সিনথিয়া আমার সিনথিয়া  

নাসিম বলল, ‘তাহলে কি টাকাটা আমি পাচ্ছি?’

তখন আমি প্যাকেট থেকে বের করে বেনসন অ্যান্ড হেজেজ একটা ধরাচ্ছিলাম।

বললাম, ‘দাঁড়াও, একটা সুখটান দিয়ে নিই। তারপর কথা বলি।’

আজ অফিসে সারাদিনই ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছি। কেবল লাঞ্চের সময় মিনিট ত্রিশেক সময় হাতে পেলেও একটি বারের জন্য হলেও বলা যায় বাম্বু টানার ফুরসত পাইনি। কাজের সময় আমার কনসেন্ট্রেশন খুব কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন বাম্বু কী অনেক সময় লাঞ্চের কথাও ভাবনার মধ্যে আসে না। আর কী প্রেসারই না আজ গেছে নিজের ওপর দিয়ে! এক, দুই করে গুনলে মনে হয় হাজার দেড়েক স্বাক্ষর-সিগনেচার করেছি আজ। এত কাজ জমে ছিল! দোষ তো ওই হেডকøার্ক শংকর চক্রবর্তীর। এগুলোয় তো মালটোভা নেই, তাই তার তাড়াও নেই। মালটোভা ছাড়া তার কথাও নেই। মনে হয় বছর দুয়েকের মধ্যে এত্তগুলো সিগনেচার আমার দ্বারা হয়নি। সময় আসুক। সময় ও সুযোগ মতো কত ধানে কত চাল তুমি শংকর চক্রবর্তী হাড়ে হাড়ে টের পাবে। এমনিতে তো সারাদিনে তোমার সময় হয় না। কাজে ডুবে থাক। কাজে ডুবে থাকা তো ভালো। তবে, তুমি ওই যে মালটোভা ছাড়া  কোনো কাজ করো না। কোনো কাজই তোমার এছাড়া হয় না। অথচ, সরকার তোমাকে এই কাজের জন্যে সময় মতো বেতন ও ভাতা দিচ্ছে।

তিরিক্ষি মেজাজে মাথা ভনভন করলেও কুণ্ডলী পাকিয়ে দিগন্তে ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করলাম আস্তে ধীরে, ‘কী যেন বললে একটু আগে, নাসিম?’

‘তাহলে কি টাকাটা আমি সময় মতো পাচ্ছি?’


ওই সময় আমি প্রথম নারী দেহের ছোঁয়ায় সিক্ত করে নিজেকে বিজয়ী বলে মনে করেছিলাম।


আমি এই মুহূর্তে হ্যাঁ বা না কোনো কিছুই উচ্চারণ করলাম না। কী বলব; কী উচ্চারণ করব? নাসিমের এই টাকা-পয়সা নিয়ে বেশ বড়ো রকমের বদভ্যাস আছে। খামোখাই নেবে, আবার দেবে। আবার নেবে। আবার দেবে। পারলে ভেঙে ভেঙে দেবে। সবসময় আমার পেট লাগিয়ে রাখবে!

নাসিমের একটা, দুটো নয়, ম্যালা বদভ্যাস আছে। আর ওর এই বদভ্যাসগুলো সম্পর্কে মোটামুটি আমার একটা স্ট্যাডি আছে। এই যে আমি সিগারেট খাচ্ছি, ইচ্ছে করেই ওকে আমি সিগারেট অফার করিনি। করলেই বলবে, ‘সিগারেট খাওয়া তো ছেড়েই দিয়েছিলাম, আচ্ছা দিচ্ছ যখন দাও। চেখে দেখি। মুখের ওপর তো আর না করতে পারি না।’ কী ভাবের কথা! ভাষার এই কারুকাজ-ট্রেনিং নাসিম কোত্থেকে যে আয়ত্ত করল!

মোটামুটি মাস খানেক বাদে মিনিট ত্রিশেক হয় নাসিমের সঙ্গে আমার কথাবার্তা হচ্ছে। নাসিম আমার বন্ধু। একটা সময়, একটা সময় কী, এই বছর পাঁচেক আগেও কদাচিৎ কোথাও রাস্তাঘাটে ওর সঙ্গে দেখা হলে রীতিমতো তুই-তুকারি চলত। পরস্পর বছর দুুয়েক ঘনিণ্ঠ বন্ধু ছিলাম আমরা। একসঙ্গে বসবাস করেছি। একসঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডিও পেরিয়েছি। ওই সময় নাসিম চাকরি করত। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে অফিস সহায়ক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল। তারপর প্রয়োজনের তাগিদে আমাদের উভয়েরই পথঘাট ভিন্ন হয়ে গেছে। তারপরও গ্রাজুয়েশন করেছে। করেছে মাস্টার্সও। সেই সুবাদে চাকরিতেও দু-দুটো প্রমোশন বাগিয়ে নিয়েছে। এখনও স্টোরকিপার ওরই ওই প্রতিষ্ঠানে।

নাটোরের লোক হওয়ায় ও মূলত মান ভাষায় কথা বলে। আমার ভাষায় কমলালেবুর গন্ধ থাকলেও ওর সঙ্গে কথা বলার সময় মোটামুটি ক্যালকেশিয়ান ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি। হয়তো হয়। হয়তো হয় না। সে যাকগে। ওর সঙ্গে দেখা না হলে, বন্ধুত্ব না হলে হয়তো জানতামই না, বাবা-মা হারিয়ে বছর পনেরো বয়স থেকে একজন সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তরুণকে দিনের পর দিন কী নিদারুণ সংগ্রাম না করতে হয়েছে এই নির্দয় সমাজে!

কিন্তু তারপরও ওর প্রতি সিমপ্যাথি কারুরই নেই। আর থাকারও কথা নয়। সব ওর কার্যকলাপের জন্যে।

ওর নাম্বার ওয়ান বিবিকে তো ঘরে তুলতে ওর এক টাকাও খরচ হয় নি। কী তেলেসমাতি না ব্যাপার-স্যাপার ঘটেছিলরে বাবা!

ঘটনা হচ্ছে, ব্যাংকার বন্ধুর শ্যালিকার বিয়েতে বন্ধুর সঙ্গেই ও কুমিল্লায় গেছে বিয়েতে যোগ দিতে। ভালো কথা। বন্ধুত্ব রক্ষা করা তো বেশ ভালো কথা। কিন্তু বিয়ের দিন তালগোল লেগে গেল, এবং সেই তালগোলে সবকিছুই বরবাদ হয়ে গেল। বর এল না। সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও এল না তো এলই না। কী কেলেঙ্ককারিরে বাবা! কী করা যায়। তখন সকলে মিলে ওকেই দামাদ সাজিয়ে বিয়ে পড়িয়ে ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ ইন্টারসিটি ট্রেনে উঠিয়ে গন্তব্যে যাত্রা করাল।

এখন এই মুহূর্তে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বিস্ময়াভূত হয়ে ভিমরি খেয়ে গেলাম। ক্লিন সেভড, পরিপাটি ড্রেসআপে কী জানি কাকে যে ও ফাঁকি দিয়ে গোল দিতে যাচ্ছে। ভাব এসে গেল আমার। অনেকদিন পর তুই-তুকারিতে খোঁচা মেরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বে, বিয়ে-টিয়ে আবার করছিস নাকি?’

নিজ স্বভাব মতো ও কোনো উত্তরই করল না। খানিকক্ষণ বাদে একটু দম নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুই এখন কোথায় যাচ্ছিস?’

বললাম, ‘এই একটু জিন্দাবাজার-আম্বরখানায় ঢু মারতে যাচ্ছি।’

‘তাহলে চল না, আমার ওখানে ঘুরে আসবি।’

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিয়ে বললাম, ‘না রে, আমার ম্যালা কাজ আছে। আজ কাজগুলো শেষ করতে হবে।’

‘কাজ না হয় আরেকদিন করলি। চা-ও খেলি, তারপর কথাবার্তা না হয় বলা গেল। তাছাড়া...।’

‘তাছাড়া আবার কী। কিছু বলবি-টলবি নাকি।’

‘সিনথিয়া মনে হয় তোকে কিছু বলবে।’ বলল, ‘গালিব ভাইয়ের সাথে আর দেখা হলো না।’

আমি মরমে মরে গেলাম। গোধূলি লগ্নে বয়ে চলা উত্তরের হিমেল হাওয়া আমার মুখমণ্ডলে যেন উড়ে যাওয়া কোনো অশরীরিণীর কোমল পেলব স্পর্শের ছোঁয়া দিয়ে গেল।

‘সিনথিয়া আমাকে বলেছে, ওরা যখন ওর বাবার চাকরির সুবাদে এ অঞ্চলে বসবাস করত, তখন তোদের বাড়িতে ওরা নিজ বাড়ির মতো বসবাস করত; থাকত।’

আমি এবার সত্যি মরমে মরেই গেলাম।

বুঝলাম, এই ব্যাটার হাত থেকে আজ আমার নিষ্কৃতি নেই।

বললাম, ‘ভালো থাকিস। আরেকদিন যাব। চা খাব।’

‘গেলে কী হয়। মহাভারত কি অশুদ্ধ হয়? তাছাড়া আমার বাড়ি তো দেখিস নি। এই সুযোগে বাড়িটাও দেখা হয়ে গেল তোর।’

আমি সিনথিয়ার কথা ভাবতে লাগলাম। সিনথিয়ারা যখন আমাদের বাড়িতে বসবাস করত, তখন আমি টেনে আর সিনথিয়া এইটে পড়ত। ওই সময় আমাদের মধ্যে প্রবল ভাব-ভালোবাসার সৃষ্টি হয়েছিল। এবং অচিরেই প্রতিদিন বারকয়েক একজন আরেকজনকে না দেখলে তনু-মন অস্থির হয়ে ছটফট করত। বলতে দ্বিধা নেই, তখন ওই সময় আমি প্রথম নারী দেহের ছোঁয়ায় সিক্ত করে নিজেকে বিজয়ী বলে মনে করেছিলাম।

তারপর অকস্মাৎ বাবার বদলিজনিত কারণে এক শ্রাবণের দিনে ক্লাস টেনের পাঠ সম্পন্ন না করে সিনথিয়ারা চলে গিয়েছিল।

আর যোগাযোগ হয় নি!

এত বছর পর সিনথিয়া কিভাবে আমাকে মূল্যায়ন করবে? আমার সঙ্গে কি সে স্বাভাবিক আচরণ করবে? অবশ্য নারী মন বোঝা বড়ো দায়। যেখানে যে পাত্রে রাখ না কেন, সেই পাত্রের রূপ ধারণ করবে সে! তারপরও সিনথিয়া বলে বিশ্বাস একটা আছে তো। সেই বিশ্বাসে আমি মনে মনে নাসিমের সঙ্গে নাসিমের বাড়িতে যাওয়ার জন্যে নিজেকে তৈরি করে নিতে শুরু করলাম।


ও তো জানে ওই দায়ী। তাই ডাক্তারের চেম্বারে ভুলেও যাওয়ার কথা বলে না।


জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুই কোথায় ডেরা বেঁধেছিস?’

বলল, ‘সঙ্গে আয়। মিনিট ত্রিশেকের মধ্যে পৌঁছে যাব।’

কিন্তু মনে মনে একান্ত ইচ্ছে সত্ত্বেও ওর সঙ্গে আমার পৌঁছানো হলো না। নিকটাত্মীয় এক সমবয়সী খালাত ভাই এসে হাত ধরে জোর করে কাছেই ওর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে আড্ডা মারতে শুরু করল।

কতদিন পর ভাইটির সঙ্গে দেখা! সহজে কি আর ছাড়ে? আড্ডা-ইয়ার্কি দিতে দিতে একেবারে টাইম মতো ভালোভাবে পেট পুজো করিয়ে তবেই না নিস্তার দিল।

শেষে বলল, ‘সিনথিয়ার অনো যেইতে, আইচ্চা যা।’

পরদিন শুক্রবার যখন সিনথিয়াদের বাড়িতে গেলাম, সিনথিয়া তখন আমাকে দেখে উচ্ছ্বাসে খানিকটা জোরে দৌড়ে এল।

জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছ, গালিব ভাই?’

তারপর একেবারে আবেগে আবেগতাড়িত হয়ে গেল।

আমি বছর বিশেক আগের মারিয়া সিনথিয়া ইবনে এহতেশাম যুগে ফিরে গেলাম।

সেই সময়ে হেমন্তের ওই সোনা ঝরা দিনগুলোতেও পাখিরা আজকের মতো মধুর সুরে সুর তুলত, অলিরাও ফুলে ফুলে গুনগুন করে মধু আহরণ করে নিজেদেরকে ধন্য মনে করত।

একবার তো সেই সময়ে ওই আবেগতাড়িত হয়ে তার গালিব ভাইকে হারানের ভয়ে গোটা সাতেক ঘুমের বড়ি খেয়ে কী লঙ্কাকাণ্ডই না বাধিয়েছিল, সিনথিয়া!

স্বাভাবিক হওয়ার পর বলল, ‘বয়স বাড়লেও তরুণই তো আছ দেখছি, গালিব ভাই। শরীরের তেমন কোনো পরিবর্তন হয় নি। কেবল চোখের নিচে কিছুটা কালি পড়ে গেছে।’

আমি তখন কী প্রতিক্রিয়া দেখাব। মিনিট পাঁচেক সিনথিয়ায় ডুবে গেলাম। আমার অতীতকাল আমার বর্তমানের আকাশ-বাতাস সবকিছু দখল করে নিয়ে আমাকেও আবেগায়িত করে দিল।

বললাম, ‘চলো, এগোই।’

দ্রত বেরিয়ে নাসিম এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করে জিজ্ঞেস করল, ‘কিসে এলি?’

বললাম, ‘সিএনজি।’

বলল, ‘দেখেছিস, কেবল মিনিট ত্রিশেকের মতো সময় লেগেছে।’

আমি তখন আমাতে আর নেই। হৃদয়ের তন্ত্রীতে অতি সূক্ষ্ম একটা বেদনা বোধ আমাকে কুরে কুরে অবিরাম খেয়ে সম্মুখ পানে তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বাাড়ির চারদিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিলাম। সম্মুখে ফুলের বাগানে বিচিত্র ফুলের সমাহার দেখে নাসিমের রুচিতে মুগ্ধ না হয়ে আর পারলাম না। কী ফুল নেই তার বাগানে!

বাড়িও একটি বানিয়েছে নাসিম! এত টাকা কোথায় পেল, নাসিম! বুঝেছি, স্টোরের সব আমানত নিজের মনে করে খেয়ানত করে দিচ্ছে, শালা বদমাশ। মেজাজ খিচড়ে গেল সেই মুহূর্তে। নিজেকে প্রবোধ দিতে দিতে মনে মনে তৎক্ষণাৎ বললাম, ‘শালা বাটপার, আসিস ভণিতা করে টাকা নিতে। জুতিয়ে তোর ফর্সা মুখ যদি আমি লাল না করি, আমার নাম আসাদুল্লাহ আল গালিব না।’

সিনথিয়া তখন অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বাসে উচ্ছল হয়ে উঠেছে।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘সিনথিয়া, আমাদের কথা কি মনে আছে?’

‘কেন থাকবে না?’

তারপর মুচকি হেসে যেভাবে সে আগে হাসত, ঠিক সেইভাবেই হেসে বলল, ‘সবকিছু মনে আছে।’

মিনুর কথাও জিজ্ঞেস করল।

মিনু আমার একমাত্র অতি আদরের ছোট বোন ছিল। একই স্কুলে ওরই সঙ্গে একই ক্লাসে পড়ত। অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে বোন আমার চাচাত ভাই ডা. সজলের খপ্পরে পড়ে নিজেকে শেষ করে দিল।

চা-নাস্তা খেতে খেতে একসময় ট্যারা মজনুরও কথা উঠল।

জিজ্ঞেস করলাম, ‘ট্যারা মজনুর কথা কি স্মরণে আছে, সিনথিয়া?’

সিনথিয়া এবার না হেসে পারল না। হা হা করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলল, ‘হ্যাঁ, প্রতিদিন বটেরতলে সকাল-বিকাল যে ট্যারা মজনু ডিউটি করত, তার কথা স্মরণে থাকবে না, তা কী করে হয়। তবে, সে কিন্তু লক্ষ্মী ট্যারা ছিল। এবং একবার আমাকে একটা চিঠিও দিয়েছিল। আমিও কম বয়সের উন্মাদনায় ডুবে গিয়ে ওই চিঠির উত্তরও দিয়েছিলাম।’ বলে একদম চুপ হয়ে গেল, সিনথিয়া।

বললাম, ‘থামলে কেন, বলে যাও। তারপর এক বৃষ্টিমুখর দিনে কদম ফুল হাতে ঘণ্টা চারেক রিকশার হুড উঠিয়ে উন্মাদনায় মেতে উঠেছিলাম।’

‘ও এখন কোথায়?’

‘দেখা করতে চাও?’

‘না এমনিতে জিজ্ঞেস করছিলাম।’

‘আছে ও কানাডার অটোয়ায়। বিদেশিনী বধূ নিয়ে সুখের সংসার করছে।’

‘দেশে আসে নি?’

‘বধূসহ একবার এসেছিল।’

নাসিম যখন ‘বসে গল্পগুজব কর, এই আমি একটু বাজারে যাচ্ছি আর আসছি’। বলে-কয়ে বের হয়ে গেল, তখন নীরবতা ভেঙে অপাঙ্গে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

‘বিয়ের কত বছর হলো?’

ধীরে সুস্থে মৃদু কণ্ঠে জবাব এল, ‘আট বছর।’

তারপর, নিজেকে আর সামলাতে পারল না, সিনথিয়া। হাউমাউ করে কেঁদে-কেটে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানান দিল।

‘ডাক্তারে কি গেছ?’

‘ও তো জানে ওই দায়ী। তাই ডাক্তারের চেম্বারে ভুলেও যাওয়ার কথা বলে না। যায়ও না। বছর তিনেক আগে গোপনে বান্দি একটাকে বিয়ে করে ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠিয়েছে। সপ্তাহে দুদিন থাকে। ওখানেও কোনো খবর নেই।’


আমাকে কি বিয়ে করবে, সিনথিয়া? আমার সঙ্গে কি যাবে?


আমি কী বলব? আমার কী বলার আছে? এত সুন্দর উচ্চশিক্ষিত একটি মেয়ের জীবন যে এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, তা আমার পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব নয়।

সম্ভব হলোও না।

সব চিন্তা মাথায় রেখে অকস্মাৎ তাই জিজ্ঞেস করে বসলাম,

‘আমাকে কি বিয়ে করবে, সিনথিয়া? আমার সঙ্গে কি যাবে?’

সিনথিয়াও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া দেখাল।

দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

সে কান্নার অর্থ আমি বেআক্কেলের তাৎক্ষণিক বোধগম্য হলো না।

মাস ছয়েক পরের ঘটনা।

অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে সিনথিয়া আমার হয়েছিল।

কিন্তু এই সময়ে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের এই সময়ে সিনথিয়াকে ধরে রাখা গেল না। অপালাকে জন্ম দিতে গিয়ে বাঁচার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে সে ধরাধাম ত্যাগ করল।

অপালাও মাস চারেক পরে মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করল।

ইকবাল তাজওলী

ইকবাল তাজওলী

জন্ম ১৯৬৭, সিলেট। শিক্ষা : স্নাতকোত্তর। পেশা : শিক্ষকতা। প্রকাশিত বই— শরীরের...বিস্তারিত