সার-সংক্ষেপ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বেশকিছু স্বদেশপ্রেমমূলক গান লিখেছিলেন, যার অন্যতম ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি। এই গান বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের পূর্ববর্তী বিভিন্ন সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছিল আমাদের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জীবনে। ফলে, এ গান জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেয়েছিল। তবে, দীর্ঘ এ গানের সংক্ষেপিত বাণীতে সেই সুরটিই গৃহীত হয়েছিল, যা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিপাগল বাঙালিরা গাইতে গাইতে এদেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন। ফলে, রবীন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে সুরগত ঈষৎ পার্থক্য তৈরি হয়েছিল এবং তা কেবল ‘রবীন্দ্রসংগীত’ হয়ে থাকে নি। কী রয়েছে এই গানের বাণী বা পরিবর্তিত সুরের মহিমায় তা চিহ্নিত করা এবং কী করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার বাংলা’ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলার’ সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হয়ে উঠল, তা দেখানো এই প্রবন্ধের লক্ষ্য। আমরা দেখব, গানটির সুর বাউল অঙ্গ থেকে নেয়া হলেও এর সুরে উত্তর ভারতীয় ঝিঁঝিট রাগের চলনের সঙ্গে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে, যা মূল বাউল গানটির স্থায়ী অংশে ছিল না। বাউল গানের সঙ্গে রবীন্দ্রগানের স্থায়ীতে কেবল একটি স্বরের শ্রুতির তাৎপর্যপূর্ণ ব্যবধান ঘটেছিল, যা ঝিঁঝিটের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। আর, যুগপৎ দেখব, এই গানের সঙ্গে, রবীন্দ্রচর্চার সঙ্গে বাঙালিত্বের ভিত্তিগত একটি যোগ রয়েছে—বাঙালিত্বের কাঙাল বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে কী করে এই গান বাঙালির প্রাণে চিরকালীন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা পেল সেটাও আমরা চিহ্নিত করব।
ঔপনিবেশিক কালে, বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদটি কলকাতা-কেন্দ্রিক উচ্চশ্রেণির হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব হলেও তা পূর্ববাংলার পিছিয়ে-পড়া দরিদ্র বাঙালি হিন্দু-মুসলিমদের বিভেদের কারণ হয় নি (মুনতাসীর মামুন ২০১৩ ক: ১২)। ফলে, বঙ্গভঙ্গের বিষয়টি পূর্ববঙ্গে স্বাগতিত হয়েছিল১। কারণ, এ অঞ্চলবাসী মনে করেছিলেন, তাতে তাঁদের পশ্চাৎপদতা ঘুচবে। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার বাংলা’ আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলায় জন্মেছিলেন সেই ‘সোনার বাংলা’র সামাজিক বিভেদ ছিল। ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলেও তা ১৯০৫ থেকে ১৯৪৭ অবধি বিকশিত হয়েছিল উত্তর-ভারতীয় মুসলিমদের নেতৃত্বে। যে নেতৃত্ব বোঝাতে সক্ষম হয়, মুসলিমদের হীন অবস্থার দায় ব্রিটিশদের ও হিন্দুদের—বিশেষ করে কংগ্রেসের চক্রান্তের ফল। আর, এই বোধেরই ফসল হিসেবে ‘পাকিস্তান মানসিকতা’ তৈরি হয়। ভারত বিভাজনের দায় মুসলিম লীগের একার নয়—নানান রাজনৈতিক কারণে অনিবার্য হয়ে ওঠে এই বিভাজন। আর এই বিভাজন-পরবর্তী সময়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী করে বাঙালিদের ভালোবেসে তাঁর রাজনীতি ও জীবনকে অর্থবহ করে তুলেছিলেন তার পরিচয় আমরা পাই ১৯৫৫ সাল অবধি লিখিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’২ গ্রন্থে। আর কতটা ত্রাসের ছিল তাঁর এই রাজনৈতিক কার্যক্রম পাকিস্তানিদের কাছে, তার দলিলও আমরা দেখতে পাব তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থা আইবি সংরক্ষিত গোপন নথিতে, সম্প্রতি যা দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে—ক্রমে ১৪টি খণ্ডে৩ প্রকাশিত হবে। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে বঙ্গবন্ধুর বিস্তারিত সম্পৃক্তি এই প্রবন্ধের লক্ষ্য নয়, তবে কিভাবে রবীন্দ্রনাথের গান ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছায় এ দেশের জাতীয় সংগীত হলো তা বলতে গিয়ে কিছু রাজনৈতিক ঘটনা প্রাসঙ্গিকভাবে চলে আসবে। আর, এই জাতীয় সংগীতের সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত ও মূল বাউল গানের সম্পর্ক, বিশেষ করে সুরগত বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমরা দেখব বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলার গভীর সম্পৃক্তি রয়েছে, কিছু ব্যবধানও রয়েছে—যা যুগপৎ বাইরের ঘটনাগত এবং গানেরও অন্তর্গত বিষয়।
দেশভাগের পর পূর্বপাকিস্তানের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বঞ্চনা থাকত না, যদি প্রকৃত অর্থে পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলিমরা শোষক না হয়ে নিষ্ঠাবান সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠত। তারা প্রকৃতপক্ষে শোষক ছিল বলেই তাদের চেতনায় ধর্মগত ঐক্যের কোনো বোধ কাজ করে নি, যদিও ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে তারা টুকরো করেছিল। ফলে, এই শোষণের বেদনা বইতে হয়েছিল হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে কেবল পূর্বপাকিস্তানে বসবাসকারী বাংলাভাষী ও বাঙালি সংস্কৃতিসমৃদ্ধ সাধারণ মানুষকে। আর তাই ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতিরাষ্ট্র গঠনে ধর্মসহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক ঐক্য মূল ব্যাপার হিসেবে কাজ করেছিল। তবে, এদেশের বাঙালিদের একটা অংশের চেতনায় ধর্মীয় উন্মাদনার বীজ গভীরভাবে উপ্ত ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে যখনই এবং যতবারই সেই অংশটির রাজনৈতিক অভিভাবকত্বের সুযোগ ঘটেছে, তখনই এবং ততবারই এই জাতিরাষ্ট্রের যাত্রা ঘটেছে পাকিস্তানের দিকে এবং প্রতিবারই সেই যাত্রায় প্রতিবন্ধক ছিল রবীন্দ্রনাথের গান—যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের সঙ্গে প্রবলভাবে সম্পর্কিত। কারণ, বাঙালি মানস, বাঙালি সংস্কৃতিই বাঙালি জাতীয়তাবাদের অন্তঃসার—যার ভিত্তিভূমিতে রয়েছে বাংলা ভাষা আর ‘বাংলা’ বলে অভিহিত একটি স্থাননাম। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময় থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমাদের মুক্তির সংগ্রামে কী করে রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালির মুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে অনিবার্য হয়ে উঠল, আর কী করেই-বা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও বাঙালিত্বের চেতনার অবনমনের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকেও দমিত করা হলো তা আমরা লক্ষ করব।
“রবীন্দ্রনাথের দোহাই পাড়িয়া অখণ্ড বাংলার আড়ালে আমাদের তামদ্দুনিক জীবনে বিভেদ ডাকিয়া আনার সুযোগ দেওয়া চলিবে না। একদল লোক বাংলা সাহিত্যের অন্ধ অনুসারী ও ভক্ত। তাদের রবীন্দ্রভক্তি বিপদের কারণ হইতে পারে এবং বাইরের যারা পাকিস্তানকে দ্বিধাহীন মনে গ্রহণ করে নাই, তারা এই সুযোগ তামদ্দুনিক অনুপ্রবেশের খেলায় নামিতে পারে।” [১ বৈশাখ]
রবীন্দ্রনাথ “তখনও হিন্দু-ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন।... পাকিস্তান ও ইহার আদর্শে বড় বিরোধী ছিলেন। ...বিপ্লবী সরকারের [আইয়ুব সরকার] তৎপরতার সম্মুখে এই ছদ্মবেশী মুক্ত বাংলার ষড়যন্ত্র আবার কিভাবে মাথা তুলিয়া খাড়া হইল, তাহা আমরা বুঝিতে পারি না।” [১২ বৈশাখ]
“অবিভক্ত বাংলায়ও মুছলমান রবীন্দ্রনাথকে তাঁর জাতীয় কবি বা আশা ও ভাষার কবি বলিয়া গ্রহণ করে নাই। রবীন্দ্রনাথ ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে যে ধারার অনুসারী, সে ধারার সঙ্গে মুছলমানদের নাড়ীর যোগ সেদিনও ছিল না।” [১৪ বৈশাখ]
“পাকিস্তানের ইসলাম-ভিত্তিক জাতীয়তা ও রাষ্ট্রকে খণ্ডিত করর উদ্দেশ্যে অখণ্ড ভারত ও রামরাজ্যের স্বপ্নদ্রষ্টা রবীন্দ্রনাথকে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় কবি হিসেবে চালু করার জন্য একশ্রেণীর তথাকথিত সংস্কৃতিসেবী প্রদেশব্যাপী যে সাংস্কৃতিক অপচেষ্টা চালাইয়া যাইতেছে, এই সভা তাহাদের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করিতেছে।” [ ৮ মে ১৯৬১]
(উদ্ধৃত, মুনতাসির মামুন ২০১৩ ক: ২১-২২)
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি হয়েছিল, তারই প্রবল অভিক্ষেপ দেখা দিল রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ্য করে। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে প্রবল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ তৈরি হয়েছিল রবীন্দ্রনাথকে ঘিরেই। ওয়াহিদুল হকের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-অর্জনের পথে তিনটি বড় ঘটনা—রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও একষট্টির রবীন্দ্রজন্মশতবার্ষিকী। সেনাশাসনের রক্তচক্ষুকে কেবল নয়, পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জ করে এগারো দিন জুড়ে ঢাকায় উদ্যাপিত হয়েছিল রবীন্দ্রজয়ন্তী শতবার্ষিকী—তিনশো গান, চারটি নৃত্যনাট্য, চারটি নাটক ও নানাবিধ প্রদর্শনীর মাধ্যমে। সারাদেশ এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বার্তা তুলে নিয়েছিল, আইয়ুব শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। এই সাংস্কৃতিক আঘাত পাকিস্তান কখনোই সামলে উঠতে পারে নি। এই দ্রোহকে জ্বালিয়ে রাখতে তাঁরা ‘ছায়ানট’ নামের পেছনে সংঘবদ্ধ হয়েছিলেন (ওয়াহিদুল হক ‘রবীন্দ্রগীতির মুক্তি’, ১৪১৪: ১৪)। এভাবে, ‘রবীন্দ্রনাথ’ বাঙালি সংস্কৃতির সমার্থক হয়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের কাছে এবং পূর্বপাকিস্তানে বসবাসরত তাদের দোসরদের কাছে। ফলে, বাঙালিদের দমনের উপায় হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে দমনের বাসনাও জেগে উঠেছিল।
বাঙালিদেরকে তো ‘দাবায়ে’ রাখা সহজ নয়। পাক-ভারত যুদ্ধকালীন [১৯৬৫] অরক্ষিত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের বাঁচার দাবি হিসেবে ছয় দফা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিব হাজির হন। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে নেজামই ইসলামী নেতা চৌধুরী মেহাম্মদ আলীর বাসভবনে বিরোধী দলের এক বৈঠকে ছয় দফা উত্থাপন করতে চাইলে বাধা আসে। শেখ মুজিব বৈঠক ত্যাগ করে লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলন করে বাঙালির মুক্তির সনদ ঘোষণা করেন। ছয় দফা নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও অন্তর্বিরোধ ছিল, আর অনেক নেতা এ সম্পর্কে আগেভাগে জানতেন না কিছুই। ফলে, দূরদর্শী রাজনীতিজ্ঞ শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই স্বায়ত্তশাসনের বাসনা, ‘সোনার বাংলা’ স্বাধীন করবার বীজ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধু বাঙালির সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার যোগ্যতম মুখপাত্রে পরিণত হন। আর, বাঙালি এবং বঙ্গবন্ধু পশ্চিম পাকিস্তানের কাছে সমার্থক হয়ে ওঠে। ফলে, শেখ মুজিবকে দমন ও গ্রেফতার করা জরুরি হয়ে পড়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে। শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হলে ৬ দফা আন্দোলন বাঙালি সিভিল সমাজের একমাত্র আন্দোলন হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনে শামিল হতে সাংস্কৃতিক কর্মীরা নেমে আসে পথে। রবীন্দ্রনাথ আবারও ফিরে আসেন এবং প্রবলভাবে ফিরে আসেন৪। (মুনতাসির মামুন ২০১৩ ক: ২৮)
আর, তখন পাকিস্তান সরকার খড়্গহস্ত হন, নিষিদ্ধ করেন পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থি রবীন্দ্রনাথের গান।৫ এর প্রতিবাদ করেন সংস্কৃতিমান বাঙালি। তখন রবীন্দ্রনাথের পক্ষে বিবৃতি দেওয়া পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রচার হিসেবে পরিগণিত হবে এমন অভিমত ব্যক্ত করেন ঢাকায় বসবাসকারী পশ্চিম পাকিস্তানি বিশিষ্ট দোসররা। অধিকন্তু, ৪০ জন তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সেই অপমত সমর্থন করে বিবৃতি দেন। শিল্পী কামরুল হাসান এই চল্লিশজনকে আলীবাবার ‘চল্লিশ চোর’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যাদের অধিকাংশই পরবর্তী সময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল (মুনতাসির মামুন ২০১৩ ক: ৩১)। ‘রবীন্দ্রসংগীত’ এদেশে গান হিসেবে যাথার্থ্য পাবার আগেই স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালির জীবনসংগ্রামে প্রবলভাবে উপস্থিত হয়েছিল, যা বাঙালিদের জন্য অগৌরবের নয়, বরং পরম শ্লাঘার আকর (ওয়াহিদুল হক ‘রবীন্দ্রসংগীতের অনুশীলন অধ্যাপনা ও মুক্তি’, ১৯৮৫: ৮৩) । আর এই বিস্তৃত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের বেদনার-সুষমা ও গৌরব বেয়ে ক্রমে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়কালের গান আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে নিঃসংশয়ে জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছিল। এখন, বিশ্লেষণ করবার বিষয়, কী ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে, আর সংগ্রামী বাঙালির স্বভাব-শিল্পিতায় তা কী রূপ পরিগ্রহ করে ‘জাতীয় সংগীত’ হয়ে উঠল সেই গান তা যাচাই করা যেতে পারে।
২.
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ৭ আগস্ট ১৯০৫ কলকাতার টাউন হলে যে সভা হয়, সেই সভা উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের নতুন গান—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। “কুষ্টিয়া অঞ্চলের কোনো ডাকঘরের গগন হরকরা রচিত ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গানের সুর ‘আমার সোনার বাংলা’তে আরোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ” (উদ্ধৃত, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ১৪১০: ১০৮)। “১৯৭১ সালে ‘বাংলাদেশ’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র কর্তৃক প্রথম দশ পঙ্ক্তি ‘জাতীয়-সঙ্গীত’ রূপে স্বীকৃতি লাভ করে” (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ১৪১০: ১০৮)।
নিতাই বসু জানিয়েছেন : ...রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন্দ্রনাথ-সহ সপরিবারে শিলাইদহে বোটে থাকতেন তখন ওদের বোটে প্রত্যহ গ্রাম্য-গাইয়েদের আমদানি হত। এমনই এক অল্পবয়সী মুসলমান গাইয়ে সুনা-উল্লাার কণ্ঠে গগন হরকরার যে গানটি শুনে রবীন্দ্রনাথ এই গানটি লিখতে প্রেরণা পান, সেটির প্রথম স্তবকটি হলো—
‘আমি কোথায় পাব তারে
আমার মনের মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দিশে
দেশ বিদেশে,
আমি দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে—’
(নিতাই বসু ১৩৯৭: ১৮০)
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে আমরা যে গানটি৬ গেয়ে থাকি তার সুর বিশ্লেষণ করলে সেই গানের মধ্যে ঝিঁঝিট রাগের চলন পাওয়া যায়। ঝিঁঝিট রাগের স্বরূপ আলোচনা করে আমরা এই সম্পর্কসূত্রটি অনুসন্ধান ও যাচাই করতে পারি—
উপরের স্বরবিন্যাসে লক্ষ করা যায়, ঝিঁঝিটের নিম্নলিখিত চলনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে—মা পা ধা ণা ধা পা, র্সা ণা ধা পা ধা মা গা রা মা গা রা মা গা, মা গা রা সা ণ্া ধ্া প্া ধ্া সা।
অন্তরা অংশে তার-সপ্তকে ঋষভের ব্যবহার লক্ষণীয়, যা ঝিঁঝিট রাগের সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ—
ও র্সা র্সা র্রর্গা । র্রা র্সা -র্রর্সা ও৮
আ মে র্০ ব নে ০০
সঞ্চারিতে ‘কী শোভা কী ছায়া গো’র ‘ছায়া’ অংশের সুরে যেভাবে ‘খটকা’৯ ব্যবহার করা হয়েছে, সেরকম খটকা ঝিঁঝিটের বন্দিশে অহরহ শুনতে পাওয়া যায়—
ও ণ্া -া -সা । সরসা ণ্ধ্া -া ও -া -া
কী ০ ছা য়া০ গো০ ০ ০ ০
সঞ্চারির ‘কী আঁচল’ অংশে খটকার ব্যবহার রয়েছে যা ঝিঁঝিট সম্পর্কিত—
গমা। গমগা রসা -রা ও১০
কী০ আঁ চ ল্
আভোগে আমরা দেখি ঝিঁঝিট রাগের চলনের সঙ্গে সম্পর্কিত রা গা সা, মা গা রা সা-া, পা মা গা রা গা সা, ধা সা—এই সঙ্গতিগুলি পাওয়া যায়।
ঝিঁঝিট রাগের চলনের সঙ্গে গানটির গঠনের সম্পর্ক পাওয়া যায়। লোকসংগীতের পরিশীলিত রূপ ভারতীয় রাগসংগীত। প্রচলিত বাউল সুরের ধুনকে সংস্কার করে পরবর্তী সময়ে ‘ঝিঁঝিট’, ‘ভূপালি’, ‘খাম্বাজ’, ‘ভৈরব’, ‘কাফি’, ‘কল্যাণ’ এমন নানান রাগ আমরা পাই। দেশি সংগীত বা লোকজ ধুন বিবর্তিত হয়ে, পরিশীলিত পরিমার্জিত রূপ নিয়ে রাগসংগীত হয়েছে। এই অনিবার্য যোগের প্রতিফলন আমরা এই গানের সুরের বিশ্লেষণে পাই। গগন হরকরার গাওয়া বাউল গানের স্থায়ী অংশে ‘মনের মানুষ যে রে’-র শেষাংশের সুরে শুদ্ধ নিষাদ রয়েছে (প্রফুল্লকুমার দাস ১৩৬৯: ৮৬-৭৯), রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের স্থায়ী অংশে ‘ভালোবাসি’-র শেষাংশের সুরে কোমল নিষাদ ব্যবহার করেছেন (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৬২: ১০; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৬২: ৮৭; পরিশিষ্ট)১১। রবীন্দ্রনাথকৃত এমন পরিবর্তনের কারণে তা ঝিঁঝিটের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একটি স্বরের শ্রুতিগত এ পরিবর্তন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাঙা গানে না করলে এই লক্ষণটি গানটির শুরুতেই পাওয়া সম্ভব ছিল না। মূল গানের অন্তরাতে কোমল নিষাদের ব্যবহার পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের গানে অন্তরার প্রথমাংশে শুদ্ধ নিষাদের ব্যবহার থাকলেও ‘অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে’ অংশের সুরে কোমল নিষাদের ব্যবহার রয়েছে। আভোগের সুরেও নিষাদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে অন্তরার অনুরূপ বিন্যাস দেখতে পাওয়া যায়। আর, সঞ্চারীর সম্পূর্ণ অংশেই রবীন্দ্রনাথ কোমল নিষাদ ব্যবহার করেছেন। (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৬২: ১০-১২; রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৬২: ৮৭-৮৯; পরিশিষ্ট)
আর, রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সঙ্গে আমাদের জাতীয় সংগীতের সুরের কিছু ব্যবধান লক্ষ করবার মতো১২। খুুব সংক্ষেপে বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের গানে স্বরের অর্ধমাত্রা জাতীয় সংগীতে এসে কখনোবা একমাত্রার মর্যাদা পেয়েছে। কখনো কখনো উল্টোটা ঘটেছে। গানের স্থায়ীতেই এমন নমুনা পাওয়া যাবে। স্পর্শ স্বরের ব্যবহার ঘটেছে কখনোবা, যা জাতীয় সংগীতকে আরও আবেগঘন করেছে, যেমন ‘কী আঁচল বিছায়েছ’ অংশে। স্বরান্তরে যাবার প্রবণতাও রয়েছে। আবার, ছোটো-ছোটো মীড়ের ব্যবহার১৩ রয়েছে আমাদের জাতীয় সংগীতে, যা ইন্দিরা দেবীকৃত রবীন্দ্রসংগীতের সুরে ছিল না। বাউল গানের ঢং বা কীর্তনের মুড়কি রবীন্দ্রসংগীতে ছিল না—খাড়া খাড়া স্বরের ব্যবহার ছিল তাতে, যা আমাদের জাতীয় সংগীতে রয়েছে১৪। আর এসবই করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানকে ভালোবেসে, তাঁর গানকে অনিবার্য শক্তি হিসেবে জড়িয়ে নিয়ে ইতিহাসের অংশ করবার অভিপ্রায়ে।
৩.
আমরা জানি, অখণ্ড ভারতবর্ষে দেশাত্মবোধক ভাবনার অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল ‘বন্দে মাতরম্’ গানটি। সে গানটি সকল ধর্মসম্প্রদায় নির্বিশেষে জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাধা আছে, সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কোনো দ্বিধা ছিল না— ‘... ভারতবর্ষের ন্যাশনাল গান এমন কোনো গান হওয়া উচিত যাতে একা হিন্দু নয় কিন্তু মুসলমান, খ্রীষ্টান—এমনকি ব্রাহ্মও শ্রদ্ধার সঙ্গে যোগ দিতে পারে (উদ্ধৃত, আলপনা রায় ১৪১৩: ভূমিকাংশ ৩১)। আমরা জানি, এমনকি ‘বিজয়া’ নিতান্ত হিন্দুদের একটি সামাজিক অনুষ্ঠান হলেও রবীন্দ্রনাথ তাতে ‘অনন্ত সূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে’ তাকেও সম্ভাষণ করার আহ্বান জানিয়েছেন (প্রশান্তকুমার পাল ১৩৯৭: ২৬৪)। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রায় ন-বছর পর ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে স্বাধীন ভারতবর্ষে জাতীয় সংগীতরূপে স্বীকৃত হলো রবীন্দ্রনাথের রচিত ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা’। এই প্রসঙ্গে পরবর্তী সময়ে জওহরলাল নেহরু তাঁর স্মৃতিচারণ করেন, যেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নতুন ভারতের জন্যে ‘National Anthem’ রচনা করতে অনুরোধ করেন। আর তখন থেকেই জাতীয় সংগীত কথাটি ‘National Anthem’ অর্থে স্বীকৃত হয়। (উদ্ধৃত, আলপনা রায় ১৪১৩: ভূমিকাংশ ৩৩)। এর আগে যেকোনো দেশাত্মবোধক গানই জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃত ছিল। রবীন্দ্রনাথের গীতসংকলনে এই শ্রেণির গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখি। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশি গান থেকে বাঙালি যে অনুভবের ভাষা পেয়েছিল, সে ভাষাকে ধরে রেখেছিল পরবর্তী সময়ে বিভাজিত ভারতের পূর্ববঙ্গের পীড়িত জনগোষ্ঠী। রবীন্দ্রনাথের গান জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার বিষয়ের সঙ্গে প্রবল আবেগ ও রাজনৈতিক বোধন জড়িত হয়ে পড়েছিল। সনজীদা খাতুন এ গান সম্পর্কে জানিয়েছেন—
১৯৫৭ সালের প্রথমার্ধে ঢাকাতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতাসুদ্ধ প্রাদেশিক নেতাদের এক বৈঠক হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট সকলের জন্যে কার্জন হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। সে সভায় আমার গান গাইবার কথা ছিল। সেই সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে “আমার সোনার বাংলা” গানটি গাইতে অনুরোধ পাঠান। এর তাৎপর্য তখন বুঝি নি, আজ বুঝতে পারি। সেদিন পশ্চিম পাকিস্তানের সদস্যদের কাছে ‘সোনার বাংলা’ বিষয়ে বাঙালির আবেগ-অনুভূতি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন এদেশের নেতা। এর কিছুদিন আগে ২৩ মার্চ পূর্ববঙ্গের নাম পূর্বপাকিস্তান করে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণীত হয়েছিল। আঞ্চলিক স্বাধীনতার জন্যে উত্তাল আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু সবসময় জাহিদুর রহিমকে এই গান গাইবার জন্যে খবর পাঠাতেন। রেসকোর্সের ময়দানে তাঁর সভাতে জাহিদ যে কতবার “আমার সোনার বাংলা” গেয়েছে! এ গানের আবেগ বাঙালিকে আমূল নাড়া দিয়েছে। পাকিস্তানি বিরূপ প্রচারণা রবীন্দ্রসঙ্গীত আর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সাধারণ মানুষকে দ্বিধাগ্রস্ত করে রেখেছিল। জনপ্রিয় নেতার বাঙালি স্বার্থ সংরক্ষণমূলক বক্তৃতার সঙ্গে এই বাংলাপ্রীতির গান সকল মানুষকে অনেকভাবে আকর্ষণ করল। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তাই মাঠের রাখালও স্বতঃস্ফূর্তভাবে “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” গেয়ে উঠেছে।
(সনজীদা খাতুন ‘আমার সোনার বাংলা’, ১৪১৬: ২২৮)
সাইপ্রাসের আক্রোতিরিতে ব্রিটেনের বিমানঘাঁটিতে তেল ভরা হলো কমেট জেটে। তারপর ওমান। ব্যানার্জি দেখলেন, বঙ্গবন্ধু বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠছেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে গাইতে লাগলেন—‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ ব্যানর্জিকে বললেন, গলা মেলাতে। প্রথম বারেরটা হলো রিহার্সেলের মতো। দ্বিতীয়বার আবেগে ভরা। বঙ্গবন্ধুর চোখ সজল।
আবার দু’জনে বসলে বঙ্গবন্ধু ব্যানার্জিকে নিচু গলায় বললেন, তিনি চান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হবে আমার ‘সোনার বাংলা’। বঙ্গবন্ধু বললেন, বিষয়টা জানলাম আমি আর আপনি।”
(উদ্ধৃত, মুনতাসীর মামুন ২০১৩ খ: ৬৭)
“রবীন্দ্রগীতি এবারে পেয়ে যায় একটা অভাবিত মাত্রা। এক ধরনের মুক্তিই বটে। কেবল যে তাঁর গান ছড়াল জনারণ্যে, তা নয়। মানব-মুক্তির হাতিয়ার হলো তা, রাজনৈতিক সম্মুখসমরে। কোনো কোনো লেখক বলেছেন মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কেতনে আঁকা ছিল রবীন্দ্র-আলেখ্য। সঙ্গতভাবেই বাংলাদেশকে আর রাষ্ট্রের জন্য জাতীয় সঙ্গীত খুঁজতে হয় না। মুক্তিবাহিনীর প্রতিটি প্লাটুন, সেকশন, লুঙ্গি পরে গেঞ্জি গায়ে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে যে গান গেয়েছে, সেই ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গ্রহণ করতে, গৌরবদান করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দেরি হয় না” (ওয়াহিদুল হক ‘রবীন্দ্রগীতির মুক্তি’, ১৪১৪: ২১০)। ফলে, প্রকৃতিগতভাবে, ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মন্ত্রীসভার প্রথম বৈঠকে এই গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত হয়। যেই গানের বাণীতে সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ বাংলার ব্যাপ্ত প্রকৃতির সৌন্দর্যের সীমাহীন রূপের কথা বলা আছে । আর, আছে স্বদেশকে ভালোবাসার কথা, স্বদেশের সঙ্গে আমাদের প্রাণের সংযোগের কথা। যে স্বদেশে মায়ের মুখ সঞ্চারিত। যে ভূখণ্ড মায়ের মতো কথা বলে ওঠে—সুধার মতো লাগে তাঁর মুখের বাণী। আর, যাঁর মুখাবয়ব মলিন হলে নয়নজলে আমরা ভেসে যেতে থাকি (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৩৮০ : ২৪৩)। যে গান শুনলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে; বাঙালির প্রকৃত চোখ হৃদয়ের জলে ভিজে যায়—নিজেকে সংবরণ করা বড়ো দুরূহ হয়ে পড়ে।
‘বাংলা’ কথাটির যেমন দ্বিধারিক অর্থ রয়েছে, তেমনই স্বদেশপ্রেমেও ‘স্বজাতি’ ও ‘স্বদেশ’—এই দ্বিবিধ চেতনা কাজ করে। ভূখণ্ডের নামের সঙ্গে এমন সংস্কৃতিগত সমাপতন খুবই বিরল ব্যাপার। বঙ্গভঙ্গ আদেশের অভিঘাতে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশবোধ একজন কবির। আর, পরবর্তী সময়ে বাঙালি সংস্কৃতিসমেত পূর্ববাংলাকে মুক্ত করবার অভিপ্রায়ে যে স্বদেশবোধ বঙ্গবন্ধুর ছিল তা একজন রাজনীতিজ্ঞের। আত্মবোধদীপ্ত দেশপ্রেমিক দু-জনের আত্মপ্রত্যয়ের যাত্রা দুই রকমের। চেতনাগত ঐক্য থাকলেও রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুর জেগে-ওঠা স্বদেশ ও বেদনা এক নয়। তবু, আমরা লক্ষ করি বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির আগে বঙ্গবন্ধুর ওপর আঘাত, তাঁর বন্দিদশা সমগ্র বাঙালির ওপর আঘাতের সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের পথে সাংস্কৃতিক জাগরণকে দমাতে রবীন্দ্রনাথকেও দমিত করা হয়েছিল, কারণ, রবীন্দ্রনাথও পাকিস্তানিদের কাছে বাঙালির সাংস্কৃতিক সত্তারই অংশ হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে, স্বাধীন বাংলাদেশেও বাঙালি সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে পাকিস্তানের পথে যাত্রাকালে বঙ্গবন্ধুকে মুছে দেবার অপবাসনা আমরা লক্ষ করেছি। পাঠ্যপুস্তক থেকে বঙ্গবন্ধু অপসারিত ছিলেন, তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের মহাকাব্যিক ভাষণটিও গোপন ছিল। এমনকি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৎকালীন সরকারপন্থি বুদ্ধিজীবীরা জাতীয় সংগীতকে বদলে দেবার বাসনাও ব্যক্ত করেছিলেন। এভাবে দুই সময়ের দুই ভিন্ন স্বভাবের মানুষ রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুকে বাঙালিত্বের অনুকূল বিবেচনা করে সমার্থক করে তুলেছিলেন বাংলাদেশের শাসকগণ, যেমনটি করেছিল পাকিস্তানি শাসকরা। আমরা লক্ষ করি, পাকিস্তান থেকে মুক্ত হবার ঠিক পরপর, স্বাধীনতার কালে বাঙালির মুখের ভাষা এবং পোশাক যেমনটি ছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তেমনটি আর নেই। এর বিচ্যুতির কারণ, নতুন কোনো ভূখণ্ড যখন নতুন কোনো অনুপ্রেরণায় জেগে ওঠে, তখন তা যে তীব্রতা নিয়ে সমাজের মধ্যে অবস্থান করে, সময় যত যায় সেই তীব্রতা ক্রমে ফিকে হতে থাকে। অধিকন্তু, রাজনৈতিক পালাবদলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’কে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যখন সাংবিধানিকভাবে মুছে ফেলা হয়, স্বাধীনতা-বিরোধীরা রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসীন হয়, তখন মুক্তিযুদ্ধের ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনা’ আরও ক্ষয়ে যেতে থাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিপোষকতায়। আশার কথা যে, সাংস্কৃতিক জাগরণ ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে বাঙালি আবার ফিরে পেতে পারে নিজস্ব অনুভাবের ভাষা, যেমনটি পেয়েছিল জাতির দুঃসময়ে রবীন্দ্রনাথের গানে। ইতিহাসচেতনার মধ্য দিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা বাহিত হলে তবেই জেগে উঠবে বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’—যেখানে রবীন্দ্রনাথ কোনো-না-কোনো ভাবে ‘সোনার বাংলা’রই সমার্থক হয়ে থাকবেন।
টীকা
১. ১৯০৫-এ যে বঙ্গভঙ্গ হয়, তাতে বৃহত্তর বাংলাকে ভেঙে দিয়ে একাধিক প্রদেশ বানানো হয়েছিল—বর্তমান ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যেমন অনেকগুলো রাজ্য আছে, সেইরকম। একই রাষ্ট্রের মধ্যে আলাদা প্রদেশ। আলাদা প্রদেশ শুধু, আলাদা দেশ তো নয়। এখন যেমন ভারতে এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাওয়া যায়, সেই রকমই সহজ থাকত ব্যাপারটা। প্রশাসনিক সুবিধার জন্যেই এটা করা হয়েছিল। কিন্তু এই আলাদা প্রদেশ করার বিরোধিতা শুরু হয়েছিল কলকাতা থেকেই। কলকাতা তখন ভারতের রাজধানী। এই আন্দোলন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে এত তুঙ্গে ওঠে যে ইংরেজরা তা রদ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ায় ইংরেজরা বাংলা সম্পর্কে অতিরিক্ত সতর্ক হয়ে যায়। ফলে, তার পাঁচ-ছ’ বছরের মধ্যেই তারা কলকাতা থেকে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যায় দিল্লিতে। এর ফল যেটা হলো, ভারত স্বাধীন হবার পর দিল্লিই যখন রাজধানী রইল, তখন তারা রাজধানীকেন্দ্রিক হিন্দি ভাষাটাকেই প্রায় রাষ্ট্রভাষার মতো চাপিয়ে দিতে চাইল সারা দেশের ওপর। রাজধানী কলকাতায় থাকলে বাংলা ভাষাটা হয়ত আরও আধিপত্য বিস্তার করতে পারত। সেক্ষেত্রে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসামের দক্ষিণাংশ ও বিহারের একটা বড়ো অংশের ভাষা বাংলা হওয়ায় বাংলা ভাষাভাষীরাই থাকত সংখ্যাগরিষ্ঠ। অজস্র সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো কলকাতা এবং বাঙালিরা। এরপর ইংরেজরা বুঝে গেল যে, ধর্মের ভিত্তিতে এদের মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে দিতে না পারলে এরাই আমাদের উপনিবেশ ভেঙে দেবে। ফলে তারা devide and rule নীতি অনুসরণ করল, যার অনিবার্য ফল হিসেবে পরে এল দেশভাগ। ওই বঙ্গভঙ্গের তীব্র বিরোধিতা না করলে হয়ত এই উপমহাদেশের মানচিত্র অন্যরকম হতো। এবং বাঙালি ও বাংলা ভাষারও নানারকম উন্নতি হতো।
২. দ্র. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, জুন ২০১২
৩. দ্র. SECRET DOCUMENTS OF INTELLIGENCE BRANCH ON FATHER OF THE NATION BANGABANDHU SHEIKH MUJIBUR RAHMAN, Edited by Sheikh Hasina (Hon’ble Prime Minister), Hakkani Publishers, Dhaka, volume 1 (1948-1950) & vol 2 (1950-1951)
৪. একই রকমভাবে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানেও ফিরে এসেছিল রবীন্দ্রনাথের গান। ‘জেলের তালা ভাঙব, শেখ মুজিবকে আনব’ ধ্বনিতে রাজপথ যখন মিছিলে টালমাটাল, তখন তার সঙ্গে ‘ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো’ থেকে নেয়া ,‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো’ও ধ্বনিত হয়েছিল। (ওয়াহিদুল হক ‘সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ, রাষ্ট্রিক উত্থান, রবীন্দ্রনাথ’, ১৪১৪: ২২১)
৫. ২৪ জুন ১৯৬৭, দৈনিক পাকিন্তান পত্রিকায় প্রকাশিত খবর মোতাবেক “কেন্দ্রীয় তথ্য ও বেতার মন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীন গতকাল জাতীয় পরিষদে বলেন যে, ভবিষ্যতে রেডিও পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান প্রচার করা হবে না এবং এ ধরনের অন্যান্য গানের প্রচারও কমিয়ে দেওয়া হবে।” (মুনতাসীর মামুন ২০১৩ ক: ২৯)
৬. পরিশিষ্টে ‘ছায়নট’ থেকে প্রাপ্ত আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর সংযুক্ত রয়েছে
৭. দ্র. পরিশিষ্ট, ‘ছায়ানট’ থেকে প্রাপ্ত সাম্প্রতিক জাতীয় সংগীতের স্বরলিপির প্রতিলিপি
৮. দ্র. পরিশিষ্ট
৯. মূল স্বরে নিম্নস্বররের গমকযুক্ত স্পর্শ
১০. দ্র. পরিশিষ্ট
১১. প্রথম সুরটি রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় ইন্দিরা দেবী করেছিলেন, যা স্বরবিতান ষট্চত্বারিংশ খণ্ডের শুরুতে রয়েছে। দ্বিতীয়টি সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া রেকর্ড অনুসারে ১৩৭৮ সনে শান্তিদেব ঘোষ করেছিলেন, সেটিও ওই স্বরবিতানের শেষে যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় স্বরলিপিটি আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর হিসেবে পরিশিষ্টে সংযুক্ত রয়েছে। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের সুর প্রসঙ্গে বলা কথাগুলি তিনটি সুরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
১২. “বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরে “আমার সোনার বাংলা”-র সুর আর স্বরলিপি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। তখন ক্যাবিনেট ডিভিশনের এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু রায় দেন, যে সুর গেয়ে দেশকে স্বাধীন করা হয়েছে, তাই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের সুর। ঘটনা এই যে, সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া রেকর্ড থেকে যে সুর শুনে শিল্পীরা গানটি তুলেছিলেন, সেই সুর থেকে নিজেরাই খানিকটা সরে যান। আর সেই সুরই গাওয়া হয়ে আসছে মুক্তিযুদ্ধের সূচনাকাল থেকে এ পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত আমাদের ভুলের অপরাধকে মুছে দিয়েছিল। আজও সেই সুরে “আমার সোনার বাংলা” গেয়ে চলেছি আমরা।” (সনজীদা খাতুন ‘সোনার বাংলা’, ১৪১৬: ২২৮)
১৩. সুচিত্রা মিত্রের রেকর্ড শুনে শান্তিদেব ঘোষের করা স্বরলিপিতে এই মীড়ের ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। যেহেতু ওই সময়ে স্বরলিপি দেখে গান শিখবার ব্যাপারটি ছিল না, এবং সুচিত্রা মিত্রের রেকর্ডটি শিখবার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছিল। তাই সুচিত্রার গায়নে মীড় দেবার প্রবণতা আমাদেরকে প্রভাবিত করেছে। যদিও আমাদের জাতীয় সংগীতের সুর এবং সুচিত্রা মিত্রের গাওয়া সুর তুলনা করলে মীড় ব্যবহারে অনুরূপতা খুব কম পাওয়া যায়।
১৪. স্থায়ী অংশে ‘ভালোবাসি’র শেষাংশের সুরে বাউল গানের মুড়কি খুবই স্পষ্ট। দ্র. পরিশিষ্ট
১৫. বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের প্রাক্কালেও গানটি গাওয়া হয়েছিল। মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানেও এ গান গাওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গানটি আমাদের যৌথ জীবনচেতনা সঞ্চার করতে নিয়মিত প্রচারিত হতো।
সহায়ক রচনাপঞ্জি
১. আলপনা রায় (মাঘ ১৪১৩), রবীন্দ্রনাথের স্বদেশী গান, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা
২. ওয়াহিদুল হক (নভেম্বর ১৯৮৫), চেতনাধারায় এসো, মুক্তধারা, ঢাকা
(২ চৈত্র ১৪১৪), প্রবন্ধ-সংগ্রহ, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা
৩. নিতাই বসু (১৩৯৭), রবীন্দ্রসংগীতের উৎস সন্ধানে, সাহিত্যায়ন, কলকাতা
৪. প্রফুল্লকুমার দাস (১৩৬৯), রবীন্দ্রসংগীত-প্রসঙ্গ (দ্বিতীয় খণ্ড), জিজ্ঞাসা পাবলিশিং হাউজ, কলকাতা
৬. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় (দ্বি. সং. পৌষ ১৪১০), গীতবিতান কালানুক্রমিক সূচী, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট, কলকাতা
৭. প্রশান্তকুমার পাল (১ বৈশাখ ১৩৯৭), রবিজীবনী পঞ্চম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা
৮. বিষ্ণু নারায়ণ ভাতখণ্ডে (তৃতীয় সং. মাঘ ১৪১৩), হিন্দুস্থানী সঙ্গীত-পদ্ধতি (ধরিত্রী রায় অসীম চট্টোপাধ্যায় সম্পা.), দীপায়ন, কলকাতা
৯. মুনতাসীর মামুন (২০১৩ ক), রবীন্দ্রনাথ কীভাবে আমাদের হলেন, সুবর্ণ, ঢাকা
(২০১৩ খ), বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা
১০. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (পৌষ ১৩৬২), স্বরবিতান ষট্চত্বারিংশ খণ্ড, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা
(পৌষ ১৩৮০), গীতবিতান, বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগ, কলকাতা
১১. সনজীদা খাতুন (২০০৪), স্বাধীনতার অভিযাত্রা, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা
(ফাল্গুন ১৪১৬), প্রবন্ধ-সংগ্রহ, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা
পরিশিষ্ট
