সাহিত্যের জনপ্রিয়তা ও দরিদ্রের উন্নয়ননাট্য

ধূর্ত ও ধীমান সমালোচকও মাঝে মাঝে মূর্খ ও মুরতাদের মতো এই কথা বলে বসেন যে, সাহিত্যের জনপ্রিয়তা মানেই হলো সাহিত্যের সীমানা বাড়ানো। উল্টোভাবে কথাটার মানে দাঁড়ায়, জনপ্রিয় সাহিত্য জনগণকে সাহিত্যের দিকে টানে।

আশলে কি তাই ঘটে? ফিরিস্তি নেয়া যাক। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’র জনপ্রিয়তা বাংলার জনগণকে নিশ্চয়ই চলচ্চিত্র-দেওয়ানা করে তুলেছিল ৯০-এর দশকে। এর ফলস্বরূপ তারা ক্রমান্বয়ে উচ্চতর বোদ্ধায় পরিণত হয়ে সিনেমাহলে যাওয়া বন্ধ করে দিল। ঘরে বসে দেখতে শুরু করল তারকাভস্কি বা কিসলোভস্কি। ব্যাপারটা কি এমন?

হুমায়ূন আহমেদের গগনচুম্বী মগনগানে উন্মত্ত পাঠককুল কি তার মৃত্যুর পর দলে দলে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা কমলকুমার মজুমদার কিংবা নিদেনপক্ষে শহীদুল জহির আবিষ্কারে আকুল হয়ে উঠেছিল? নাকি তারা খুঁজে নিয়েছিল আনিসুল হক বা সাদাত হোসাইনদের?

হেলাল হাফিজের ভিউকার্ড-কবিতা-ক্রেতাগণ কিংবা পুর্ণেন্দু পত্রীর ক্যাসেট-কাব্য-শ্রোতাগণ কখনো কি উৎপল কুমার বসু বা মান্নান সৈয়দকে বুঝতে চেষ্টা করেছিল? নাকি তারা মজে গিয়েছিল অশ্রু ও চিঠি ফেরি করা কবি মহাদেব সাহাতে?

প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা দেখব এইসব জনপ্রিয়তায় শিল্পের প্রসার ঘটে না। যা ঘটে তা হলো, অভুক্ত ভোক্তার সুপ্ত বাসনার উদ্‌যাপন। এই ভোক্তা ভাত খেতে চায়। গামলা-ভর্তি ভাত। মুকুন্দরাম যেমন বলেছেন: শয়ন কুৎসিত এর, ভোজন বিটকাল।/ ছোট গ্রাসে তোলে যেন তেয়াটিয়া তাল।

এভাবেই আম-পাঠক তৈরি করে রুচির সুচির শর্বরী।

তা দেখে আমরা কেন লাজে মরি!

 

কবিতা কিভাবে জনপ্রিয় হয়? কেন হয়?

প্রশ্নটা এ কারণে ওঠে যে, শিল্পের যে মাধ্যমগুলি ভাষা-নির্ভর, আরও ভেঙে বললে শব্দ-নির্ভর, কবিতা তার মধ্যে সবচেয়ে সূক্ষ্ম, সবচেয়ে এলিট সেই অর্থে। এই সূক্ষ্মতা কিভাবে জনচিত্তে উদ্‌যাপিত হতে পারে? তবে সেই উচ্চবোধ জনগোষ্ঠী কোন গ্রহে কোন কালে বাস করে, তা আমাদের জানতে ইচ্ছে হয় বৈকি।

পৃথিবীর জননন্দিত কবিদের কথা স্মরণ করলেই আমরা প্রায় সমস্বরে উচ্চারণ করি—মায়াকোভস্কি, নাজিম হিকমত, পাবলো নেরুদা, মাহমুদ দারবিশ এবং আমাদের নজরুল, সুকান্ত প্রমুখের নাম।

মনে রাখা দরকার, এদের জনপ্রিয়তা পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে জড়িত। সময়ের বিশেষ প্রয়োজন ও প্ররোচনায় এদের আর্টওয়ার্ক হয়ে ওঠে পারপাসিভ—উদ্দেশ্যনিহত শিল্পপ্রয়াস। যে শিল্পপ্রয়াসে শিল্পী সর্বদাই ভোক্তার চাহিদা পূরণ করে চলেন। অর্থাৎ এ ধরনের কবিতায় মূলত পাঠকের জ্বালামুখে গ্যাস সরবরাহ করেন কবি। পাঠকের জ্বলুনি থেমে গেলে সেই গ্যাস আর জ্বলে না, বোঁটকা গন্ধ ছড়ায় মাত্র। এবং তারপর অপেক্ষা করতে থাকে আরও একটি ফুলকিফোটা মুহূর্তের। যদি আবার জ্বলে ওঠা যায়।

জনপ্রিয়তার রকমফেরও আছে। মুগ্ধবোধ জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয়তা, আর উচ্চবোধ জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয়তা এক জিনিশ নয়। রুশ জনগোষ্ঠীর কাছে আসতে তলস্তয়কে আর্টের সাথে যে বোঝাপড়া করতে হয়, বাংলার জনগোষ্ঠীর কাছে যেতে সুনীল-শীর্ষেন্দুর বোঝাপড়াটা হয় ভিন্নতর। বলা ভালো, নিম্নতর।  শিল্পিমন ও জনচিত্তের সংযোগ কিভাবে ঘটবে এ নিয়ে গ্যেটেরও ছিল টনটনে টেনশন। ফাউস্টের উপক্রমণিকাতেই তা পরিষ্কার।

আমরা যেসব ক্লাসিক বা সিরিয়াস লিটারেচারের কথা বলি, সেসবও জনপ্রিয়। কিন্তু তা জনপ্রিয় হয়েছে দীর্ঘকালপরিসরে, জীবিত ও মৃত পাঠকের কলরবে। রাতারাতি হাতাহাতি করে মাত করার বিষয় ছিল না সেসব।

তাৎক্ষণিকভাবে, কবির জীবৎকালে কবিতা জনপ্রিয় হতে হলে ঘটতে হবে দুইটি ঘটনা। হয় কবিতাকে স্থূল হতে হবে, নয় পাঠককে সূক্ষ্ম হতে হবে। মানে দুপক্ষকে এক বিন্দুতে এসে মিলতে হবে।

 

অতি-সম্প্রতি দুচার জন জীবিত কবির জনপ্রিয়তা নিয়ে খানিকটা বিস্ময় ও বিতণ্ডা শুরু হয়েছে। ব্যাপারটা ফয়সালা করার জন্য চার জন কবিকে নিয়ে সামান্য আলাপের সূচিমুখ তৈরি করা যাক। এই চার জন কবি হলেন—হেলাল হাফিজ, মারজুক রাসেল, ইমতিয়াজ মাহমুদ ও হাসান রোবায়েত।

প্রথমত আমরা বুঝতে চেষ্টা করব এদের জনপ্রিয়তা অর্জনের তরিকাটা কী। ওই তরিকার মধ্যেই লুকানো থাকবে কাব্যশৈলীর তর্জা। ফলে কবিতার মূল্যনিরূপণে আমরা বেশিদূর এগোব না আপাতত।

‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—হেলাল হাফিজের এই পঙ্‌ক্তি একদা দেয়ালে দেয়ালে উৎকীর্ণ ছিল। যে সময়ের কথা বলছি, সেসময় দেয়াল নিজেই এমন একটা পঙ্‌ক্তির জন্য উদ্গ্রীব হয়ে ছিল। এই পঙ্‌ক্তিকে ছড়িয়ে দেয়ার কাজটি করেছিল পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্টরা। যারা মূলত কবি-সাহিত্যিক বা শিল্পী নন। কিন্তু প্রায়-কবি, ঊনকবি অথবা কবি-ভাবাপন্ন ক্যাটাগরিতে পড়বেন হয়তো। তাদের দ্বারা এইসব পঙ্‌ক্তি চারদিকে প্রচারিত ও উদযাপিত হতে দেখে উঠতি কবিরা রীতিমতো উদ্ভ্রান্ত হয়েছেন এবং প্রীতিগতভাবে প্রলুব্ধ হয়েছেন অমন পঙ্‌ক্তি রচনার জন্য। কিছুটা দূর থেকে, আড়চোখে এইসব দেখেশুনে বয়োজ্যেষ্ঠ কবিরা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন, কখনোবা ঈর্ষায় পুড়ে মরেছেন সঙ্গোপনে।

এই আলোচনার সূত্রপাতে যে সূত্রটি বেরিয়ে আসে তা হলো, সমকালে কবিতা জনপ্রিয় হয় মূলত অকবিদের দ্বারা। তারপর তাতে যুক্ত হন দ্বিধান্বিত কবিসমাজ।

মারজুক রাসেলের ক্ষেত্রেও তাই। ভিজুয়াল-মিডিয়ার দ্বারা অর্জিত তারকাখ্যাতি বিজ্ঞাপিত হয়েছে কবিতা-বিক্রির জগতে। পরিমণি বা হিরো আলমের কবিতার বই আরও বেশি বিক্রি হবে, এমনটা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। প্রশ্ন উঠতে পারে, যা কিছু লিখলেই কবিতা হয় নাকি?

প্রশ্নটা কবিদের কাছে করলে একরকম উত্তর পাওয়া যাবে, জনগণের কাছে করলে ভিন্নরকম। এ দুয়ের মাঝে যে বিস্তর ফাঁক এবং কবিতার সংজ্ঞা-নিরূপণে যে ঐতিহাসিক ফোকর বিদ্যমান, তাতে যে কোনো কিছুকেই কবিতা বলে চালানো সম্ভব। অন্তত গণতান্ত্রিক গণপরিসরে। এখানে প্রয়োজন শুধু একটা লেখাকে কবিতা বলে ক্লেইম করা।

যে কারণে ম্যাক্সিম বা প্রবচনগুচ্ছকে কবিতা বলে ভ্রম তৈরি করা সম্ভব। কিংবা বোর্হেসের প্যারাবলগুলিকে। এমনকি ইশপের গল্পগুচ্ছকেও। ফেসবুক হচ্ছে তেমনই একটা ‘গণতান্ত্রিক গণপরিসর’। ইমতিয়াজ মাহমুদের কেসস্টাডিতে এমনটাই আমরা দেখতে পাব।

ইভ বনফোয়া একটা কথা বলেছিলেন, কবিতার মধ্যে কবি তার বাসনা ব্যক্ত করেন, পাঠক তার বাসনা দিয়ে সেখানে যুক্ত হন। আমার পর্যবেক্ষণ হলো, এই দুই বাসনার মিলন হলে সেখানে আর্টের প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে। কিন্তু বাসনার সংঘাত যখন লাগে, তখন সত্যিকার অর্থে আর্টের লড়াইয়ে টিকে থাকা ছাড়া কবির হাতে কোনো টুল থাকে না। বস্তুত, সেই টিকে থাকাটা হয় টেকসই।

হাসান রোবায়েতের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে এই বাসনার সম্মিলন। যে বিপুল মাদ্রাসা-আগত বুদ্ধিবৃত্তিমুখর তরুণ তুর্কি ছড়িয়ে আছে চারপাশে, তাদেরই কাছে তার কবিতা ইদানীং ব্যাপক সমাদৃত। তাদেরই দ্বারা সম্প্রচারিত। তার কবিতার কনটেন্ট তাদের কান ধরে টেনে আনছে বলা যায়। এখানে শিল্পের তর্জনী তোলা বৃথা।

আমার বক্তব্য এটা নয় যে, এই চার জন কবি হিশেবে দুর্বল। বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা সমকালের অন্য কবিদের তুলনায় তীক্ষ্ণ। কিন্তু যে ধরনের রসদ-সরবরাহ তাদের জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে, তা রসে টইটুম্বুর যতটা, ততটা রসোত্তীর্ণ নয়।

অনেকটা উন্নয়ন-নাট্যের মতো। তৃতীয় বিশ্বের দেশে উন্নয়নের গল্প মানেই যেমন দুর্নীতির প্রকটন ও স্বচ্ছতার অনটন। কবিতার জনপ্রিয়তা তেমনি সন্দেহের নীড়ে নিঃশব্দ চিত্তের উচাটন। অন্তত আমার কাছে।

 

[আমার খুতবাগুলি থেকে। প্রথম প্রকাশিত 'দেশ রূপান্তর'-এ।]
সোহেল হাসান গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা