তিন আরব কবির পাঁচটি কবিতা

নিজার কাব্বানির কবিতা
জেরুসালেম

কাঁদলাম আমি, যতক্ষণ না শুকালো আমার চোখের জল
মোমবাতিটা কেঁপে-নিভে-যাওয়া অব্দি করে গেলাম আরাধনা
মেঝেতে ফাটল ধরার আগ পর্যন্ত বসে থাকলাম হাঁটু মুড়ে 
আর জানতে চাইলাম মোহাম্মদ ও ঈসার বিষয়ে 

ও জেরুসালেম, নবিদের অগুরু লোবান তুমি
বেহেশত আর পৃথিবীর মাঝে সবচে’ কম-দূর পথটাই তুমি

ও জেরুসালেম, সকল কানুনের রক্ষাকবচ তুমি
তুমি এক মায়াবী শিশু, যে তাকিয়ে আছে মাটির দিকে 
আর আগুনে পোড়া তার আঙুলগুলো 

ছায়ানিবিড় সেই মরু-বাগিচাটিই তুমি
যার পাশ দিয়ে হেঁটে যেতেন নবিজি

তোমার পথগুলোর নাম বিষাদ
তোমার মিনারগুলি বিলাপরত

তুমি কি সেই কালো আঙ্‌রাখা-পরা অনূঢ়া, যে 
ঈসা মসিহের জন্মস্থানে 
প্রতি শনিবার ঘণ্টাগুলোকে বাজায়? 
বড়দিনের সময় যে এসে বাচ্চাকাচ্চাদের 
হরেক রকমের খেলনাপাতি উপহার দেয়, সে কি তুমি?

ও জেরুসালেম, ও বেদনা ও বিষাদের শহর
অশ্রুর বড় একটি ফোঁটা টলমল করছে তোমার চোখে 

মুকুতার বিন্দু তুমি সকল ধর্মের
কে রুখে দেবে তোমার ওপর আগ্রাসন? 
কে তোমার দেয়ালগুলি থেকে ধুয়ে সাফ করবে রক্তের দাগ?
কে হেফাজত করবে তোমার ইঞ্জিল কিতাব?
কে উদ্ধার করবে কোরান?
তোমার ঈসা মসিহকে কে দেবে সুরক্ষা?
কেই-বা হবে মানবের পরম ত্রাতা?

ও জেরুসালেম, আমার শহর তুমি
ও জেরুসালেম, প্রেম তুমি আমার
লেবুগাছগুলো ফুলে-ফুলে ভরে উঠবে কাল; আর 
জলপাইগাছগুলো তুলবে আনন্দ-হিল্লোল
আর ক্ষণে-ক্ষণে নেচে উঠবে তোমার চোখের তারা 
দেশান্তরী পায়রার দল ফের এসে বসবে তোমার পবিত্র গৃহছাদে
আবারও খেলায়-খেলায় মেতে উঠবে তোমার শিশুরা।

আর, তোমার গোলাপি পাহাড়চূড়ার উপর 
ফের মোলাকাত হবে পিতাদের সঙ্গে তাদের পুত্রদের 
আমার শহর
আমার শান্তির শহর আর জলপাইয়ের শহর।

[Jerusalem by Nizar Qabbani]

আদুনিসের কবিতা
নয়া নুহ্ 

১.
আমরা ভ্রমণ করি কিস্তি চেপে, কাদায়-বৃষ্টিতে
আমাদের দাঁড়গুলি ঈশ্বরের প্রতিশ্রুতিজাত;

কেবল আমরা রই বেঁচে; আর, বাকি সকলেই যায় মরে।
আমরা চলি ঢেউয়ে-ঢেউয়ে, আকাশ-ছাপিয়ে-ওঠা
লাশের দড়ির সঙ্গে আমাদের জীবনকে বেঁধে।

স্বর্গ আর আমাদের মাঝে তবু 
অবারিত আছে এক স্থান; আছে
রসদ রাখার এক পার্শ্ব-দুয়ার

‘‘প্রভু, তুমি আর-আর প্রাণীদের, লোকেদের মধ্য থেকে
কী কারণে আমাদেরই বাঁচালে কেবল? আর এইবার
কোনখানে আমাদের করবে স্থাপন?
তোমার আরেক দেশে, আমাদের আদি ঠিকানায়?
মরণের পাতার ভেতরে, নাকি জীবনের হাওয়ার নিগড়ে?

আমাদের প্রতি প্রাণে, আমাদের ধমনীতে সূর্যের ত্রাস বহমান।

‘প্রথম’ আলোয় আমরা হয়েছি হতাশ,
আমরা হতাশ, প্রভু, সে-আগামীকালের বিষয়ে
আমরা করব শুরু তাতে এক নতুন জীবন।

সৃষ্টির আদিতম চারা আমরা না-যদি হতাম,
এ-জাহান আর এর প্রজন্মের পরম্পরায়,—
স্রেফ এক উনুনের ছাই কিংবা কাদা হয়ে যদি থাকতাম,
কিংবা, এ-দুয়ের মাঝামাঝি কিছু একটা যদি-বা হতাম,
তাহলে তো আমাদের আর দু’দুবার
দেখতে হতো না এই পৃথিবীকে,
আর এর প্রভুকে ও এর জাহান্নাম।’’

২.
কালের সূচনা যদি হতো আরেকবার,
আর যদি জীবনের মুখখানি ডুবে যেত অগাধ সলিলে,
আর যদি পৃথিবীর উঠত খিঁচুনি, আর, এ-আমারই কাছে
ঈশ্বর সানুনয় আসতেন ছুটে:
“নুহ, তুমি রক্ষা করো জীবিত রয়েছে যত প্রাণ!”
আমি তার অনুনয়ে দিতাম না সাড়া
আমার কিস্তিতে আমি ভ্রমণ করতাম
মৃতদের চোখ থেকে কাদা আর সমুদয় নুড়িকে সরিয়ে

আর, মহাপ্লাবনের কাছে আমি তাদের সত্তার তল মেলে ধরতাম,
তাদের ধমনী-শিরায় আমি ফিসফিস স্বরে বলতাম:
আমরা এসেছি ফিরে পাড়ি দিয়ে প্রাণহীন, অন্তহীন ধু-ধু জলরাশি।
গুহা থেকে বের হয়ে আমরা এসেছি,
বদলে দিয়েছি আমরা অন্তহীন কালের অম্বর,
ভয়তরাসের কাছে মাথা না-নুইয়ে আমরা উড়িয়েছি পাল—
সেই ঈশ্বরের কোনো কথা আমরা তো করি নি পালন।
মরণের সঙ্গে শুধু আমাদের সব বোঝাপড়া।

আমাদের তটভূমি সে তো এক চিরচেনা সুখদায়ী হতাশার নাম,
অবশেষে অবিরাম বৈঠা ঠেলে, আমরা দিয়েছি পাড়ি
লৌহ-উদকময় অগভীর সেই পারাবার

সে-ঈশ্বরে আমরা তো দিই নি আমল, তার শুনি নি বচন
অভীপ্সা করেছি শুধু কোনো এক, নতুন প্রভুর।

[The New Noah by Adonis]


অশ্রুরা

তারাটি ফুঁপিয়ে কাঁদে—
রাত্রি তারাটিরই চোখের জল।

[Tears by Adonis]

মাহমুদ দারবিশের কবিতা
হে, আমার পিতা, ইউসুফ আমি

ওগো পিতা, ইউসুফ আমি
ওগো পিতা আমার! আমার ভাইয়েরা আমাকে ভালোবাসে না 
ওরা চায় না আমি ওদের সঙ্গে থাকি।
ওরা আমাকে পেটায়, মারে আর ঢিল ও কথার বাণ ছুড়ে মারে 
আমার ভাইয়েরা আমার মরণ চায়, যাতে ওরা লোকদেখানো 
মিছে গুণগান করতে পারে আমার 
ওরা আমার মুখের সামনে তোমার বাড়ির দরজা বন্ধ করে দিয়েছে
আর বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেছে আমাকে।

তোমার জমিজিরেত থেকে ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে আমাকে
ওরা বিষ ছড়িয়ে দিয়েছে আমার আঙুরের বাগানে 
ওগো, পিতা আমার! ওরা ভেঙে দিয়েছে আমার সব খেলনাপাতি 
যখন আমার চুলে বাতাস খেলা করে, হিংসায়, ক্রোধে ওরা তখন জ্বলেপুড়ে মরে 
আর রেগেমেগে তোমার গুষ্ঠি উদ্ধার করে।

ওগো পিতা, বলে দাও কোন অন্যায়টা আমি করেছি ওদের সঙ্গে? 

প্রজাপতিরা উড়ে এসে আমার কাঁধের উপর বসে,
গমের শিষগুলো মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে কুর্নিশ করে,
আর পাখিরা উড়ে এসে আমার হাতের ’পরে বিশ্রাম নেয়,
তাহলে কী আমার অপরাধ, ওগো পিতা আমার
কেন তবে এহেন লাঞ্ছনা?

তুমিই আমার নাম রেখেছিলে ইউসুফ! ওরা আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল পাতকুয়ার ভেতরে 
আর দোষ চাপিয়েছিল নেকড়ের ওপর

ওগো, পিতা আমার! নেকড়ের দিলে যতটুকু দয়া আছে, ততটুকুও নেই আমার ভাইদের পাষাণ দিলে

‘‘আমি দেখে ফেলেছি সূর্য আর চাঁদ আর এগারোটি নক্ষত্র; আমি দেখলাম, ওরা আমার সামনে 
সেজদায় আনত।’’

—ওগো পিতা, যখন আমি একথা বললাম তখন কী আমার অপরাধ?

[I Am Yusuf Oh Father by Mahmoud Darwish]


আমার মা

মায়ের হাতে বানানো রুটির জন্য আমার মন কাঁদে;
মায়ের হাতে বানানো কফির জন্য, 
তাঁর স্নেহমাখা হাতের পরশের জন্য। 

দিনের পর দিন আমার মনে 
আকুলি-বিকুলি করে ছেলেবেলার স্মৃতি।

যখন আমার মরণ হবে, তখন যেন
আমি হয়ে উঠতে পারি নিজের জীবনের যোগ্য, 
হয়ে উঠতে পারি আমার মায়ের চোখের জলের যোগ্য

যদি কোনও দিন ফিরে আসি, আমাকে গ্রহণ ক'রো 
তোমার চোখের পাতার আবরণ করে নিয়ো আমাকে
আমার হাড়-পাঁজর ঢেকে দিয়ো ঘাসে-ঘাসে  
যে-ঘাসে লেগে আছে তোমার পবিত্র পায়ের ছাপ;

তুমি তোমার চুলের একটি গোছা দিয়ে 
বেঁধে রেখো আমাদের
চুলের যে-গোছাটি নেমে এসেছে তোমার পিঠ বেয়ে

আমি যদি তোমার হৃদয়ের নাগাল পাই, তাহলে 
মরণকে জয় করতে পারব আমি
আমি হয়ে উঠব ঈশ্বর

যদি ফিরে আসি কোনও দিন
তোমার উনুনের চেলাকাঠ করে নিয়ো আমাকে
বাড়ির ছাদে কাপড়-টানা দড়ি করে নিয়ো আমাকে
তোমার স্নেহের আশিস না পেলে
হীনবল আমি উঠে দাঁড়াতে অক্ষম।

বুড়ো হয়ে গেছি আমি
ছেলেবেলার তারার মানচিত্রখানি তুমি ফিরিয়ে দাও আমাকে
যাতে আমি সেই মানচিত্র দেখে 
আবাবিল পাখিদের সঙ্গী হয়ে  
আবার রওয়ানা দিতে পারি
তোমার অপেক্ষমাণ নীড়ের পথে

[My Mother by Mahmoud Darwish]
জুয়েল মাজহার

জুয়েল মাজহার

জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা। মার্কসবাদী। কোনো অলৌকিকে বা পরলোকে বিশ্বাস নেই।...বিস্তারিত