কারুশিল্প ❑❑
তোমার সহিংসতাটুকু আমিই তোমার হয়ে সেরে আসি বাইরে গিয়ে। তবেই-না তুমি সম্পূর্ণ অহিংসরূপে স্বর্গসুখে দিবানিদ্রা যাও। সন্ধ্যাবেলা জেগে উঠে বলো—বাহ্! করেছ কী কাণ্ড! বাইরে কী অপরূপ রক্তবিকিরণ! স্প্রাং রিদমের তালে-তালে জম্বি ছন্দে চলছে যজ্ঞ মনুমেধ— ওই যে থেঁতলানো দেহ—প্রতীকপ্রতিম। ছিটকে-পড়া ঘিলু—রূপকসমান পোড়ানো হাত-পা মুখ-মাথা—উপমেয়হারা উপমান। কাটা মুণ্ডু, ফাটা জিভ, বিমূর্ত চিত্রের মতো নাড়িভুঁড়ি, অনুপ্রাস, থকথকে কূটাভাস, চকচকে চিৎকার, সত্রশিখা, উগ্র আগ্নেয় তুফান... থেকে-থেকে যজ্ঞপটে জেগে ওঠে ভৌতিক জবান। যোজনগন্ধার গন্ধকাহিনির মতো চমৎকার রক্তের সুবাস ভেসে আসছে জানালায়। সেইসঙ্গে এও বলো— জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেল সব আর্ট, তাড়াতাড়ি। বিমূর্ত চিত্রের রূপ—মূর্ত তো থাকে না বেশিক্ষণ। পচে। গলতে থাকে। চণ্ড গন্ধ হয়। জীবাণু ছড়ায়...সাব-জিরো সাইলেন্স ❑❑
চোখ-বাঁধা জিম্মি-হওয়া মানুষ জানে না ঠিক কোন মুহূর্তে গুলি এসে লাগবে ঠিক কোথায় কোথায়। অচেনা রোমাঞ্চে, রোমহর্ষে, ত্রাসে, সর্বোচ্চ সংরাগে শরীরের প্রতি ইঞ্চি তাই প্রতিস্পর্ধী, টানটান। যেমন ‘দেহের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা পোশাকের ফেলে-রাখা ফাঁকা স্থান’। একদিকে তোমাতে সঞ্চার করা হবে অনন্ত বাকতৃষ্ণা, চিৎকারের উদগ্র তাড়না, উদ্গার অন্যদিকে নিষেধ বাকস্ফুরণ। নিষেধ চিৎকার। কোন দিকে যাবে? কোন দিক থেকে তেড়ে আসবে কোন ধারাল ছোবল, কোন কোপ, কোন কার্তুজ, লেলিহ ফিসফাস— এই গা-ছমছম ভুতবান্ধব জ্যোৎস্নায় বুঝতেও পারবে না আর, ওরে নিরুপায়। এই এখনই শুনবে বহু ঘোলাটে ভয়ের ঘোলতরঙ্গবাদন আবার এখনই উচ্চনাদী নীরবতা। কতশত সশব্দ উচ্চার, ঘুরে-দাঁড়ানো চিৎকার, অন্তরাত্মা-কাঁপিয়ে-তোলা কান্না, আর্তি, আহাজারি, বহুমাত্র বিচিত্র আওয়াজ— স্রেফ দ্বিমাত্রিক কালো টোটেম-অক্ষর হয়ে একদম খামোশ মেরে থাকে তারা নিঃসহায় কখনো তা ভাবদোষে, কখনো-বা রাজরোষে স্তরে-স্তরে-রাখা কল্পপুথির ঘোর-গুমসুম নিঝুম পাতায়। অতিরিক্ত অবদমনের অবশেষ দোষযুক্ত স্বপ্নে ভরে যায় সারা দেশ। স্বপ্নের ভেতর থেকে ঘটে যায় তার লাভাভর্তি পিচকারির ঘন পিচিৎকার।আনপ্লাগড অ্যান্ড আনলিশড, প্রমাদসংগীত ❑❑
আধা-বাস্তব আধা-ফ্যান্টাসির যুগ পেরিয়ে সম্ভবত আমরা অজান্তেই প্রবেশ করেছি এক উচ্চতর ফ্যান্টাসির যুগে। এখন, এই তুঙ্গ পরিণামপর্বে, অজ্ঞাত আরশ থেকে প্রত্যাদেশ পেয়ে—হ্যাভ আর হ্যাভ-নটস—দুই ধ্রুপদী বৈরীপক্ষ পরস্পর হাতে-হাত কাঁধে-কাঁধ রক্তহোলি জঙ্গে নেমেছে অজানা ফ্যান্টমের বিরুদ্ধে, উদ্দেশ্যবিধেয়রিক্ত, নিশানাহীন নিশানা তাক ক’রে।
বলপূর্বক-গুমের পিছে পিছে স্বেচ্ছা-গুম। ঊর্ধ্বকমার বন্দিদশা থেকে ছাড়া পেয়ে বন্দুকযুদ্ধ স্বয়ং ছুটছে দিগ্বিদিক। অতএব, এখন, কমাযুক্ত বন্দুকযুদ্ধের পিছে পিছে, এবং পাশাপাশি, কমামুক্ত সাচ্চা বন্দুকযুদ্ধ। ধরে-আনা নিরীহ বিড়াল, নির্যাতনে উদ্ভ্রান্ত, অবলীলায় কবুল করছে ‘আমিই বাঘ’। আর সঙ্গে-সঙ্গে সেই বানোয়াট বাঘের কাহিনির পিছে পিছে সত্যিকার শ্বাপদসংগীত।
কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন যে-কোনো মামুলি কথা, যে-কোনো নির্দোষ জিজ্ঞাসাকেও মনে হবে জ্যান্ত সর্পরূপক। নকশিকাঁথার পাশে পড়ে-থাকা নিরীহ সুতাকে ভ্রম হবে সুতানলি সাপ। ছেলের হাতে-ধরা মোয়াকেও মনে হবে ‘ওরে বাপরে বাপ’!