দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব

পাকা রাস্তা ভেদ করে ফুঁসে উঠছে চাপা-পড়া উলু ঘাস। এমনই অদম্য তবে উদ্ভিদের উৎপ্রেষ? ভাং-মেশানো ভাষার ভেতর বইয়ে দিচ্ছে ভেজা-ভেজা সুর ঊর্ধ্বমুখী তাড়নায় ওই দ্যাখো যুক্তি বাঁকিয়ে গোলাকার করে ফেলছে সব প্রসাদপুষ্ট বুধমণ্ডলী, কুবের কুমির আর যক্ষদের সপক্ষে। চোখেমুখে তাদের অনর্গল বুধবিকিরণ। আর বলাই বাহুল্য— যখনই অ্যাপেন্ডিক্সরা ভূমিকা নেয় জিহ্বার, আর তা চলতে থাকে অবিরাম, তখনই সমাজে দেখা দেয় চণ্ড ব্যথা অ্যাপেন্ডিসাইটিসের। তবে বুধবর্গ ভয়ে থাকে সারাক্ষণ—কখন যে কে এসে তাদের সুরক্ষিত সফটওয়্যারের মেঘে মিশিয়ে দেয় দুরারোগ্য বাগ ও ভাইরাস আন-ডু করে দেয় সরাসরি সমস্ত অর্জন ও আস্ফালন। ভয়ে থাকে সারাক্ষণ কখন যে কারা এসে গোল করে ফেলে দুর্ভেদ্য চাট্টিবাট্টি তাদের কিংবা ক্লোজ করে দেয় সানডে মানডে একদম দূরতর ফ্রাইডে অবধি। সুধী দুর্ধী সবাই থাকে তাই এক চিনচিনে ভয়ের ভেতর। আর কে না-জানে—দুঃস্বপ্ন দেখাটাও এক ধরনের দক্ষতা। নিচে নেমে এসো ন্যায়াধীশ, দেখে যাও— বলকানো ভাতের হাঁড়ি ঘিরে বসে আছে তিনটি ক্ষুধার্ত শিশু মাছের চাতুর্যে নাজেহাল হচ্ছে বাচ্চা বক, দূরে, আত্রাই নদীতে। বনপথে বানরেরা ট্রাক থামিয়ে লুট করে নিচ্ছে ট্রাকভর্তি পাকা কলা। এসব কি ন্যায় হচ্ছে কোনো, ন্যায়াধীশ? জিনদের জীবাণু এসে ধরছে ইনসানে এ কেমন ভ্রষ্টাচার চোর দিয়ে চোর ধরাধরি নাটকীয় কাঁটা দিয়ে কাঁটা... আর এ সবই ঘটে সেইদিন যেদিন তুখোড়তম গোয়েন্দাকে আবারও উল্লু বানিয়ে সটকে পড়ে খতরনাক অপরাধী। দমকা হাওয়ায় দ্রুত মুড সুইং হচ্ছে নদীর। ফের দমকা হাওয়ায় কার যেন হাত ধরে পালিয়েছে মল্লিকবাড়ির আফরোজা মল্লিকা। জীবনের প্রথম ক্রাশ... আর তা-ই নিয়ে কত কথা! বিয়ের আগে যেন স্বপ্নে-পাওয়া দিব্যপ্রভা অথচ বিয়ের পর নিরেট আসবাবশোভা। মেকি দাম্পত্যসুখের ছবি, ফটোশপ-করা সুখ নদী শুধু একবার ভ্যাবাচ্যাকা খাবে উত্তাল সাগরের মোহনায় তারপর স্বতঃস্ফূর্ত মিশে যাবে দরিয়ায় নির্বিকার নির্বিকল্প। আনকোরা নতুন জাহাজ জীবনে প্রথম জলে নামে শঙ্কা-থরোথরো জ্যোতির্ময় জলদস্যুর সম্ভাবনা-জেগে-ওঠা জলরাশি... ইউরেকা ইউরেকা বলে সেই কবে আচমকা ছুটেছিল উত্তেজিত আর্কিমিডিস, তারও বহু আগে থেকেই মানুষ ভাসিয়েছে নৌকা ও জাহাজ। বস্তুত যে-কোনো সূত্র উদ্ভাবনের আগেই মানুষ জেনে এসেছে সে-সূত্রের ব্যবহার, এমনকি দুর্ব্যবহারও। মানুষের চর্চা ও চর্যা তাই তার সফল জ্ঞাননাট্যের প্রিকুয়েল মাত্র। দীক্ষার্থী এসেছে দ্বারে, যাকে বসিয়ে রেখেছিলে ওই দূর ঊনপঞ্চাশের নির্জনে। দাও দীক্ষা এখন এ অর্বাচীনে সেইসাথে দিৎসাও জাগিয়ে তোলো ধীরে, অভ্যন্তরে। আধার এগিয়ে ধরো যদি নিরাধারে আশ্রয় এগিয়ে দাও যদি নিরাশ্রয়ে ভিক্ষার্থীকে দিয়ো তবে মুষ্টিভিক্ষা ওগো দানেশ্বরী। নচেৎ বিফলে যায় আমাদের এ দুঃখদিনের মাধুকরী। আলাভোলা মার্বেল, চুপচাপ থেমে আছে পথের ঢালে। ঢালু, গতি নেই তবু। মনোযোগ নেই তার গড্ডয়নে। তাকে দিয়ো মনোযোগ মার্বেলের অগতিকে দিয়ে দিয়ো রঙিন রিনিঝিনি গতিজাড্য জঙ্গলের তমোমণি তুমি হে জোনাকি তমসা কাটিয়ে দিয়ো হেসে মিটিমিটি। নিজের পুরনো খাত ফেলে এঁকেবেঁকে পালিয়েছে নদী সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে। এখন সে বয়ে যায় অন্য এক বিষণ্ন হারাবতীর শুকিয়ে-যাওয়া খাতে যেমন বিপ্লব ব্যর্থ হলে গেরিলারা বনবাসে যায় প্রতিবেশী রাজ্যে যেমন পিক-আপ থেকে পালায় ধরে-আনা বাঘের শাবক। মধুমতী বইছে এখন ময়ূরাক্ষীর খাতে খাত বদলের চমকলীলা চলছে দিনে রাতে স্পষ্ট দিনের বেলা খাত বদলের খেলা... নদীশাসন পলিবহন বিষম অনুপাতে। কী যে দুষ্ফল ফলেছে এবার গাছে গাছে খুনখারাবি রং গতিদীর্ণ খানাখন্দ পথ, দারুদহনের দিনে নিঃস্ব বনভূমি... চত্বরের বেদিতে উঠে সমবেত পায়রাদের উদ্দেশে অনর্গল বলকাতে-থাকা এক ধূসর ধুরন্ধর ঘুঘু, পাশে এক বাচ্চা গোল্লা কবুতর যেন ওয়াজের উত্তেজিত বক্তার পাশে দাঁড় করিয়ে-রাখা কাঁচুমাচু নওমুসলিম। এদের তো চিনি না, এরা কারা আচমকা থানা আক্রমণ করে আমাদের উদ্ধার করে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে গেল নিরাপদে! বিপ্লবীরা অবাক রীতিমতো। সেইসঙ্গে উদ্ধারকদেরসহ সবাইকে ফের তাবা-তাবা করে দেবার শপথ নেয় তারা। শুধু এটুকু নিশ্চয়তা দেয়—শবসৎকার হবে সবারই, যথাযথ ধর্মমতে। দংশনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলে বাস্তুতক্ষকও দুঃস্বপ্নের মাঝপথ থেকে ধড়ফড় করে জেগে ওঠে ভীত তক্ষকতাড়িত গৃহস্থ। জোরে বাক দিয়ে ওঠে মিনারচূড়ার আবহমোরগ মোটেও ভালো নয় এইসব উঁচু আলামত... কপোতাক্ষ বইতে থাকে দামোদরের খাতে খাত বদলের নর্মলীলা চলছে দিনে রাতে স্পষ্ট দিবালোকে খাত বদলের ঝোঁকে পড়ছে ভেঙে এ-কূল ও-কূল দুকূল একই সাথে।
মাসুদ খান

মাসুদ খান

কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, পিতার কর্মস্থল জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে।...বিস্তারিত