ভারতের তৎকালীন বিহার রাজ্যের জামশেদপুরে কবি শংকর লাহিড়ীর জন্ম। তাঁর কবিতার বই ৪টি। কলমের পাশাপাশি ক্যামেরাতেও সচল তিনি; বিশেষভাবে আগ্রহী তথ্যচিত্র নির্মাণে।
কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য...
কাব্যগ্রন্থ : শরীরী কবিতা, কৌরব প্রকাশনী ১৯৯০ রচনাকাল : ১৯৭৯-১৯৮৯
ঘ্রাণ
❑❑ হাওয়ায় বিনাশী ঘ্রাণ ভেসে আসে ক্রমে গান, ক্রমশ শিহরন; গাঢ় হয়ে আসে রস ফুলের ও ফলের হাতের গোলাপি রেখা, ঠোঁটের সূক্ষ্ম দানাগুলি। যে নক্ষত্র আলোকময়, যা আর এখন নক্ষত্র নয় স্পন্দনের সেই সব সকল পর্যায়ে জেগে ওঠে রঙ : কালো ও গোলাপি, —এই প্রধানত, কোথাও সবুজ কিছুটা খয়েরি, কিছু রক্তবর্ণ, সুনীল ভিতরে। আসে এক ঘ্রাণ ভেসে, দূরে যায় ধরা যায় ইজেল ও তুলিতে, সমস্ত ফলের দেহে ক্রমে,— কালো ও প্রকাণ্ড এক উদয়ের যে ঘ্রাণ বিনাশী।অসমাপ্ত কথারা : আজ ভোরবেলায় যা যা দেখলাম
❑❑ নিয়ন্ত্রণ ছিঁড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে শিকারি কুকুর সবচেয়ে বড় ডালিয়ার দিকে তার লাফ হাইড্রান্টে জলের চাপ বাড়ছে শিমুল ফুল ঝাঁট দিতে পথে নেমেছে পুরকুমারীরা ফুটপাথে পড়ে আছে তাদের জলখাবার গেলাস বাটি চামচ কাল রাতের শেষ ফিয়াটের টায়ার চিহ্নে সূর্যের কাঁচা পাপড়ি খসে পড়েছে; সকালের প্রথম ফিয়াটের জন্য তার অপেক্ষা গলি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একা হাবিলদার, তার পাজামার পকেটে গতরাতের বাসি পাকৌড়ি লিট্টি সারাদিনের জন্য হাওয়া ভরে নিচ্ছে একটা দু-চাকার সাইকেল রাত-ডিউটি শেষে এক ঝাঁক নার্স হাসপাতালের টানা গেট দিয়ে বেরিয়ে এল; দিনের প্রথম নীরবতা ওরা রক্ষা করেছে পরিত্যক্ত রানওয়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা লাল অন্তর্বাস পড়ে আছে ঘাসের জঙ্গলে একটি শব; তাকে জাগাবে বলে উড়ে আসছে দীর্ঘ ডানার পাখিরা।দেখি সুষমাকে
❑❑ ওখানে সুষমা থাকে, ঐ তার ঘর ঘর নয়, চৌকো লাল একটু উচ্চতা যেখানে সে চুল বাঁধে,—যাবে সে সমুদ্রে একদিন সমুদ্রের দিক থেকে দেখা যায় সুষমার বাড়ি জলে ভাসে মাস্তুল, ভাঙা নৌকোর পাটাতন যা কিছু ডোবে না জলে, সমস্তই সমুদ্রে রয়েছে একবার ওঠে ঢেউ, একবার ঢেউ ভেঙে পড়ে জলের গভীর তল অন্ধকার পাথরের বাড়ি সেই বাড়িটির থেকে সুষমার বাড়ি দেখা যায় দিগন্ত চিহ্নিত জল, নীল ও সফেন জলরাশি পরপারে লাল বাড়ি, বেণীবদ্ধ নগ্ন সুষমা।চাঁদিপুর - ১
❑❑ বুড়িবালামের তীরে নৌকো লেগে আছে, সমুদ্রসংকেত। এরকমই একবার শ্মশানের সামনে দাঁড়িয়ে— ফিরে যাওয়ার কিন্নর ডাক; কাশফুলের ছায়ায় একা পাখি, তার নীলকণ্ঠ ভিজে উঠছে জলের গন্ধে; সূর্যদ্বীপের পরিপূর্ণ মদ ঐ অবগাহন তুমি ঠেকাতে পারো না ফিরে যাচ্ছে বন্ধ ঝিনুক, তার শেষ টান জলের লাল কাঁকড়ার প্রাণে স্মিত ধীর বালির গরিমা। বাস্তবিক বাতাসে আজ হা হা করে উঠছে শাটার কত কিঞ্চিৎ ঐ ছড়ানো নাইলন তোমার গুটিয়ে উঠছে ইথারের চেয়েও পারঙ্গম, ফৌজি অশ্বগুলো নেমে আসছে দূর নক্ষত্রালয় থেকে পারলৌকিক স্রাবে, বালির বিজনে; ভাঙা ইঁট, পদচিহ্ন মৃত শামুকের মেরিন ভ্রুভঙ্গির মতো আলোকবর্ষগুলো— নেপচুন পাহাড়ের হাতিদের তীব্র বৃংহণে আজ উত্তাল হয়ে উঠেছে জল, সম্রাটের ম্লান পতাকাগুলোকে তারা ঢেউয়ে ঢেউয়ে গড়িয়ে নিয়ে চলেছে মহীসোপানের দিকে।বিপন্ন মহিষগুলো ডাকছে
❑❑ সন্ধ্যায় বৃষ্টিতে বিপন্ন মহিষগুলো ডাকছে। আরব সাগর থেকে জল এসে লাগছে তাদের বাঁটে আর নুনে ভরে উঠছে দুধ; গায়ে আটকে যাচ্ছে ছোট ছোট ঝিনুক ও জেলিফিশ। একটা উল্কাপিণ্ড এসে পড়ছে খড়ের গাদায়, চাঁদের প্রান্তবর্তী টুকরোগুলো এসে পড়ছে মহিষের খাবারে আর প্রধান রাস্তা দিয়ে দুধ বয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্যে শহরের উদ্ভ্রান্ত সমস্ত রাখাল, তারা বেহালা বাজাতে জানে না, ভয়ে জড়িয়ে ধরছে আপন মেয়েমানুষদের; মেয়েমানুষের লাল আলোয়ানে মুখ লুকিয়ে কাঁপছে তারা আর অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে সন্ধ্যায়। মেয়েরা, মকাইয়ের গন্ধ যাদের সমস্ত শরীরে, হাতে নিয়ে দেখছে ঐ উল্কাপিণ্ড ও ছোট ছোট ঝিনুক, জল এসে লাগছে তাদের স্তনেও। একটা কাঁপন এসে লাগছে জরায়ুতে; হিম গুঞ্জনময় জলে গর্ভ ভরিয়ে তুলবে এই সম্ভাবনায় আবেগে শিহরনে তারা দুলে উঠছে। বিদ্যুতের আলোয় চমকে উঠছে মহিষ ও দূরগামী রাজপুরুষেরা।সস্প্যান
❑❑ সাদা সস্প্যানটি ক্রমে কালো হয়ে উঠছে বিন্দু বিন্দু জলে মুখ ভিজে যায়, কাঁপে ঐ কালির মধ্যে আছে কার্বন ও রন্ধনপ্রণালি আর এক রুদ্ধশ্বাস আবেগ গহ্বর। কত সস্প্যান ও ব্রেকফাস্ট টেবিল ঘটে গেছে চাকা ও দড়ির কারুকার্য কত রকমের চাবুক ও সসেজ ভালো স্ট্রবেরির জন্যে আয়োজিত ঈষদুষ্ণ জীবন উষ্ণতার জন্য কত সস্প্যান ক্রমশ কালো।কফি
❑❑ আমায় টেবিলে ডাকো, দাও কাপ, দাও প্রস্তাবনা বাতাসে অনেক দুধ, আলোয় অশেষ চিনি আছে যেতে চাই কোনও দূরে স্পষ্ট কোনও মাইলমিটারে দেখো ডানা সংকুচিত কিনা সম্পূর্ণ মেপে ভেঙে প্যাক খুলে দাও যেন গলে যেতে পারি এবার কাপের মধ্যে; —জেগে আছে উজ্জ্বল চামচ আর কফিটুকু তৈরি হয়ে যাক। আমি টেবিলের এক প্রান্ত থেকে অন্য পাশে ঘুরে এসেছি তোমার কাপে, সেই মাপে তুমিও ঢালো কী তোমার সকল দুধ তোমার সমস্তটুকু চিনি তুমিও কি লিপিবদ্ধ রন্ধনপ্রণালি ভালোবাসো কাপের গহ্বর ছেড়ে উঠে এসে কফি থেকে ক্রমে তীব্র এক ঘ্রাণ এসে ঢুকে পড়ে ভ্রূণের ভেতরে, —ক্রমে চঞ্চলতা আসে ঠোঁটে গর্ভে অজস্র ডানায়।নীল বোতাম
❑❑ জল: এক দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ নীল রঙ যেখানে সৃষ্টি হয়েছে; আলো: ঐ সুড়ঙ্গের প্রান্ত-ঢাকনা । উজ্জ্বল একটা ছুরি ও আগ্নেয়াস্ত্র শিরাকাটা চিৎকার, এক প্লাবন উষ্ণ গোলাকার তীব্র ব্যান্ডেজ আর সর্বব্যাপী আঘাত। হাওয়া : উড়ছে স্বচ্ছ লাল তুলো জলকণারা তাদের ঘিরে ফেলছে ঘিরে ফেলছে কয়েকটি দীর্ঘ নিটোল আঙুল। একটি আঙুল ঢাকনা খুলে নেমে আসছে ক্রমে ধীরে সুড়ঙ্গে অদ্ভুত বোতামে; মৃদু গুঞ্জনময়, সারিবদ্ধ নীল ঐসব বোতাম।দেওয়াল ও বিছানা
❑❑ বরফের তৈরি দেওয়াল, কাঁটায় আকীর্ণ বিছানা আর গান : তোমারে ভালোবেসেছি। শব্দগুলি শ্লথ, অক্ষর কাবু ও নড়বড়ে, ফুলে উঠছে যদিও সুরগুলি তাঁবুর মতো, বসবাসহীন ঘুমঘোর কয়েকটি চেয়ার। একটি পা দীর্ঘ হয়ে বেরিয়ে আছে বিছানা থেকে। ডাকছে ঐ তাঁবুর ভেতর কয়েকটি পাখি; ব্রোঞ্জের তৈরি ডানা, পিপাসা, ও চোখ বিস্ফারিত। পরাজয়, অথবা অসহায় শিঙওয়ালা একটি হরিণ; দেওয়াল, অথবা ধসে পড়ার এক চেতনা; বিবাহপ্রস্তাব, অথবা ক্রাচে ভর দিয়ে এক পা এক পা চলে যাওয়া; ঐ বরফের দেওয়াল ও কাঁটায় আকীর্ণ বিছানা ।ডাক
❑❑ বসন্তকে ডাকছে বসন্তের ফুল; সময়ের দুই পাড় জুড়ে অরণ্যে ছড়িয়ে পড়ছে সেই ডাক; ডাকছে গর্ভফুল পুরুষ ও নারীকে, পাতায় তৃণমূলে পরাগে; ডাকছে নক্ষত্রকে নক্ষত্রের ফুল ম্যাজেলান মেঘ থেকে তীব্র সুরে সুস্পষ্ট প্রস্তাবে— তৈরি হচ্ছে অম্লজান, জল ও জলের বিদ্যুৎ। ডাকছে বস্তু ও অবস্তুর ফুল, বস্তু ও অবস্তুকে। চলেছে গভীর স্রোতের দিকে আগ্রাসী মাছের ঝাঁক, নেমেছে পিঁপড়ের স্রোত শবদেহে। ওগো পিঁপড়ে, মাছের ঝাঁক, পরিত্যক্ত বন্দরের রান, হে বনমর্মর, জলপ্রপাত, কসাইখানার ভিজে পাম্পশ্যু, বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন মাংসপেশি, ইস্পাতের পাত, ওগো পরিচারিকা, দ্রাক্ষারস, মোমবাতি, সন্তানসম্ভবা নারী বলো, —শুনছি, শুনতে পাচ্ছি, শুনিতে পাইতেছি।
ট্রাজেডি
❑❑ একটি ট্রাজেডি দেখি প্লেট ভরে আছে হিম, আয়তাকার, বিন্দু বিন্দু নীল ও তার সোনালি রস উপচে পড়ছে টেবিলে। প্রত্যেক টেবিল তাদের চারটে পা ও তিনটে চেয়ার সাদা লিনেন ও সরু দাগটানা ধূসর গ্যাবার্ডিন গরমজলের ব্যাগ ও রুমাল ও তাজা মচমচে বাদামি জুতোগুলো ক্রমশ ভিজে যাবে ঐ সোনালি রসে, একটি প্লেট নীল হয়ে পড়ে থাকবে, আজ প্রত্যেক টেবিলে এই সম্ভাবনা।জাগালে তুমি
❑❑ জাগালে তুমি আমাকে আজ ভোরবেলা; দেখালে চায়ের কাপ, জল বাষ্পীভূত, আর শিমুল গাছের দৈব নির্যাস ঝরে পড়ছে ভিখিরি মেয়ের পদতলে। পদতল! চেনালে এই শব্দরাজি, শোনালে স্রোতের শব্দ; পরপার থেকে ডেকে নৌকো থামিয়ে তুলে নিলে; দিলে প্রেম, দিয়েছ সখ্যতা। দিয়েছ আখের রস, বনানী নামের মেয়ে দেওদার নামের গাছগুলি। গিয়েছি অনেক দূর জলের স্রোতের উৎসে, এইমত পদচিহ্ন চিনে হারিয়ে গিয়েছি বনে, হয়েছে বসন্তজ্বর দেখেছি হিংসা নামক তীক্ষ্ণ ছুরি। দেখা হলো সন্ধ্যায়, মাঝরাতে, দ্বিপ্রহরে, ভোরে পাখিদের মৃত্যু হলো, পুষ্পের মৃত্যু হলো কত কল্পনার মৃত্যু হলো।থলকোবাদ - ২
❑❑ অরণ্যের স্পর্শ আজ আমাদের শিহরিত করেছে। জ্যোৎস্নায় দ্বিতীয় গিয়ারে ওঠে চাঁদ, চাঁদ ভেঙে পড়ে; কে যেন ডেকেছে আজ আমাদের, শিকারি রোডের গেট আহ্বানে খুলেছে সহসা, যেন কে ডেকেছে আজ আমাদের; —দৈব দাবানল নিয়ে এইমাত্র খেলা শুরু হলো। এসো তুমি মধ্যখানে, জ্যোৎস্নায় সম্পূর্ণ জোয়ারে চালক-আসন ছেড়ে জিপের পিছনে এসে বসো বসন্তরাতের মদ ঢেলে নাও পাত্র থেকে, ক্রমে সন্ধ্যা নেমে আসে থলকোবাদে। এবার সম্পূর্ণ ডাকো, সুরে ডাকো, সুস্পষ্ট বৃংহণে, যেন স্রোত নেমে আসে, দৃপ্তরূপ জঙ্গল-যুবতীর যেন গর্ভকেশরের মধ্যে সেই স্রোত এসে লাগে; যেন তৃপ্ত হয় আমাদের প্রধান অঙ্গ আর পরিস্রুত হয় যেন সকল কণিকা।কাব্যগ্রন্থ : মুখার্জী কুসুম, কৌরব প্রকাশনী ১৯৯৪ রচনাকাল : ১৯৮৫-১৯৯৪
গান এসেছিল কাল
❑❑ গান এসেছিল কাল ফলের আকার নিয়ে আমার টেবিলে তাতে আমি দু-কামড় দিয়ে দেখেছি, ভরেছে মুখ ফলের অপূর্ব পীত রসে। জেনেছি, এমন ফল এ বাজারে সহজে মেলে না বহুদূর অরণ্যপ্রদেশে কুয়াশা অধ্যুষিত দুর্গম পাথর পেরিয়ে এই ফল এসেছিল আমার টেবিলে, আমি কিনেছি অনেক দামে তাকে। আমাকে বাগানে আজ মুখার্জীরা ডেকে বলে গেছে ও-গানের নাম নাকি সিন্ধুভৈরবী, আর ঐ ফল তারা নাকি প্রতিদিনই খায়। একথাও বলেছে যে আগামী আশ্বিন থেকে এ-ফলের স্বাদ আমি কোথাও পাব না— শুধু মুখার্জীরা পাবে, কেননা তাদের আছে জেলি বানাবার পদ্ধতি।মুখার্জী, তোমার আছে
❑❑ মুখার্জী, তোমার আছে লাবণ্য, চেতনা, নুন, আত্মবিশ্বাস, ক্রিমের প্রচুর তুমি, প্রচুরের ক্রিমের মতন— তোমাকে সকলে চায়, কবিতাও চেয়েছে তোমাকে। এই যে তোমার কাল, একালের অদ্ভুত ব্যাটারি, আপামর চার্জড্ হয়ে আছে— এই যে তোমার জেলি, সুরাসার, দ্রাক্ষারিষ্ট, ক্ষীর, সামগ্রিক পরিক্রমা, ডাবলিউ এবং ডাবলিউ, এই বৃংহণ, এই সফিস্টিকেটেড হ্রেষা ধ্বনি— এ কি তাৎক্ষণিক গুঁতো, এ শুধুই অসার রোয়াবি? আমি তো দেখেছি ভেবে, ভেবে কেন, স্পষ্টই দেখেছি, কিভাবে লাফাও তুমি, হঠাৎ কিভাবে ঝুঁকি নাও । কত অনায়াসভাবে ফল থেকে জেলি তৈরি করো সহসা বিপুল জলাভূমি রূপান্তরিত করো অদ্ভুত রঙিন সুরাসারে । ঘোর অবিশ্বাস হয়, তবু ভাবি স্পষ্টত দেখেছি, প্রায় দেড় লক্ষাধিক লেখা হলো বিপুল কবিতা মুখার্জী তোমারই মাপে। —সকলে আমাকে বলে, আমিও আমাকে ডেকে বলি, হতে হবে মুখার্জীর মতো।কবিতা, ঘুমোও তুমি
❑❑ কবিতা, ঘুমোও তুমি, মুখার্জীও ঘুমিয়ে পড়েছে তোমার দক্ষিণ পাশে, তোমারই স্তনের দিকে ফিরে; —গাঙ্গেয় বাতাস আসে, প্রান্তরে নগরে হাই ওঠে। যা তুমি বলেছ কাল, গত রাতে, আগের সপ্তাহে, যেখানে রেখেছ তুমি অন্তর্বাস, অধিক কাঁচুলি, শব্দ সংযোজন করে, সমাসবদ্ধ হয়ে, ভেঙে —সেখানে তোমারই বেদি, নিত্যপূজা, মাল্যদান হলো। কবিতা কি সহসাই নগর বন্দর থেকে, ঘর থেকে, ক্রমে বিবাহ জীবন থেকে, ফলবাগানের থেকে অন্তর্হিত হবে? —ভাবি আমি, দেখি ভেবে রাত্রি হয়ে নেমেছে আঁধার। মুখার্জী ঘুমিয়ে আছে, কবিতাও ঘুমে মগ্ন, তার বাম হাত এলিয়ে রয়েছে পড়ে, কামচিহ্ন আঁকা আছে হাতে; ফুটেছে শীতের রেখা ; শীতের স্পষ্ট দাঁত প্রতি ছত্রে, প্রত্যেকের ঠোঁটে।শোনো, দেখা হলো
❑❑ শোনো, দেখা হলো, দেখা হলো পরিষ্কার ভোরে... —অমন সজোরে হাত কেন ধরো, শান্ত নম্র হও, শোনো, দেখা হলো, ছদ্মবেশ ধরে নয়, ব্যক্তিগত পাঞ্জাবি চাদরে পাহারা দেবার ছলে, রাত্রিদূত সেজে —কিভাবে যে তুচ্ছ কর, শুনেও শোনো না, কথা কাটো, তবু মনে করো, মনে করো একবার অযোধ্যা পাহাড়ে ভোরবেলা রাত্রির বেবুন-আঁধারের পশ্চাতের স্ফীতকায় লালপিণ্ড ক্রমে সূর্য রূপে কী রকম লাফ দিয়ে উঠেছিল... সেইমতো পরিষ্কার ভোরে দেখা হলো: দেখলাম শহরের রাজপথে, প্রকাশ্য সড়কে থেঁতামুখ কবি,—পাশে পড়ে আছে কবিতা পাথর!অপলক চেয়ে থাকি
❑❑ অপলক চেয়ে থাকি, দেখি ছবি, তোমাকেই দেখি সামান্য মেশাই তেল, দেখি রঙ নরম হয়েছে— এভাবে সামান্য টান লাগে আর কবিতার পালটায় রঙ রঙ পালটায় রঙ পালটায় রঙ। আমি কাহানি সরিয়ে রেখে তোমাকেই দেখি দেখি তুমি সামান্য উদাসী ঋজু, ডাঁটো এবং রসস্থ। চাহনি মদির নয় কিন্তু অনর্গল নিঃশব্দ কথা বলো, কেশদাম খুলে দাও, কর্কশ আঙুল পোষা টিকটিকির মতো ক্লিন্ন, হিম –ফলত উত্তেজক। শোনাও স্রোতের শব্দ, রক্তে কফে তোমার যে স্রোত স্পর্শ করো না কেন? শরীরে কি অসঙ্গতি আছে? —এবার তুলির আমি অন্যপ্রান্ত ব্যবহার করি। দমকা হাওয়ার লাগে সহসা ঝাপট, দেখি কারা যেন নোঙর তুলেছে দোলা লাগে, দুলি দেখি তুমিও তো, নতুন কবিতা, অস্পষ্ট অবয়ব, —দুলে ওঠো, আর ছুঁতে চাও কেশদাম খুলে পড়ে খুলে পড়ে বুকের বোতাম।ফুল পড়ে আছে
❑❑ ফুল পড়ে আছে,— ভাবি আমি ঝরেছে কবিতা বৃন্তচ্যুত হয়ে। আরও প্রবাহিত জল, চিমনি লাল ডোরাকাটা নীল আকাশ মন্থন করেছে। ভাবি আমি এইবার ক্রিয়াপদ বর্জিত হবে রান্নাঘর ধুয়ে দেবে মুখার্জীর নতুন চাকর নয়া পোর্সিলিনে রঙ লাগে। কী খেয়েছ গতরাতে, ছিল স্যুপ, ছিল কি অদ্ভুত সাজানো দাঁতের মাঝে চেরিফল, সম্ভ্রান্ত আপেল খাসির মাংস ছিল উষ্ণ আর্দ্র রসুন গোলাপজল লবঙ্গ আতর। কী খেয়েছ গতরাতে, চাদরে লেগেছে কিছু তার; —মনে হয় সেজেগুজে আছ, নতুন পাতার পাশে সবুজ কলমে আছ তুমি। কী দেখেছ মধ্যরাতে, পিপাসায় শুকনো ফাটা ঠোঁট, —মনে হয় কীটদংশ পাতা, অনন্ত গভীরে জল, ধুলো ওড়ে, দস্যু মরুভূমি।
ক্রমে ওঠে ক্লান্ত হিম
❑❑ ক্রমে ওঠে ক্লান্ত হিম পাতাপোড়া রাতের হিল্লোল ওঠে বল্লরী-জল পিচ ও পাথরকুচি রাশি আগুন কামান রাঁড় রূপসী ও হাফ্প্যান্ট পাগল। ওঠে চাঁদ কবিতার একনায়কের বাম কাঁধে— বেআব্রু ধাতুর পারলিন গেয়ে ওঠে, এরি মাই, আজ শুভ মঙ্গল দিন... কেরানি কলসগুলো ঠং ঠং ঠং বেজে ওঠে। রাগে ঝিম ফোলাগাল বিভ্রান্ত লাট্টুনীল ক্রোধ সহসা পাজামা ছেঁড়ে চিল্লোয় থুতু ছোড়ে গায়ে— অনন্ত সেতুর নিচে নাফিসা নাফিসা স্রোত, কে তবে ঘুমোয় জাগে কারা কে বিষ্ণু পরম বিষ্ণু হিম পাতাপোড়া আনন্দ-আইস গলে, ভাসে ক্রিম রাঁড়ের অন্তর। থাকুক আহারা ওরা বিষ বাষ্প বাছার লেগেছে মুখার্জী, টাট্টুঘোড়া ঢিমে বেতো হাঁপানি ঘঙ্ ঘঙ্ রয়েছে কবিতা-শায়া রক্তজলদাগ তাপ লাগা —রাতের খোঁয়াড়ি শেষে ধোবীঘাটে লেজ নাড়ে ভোর।কাব্যগ্রন্থ : উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ, কৌরব প্রকাশনী ১৯৯৬ রচনাকাল : ১৯৯০-১৯৯৫
জ্যামিতি
❑❑ আমাদের মধ্যে ছিল সমীরণ সবার চেয়ে সুন্দর হ’ত তার বৃত্ত আঁকা । জানালায় যখন কুয়াশা গাঢ় হয়ে উঠত অথবা আকাশ থেকে ঝরে পড়ত স্নানের জল,— আমার কতদিনের পছন্দ ছিল ঐ সমীর ও তার অঙ্কিত রেখা : ‘ধীরে বও সমীরণ’—আমরা গেয়েছি। আমরা কাঠির পাশে কাঠি সাজিয়েছিলাম মাপের পাশে ছিল মাপ; দেখেছিলাম কিভাবে কম্পাসের চাপে বিদ্ধ হয় কাগজ আর একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে একটা সম্পর্ক, যার বক্ররেখা সমতল ছেড়ে উঠে যায়। বহুদূরের ঠিকানায় আমাদের চাকরি ছিল আমাদের চিঠিগুলো চলে যেত মহানদী পেরিয়ে চিনি কারখানার গভীরে আর কাগজের কলে। একদিন মধ্যরাতে ডাক এসেছিল, যেন তীব্র এক জ্যামিতিক ঝড়— আমরা কি বৃত্ত পরিধি, নাকি অসীমের দিকে ধাবমান কোনও রেখা, —সহসা একদিন রাতে এইসব প্রশ্ন উঠেছিল।স্থাপত্য
❑❑ নির্জনতা, তোমার চিবুকবিন্দু লেগে থাক আমার চিবুকে ছেঁড়া কাগজের স্তুপ, কুচি কুচি, হাওয়ায় থার্মালে উড়ে যায় শুধু ঐটুকু চাই আমি যেখানে কেবলই আমার সাথে বলব আর লিখবে আকাশদীপ আকাশদীপের কথা পাথর জিলেটিন বাকল সৈকতবালু ঝিনুকের খোলা একটা ঢিল ছুঁড়ে দিলেই শূন্যশেষ যেন সে ঝিলের জল— তরঙ্গ ক্রমশ ছড়িয়ে যায়, আমারই পায়ে ফিরে আসে বিশ্রাম একটা ক্রেন, একটা ফাঁকা শূন্য ঘর একটা কনভেয়রের থমকে দাঁড়ানো জলস্বচ্ছ স্ফটিক স্তব্ধ আওয়াজ-চুপ একটা বয়লার তার পালক ঝরে পড়ছে একটা একটা একটা... শুধু আমিই গাইব, আমার সুর যতদূর ছড়িয়ে যায় যেভাবে সকলেই গাইতে চায় গোপনপ্রাণ— ওয়াকিটকির ঘুম, জমে আঠা হয়ে আছে ফ্যাক্স মেশিনগুলো লালায় ভাসছে শান্ত স্থির টাইপরাইটার আর কোনও শব্দ নেই, —এত বিস্তৃত অধিকার, দূরে দূরে স্থাপত্য এরকমই, নির্জন ।ড্রাকুলা পুতুল
❑❑ চিন্তা, রোমশ শক্তি, থাবাগুলো প্রত্যঙ্গ ঢেকেছে বালির বস্তায় ঘেরা বাংকারে নেমেছে ভারী বুট বর্জ্য পদার্থ যত, বস্তুরূপ, প্লাস্টিক, টিনের কৌটো, পলিপ্যাক, জুট ও রাবার কাগজের টুকরো কাগজের পিন্ড কাগজের তৈরী শরৎ প্রতিমা— মুক্তিপণ বিবাহবিচ্ছেদ লাশ সনাক্তকরণের রুটিন সিগন্যাল ফেল করা অন্তিম দৌড়ে মেলট্রেন ট্রেডল্ মেশিন, চিমনি ও ফর্জহ্যামার । দমদেওয়া ড্রাকুলা পুতুলগুলো— পুতুলের সর্বাঙ্গে থাবার দাগ, নখ ও আঁচড় নষ্ট উদ্ধৃত আংশিক জোড়াতালি দেওয়া রবিবাসরীয় গান বেওয়ারিশ শবের ঊরুতে কয়েক পোঁচ লাল রং ও বিজ্ঞাপিত বুরুশ ।গোপন দুধের শোক
❑❑ ফল থেকে সময়কে আলাদা করি নি, সঙ্গীরা ফল তাই পেকে ওঠে, আমাদেরও রক্তপাত হয়; অভিকর্ষ-তরঙ্গের প্রবাহিত এক সমন্বয় অথবা সে বৃত্তগামী, কাঁটা দেয় রেখার শরীরে। দেখিনি সমুদ্র-শাঁখ, শঙ্খনাদ শুনিনি সঙ্গীরা রহস্য-আঙুল নেই— মাটির গেলাসে জল কথা ছিল জল ও মাটির সময়ে সৎকারে এসে, চোখের মুদ্রায় পারাপারে বর্ষীয়সী রেখা ডাকে অল্পবয়সী রেখাটিকে; সে আবেশে ফলের শরীর প্রাচীন কণার প্রেত, আধুনিক হেমন্ত-আঁধার ছেনাল মেয়ের স্বপ্নে সমুদ্র-প্ল্যাংকটন জেগে ওঠে। আমার দুহাতে আছে, তোমাদেরও রয়েছে সঙ্গীরা গোপন দুধের শোক, চেনা নাম অচেনা ঠিকানা বোঝা যায় একা আছি, সময়ের অন্তস্থঃ একা অর্বুদ একক বিন্দু সৃষ্টি করে রেখা ও কম্পন।উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ
❑❑ কত রকমের খেলায় ভুলে থাকা যায় ঐ ঘণ্টাধ্বনি। অশ্লীল ও কর্কশ শব্দ, যা বেজে যাচ্ছে আমাদের আপত্তি সত্ত্বেও। বাজুক, শব্দহীন, আর এগিয়ে নিতে দিক আমাদের চরাচর ও পর্যটন। হাইতোলা, আড়ামোড়া, খুনসুটি । আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো খেলব, চুমু খাব, টেলিফোন করব ভুল নম্বরে। একটা দীর্ঘ সরলরেখাকে স্প্রিং-এর মতো গুটিয়ে এনে, একপ্রান্ত ছেড়ে দিয়ে দেখব কী প্রচন্ড বেগে লাফিয়ে ওঠে তেজপূর্ণ রেখাসকল। আমরা নকল করব থান্ডার মেঘের গম্ভীর ডাক, আর যেরকম শব্দে শালের জঙ্গল থেকে লাল পিঁপড়েরা ছড়িয়ে পড়ে গভীর শিকড়ে। —সেই শব্দ শোনাব আমরা ফাঁকা খনিগর্ভে নির্বাচিত বন্ধুদের। একটা ইস্পাতের দাগের গভীরেও ঝাঁপিয়ে নামতে পারি আমরা, কেননা আমরা সর্বত্র যেতে চেয়েছি। যেখানে যত প্রশ্ন রয়েছে,— প্রশ্নই আমাদের প্রাইম মুভার । আমরা দিন-মাস-বছর ধরে খুঁজতে পারি শিরায়-নাভিতে-শীৎকারে জন্মে ও হত্যায়, নতুন সম্পর্ক সৃষ্টিতে, —কোথায় রয়েছে সেই সমূহ উত্তরমালা। বেরিয়ে এসো উত্তরমালা মাতৃগর্ভ থেকে, ছাপাখানা থেকে, অশ্বত্থ বৃক্ষ থেকে ; কাম আউট আনসার শিট্স্, —সোয়াইন, ঘাগু, যুদ্ধবাজ, হিমায়িত ফসিল থেকে উত্তরমালা, বেরিয়ে এসো প্লীজ ।কাব্যগ্রন্থ : বন্ধু রুমাল, কৌরব প্রকাশনী ২০০৪ রচনাকাল : ১৯৯০-২০০০
সময়-চাদর
❑❑ সময়-চাদরের এক প্রান্ত থেকে গড়িয়ে যায় বল সে বল আস্তে ধীরে বাঁক নেয় বক্ররেখায় অর্জুন গাছের দিকে— অর্জুন গাছের নিচে মহাকাশ অন্ধ-গহ্বর। ভাবি আমি, তবে কেন আমাদের বন্ধু সমীরণ নীল জিন্সের প্যান্ট, বাহুতে বান্ধবী আর তার পানপাত্রে মদ— দেখি আমি আমাদের বন্ধু সমীরণ হাতে গল্ফের স্টিক, কোর্সে নেমেছে প্রাচীন গাছের কাছে, অন্ধ গহ্বরের কাছাকাছি। সময়-চাদরের এক প্রান্ত থেকে দোলা এসে লাগে শরীরী তরঙ্গ এক; এত সে মাংসল স্থূল জৈবগন্ধী তীব্র এত টান, এত তীব্র কম্পিত চাদর আলোর সকল কণা শুষে নেয়, সহসা আলোর কণা সকল আঁধার হয়ে নামে । ডাকি আমি : কোথায় বন্ধু তুমি কোনদিকে বান্ধবী আমার ? কোথায় বন্ধু তুমি কোনদিকে বান্ধবী আমার... —অর্জুন গাছের নিচে মহাকাশ, স্রোত ও গহ্বর।সমুদ্র শিকার
❑❑ জেলেরা মাছ ধরতে যায় দূর সমুদ্রে ; সমুদ্র থেকে তুলে আনা প্রত্যেক মাছের বদলে তারা সাগরে দিয়ে আসে স্থলভূমির একটা মাছ— এইভাবে প্রতিবার তারা জলে ভাসিয়ে দেয় তাদের অহংকার। যখন তারা রৌপ্যমুদ্রা নিয়ে ঘরে ফেরে তিন চার পাঁচদিন সমুদ্রে কাটানোর পর তাদের বুদ্ধমূর্তির মতো দেখায়। —একবার গিরিগুহায় দেখেছিলাম এক বুদ্ধমূর্তি; দীর্ঘকাল ঝঞ্ঝাবাতাসের সাথে যুদ্ধ করে ঊর্মিমালায় ভাসতে ভাসতে ফিরে এসে তিনি ধ্যানে বসেছিলেন। জেলেরা যখন সমুদ্র-শিকারে যায় মহাকাশ থেকে তাদের লক্ষ করে কয়েকটা উপগ্রহ, যখন বন্দরে বন্দরে লাল আলো জ্বলে আছড়ে পড়ে ঝড় জেলেপাড়ায় কান্নার রোল ওঠে আর সহসা নৌকোগুলো তলিয়ে যায় মহাসমুদ্রে। তখন ঐ বর্তুল নীল উপগ্রহরা বহুদিন তারা অপেক্ষায় অপেক্ষায় ঘোর জলের ওপরে স্পন্দিত হতে থাকে ক্রমে, একে একে তারা ছেড়ে চলে যায় সেই সলিল চলে যায় অন্য দ্রাঘিমায় যেখানে নক্ষত্রের আলোয় ঘন অন্ধকারে মাছ ধরে আরও পারঙ্গম জেলেরা।রোদ উঠেছে
❑❑ আজ আবার রোদ উঠেছে আবার একলা একা হয়ে হাঁটা, নদীতীরে শিশিরে চিবুকে ঘুমের হাই ‘হাই সজল’, —মেয়েটা ভোরবেলা ডাকবে । জল... শব্দ... অক্ষর... কাগজ... —আজ এইভাবে সজল হাঁটবে; গন্ধ ও আক্রমণ, চিৎকার ও কোমল, দুদিকে এমন দুলবে মনে হবে এসবই গন্তব্য— একটা সকাল ভেঙে টুকরো হয়ে গেলে মনে হবে একটা গোটা জীবন অতিবাহিত হলো। এখন প্রত্যেক সকালেই আমার ভয় করে, মনে হয় কেউ পরিয়ে দেবে তার নির্বাচিত পোশাকগুলো অথবা বলবে, এখন থেকে ক্রাচে ভর দিয়েই হাঁটবে তুমি। হাওয়ায় যখন সাইরেনের শব্দ বাজবে জানালার ওপারে এক উদাসীর নূপুর মনে হবে শহরের গভীরে কোথাও হিংসা শুরু হয়েছে, বারো তলার নির্জন বাথরুমে ঝুলে থাকবে একটা ফাঁস সকালের ঝলমলে প্রচুর রোদ লাশ দোলায়িত, দুলবে।অতিকায় নীল ড্রাম
❑❑ পাহাড় চূড়া থেকে গড়িয়ে নামছে একটা অতিকায় নীল ড্রাম, কোথাও থামবে না সে নামছে নীল ড্রাম গড়িয়ে, অশ্লীল ও কর্কশ শব্দে ঝংকার তুলে। কে তাকে বাজাবে, বলবে কে তার নম্বর ও উপাদান পথ এখন প্রশস্ত ফাঁকা, সূর্যাস্ত আসন্ন —ঝিম গন্ধে ভরে উঠেছে বাতাস। শঙ্কিত কবিকুল, তারা এর বিষয় জানে না অধ্যাপকরাও শংকিত ; আর যন্ত্রবিদরা নানা দিক থেকে ছবি তুলবে বলে তারা তৈরি হয়েছে; এসো, নিচে নেমে এসো মহান নীল ড্রাম পিষ্ট করো আমাদের, কালো নক্ষত্রের মতো হু হু শব্দে ছড়িয়ে পড়ুক তোমার পিচ্ছিল রস। নামছে নীল ড্রাম গড়িয়ে পাকা আখরোটের মতো যার খোল, লোমশ অসংখ্য দাঁড়া। এখন প্রতিবেশীর দরজায় কান পাতলে চোখ রাখলে সন্তানের চোখে শুনতে পাওয়া যায় তার কর্কশ ঝংকার, স্পষ্ট তাকে দেখা যায় ।কবিতাসমগ্র : সমুদ্রপৃষ্ঠাগুলো, কৌরব প্রকাশনী, ২০১৪
নীলকাগজ - ১
❑❑ আমি লিখছি আমারই জন্যে এইসব লেখা কাগজে কলমে জলছবিতে, কাঠখোদাই করা ঢালাই করা ধাতুর গায়ে, মৃৎপাত্রে জঙ্গল-লতায়, মনে হয় আপনাকে একদিন পড়াব, অথবা হয়তো পড়বে না তুমি কোনোদিন যা কিছু কবিতা গল্প নাটক সুর নক্ষত্র মৃগশিরা আমার চিন্তায় প্রাণে বাক্যবন্ধনে রেখায় হঠাৎ করে কাগজ কলম নিয়ে আহাম্মক অথবা প্রকৃত প্রেমিকের মতো যা কিছু তোরঙ্গসন্ধানী, ড্রয়ারের গহ্বরে, অবচেতনে কার্নিশে বেসমেন্টে হিপ পকেটে গোপন ফ্লপিতে লুকিয়ে রাখা যা কিছু, অথবা নীল কাগজে টুকরো ছেঁড়া ফেনিল হিজিবিজি হিংসুটে আমি যা কিছু লিখেছি তা নিজের, শুধু নিজের জন্য, সিপাহি বা সম্পাদক ও চাঁদা-দেওয়া গ্রাহকদের জন্য শুধু এ-লেখার ওপরাংশ যা নিয়ে ইচ্ছে করলে আপনি সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে পারেন সোফায় সেক্রেটারিয়েটে মেট্রোয়, চুলে ক্রিম লাগিয়ে জুতোর ফিতে অথবা সিট-বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে ভাবতে পারো এইসব লেখার ক্রিয়াপদ বিশেষ্য, বহুব্রীহি, মীড় ও গমক যা তোমাকে নিয়ে যায় না কোথাও ; ভুল ঝাঁকানি দেয় টান দেয় ড্রিপ-টিউবে, অক্সিজেন নলে কিম্বা উদাসী নার্স আনে গরমজলের ব্যাগ আর পায়ের ওপর টেনে দেয় কম্বল, দেয় শক্তিবর্ধক ভিটামিন— কিম্বা বিল আনতে দেরি করছে ওয়েটার আর আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না ক্রেডিট কার্ড ও ফটো-আইডি এমন সময় খাবার পরিবেশিত হলো! এমন অনেক শব্দ আছে আবেগ ভাষা রক্তচাপা বাক্যবিন্যাস যা আমি নিজের জন্য সৃষ্টি করেছি, কী করে বসাব পাশে এমন অনেক ভালো খাবার আছে যার কাছে লঘু হয়ে যায় সকল চেতনা প্রহার অভিমান শুধু লালা ঝরে, কষদাঁতে লেগে থাকে সম্ভ্রান্ত মশলার গন্ধ আমি খাবার টেবিলে তোমাকেই পাশে চেয়েছিলাম। আপনার স্ত্রী বিবাহিত মৃদুভাষী চতুর্থ অধ্যায় আমি দীর্ঘ উপন্যাস যার পেপারব্যাক এডিশনে বিচ্ছেদব্যথার ঘ্রাণ পাই তার সুরায়িত অ্যারোমা পাকিয়ে উঠে যায় বিজন থার্মালে যখন শব্দের বাগানে ঘুমের ঢল নামে ভিআরেস-আদৃত জনস্রোত হারিয়ে যায় বৃন্দগান লঘু অন্ধকারে তারা খেলাধুলোর ভারি পর্দা বন্ধ করে দেয় রাতের ঢাকনার ভেতর থেকে খাবারের গান ও গন্ধ ভেসে আসে দিনের; যে বাদ্যযন্ত্র ও তাল খানসামা ও সাগরেদের, রূপসী ও কর্মকর্তার যার সুর ও খাবার নিয়ে অসুবিধে হয় পারকিনসন ও সেরিব্রাল পাল্সি যেন কেউ তৈরি ছিল না শুধু সা-পা টিপে গাইতে এসেছে। সুর ভুলে চলে গেছে অন্ধকারে পা টিপে টিপে এমন সময় সবাইকে চমকে দিয়ে হাসি হৈ হৈ একটা দিন মাস বসন্ত পাতা শেষ হয়ে যাওয়ার মতো সবুজ হলুদ পার্পল পাতা নখ চুল বিবাহ বয়স প্রেম শেষ হয়ে যাওয়ার মতো ছুরি কাঁটা মেরুন ন্যাপকিন এমন অসময়েও খাবার পরিবেশিত হলো। সমস্ত লেখাই অসমাপ্ত, প্রথাহীন ছন্দহীন যা কিছু দ্বিধাহীন বৃক্ষচ্যুত, বাতিদান, মেরুন ন্যাপকিন, যা পুনরায় ব্যবহৃত হবে কঙ্কাল অস্থিভস্ম সুর ও সরগম...
শংকর লাহিড়ীর বই