলে ছোঁয়ার খেলা। এমনও ছিল যাতে ঝাঁকি খেয়ে উত্তেজিত হওয়া যেত ছিল ঘষা দিয়ে আগুন তোলার খেলা নবান্নভুক্ত এখন এদিকে সবাই পান চিবোয় আতাগাছে বসে কলুট তোতা একবার রাধায় পায় তো একবার কৃষ্ণে পায়। আজ কোথায় সারে বন্দেমাতরমগুলি শুনি কোথায় মিলমিলাপ মুশায়রা তাপ বিনিময়ের খেলা আজ জানে কে জানে কে উথালপাথালের রীতি? জানে একটা খেলা সব গুষ্টিশুদ্দু সবাই জানে খেলা ভাঙবে বলে খেলা।আমার বিষয়বস্তু
আমার বিষয়বস্তু মুখে একটা ফুলকাটা দাগ। তুমি আছ, আম্মো আছি, তামাম বিষয়বস্তু আছে গোলাপে গোলাপি আর জলে তার জল-ছলাৎ বাজি যেমন পেতলখণ্ডে মেজে তোলা সোনা ভাব আছে। তুমি তো অনেকটা ভালো তাই তুমি সুন্দর বিষয় এক কামড় খাওয়া আমি, দু’কামড়, আমিও বিষয় তিনি, যে কাছায় হাত, তিনি এক তৎকাল বিষয় হাতে হারিকেন মুখ, কালো জোব্বা, কয়েন-সন্ধানী। ভোর ভঁয়ো ভোর ভঁয়ো ভোর হলে খালাস রয়েছে সৎমুখ, সৎপাত্র আছে, বাথরুমেও যা-কিছু রয়েছে ফলের খিদেটি আছে জলের তেষ্টাটি ধরে ধরে সরলা বহিন আছে ভেসে যায় সায়া-সরোবরে। আরোই রাখতে চাই, দেবে কেউ, ভবা কী দিবি রে ওই তো লাউডগা টান, গামছা তেল জল সাবান লোক ঝাঁকের ব্যালকনি-পাখি, কত ফুল ফল পাতা ডাল হাত পা ছড়ানো আছে, সন্দেশ কামড় আছে চোখে। গোলাপি পাকড় আছে, অন্নলাগি গোটা সেদ্দ রাত আছে কষ্ট-গুণ নিয়ে অন্ধকারে আহত এক দুই ইমন ঠন ঠন আছে, বরবাদির ভেতরে বরবাদ তবুও বিষয়বস্তু মুখে একটা ফুলকাটা দাগ।ব্রেকফাস্ট টেবিল
তুমি যদি ব্রেকফাস্ট টেবিলে যা নেই আর যা নয় তাই বলতে চাও আমি তবে শুনি বনবিভাগের বনে যে পাখি তার গান কী হয়েছে কী হবে না বুঝেই যখন ভাবতে থাকো ভাবনায় ব’সে আমি তখন ছাদের পরে ছাদে কাউকে বলি, দে তো রে দোতারা। এই যে উদ্বেগ উদ্বেগ এই যে ব্যাকুলতা ব্যাকুলতা এর কী উপায় কে জানে যা আসে ভোর দরজা ঠেলে আসুক যেমন পাউরুটিটা ভালো, ভালো হ্যাম আজকের এই পৃথিবীতে আমরা কিছু ভালো জলখাবার চাই এমনিতে ঠান্ডা জলে ওমনিতে গরম জল যেমন ঠান্ডায়। পাঁচটা মেয়ের বাবাও তো বাবা তার কবে থেকে বাবার ভাবনা আমি বলি কী, কেন মিথ্যা বলব, ভাবনা না জাবনা ভোরবেলার দরজা খোলো, ওকে ডাকো, খোকন খোকন খোকন এদিকে চেয়ারগুলো অনেক করে অনেকবার পেতে রেখো তখন।কবিতাসমগ্র : স্বদেশ সেনের স্বদেশ [কৌরব প্রকাশনী, ২০০৬
কাবেরী পাখি
যে কোনো শস্যক্ষেত আমাকে ঘরের থেকে সহজেই ডাকতে পারে ততোমধ্যে আমি এক জন্মসুত্রে বাঁধা বুঝতে পারি কী ভাবে জীবিত বাংলায় জন্মে এতস ব উত্থানে জেনেছি পতনে জেনেছি বিদেশি প্রবাসী হাওয়া তারাও কি কম কিছু—কম তো ভাবি না। মাগো শব্দে আমি ডাকি আর কোন ডাকনাম জানি না এ বয়সে আর মাগো তুমি নয়া শৈলী, মাগো তুমি বক নদী, মাগো তুমি কী-জানির বিভা। জন্মেই মরেছে যারা তারা সেই এক জাতি, এক ডানা, এক ডাকনাম তাদেরও। মণিময় চন্দ নামে একদিন একটা পাতা মূল্যবান ছিল সে যে কবে হারিয়ে যে গেল সেই অনেক কাবেরী পাখি কে আর বুঝিয়ে বলবে হাত ধরে। আমি আর নামে নেই দেখি কে কী করে, কে কী বলে, কী ভাবে বা বলা দেখতে বলি সেই দেখা আমার ক্রমপ্রসারিত বটের ক্ষেতটি যাতে একবার দেখো তিসি বৃক্ষ ডেকে বলছে, কী বলছে শুনছ তুমি কানে শুনতে পাও তো? উঠোনে নতুন মাটি গোবর লেপন করে একটা মাধ্যম বলে মনে হলে আমি আর কোনো ডাকে কিংবা ডাকাডাকিতে আর যেতে চাই না, এই মন বলে তুমি কৃষ্ণস্তন, একবস্ত্রা, বাঙালি জননী।স্বদেশ সেনকে নিয়ে লেখা গদ্য : সাজমহল ও উচ্ছ্বাস-বিজ্ঞান