কবির মধ্যে জীবনব্যাপী এক ধরনের প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকতে হয়, কবিতার প্রতি সৎ, ধ্যানস্থ থাকতে হয়
স্বকীয়তা আর স্বতঃস্ফূর্ততার মধ্যে কোনটি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? এ দুয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি?
কবিতা তো আসলে জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। ব্যক্তির জীবন যাপন, তার পড়াশুনা, চিন্তা-চেতনা, পৃথিবী ও জীবন দেখার চোখ, দৃষ্টিভঙ্গি—এসবই তার চিন্তায় এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া তৈরি করে। সেক্ষেত্রে সভ্যতা ও সাহিত্যের ইতিহাস জেনেবুঝে নিজের পালস অনুযায়ী পথ তৈরি করে নিতে হয়। আর কবিতা বিষয়টাকে নাজিলকৃত বলে আমার মনে হয়। জীবন তার স্বতঃস্ফূর্ত নিয়মে প্রকৃত কবিকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। তবে কবির মধ্যে জীবনব্যাপী এক ধরনের প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকতে হয়, কবিতার প্রতি সৎ, ধ্যানস্থ থাকতে হয়। কবিতা আসলে জীবন ডিমান্ড কবে, তাই কবিদের জীবন থেকে কবিতাকে পৃথক করে দেখার সুযোগ নেই। সংঘ করে, নানান কসরত করে কবিতা হয় না। আসলে কবিরা গাছের মতো অন্য কবির ছায়ায় বাড়ে না। একজন কবি তাই, যা সে লেখে।
ভেতরে কবিত্ব না থাকলে সে যেভাবেই লিখুক তাতে ব্যক্তির কসরত বা তার জানার পরিধি প্রকাশ পেতে পারে কিন্তু কবিতা অন্য জিনিস
কবিতার কথা উঠলেই দুটো প্রসঙ্গ চলে আসে—ছন্দ এবং দশক। দুটো বিষয় নিয়ে আপনার কী পর্যবেক্ষণ?
ছন্দ না জেনেই তাকে ইগনোর করা আসলে এক ধরনের হীনম্মন্যতা। ছন্দ বিষয়টা জেনে নিলে শব্দের প্রতি এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়। ভাবনার পরিমিতি তৈরি হয়। এটা আসলে এক ধরনের সৌন্দর্য যা জানা থাকা উচিত। ছন্দ জেনে তারপর ছন্দে লিখলেন বা লিখলেন না, কিংবা তাকে ভাঙলেন।
মূলত মহাবিশ্বের সবকিছুই তো আসলে ছন্দময়। এখন ছন্দ বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন—সেটা একটা প্রশ্ন হতে পারে। আসলে ছন্দ এক ধরনের নান্দনিক শৃঙ্খলা, কেউ কেউ না বুঝেই যেটাকে শৃঙ্খল ভাবে। আর গদ্য কবিতায়ও তো এক ধরনের আভ্যন্তরীণ ছন্দময়তা থাকে। যে ছন্দ জানছেন না, সে টেরও পাচ্ছেন না যে সেও তার লেখার ভঙ্গিতে এক ধরনের ছন্দময়তা বহন করছেন।
ঐতিহ্য প্রকাশনী, অমর একুশে বইমেলা ২০১৫
দশকের কুয়া নিয়ে এই যে সংকলন, নাচানাচি এসব আসলে স্বল্প-রেসের লেখক-কবিদের ভাবনার বিষয়
আর দশক একজন কবি কোনো সময়ে লিখতে শুরু করল এটা জানার জন্য আলোচনায় আনা যেতে পারে। তবে দশকের কুয়া নিয়ে এই যে সংকলন, নাচানাচি এসব আসলে স্বল্প-রেসের লেখক-কবিদের ভাবনার বিষয়। লেখক বা কবি তো তার আগের সব দেশের সকল লেখক বা কবি কিংবা অনাগত সব লেখক বা কবিদের মধ্যে একজন, তার টেক্সট তাকে এদের মধ্যে স্বতন্ত্র স্থানে নিয়ে যেতে পারলে তবে তাকে সব কালে, সব স্থানে বসে শনাক্ত করা সম্ভব। এজন্য আর তার আইডেনটিটির জন্য দশক পরিচয়ের দরকার হয় না।
নিজের পাঠকের জন্য আপনার পছন্দের কিছু বইয়ের নাম বলুন।
জীবনানন্দ দাশের কবিতাসমগ্র ও কবিতার কথা, আবুল হাসান সমগ্র, জয় গোস্বামীর আজ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করো, আলেয়ার হ্রদ, বর্জ্রবিদ্যুত ভর্তি খাতা, রৌদ্র-ছায়ার সংকলন, খুসবন্ত সিংয়ের জোকস, শাহাদুজ্জামানের কথা পরম্পরা ও চ্যাপলিন আজও চমৎকার, শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা ও স্মৃতির শহর, মুজতবা আলীর পঞ্চতন্ত্র, দেশেবিদেশে, চাচাকাহিনী, সৈয়দ আলী আহসানের কবিতাসমগ্র ও জার্মান সাহিত্যের অনুবাদ সংকলন, ভাস্কর চক্রবর্তীর শয়ানযান ও দেবতার সঙ্গে, গোলাম মোস্তফার শ্রেষ্ঠ কবিতা, আল মাহমুদ সমগ্র, জসিম উদ্দীনের শ্রেষ্ঠ কবিতা, আল্লামা রুমির কবিতা, নাজিম হিকমতের কবিতা, লালনসমগ্র, আবিদ আজাদের কবিতাসমগ্র, হোসে সারামাগোর ব্লাইন্ডনেস, মার্কেজের হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচিউড, নিটশের দ্যাজ স্পোক জুরাথুস্ত্রা, বাৎসায়নের কামসূত্র, ভগবান শ্রী রজনীশের যৌনতা, শহিদুল জহির সমগ্র, মানিকের পুতুল নাচের ইতিকথা ও গল্পসমগ্র, বিভূতি সমগ্র, আরজ আলীসমগ্র, বু্দ্ধদেব বসুর অনুবাদ ও গদ্যসমগ্র, রবীন্দ্র রচনাবলী—এই মুহূর্তে এসবই মাথায় আসছে।