ট্যাবু
নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রের দূরে সরে যাওয়া ফলত সমস্বর নিভে আসে ক্রমশ। সহস্র আলোকবর্ষ দূরে— তিরতির করে কাঁপছে আলোকমালা ও কি আদৌ ছিল ওখানে, অই কারুচিত্রের দাবারু আকাশ! ভ্রম-মন্থরতা পেরিয়ে— কেমন চূর্ণতার দিকে চলে যাচ্ছে প্রিজম চোখ, কাকে আজ জানব গূঢ় সত্য! এই ভ্রম-মন্থর সময়, এই বিভাজন কেবল অসংযম ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীরময়; পরস্পরের শত্রু হয়ে উঠছি আমরা আহত রণমাঠ ফেলে যাচ্ছি— ছায়াকে মুছে ফেলার জন্য তৈরি করছি ছায়া ছায়ার অন্তরালে ওঁৎ পেতে আছি, বৃংহণ শেষে ঝাঁপিয়ে পড়ব, রক্তাক্ত করব যতটা তোমাকে— ততধিক নিজের অনুভূতিসকল ওষ্ঠে অস্ফুট সকল শব্দ সম্ভাবনা।
বিস্মৃতি
ছায়ার গভীরতা নিয়ে তাকাও যত সব ভুলের দিকে তরুমন্থিত বাতাস কবে এনেছিল রঙের ফানুস সে শুধু আকাঙ্ক্ষার আজ। খুব গোপনে নয়, ঋতু পরবর্তী দূরে আমাদের ছুড়ে ফেলা অবসর কারা যেন আজ কুড়িয়ে নিল জানি তারাও— ছায়ার গভীরতা নিয়ে তাকাবে পত্রমন্থনরত বাতাসের দিকে ঋতুর মধ্যবর্তী ঋতুর দিকে গন্ধ নেবে, পরিণত ঘ্রাণ… অতঃপর— দূরে চলে যাবে নিজেদের ঋতু ভেবে। হয়তো কেউ— শরতের তোড়ে কাশফুল ভেঙে উড়িয়ে দেবে পাতানৃত্য বাতাসের দিকে।
জাফরান
অপরাহ্ণের আলোর মতোই অধোমুখী অথচ কি থরোকম্পমান উজ্জ্বল! আমাকে কোথায় নিয়ে যাবে জাফরান? মন্দাক্রান্ত এই সম্পর্ক যাচায় তার কোনদিকে ধাবমান হয়েছে দক্ষিণ সুর? শরীর জুড়ানো হাওয়া, পাতার মর্মর, হর্ষধ্বনি ওকার? এত কাকলির মাঝে আমি কার কথা শুনছি? সে তো কান নয় আমার, নিজের স্বরও তো নয় প্রায়! এখনো সমুদ্র থেকে এক পা দূরে আছি, যথার্থ গানের অভাবে হচ্ছে না স্নান, ঝাঁপিয়ে পড়া আর সাঁতার। হাওয়ায় স্ফূর্তির সাথে গাঙচিল হচ্ছ তুমি; আর শূন্যে—লতার মতোই ললিত। অথচ— সমস্বরের বিপরীতে যেতে হবে আমায়, বর্ণান্ধের মতো— যেন তোমাকে দেখতে পাই করমচার পরিপক্বতা নিয়ে আছ আর আমি— আঙুল ফুটিয়ে তোমাকে মাখিয়ে দিচ্ছি সিঁদুর।
আত্মহত্যার আগে
শুকনো ফল বুক ফেটে যাকে দিলো সে আগামীর ছায়া। সে ছায়াও শীতলতার কী যূথসাকিন! ফলজ মৃত্যু মহৎ। ফলের মতো তুমি অথচ নিজেকে বিদীর্ণ করছ বীজহীন; ভবিষ্য ছায়াহীনতার প্রস্থান। এই টুকরো-ভাব কী এমন ঘোষণা করছে প্রস্থানের? এই পরাভব ভ্রমরের কাছে হাস্যস্পদ হয়ে উঠেছে; সেও জেনেছে কত ব্যর্থসন্ধান—অজস্র উড়ে যাওয়া মা-স্বভাবী ফুলের কাছে। কত কত ফুল পুরনো গন্ধ দেয় ভালো। তার চেয়ে দারুণ বারান্দায় স্মিত কলি-ফুল—চড়ুইয়ের কানামাছি, আর কুসুম আলো। ঘুমের অবসরে কত না সহজ নৃত্য আশ্চর্যের মতো করে অধরা। খুব ঘুম হলে একদিন প্রস্থানে যায় সকল। ভারি বাতাসে স্নেহগুলো কর্পূর হয়—সে হাওয়া মানেই স্নেহহীন নয়। চক্রে মুছে আসা, চক্রে আবর্তমান করে চলে কিছু প্রস্থান, কিন্তু প্রত্যাহার নয়। এইরূপ অন্তহীন এক ডায়নামো ঘূর্ণ্যমান। এভাবে অন্তহীন স্লেজগাড়ি বয়ে যায় দুটো এস্কিমো। তার আগে অপরিণত এমন প্রস্থান ভাবনা। এইসব আবাল্য পরিণতি। ভাবনায়, বাস্তবে, অজস্র সৌম-ফুল তো মাকে ঘিরে বর্তমান। যদি ভালোবাসতে পারো—তবে পৃথিবী প্রতিটাদিনই বসন্তের! দ্যাখো,বাতাসে রেণু উড়ছে, পিপাসা ফুটছে জলের। তুমি তো নিজেই জলজ, জলের সন্ধান পেতে তাই ক্ষতচিহ্ন মুছে তোমাকেই তো যেতে হবে, একা।
স্বপ্নবাজ
আজও উড্ডয়ন আধোডানার বাতাস তাই কাঁপিয়ে দেয় ঊর্ধ্বমুখ, গন্তব্য আমাদের। কাদের হলো জয় উঁকি দিয়ে দেখে আসি চোখ ধরে আসে জলে, শিশ্ন উত্থিত তর্জনী বাঁকিয়ে আনি খুব ভুল হয় আমাদের মা আমাদের উচ্চারণে শব্দে চাওয়ায় ভুল আমাদের পিঠে লেখা ভুল পিঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায় কারা? ঘাড় বাঁকাতেই চাবুক এসে পড়ে রক্তের ধারাপাতে উজ্জ্বল মৃত্তিকা আরও উর্বর হতে চায়। আর শিশুঘুমের জন্য আমরা চাই কেবল একটি শান্ত গান— আয় ঘুম আয় ঘুম আয়… ঘুমের ভেতর স্বপ্নে বাধা নেই কোনও।