সম্ভবত, এই সিনেমাটি না দেখলে কখনোই আমার চলচ্চিত্রের প্রতি বিশেষ আগ্রহ জন্মাত না, কিংবা চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশোনা বা লেখার কোনো ইচ্ছাই তৈরি হতো না, এবং এই যুগোস্লাভিয়ান সিনেমাটিই মূলত আমাকে বাধ্য করেছে জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো চলচ্চিত্র নিয়ে লিখতে। শুধু তাই নয়, এই সিনেমাটি দেখার পরই শুরু হয় আমার বিশ্ব-সিনেমার যাত্রা, আর সেজন্য পেত্রোভিচকে জানাই অসংখ্য ধন্যবাদ, এমন অনবদ্য একটি সিনেমা আমাদের উপহার দেওয়ার জন্য।
সিনেমাটি ১৯৬৭ সালে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম হিশেবে অস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা জিততে না পারলেও, একই বছরে কানস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জিতে নেয় স্পেশাল জুরি প্রাইজ।
১৯২৯ সালের ১৪ই জানুয়ারি ফ্রান্সের প্যারিসে জন্মগ্রহণ করা এই পরিচালক ১৯৪৭-৪৮ সালে প্রাগ-এর ‘অ্যাকাদেমি অব পারফর্মিং আর্ট’-এ চলচ্চিত্র পরিচালনার ওপর পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু চেকোস্লাভিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরুর কারণে তিনি শিক্ষা শেষ করতে পারেন নি, ফলে তাকে স্বদেশে ফিরে আসতে হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালে তিনি বেলগ্রেদে ‘শিল্পের ইতিহাস’ বিষয়ে গ্রাজুয়েট করেন। বস্তুত, তিনি ছিলেন ৬০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ান সিনেমায় প্রভাব বিস্তার করা ‘নোভি ফিল্ম’ (নিউ ফিল্ম) আন্দোলনের একজন প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সারির পথিকৃৎ। ১৬৯১ সালে তার নির্মিত ‘টু’ সিনেমাটি এই আন্দোলনের পথ পোক্ত করে, এবং ১৯৬৫ সালে নির্মিত ‘থ্রি’ সিনেমাটি পুরো আন্দোলনের সবচেয়ে পরিণত ও উচ্চমানের সিনেমা হিশেবে আমাদের সামনে হাজির হয়।
যদিও সে সময় ‘নোভি ফিল্ম’ আন্দোলনের তেমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল না, তবে একে ৬০-এর দশক জুড়ে যুগোস্লাভিয়ার সামাজিক পট পরিবর্তনের অবস্থান থেকে দেখা যেতে পারে, যেহেতু সমাজ তখন বৃহত্তর গণতন্ত্রায়ণ ও বিকেন্দ্রীকরণ একটি ধাপের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, সেহেতু চলচ্চিত্র-নির্মাতারাও শুরু করেছিলেন আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে পৃথক বৃহত্তর শৈল্পিক অভিব্যক্তি ও অধিক স্বাধীনতার অধিকার দাবি করতে। তারই সূত্র ধরে ১৯৬৭ সালে ‘স্কুপইয়াকজি পেরজা’ মুক্তি পায় এবং দ্রুত তা আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও প্রশংসা অর্জনে সক্ষম হয়, যা পেত্রোভিচকে ইউরোপিয়ানদের মধ্যে প্রথম সারির পরিচালকে উন্নীত করে। মূলত এই সিনেমাটিকে বলা যায় ‘যুগো-জিপসি’ সিনেমার পথিকৃৎ, যার সূত্র ধরে পরবর্তীতে এসেছে এমির কুস্তোরিকার ‘দ্য টাইম অব দ্য জিপসিস’ ও ওরান পাক্সালেভিচের ‘গার্ডিয়ান এঞ্জেল’; অথচ দুটো সিনেমার কোনোটিই সক্ষম হয় নি জিপসি জীবনধারার সেই নিপাট-নিভাঁজ সত্যতা বা বাস্তব অনুভূতি তুলে ধরতে, যা পেরেছে এই সিনেমাটি। সিনেমাটি ১৯৬৭ সালে বেস্ট ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্ম হিশেবে অস্কারের জন্য মনোনীত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা জিততে না পারলেও, একই বছরে কান'স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে জিতে নেয় স্পেশাল জুরি প্রাইজ।
৯৪ মিনিটের এই সিনেমাটিকে একটি উৎকৃষ্ট মানের চলচ্চিত্রের যেকোনো বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বলা যেতে পারে অনবদ্য নির্মাণ এবং পেত্রোভিচ আমাদের সামনে তা তুলে ধরেছেন সময়ের এমন এক প্রামাণ্য দলিল হিশেবে, যেখানে সামাজিক বাস্তবতার সাথে সাথে উঠে এসেছে মানব জীবনের শাশ্বত কিছু টানাপোড়েন, আর্থ-সামাজিক বৈষম্য ও যাযাবর জীবনের সেই সব দিক, যার সাথে এভাবে পরিচয় ঘটে নি আগে। বস্তুত, সিনেমাটি কেবল অনবদ্যই নয়, বরং বলা যায় অনেক বেশি সাহসী, বিস্তারিত ও জীবনঘেঁষা। কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকেই এর কাহিনি আমাদের নিয়ে যায় না, কিন্তু এর কাহিনির যে বয়ান, তা জীবনের চিরন্তন সব অনুষঙ্গকে আমাদের কাছে এত নিপাট-নিভাঁজ তুলে ধরে যে, আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। সময়কে ছাড়িয়ে যাবার জন্য সময় ধারণ করার প্রয়োজন নেই, বরং সময়ের যে স্বাভাবিক ও সাদা-মাটা গতিপ্রবাহ তা স্বাভাবিক মাত্রায় প্রকাশ করার ফলেই হয়ে ওঠে চিরন্তন, যা এই সিনেমাটির ক্ষেত্রে শতভাগ প্রযোজ্য এবং পেত্রোভিচ তা করতে পেরেছেন সফলভাবেই।
তিসাকে ১২ বছরের একটি ছেলের সাথে বিয়ে দেয়, কিন্তু তিসা বিতৃষ্ণায় ছেলেটিকে বিছানা থেকে ফেলে দিলে মিত্রা তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে।
সিনেমাটির কেন্দ্রীয় চরিত্র, বোরাকে (বেকিম ফেমিউ) আমরা সত্যিকার জিপসি হিশেবেই খুঁজে পাই এখানে। গোঁয়ার, বেয়াড়া, বেহিসেবি, মাতাল, জুয়াড়ি, দুশ্চরিত্র ও সাহসী এক জিপসির প্রকৃত জীবন এই সিনেমায় কাদা-মাটির গন্ধ সমেত বর্তমান, আর দর্শক হিশেবে আমরা সিনেমাটি দেখতে দেখতে তা টের পাই ভালোভাবেই। টের পাই এও, জীবনের এমন গতি প্রবাহ আমাদের একাত্ম করছে, যদিও তা আমাদের জীবনের অংশ নয়, কিন্তু এই প্রশ্ন থেকে আমরা সরে আসতে পারি না বিন্দুমাত্র, ‘সর্বত্রই কী জীবন এমন নয়, সবখানেই কী জীবন এমন সংঘাত ও সংগ্রামপূর্ণ নয়, তাহলে আমরা কিভাবে এড়িয়ে যেতে পারি এমন উপস্থাপন?’ ফলে সিনেমাটি খুব সহজেই হয়ে ওঠে আমাদেরও, এবং আমাদের একাত্মবোধ রোমানিয়ান মানুষ বা বোরা নামের জিপসির জীবন থেকে ভিন্ন হয়ে উঠে না আর।
বোরার জীবনের বহুবিধ রূপকে খুব সাবলীলভাবেই উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে, যার সাথে আমাদের সংযোগ ঘটতে দেরি হয় না, আবার সংযোগ ঘটে গেলে সিনেমাটি থেকে নিজেদের পৃথক করাও যায় না। এই সব সিনেমাগুলো আমাদের জন্য দলিলস্বরূপ, যেখানে আমরা খুব স্পষ্টভাবে অবলোকন করি জীবনের বর্ণিল প্রবাহ, সামাজিক অবস্থান, পরিবেশ ও পরিস্থিতি। পেত্রোভিচ সম্ভবত সেই সব বিরল পরিচালকদের অন্যতম, যারা কেবল সিনেমা বানানোই জানেন না শুধু, বরং যাদের সিনেমা জ্ঞান রীতিমতো তাদের নিজস্ব জীবনবোধের সমান্তরাল, এবং তাঁরা খুব সহজেই ক্যামেরার মধ্যে দিয়ে এই সব বোধের বাস্তবিক চিত্রায়ণ করতে সক্ষম। ফলে আমরা যেমন চমকে উঠি, তেমনি বিস্ময়কর মুগ্ধতায় ভাষা হারিয়ে ফেলি, প্রশংসার।
পরিচালক নিজেই ক্যামেরাম্যান হিশেবে
এই দৃশ্য দেখে সে এতটাই মুগ্ধ হয় যে, বস্তার পর বস্তা পালক সে উড়িয়ে দিতে থাকে উন্মাদের মতো এবং সমগ্র দৃশ্যপট ঢাকা পড়ে যায় রাজহংসীর সাদা পালকে।
বোরা তিসাকে তার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছে নিয়ে আসে এবং সেখানে সে কিছুদিন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে বসবাস করে। এদিকে বোরার স্ত্রী, বোরার অনুপস্থিতিতে তিসাকে বেলগ্রেদ যাবার ব্যাপারে বোঝায় এবং গায়িকা হিশেবে অর্থ উপার্জন করার জন্য উৎসাহিত করে। তিসা অবশেষে বেলগ্রেদ যায় আর সেখানে গিয়ে ভিন্ন বাস্তবতার সম্মুখীন হয়, যেখানে সে গায়িকার ছেলেকে কেবল পঙ্গুই নয়, বরং ভিক্ষুক হিশেবেও আবিষ্কার করে, যে-বস্তিতে বাস করে ও জীবিকার জন্য গান গেয়ে ভিক্ষা করে। এমন বাস্তবতায় সে ভীষণভাবে আশাহত হয় এবং বাড়িতে ফেরার জন্য মনস্থির করে। পথে দুই হাঙ্গেরীয় লরি ড্রাইভার তাকে লরিতে তুলে নেয়, যাদের একজনের প্রস্তাবে তিসা রাজি না হলে তাকে প্রচণ্ড মার-ধোর করে লরির পেছনে হিমায়িত কেবিনে রেখে দেয় এবং সম্বরের কাছাকাছি কর্দমাক্ত জমিতে ফেলে যায়। সেখান থেকে এক রোমা তাকে পেয়ে মিত্রার কাছে ফিরিয়ে দেয়। বোরা নিজেও বেলগ্রেদ পর্যন্ত তিসাকে অনুসরণ করে, কিন্তু না পেয়ে ফিরে আসে এবং মিত্রার কাছে গিয়ে তিসাকে দাবি করে। ফলে দুই পুরুষের মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং বোরার হাতে মিত্রা খুন হয়। বোরা মিত্রার লাশ হিমায়িত হ্রদের বরফের নিচে ফেলে দেয়। ঘটনাক্রমে লাশ পানির ওপরে ভেসে ওঠে এবং চলচ্চিত্রটি শেষ হয় পুলিশের ঘরে ঘরে তল্লাশি ও প্রতিটি রোমাকে বোরা ও তিসার অবস্থান সম্পর্কিত জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে দিয়ে।
লেংকা হাউজে মদ্যপানরত বোরা
সিনেমাটিতে অনেকগুলো অনবদ্য দৃশ্য রয়েছে, তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দৃশ্য—বোরা যখন স্থানীয় পুরোহিতের কাছ থেকে রাজহংসীর পালক কিনে বস্তায় ভর্তি করে লরিতে করে নিয়ে আসতে থাকে, তখন ছুরি দিয়ে বস্তা ফুঁটো করে সে পালক উড়িয়ে দেয় এবং দেখতে থাকে পালকগুলোর উড়ে উড়ে রাস্তায় পড়তে থাকা। এই দৃশ্য দেখে সে এতটাই মুগ্ধ হয় যে, বস্তার পর বস্তা পালক সে উড়িয়ে দিতে থাকে উন্মাদের মতো এবং সমগ্র দৃশ্যপট ঢাকা পড়ে যায় রাজহংসীর সাদা পালকে। অথচ বোরা নিজে পালক ব্যবসার উপরেই সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল এবং কিছুদিন আগেই এক গরিব কৃষক পরিবারের কাছ থেকে রাজহংসী কেনার জন্য সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিল, অথচ সেই কিনা বস্তার পর বস্তা কেনা পালক বাতাসে উড়িয়ে দেয় কোনো কারণ ছাড়াই।
রোমা নিয়ে বানানো এখন পর্যন্ত এটাই সেরা সিনেমা, আর আমার কাছে, সত্যিকারের এক মাস্টারপিস, যা আজীবন স্মরণ রাখার মতো।
লেংকা হাউজে গায়িকা অলিভেরা ভুচো ও মিত্রা
প্রশংসার দিক থেকে একই কথা সিনেমাটির চিত্রগ্রাহক ‘তোমিস্লাব পিন্ত’ এর বেলাতেও খাটে এবং তার চিত্রগ্রহণ সিনেমাটির বিশেষ মেজাজ তৈরিতে অনস্বীকার্য ভূমিকা পালন করেছে। প্রায় পুরো সিনেমাটিই মলিন ধূসর-হলুদ আলোয় চিত্রায়ণ করা হয়েছে, যার ব্যবহার আবার পুনরায় দেখতে পাই প্রায় দুই দশক পরে ক্রিস্তোফ কিওলস্কির ‘এ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’ এ। বস্তত, আলোর এমন ব্যবহার পুরোপুরি মিলে যায় ভজভোদিনার ফ্ল্যাট, বর্ষাক্রান্ত ও কর্দমাক্ত ল্যান্ডস্কেপের সাথে। শুধু কিছু কিছু সময় আমরা আলোর বর্ণিল ব্যবহার দেখতে পাই সিনেমাটিতে, যেমন গ্রামবাসীদের রাস্তায় নাচ, বিয়ের ভোজ বা অনুষ্ঠানে। মূলত চিত্রগ্রহণের মুন্সিয়ানা সিনেমাটির অন্যান্য দিকগুলোর মতোই সমান প্রশংসা পাবার যোগ্য। আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক সিনেমাটির, তা হলো ভাষার ব্যবহার। চরিত্রগুলোকে একদিকে যেমন শুনি রোমানিয়ান ভাষায় কথা বলতে, তেমনি শুনি হাঙ্গেরিয়ান, সাইবেরিয়ান কিংবা স্লোভাক ভাষাতেও কথা বলতে, ফলে সিনামাটির সংগীতের মতো এর ভাষার ব্যবহারও একে ঋদ্ধ করেছে এবং ভজভোদিনার জাতিগত বৈচিত্র্য আরও গভীরভাবে তুলে ধরেছে আমাদের সামনে।
পেত্রোভিচ এই সিনেমায় কোনোরূপ মহত্ব আরোপ বা রোমান্টিকতার সামান্যতম সংযোজন ছাড়াই আমাদের দেখিয়েছেন যুগোস্লাভ রোমার বাস্তব জীবন, এবং সম্ভবত, রোমা নিয়ে বানানো এখন পর্যন্ত এটাই সেরা সিনেমা, আর আমার কাছে, সত্যিকারের এক মাস্টারপিস, যা আজীবন স্মরণ রাখার মতো। অথচ দুঃখের বিষয়, পেত্রোভিচের চলচ্চিত্রগুলো এখন বিস্মৃতপ্রায় এবং তারচেয়েও দুঃখজনক, তাঁর সিনেমাগুলো সম্পর্কে যথাযথ তথ্য না পাওয়া কিংবা ভালো মানের রিভিউ না থাকা। অথচ স্কুপইয়াকজি পেরজা ও পেত্রোভিচ উভয়ই বিশ্ব-সিনেমায় আরও অধিক মনোযোগ ও সম্মান দাবি করে, কেবলমাত্র শিল্পের বিচারে নয়, বরং আমাদের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অনন্য দলিল ও পথিকৃৎ হিশেবেও।
পরিচালকের অন্যান্য সিনেমা: .
ইট রেইনস ইন মাই ভিলেজ ১৯৬৮ দ্য মাস্টার অ্যান্ড মার্গারেট ১৯৭২ গ্রুপ পোর্টেট উইথ আ লেডি ১৯৭৭
সিনেমাটির ইউটিউব লিংক: