২০১৩-এর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। আমার কবিতার দ্বিতীয় বই 'ডালিম যেভাবে ফোটে' বের হবে। কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান নিয়ে গেলেন বিখ্যাত এক প্রকাশকের কাছে। আমার বইটি যেন বের হয়, এমন অনুরোধ করলেন। পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে সেই প্রকাশক জানালেন—এত অল্প সময়ের মধ্যে বই করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পাপড়ি আপা সহজেই দমে যাবার মানুষ নন। সেখান থেকে বেরিয়ে আরেক প্রকাশককে ফোন করে একই অনুরোধ করলেন। ঐ প্রকাশক পাণ্ডুলিপি নিয়ে দেখা করতে বললেন পরদিন। গেলাম সেগুনবাগিচায় সেই প্রকাশকের কাছে। পরিচয়পর্বে, শিক্ষকতা করি জেনে একটু হতাশ হলেন। কোনো পত্র-পত্রিকার ‘সাব এডিটর’ নই বলে সামান্য আক্ষেপও করলেন। পরে পাণ্ডুলিপিটি গ্রহণ করলেন। এও জানালেন—সাতদিন পর আমি যেন ফোন করে আসি! সাতদিন পরে ফোন করেই তার সাথে দেখা করতে গেলাম। তিনি বললেন—এসব লেখা দিয়ে বই করা সম্ভব নয়। বিকল্প একটা প্রস্তাবও দিলেন। আমি যদি আমার শিক্ষার্থীদের দিয়ে দুশ বই কেনাতে পারি, তাহলে বইটা তারা প্রকাশ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় দুচারজন শিক্ষকের এমন অশোভনীয় প্রস্তাবে আমি নিজেই নাজেহাল হয়েছিলাম। আমার পক্ষে এ অশোভনীয় কাজটি করা তাই অসম্ভব, জানিয়ে দিলাম তাকে। এও জানালাম—শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, আমি যে কলেজে শিক্ষকতা করি, সেখানে দু’একজন ‘মাই ডিয়ার’ কলিগের বাইরে তেমন কেউই জানেন না যে, আমি লেখালেখি করি! কবিতার প্রতি আগ্রহী নন, এমন কেউ বইটা কিনুক সেটা আমি নিজেও চাই নি। ফলে, সেখান থেকেও হতাশ হয়ে বাসায় ফিরলাম। বিকেলে কবি সোহেল হাসান গালিবের সাথে দেখা। পুরো ঘটনা তাঁকে বললাম। তিনি আশ্বাস দিলেন, কিছু একটা হবে। সে সময় তরুণ কবি রাসেল আহমেদ ‘চিত্রকল্প’ নামে একটি প্রকাশনীর সাথে সংযুক্ত হয়েছেন। আমার বইয়ের প্রস্তাবটা গালিব ভাই-ই তাঁকে দিলেন। রাসেল একটু দ্বিধান্বিত হয়ে রাজি হয়ে গেলেন। ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে বসে, মুখে মুখে একটা চুক্তিও হয়ে গেল সেদিন।
কবিতার ‘পাঠক নাই-পাঠক নাই’ জাতীয় হাপিত্যেশের দিনে, একজন অতিতুচ্ছ, অখ্যাত মানুষের বই প্রকাশের নেপথ্যে, এর বেশি কিছু আশা করাটা বোধহয় সমীচীন নয়
চিত্রকল্প প্রকাশনী, অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৪
এ সময় তরুণ কবি হাসান রোবায়েত একদিন বাসায় এসে সাহস দেয়—'চিন্তা করবেন না সজল দা, দেখবেন বিক্রি হয়ে গেছে'। কবিবন্ধু তারিক টুকু তাঁর নিজের শত ব্যস্ততা থেকে সময় বের করে পাণ্ডুলিপিটা দেখে দিয়েছিলেন। তিনিও ফোন করে অভয় দেন। রাসেল আহমেদ তাঁর প্রকাশনীর অন্য বইগুলোর চেয়ে বিলম্বে কাজ শুরু করেও আমার বইটা বইমেলায় নিয়ে আসেন ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখেই। ২০১৪-এর ৮ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৫-এর ২২ফেব্রুয়ারি। কপি নিঃশেষ হলো গতকাল। প্রথম মুদ্রণে প্রায় তিনশ কপি বই হয়েছিল। ১০/১২কপি একে-তাঁকে সৌজন্য কপি দিয়েছি, মনে আছে। বাদবাকি বিক্রি হয়ে গেল!!
প্রকাশনা থেকে ক্রয়-বিক্রয়—ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা সবার কাছেই। স্রেফ, ভালোবাসার জায়গা থেকে যারা আমার বইটি কিনেছেন। কবিতার ‘পাঠক নাই-পাঠক নাই’ জাতীয় হাপিত্যেশের দিনে, একজন অতিতুচ্ছ, অখ্যাত মানুষের বই প্রকাশের নেপথ্যে, এর বেশি কিছু আশা করাটা বোধহয় সমীচীন নয়।
জয়তু বাংলা কবিতা!