অনেক কবিই আছেন সারা জীবন ধরে একটা কবিতাই লিখে চলেন! এতে বেশ সুবিধে হয়! তাদেরকে বোঝা যায়! কিন্তু গৌতম চৌধুরী এই জাতের কবি নন। তাঁর কবিতা এতই পরিবর্তনশীল যে তাঁর কবিতাকে গৌতম চৌধুরীর কবিতা বলে চেনা গেলেও সেই কবিতাগুলিকে প্রতিবারই নতুন ও অচেনা মনে হয়!
প্রতিটি বইয়ে নতুন কিছু নিয়ে ফিরে আসা কিংবা নতুন কোনো আইডিয়াভিযানের সাথে আমাদেরকে যুক্ত করার কাজটা তিনি করেন অবলীলায়! প্রতিবার নিজেকে তিনি ভাঙেন, প্রতিবারই নিজেকে তিনি গড়ে তোলেন নতুন এক কবি হিশেবে!
‘কলম্বাসের জাহাজ’ থেকে ‘আখেরি তামাশা’ পর্যন্ত গৌতম চৌধুরীর যাত্রাপথে আমরা তাঁকে প্রতিবারই দিক বদলে বদলে যেতে দেখি। ফলে, গৌতমের নতুন বই মানেই আমাদের সামনে এক নতুন বিস্ময় এসে হাজির হয়, যেখানে আমরা পেয়ে যাই মানবজীবনের নানামাত্রিক উপলব্ধিসমূহ!
তা হৈলে বাতাসবাড়ি, তুমিও চাইপা ধরো পুচ্ছ তার ভগ্নদেহখান লইয়া পিছে পিছে আসমানে সিন্ধাও
(আন্ধার ব্ল্যাকবোর্ড আর বাতাসবাড়ির ছায়ানাচ, আখেরি তামাশা)
এমন পঙক্তি রচনার পর যখন তিনি লেখেন—
তবে কি চোখের ভুল? ছবি নামে অঝোর পর্দায় সামান্য দৃশ্যের মর্মে অসামান্য অদৃশ্য বর্তায়
(ধ্যানী ও রঙ্গিলা, পৃষ্ঠা-৬)
তখন বিস্ময় মানতে হয়! কবিতায় কোন শব্দের পর কোন শব্দ তিনি ব্যবহার করবেন, কোন পঙক্তির পর কোন পঙক্তি—প্রথামাফিক থাকে না কিছুই, সর্বত্রই তিনি সৃষ্টি করে চলেন একের পর এক বিস্ময়! আমাদের প্রচল কান ও চোখ যে শব্দের পর যে শব্দ শুনতে বা দেখতে অভ্যস্ত, গৌতমের কবিতায় তা আশা করা একরকম বৃথাই! তিনি বরাবরই আমাদেরকে দাঁড় করিয়ে দেন একের পর এক রহস্য-দরোজার সামনে! ‘অঝোর’-এর পর আমার তো এমন মনে হয়েছিল, গৌতম বুঝি-বা পরের শব্দটি লিখবেন ‘ধারায়’! কিন্তু তিনি লিখলেন, ‘ছবি নামে অঝোর পর্দায়’!
প্রকাশক : চৈতন্য প্রচ্ছদ : বিধান সাহা মূল্য : ১০০ টাকা
● ● ●
‘ধ্যানী ও রঙ্গিলা’য় আছে তিনটি অধ্যায়। ‘কালুডোম’, ‘নগরভিক্ষুর পদাবলী’ ও ‘খুদ্দক নিকায়’। তিনটি অধ্যায়েই আছে তিনটি সূচনাকবিতা! সূচনাকবিতাগুলি সনেটে পর্যবসিত না হলেও বাকি কবিতাগুলিকে তিনি সার্থক সনেটে রূপান্তরিত করে তোলেন! অন্ত্যমিলগুলো এতই অনায়াস যে সেগুলোতে কোনো জবরদস্তি টের পাওয়া যায় না! কখনো দ্বিতীয় পঙক্তির সাথে তৃতীয় পঙক্তির, প্রথম পঙক্তির সাথে চতুর্থ পঙক্তির মিল, কখনো বা প্রথম পংক্তির সাথে দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পংক্তির সাথে চতুর্থ পংক্তির মিল দেখা যায়!
সনেট বা পয়ারে লেখা কবিতা তো আজকাল প্রায় বিরলই হয়ে উঠেছে! সনেট দুএকটা চোখে পড়লেও পাঠে বোঝা যায়, সেগুলি আসলে চতুর্দশপদীই! কবিতার এই ফর্মটিকে সার্থকভাবে ব্যবহার করতে পারার চ্যালেঞ্জটুকুও তো আজকাল তেমন নিতে দেখি না কাউকে! অন্ত্যমিলে কখনও কখনও অর্ধমিলের ব্যবহারও চোখে পড়ে! যেমন—
নিমেষ মশাল হয়ে দুলে ওঠে, সুরঙ্গের গায়ে সারি সারি ভিত্তিছবি, কোথা তার মুগ্ধ রূপকার? শূন্যে মিশে আছে মুখ, কেশরাশি স্তব্ধ তমসার গহন তরঙ্গ হয়ে বয়ে চলে বিষণ্ণ ক্ষমায়
(খুদ্দক নিকায়, ৭, পৃষ্ঠা-৩৩)
প্রথম পঙক্তিতে ‘গায়ে’ ও চতুর্থ পঙক্তিতে ‘ক্ষমায়’- এমন অর্ধমিল অন্য পাঠকের কাছে কিছুটা দুর্বল মনে হতে পারে, কিন্তু পাঠক হিশেবে আমার কাছে অন্তত অন্ত্যমিলের এক নতুন দুয়ার খুলে দেয়!
নিত্য ব্যবহার্য আটপৌরে ভাষা থেকে কিছুটা সরে গেলেও এ বইয়ের কবিতাগুলিতে মানবহৃদয়ের ক্ষরণ ও দগ্ধ এক আটপৌরে জীবনের ছবিই আমরা স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখি
ছন্দ, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাটা গৌতমের প্রায় মজ্জাগত! এ বইটিতেও আমরা দেখতে পাই, অসংখ্য তৎসম শব্দের সমাহার যেগুলোকে তিনি প্রায় আমাদের মুখের ভাষায় পরিণত করে তুলেছেন! কোনো শব্দকেই মনে হয় না ব্যবহৃত হয়েছে আলটপকা, বরং তার কবিতায় সেগুলিকে মনে হয় অনিবার্য, বিকল্পহীন!
কালুডোমও মিশে যায় চিতাগ্নির তমোঘ্ন আঁচলে রঙ্গ রসিকতা শুরু পুনর্বার জীবিতে ও শবে
কিংবা
জঠরাগ্নি জ্বলে নিত্য, ভক্ষ্যবস্তু তোমারও জরুরি
‘চিতাগ্নি’, ‘তমোঘ্ন’, ‘পুনর্বার’, ‘জঠরাগ্নি’ ও ‘ভক্ষ্যবস্তু’র মতো অসংখ্য তৎসম শব্দ ছড়িয়ে আছে এ বইয়ের পঙক্তিতে পঙক্তিতে! কিন্তু এসব শব্দকে মনে হয় না খুব একটা অচেনা, মনে হয় নিত্য ব্যবহৃত!
নিত্য ব্যবহার্য আটপৌরে ভাষা থেকে কিছুটা সরে গেলেও এ বইয়ের কবিতাগুলিতে মানবহৃদয়ের ক্ষরণ ও দগ্ধ এক আটপৌরে জীবনের ছবিই আমরা স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখি! জীবনের পরতে পরতে যে অন্ধকার, তাকে সরিয়ে আলোর সন্ধানেই যেন এই অভিযাত্রা! তাতে নানা রহস্যের যে ইশারাটুকু মেলে তার পর পাঠককে কালু বা নগরভিক্ষুর সন্ধানে এ অভিযাত্রায় শামিল হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না!
নিজেকে শনাক্ত ক’রে চলে কালুডোম দিনভর মর্গের চৌখুপি ঘেঁটে উল্টেপাল্টে শত শত লাশ...
কিংবা, ‘কালুডোম-২ কবিতায়—
তবে কি দেহের সাথে রাশি রাশি মনও পোড়ে ঠায়! কাকে খোঁজ কালুডোম নিবে যাওয়া চিতার আঁধারে
প্রথম দু-তিনটি কবিতা পড়তে পড়তেই আমরা দেখতে পাই ‘কালুডোম’ যেন সওয়ার আমাদের ওপর, মনে হয়, আমরা নিজেরাই এক একজন ‘কালুডোম’ যেন আমরা ‘মর্গের চৌখুপি ঘেঁটে’ নিজেদের লাশ খুঁজে চলেছি!
আমরা কীভাবে, কেন লাশে পরিণত হলাম, তার বিবরণে যান না গৌতম, যেন লাশ হয়ে ওঠা আমাদের সমাজে, কলুষময় রাজনৈতিক ইশারায় এক অবশ্যম্ভাবী পরিণতি!
চিতার আগুন জ্বলে ওঠার কোনো আভাষ এতে নেই, যতটা আছে নিবে যাওয়ার গল্প! ‘নিবে যাওয়া চিতার আঁধারে...’!
এই আঁধার আমাদেরকে গভীর আঁধারের কাছেই নিয়ে যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আঁধারও তাঁর লক্ষ্য নয়, কেননা, পরের কবিতায় আমরা পেয়ে যাই ‘নদীজলে কাঁপে ছায়া—মুখোমুখি কালু আর যম’!
‘নগরভিক্ষুর পদাবলীতে’ও আমরা স্বপ্ন আর আশাভঙ্গের আখ্যানই যেন দেখতে পাই। সেখানেও মানুষের ক্ষরণ আর পীড়নের কাহিনিই বিধৃত হতে দেখি:
তবে সে-বেদনাভঙ্গী, নির্যাতিত কাতরোক্তিগুলি যত্নে গাঁথা মালা মাত্র! অদৃশ্যের ফুল সূচ সুতো কে দিল সে-দীনহীনে? ভোর থেকে অনন্তগোধূলি ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে কার ছায়া হেঁটে চলে দ্রুত? দ্যাখো তার ভিক্ষাপাত্রে নাচে এক হাস্যরত খুলি
এইভাবে, এ বইয়ের প্রতিটি কবিতায়, পঙক্তিতে পঙক্তিতে গৌতম যেন আমাদের নিত্যদিনের ব্যর্থতা আর বেদনার গল্প বলে চলেন!
‘খুদ্দক নিকায়’ গিয়ে তা যেন আরও পরিণতি পায়, যখন তিনি বলেন:
যখন গড়েছে চূড়া, তলে তলে বেড়ে গেছে খাদ...
কিংবা
ভাঙা মিনারের শীর্ষে চাঁদ খোঁজে ব্যর্থতার হেতু বিবিধ শূন্যের ফাঁকে ভেসে ওঠে বৃন্ত, চ্যুতপাঠ...
সকল নেতির মধ্যেও এই বইয়ের কবিতা আমাদেরকে, হোক ভাঙা মিনার, তার শীর্ষে চাঁদও যে রয়েছে—সেই ইশারা রেখে যায়!
