হোম
কবিতা
আবর্ত : আসাদ জামান
আবর্ত : আসাদ জামান
একেকটা শব্দ এসে মুছে ফ্যালে শব্দের কথা
ঢেউ এসে গড়ে তোলে ঢেউয়ের কবর
....................................বহু কথার সংকেত নিয়ে—
বালু কামড়ে আছি আধডোবা জলে।
....................................উড়ন্ত চিল, স্নিগ্ধ সি-গাল
তারা কী সংকেত দিয়ে চলেছে বিশ্বকেন্দ্রে
যেন শিস দিয়ে জাগাতে চেয়েছে সমুদ্র উগরে ফেলা শিশু;
এই তীর মনে হলো প্রৌঢ়তা এসে ছুঁয়েছে তাকে—
বাতাসে উড়ছে চুলের মতো সাদা বালু
.....................গোপনে এসেছে যত লঙ্কা-শিকারি
তারা চেয়েছে খুলির নকশা, বালুতে গোপন হাড়ের গল্প
তারা সংকেত নিয়ে যেতে চেয়েছে বহুদূর
.............................................তড়িতাহত, নখে বিদ্ধ ক'রে,
..............................................................ছোঁ মেরে।
কারা ঘুমের মধ্যে ভেঙে ফেলে তমানু সুন্দর
.......................ডিমের ভেতরে দেখছে গোপন সূর্যোদয়
আর সূর্যাস্তের ঘোষণা শুনে এসেছে কত লোক
......................................................লৌকিকতা ভুলে
জলের অতলে সঙ্গম করে তারা মীন হয়ে ভেসে গেছে
সোনার মীন কবে ভেসে উঠবে সূর্যোদয়ের পথে
নির্মোহ, উষ্ণ ক্ষেতের ওপরে বিছিয়ে নেবে সৌরজালিকা
ঈভ ও আদমের আখ্যানে মানুষ হয়ে জন্মাবে মাঠে।
আমি তাই বৃক্ষের ছায়া ভেবে মানুষের দিকে যাই
.................................................ছিটকে সরে আসি,
তারা ছায়ার বিন্যাসে কতভাবে বিছিয়েছে জাল
.................কতভাবে রপ্ত করছে বধির ও শ্বাপদের ভাষা।
এ-সমস্ত দিন আমি গণিকার চোখ দিয়ে দেখেছি
...........................................যেন পৃথিবী এক দীর্ঘ যোনি
তাবৎ অসূয়া সমেত গর্ভ মুখে ঢুকে যাচ্ছে সকল সন্তান
বিপরীতে সমুদ্র উগরে দিয়েছে মৃত শিশু
পাঁজরে দোল দিচ্ছে মৃতপ্রসবা পাথার
....................................আন্দোলিত হচ্ছি,
আন্দোলনকে দোলনা ভেবে গুটিয়ে নিয়েছি সখ্যের রশি।
আমাদের স্নেহগান ভেঙেছে ঢেউয়ে,
....................................সমুদ্র উগরে দিয়েছে মৃত সন্তান
লোনাজল ভেঙে পালাতে চেয়েছি
জালে আটকা পড়েছি তৃণভোজী মাছ;
তারা কেউ কেউ সংক্ষেপ সাতারু
....................................মিঠা জলে এসেছে যৌন-উৎসবে।
দেহে দাগ নিয়ে দলছুট কেউ,
..................................কর্পুর-স্নেহে ছেড়েছে ভিটে-মাটি;
দেখেছি, বনের সাদা-লাল পথগুলো—
কালো হয়ে এসেছে আমাদের চোখের সামনে।
আমরা মুষ্টিবদ্ধ ছুড়েছি হাত—
...................ঊর্ধ্বমুখে, ঊর্ধ্বপানে এ যাবত সকল সংকটে।
...........................................এ কেবলি আন্তঃসভ্যতা—
যাকে জানো তার চেয়ে অভিজ্ঞ আমার দুটো কুকুর
............................................অন্ধকারে দুপাশে বসে থাকে।
আমি কম্পিত জলের মতো স্থির হই
...............................আয়না শিকারে স্থাপন করি নিজেকে
স্থাপিত হতে গিয়ে হয়ে উঠি স্থাপতি,
.........................................যেন একজন সিনেমাপ্রেমিক
অনুভূতি জুড়ে কাঁটাতার—প্রহরী প্রস্তরমূর্তি
...............................ঝাঁকে ঝাঁকে সীমানা পেরোচ্ছে পাখিরা;
পাখার ঝাপটায় ষড়ঋতু লেগে আছে শীতে,
আমাদের জাগ্রতবোধ পাখি শিকারের বেশে
................................পথে পথে বসিয়ে রেখেছে রক্তের নহর।
নক্ষত্রের খেলা ভেবে এ কেবলি শিকার—শত শিকারের মাঝে
শত বাসনার পুঞ্জ পুঞ্জ ফেনা, সে ফেনার শিখরে মস্ত এক—
....................................রঙিন বুদবুদ
আমাদের আত্মায়, আমাদের তীক্ষ্ণ বোধের অন্তরালে —
....................................সদা ম্রিয়মাণ সে রঙিন খেলনা
নিভেছে, জেগে উঠেছে অতিপাণ্ডব—দানবের মতো নির্ভুল।
শুধু শব্দের ঘোর ভেঙে কথা বলি,
....................................ভোর হলে—
বিস্মৃত পুষ্পেরা ঝরে পড়ে, শিশুরা কুড়ায়, মালা গাঁথে;
....................................মালাগুলো গাথা হয়ে যায়
গাথার অন্তরালে ওগো মুখ, ওগো মূক ভাসতে ভাসতে কোন
.........................কোন শেষরাতে তীরে এসে উবু হয়ে রও?
আমাকে শোনাও ফালি-বৃত্তের ঘের—
আমাকে শোনাও প্রভূত মঞ্চের গান
....................................আর যত তীক্ষ্ণতর আবহ সঙ্গীত।
ছেলেখেলা ভেবে এইসব মায়ান শাস্ত্র, আজও ধ্বংস হয় নি
...............সেসব মুমূর্ষু মূর্খের বুলি ;
যারা শাসিয়েছে তারা আজ শ্বাসরোধ হয়ে আছে
....................................গ্লানি-কাতর—রণ-রক্তের পাশাপাশি।
সেসব রক্তখোর আজ মানুষের কথা বলে
................................................শ্বাপদের জঙ্গলে।
সে জংলি হাওয়ায় প্রশ্নের ধ্বনি অহোরাত ,
ধ্বনি কাতর—
আমাকেও প্রহরী করেছে রাত
..............................ভেবেছি সীমানার বাইরে যা ছুড়ে দেয়া
...................বৃহৎ সীমানায় সে তো আকাঙ্ক্ষাই আমার।
তবু এই তো পেয়েছি বৃত্তের বাইরে অচল আমাকে
এই তো দেখেছি ঘোলা চোখে স্রোত এসে
..............................................ভাসিয়ে দিয়েছে বহু বর্ণালি।
যে প্লাবন ধরে এসেছে জলদূত—
....................................সহস্র শুঁড়ের নাচন দেখছি তাতে
বহু রূপ ফুটতে দেখেছি নীলিমায়,
বহু বন্যহাতি, হরিণের ছায়া ফেলা মেঘ
.............................................নিভেছে কমলা আগুনে।
বহু সত্তা আমি আঁধার দিয়ে ভেঙেছি—
নিভৃতে, যৌথতা এসেছে যখন চোরা শিকারীর বেশে,
.....................স্নেহের মাদুর বিছিয়ে এসেছে সৌম দরবেশ!
পেয়েছি, মেঘের ফাটলে সাঁতারু এক পাখি
দেহে বর্ণালি, ঠোঁটে চেপে রাখা ফসল
................................গ্লাইডিং করে নেমে আসছে রপ্ত মাটিতে।
আমাদের মূলের নিকটে ফেলে আসা সন্তাপ
....................................বল্গা হয়েছে কত নিজের ভেতরে
কত অজানা ডানার শব্দে বাজিয়ে নিয়েছে সুর।
অই যে কুয়াশায় ঝরে গেছে রঞ্জন ফুল
ধরতে পারি নি তার রূপ,
শুধু মীমাংসা থেমেছে কোথাও—
....................................ঢেউয়ের ওপরে মুছে যাওয়া ঢেউয়ে
কিছু চিহ্ন থেকেছে অনির্ণীত, নিঃশব্দ,
...........................................কোরকের নুয়ে পড়া ডালে,
মাটিমুখো;
মাটিকে শোনাও কত যৌথ-গান সে মিশিয়ে দিয়েছে জলে
কত সরণির মতো রেখাগুলো মুছে গেছে হাতের তালুতে
কত সশব্দ প্রকাশ ক্রন্দভারে বাতাস শুধিয়েছে
..............................................নৈঃশব্দ্যবিভোর—
কোথাও আনন্দ সঙ্গীত হয়ে বেজেছে ফাঁকা মাঠে।
তবু আত্মনিবৃত্তির শেষে আহত বাঘের গর্জনে—
...................................................শোনাচ্ছি গান
......................হাঁপ নিশ্বাসে তুলে আনছি কৌটোবন্দি ভোমরা।
রাজ-রাক্ষস আজ উপ্যাখ্যানের অতীত—
পায়রা উড়িয়ে চলে যাচ্ছে আমাদের বংশ কুলীন
উড্ডীন হাত, ওতে বশ্যতা মাখানো অহিফণা
.....................তুমি মাথা নত করো, কাফনে বেঁধে রাখো চোখ
নীরবে ভাঙো ভেতরে যা আসার, কুণ্ডল শীতনিদ্রা
ভাঙো যা ভাঙার অতীত, অপক্ব ফাগুনে ফুটেছে যা।
ভুলেও যেতে পারি এইসব পদস্খলন
যা যা আমাদের চিত্রিত অতীত,
ম্যুরালে নির্বাপিত পিতার গণিত
....................................তাকে দিচ্ছে শুধু আলোর মহড়া।
আমাদের অন্ধ চোখে বিজলি এসেছে,
বিজলির চারদিকে জমেছে আলোখেকো
উদভ্রান্ত তারা জন্মাবধি
আলোর পোকারা নিঃসঙ্গ চিরকাল, নির্জনে গাছের মুকুটে
......................................................মণি হয়ে জ্বলছে।
যদিও বাতাসে দোলে নি সুরভিরঙ্গন—তার শুভ্র পালক
আমি শুধু তার পাশে বসে ফুটতে থাকা মুখস্থ করছি
তার সারাৎসারে জলের ওপরে শুয়ে থাকবো ,
....................................শুনব—বরষা গাইবে প্রজন্মের গান
জন্মান্তর মাঠে মাঠে সবজে বরষা—
তুমি হে ভ্রাতৃপ্রতিম ,
..................এখানে—শেষ মরুরাত ঘোষণা করো,
ভাইয়ের স্কন্ধ থেকে তুলে নাও মাথা, মাথার দিব্যি—
........................কমলালেবুর ধারণা থেকে বরং অই মাঠে চলো
ওই সূর্যডোবা মাঠে নিজস্ব সঙ্গীত রচনা করছে রক্তমেঘ
...................................................শিশুরা নৃত্যরত—
..................ওই রক্ত -মেঘের আড়ালে মাদুলি ডুবছে
ওই ডোবার আড়ালে সৃষ্টি—আঁধার, নিষিক্ত হচ্ছে
................................................বিন্দু বিন্দু প্রোটিন।
তোমার শিশুর দিকে যে দূরের কুটুম বাড়িয়েছে বাহু
তার থেকে দূরে—তোমারও সুন্দর নিজস্ব ছোট্ট পৃথিবী আছে
মনে রাখো ,বহুদূর থেকে—
গড়িয়ে দেয়া খেলনা-বল, সে তোমার শিশুর জন্য বিস্ফোরক!
আসাদ জামান
জন্ম ৯ জুলাই, ঝালকাঠি, বরিশাল। কবি, অনুবাদক, গদ্যকার। পেশা : শিক্ষকতা। ই-মেইল...
বিস্তারিত
জন্ম ৯ জুলাই, ঝালকাঠি, বরিশাল। কবি, অনুবাদক, গদ্যকার। পেশা : শিক্ষকতা। ই-মেইল : Asad.du327@gmail.com (স্বল্প)