আসাদ জামানের কবিতা

আগুন

আমি তোর কমলা কোমলে ছিলাম কয়েকটা মুহূর্ত, কয়েকটা মুহূর্ত— নিঃসঙ্গতাকে যাযাবর করে রেখেছি; বুক বরাবর ধরে রেখে ছুঁড়ে ফেলেছি তোকে অথবা তুই আমাকে!

আমার মীনগন্ধী শরীর ছিল , শরীরে শীতল আঁশ, অনেক সিঁদুরাভ আঁধার; তারপর, গতিহীন পুড়ে খাক— ছুড়ে দিলি তুই আমাকে অথবা আমিই তোকে

তুই পতনপর আমি পতনস্তব্ধ কোনো মুহূর্তেই বাতাসে ছুঁড়ে দিতে পারি কালো দেহ।

সর্বজ্ঞ

এই বিলে পাওয়া যাবে আপনাকে জলডুবুরির আগে এ পাড়ে আপনার ছায়াছবি ভাসে এই লোকালয় জানা মাস্তান আপনি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ানো খোঁপা থেকে ফুল খুলে নেয়া কত সমৃদ্ধ ছায়ার জ্ঞান আপনার

আমি আপন আয়তন থেকে যতটুকু পারি ভাসিয়ে দেই কাগুজে নৌকা এইসব দুপুরে কেওয়াস— আর অল্প-স্বল্প ধবলা, ধলা ধলা ফুল।

আমাকে কতভাবে গণনা করে গাছে গাছে অস্থায়ী পাখিরা, শাখা নড়ানো আর শাখামৃগের— দৈর্ঘ্য পার হয়ে উৎকর্ণ—অশোভন ধ্বনিত কিছু বাজিয়ে নিয়েছে আমায়।

আপনার উচ্চস্বর উচ্চতর শরীরবিদ্যা সমস্ত রন্ধনশৈলী,প্রকরণ, প্রতিস্থাপন— আপাত বিজ্ঞান আমাকে শিখিয়েছে ওসব প্রজ্ঞার সংকট কত বিস্তর, দেহের অসীমে কত আর্দ্র আর কক্ষচ্যুত কত শিথিল উঠে উঠে আসা আবরণ পদ্ম-হাসির মাঝে আসন পেতে থাকা নাগের কুণ্ডল। খুব শোভন, আমাকে শিখিয়েছে আপনার ছায়াবাজি, কুম্ভীলতা মুখ ও মুখোশের আড়ালে গুপ্তবৃত্তি আমি আমার দৈর্ঘ্য ভাঁজ করে নিয়েছি আপন ছায়ার ভেতরে ছায়াহীন খুব ছোট, খুব ছোট

অর্জন

স্থিরতাহীন, এই ইচ্ছে যেন আমাকে চিনতে না পার। যেন আমার পদচ্ছাপ চিনতে না শেখায় , এইদিকে এই চিহ্ন ধরে হেঁটে গেছি; এ যেন আমারই হাঁটার ভঙ্গি। আমি চাই ডেরায় এসে ভিড় না করুক অগুনতি কাঁকড়া , শ্বাপদের শ্বাস—আমাকে না পোড়াক।

যেদিকে যখন ভালোলাগা এসে ছিনিয়ে নিয়েছে— হাত পেতে নিয়েছি আনন্দ, মদ; মাতাল হয়েছি ,হাততালিমুগ্ধ জনতার থেকে বাইরে এসেছি, নগ্ন হয়েছি, নগ্ন হয়ে দেখেছি দশটি আঙুলে ফুটেছে ফুল— তালুতে অসংখ্য নদী—শাখাগুলো যার অসীমে ঠেকেছে তার তীরে বসে আমি আবিষ্কার করেছি অপার প্রেম ,ঘৃণা, অপরাধ আর স্বস্তি।

কিছু অবসাদ আমার মৃত্যুকে গুম করেছে ঘুমের আড়ালে— যার প্রতিটা শিয়রে ছিল একেকটি সকাল, সৌম্য ও কান্ত।

বাঁক

আমার মুহূর্ত এসে গ্যাছে এবার এইদিকে বাঁক নেব এই বিরান মাঠ, যুদ্ধপূর্ব নীরবতা ঘোড়াগুলো স্থির

দামামার পাশে দাঁড়িয়ে কেন বলছি ভূতপূর্ব  ক্লান্তির কথা! জানু-ভাঁজ বসে থাকা আমার পাঁজরে বিদ্ধ বেতোহাসির ছুরি আমি তা নিয়েছি তুলে;

কোলাহলরত যত মুখ দ্বিখণ্ডিত আমার তাকত্ অস্ত্রে। এবার অই চ্যারিয়টভর্তি মুণ্ডিত মস্তক সকল চূড়ায় ছুটে গিয়ে শূন্যে ছুড়ে দেবো—

না গোনাই ভালো কত ফুল কুড়িয়ে নেবার আগে ঝরে যায় আর নাবালক কত যুবক বলিদান হয় এই সব যুদ্ধে

এবার ধড় পেরিয়ে যাওয়ার দিন হয়তোবা নিজের শরীর বুক থেকে পাঁজর, পাঁজর থেকে ঊরুসন্ধি খুঁজে বেড়ানো— একটি কালো তারা আর রক্তে ভেজানো উজ্জ্বলতা

এবার শূন্যে শূন্যে নিজেকে ছুঁড়ে শূন্যে শূন্যে নিজেকে তুলে বাতাসে ভর করে পুষ্প দুলিয়ে যাওয়ার গল্প বলবো।

যুদ্ধ

আমাদের যোদ্ধারা আহত ক্লান্ত ঘোড়াগুলো সমতলে ঘোরাফেরা করে খুর নেই,দুপাটি কয়লা খুরের কালো ফেলে ক্লান্ত হাঁটে

ধুলো ওড়ে ,সায়ান ধুলো ঝড়ের কূটাভাসে কালো মেঘ ওড়ে বজ্রহীন বিদ্যুৎহীন না বাতাস না শিলাঝড় না অশান্ত বালুকণা

শুনি পাতাদের হাততালি মুক্ত পাতার কম্পন হে বাজিগর, মায়াযাদুবলে আমাদের ঘোড়াগুলো ক্লান্ত

আসাদ জামান

আসাদ জামান

জন্ম ৯ জুলাই, ঝালকাঠি, বরিশাল। কবি, অনুবাদক, গদ্যকার। পেশা : শিক্ষকতা। ই-মেইল...বিস্তারিত