বই থেকে : ঊর্মিকুমার ঘাটে

অলুক, অনশ্বর ◘

তোমরা কারা? কতদূর থেকে এলে? মনোহরপুর? মধুপ্রস্থ? লীলাস্থলী? অবাকনগর? কোন যুগেরই-বা তোমরা? উপলীয়? তাম্র? প্রত্ন? নাকি নুহের আমল? যে যেখান থেকে, যে যুগ থেকেই আসো-না-কেন একই জাহাজের যাত্রী আমরা এ অকূল মহাকাশে। সহযাত্রী, এবং সমবয়সী। তোমাদের বয়স প্রায় পনেরো শ কোটি বছর, আমাদেরও তা-ই। যে-যে কণিকায় গড়া দেহ তোমাদের, আমাদেরও তা-ই— সব উদ্ভব ওই মহাবিস্ফোরণের ক্ষণে। অমরতা চাও? চাও অন্তহীন পরমায়ু? বিলাপ থামাও, শোনো, আমরা যে যখনই আসি অমরতা নিয়েই আসি হে অমৃতের সন্তান— অলুক, অব্যয়, অনশ্বর, চির-আয়ুষ্মান। জরা ব্যাধি মন্বন্তর মহামারি অনাহার অত্যাচার গুম খুন দুর্বিপাক দুর্ঘটনা কোনো কিছুতেই হবে না কিছুই, ধস নেই, মৃত্যু নেই, ক্ষয়ে যাওয়া ঝরে যাওয়া নেই শুধু বয়ে চলা আছে, রূপ থেকে রূপান্তরে, রূপক থেকে ক্রমশ রূপকথায়... জলে স্থলে মহাশূন্যে অগ্নিকুণ্ডে... কোত্থাও মরণ নাই তোর কোনোকালে... সাড়ে চার শ কোটি বছরের পুরনো এক সজল সবুজ কমলা আকারের মহাকাশযানে চড়ে চলেছি সবাই এক অনন্ত সফরে।

প্রস্থানের আগে ◘

প্রীতি পেলে থেকে যাব আরো কিছুদিন, না পেলে এক মুহূর্ত নয়। আবার যোগ দেবো প্রকৃতির প্রতিটি আয়োজনে— মেষশাবকের তৃণপ্রাশনের দিনে, জোনাকিদের বিচিত্রানুষ্ঠানে, বৃষদের বপ্রক্রীড়ায়, সাতভাইচম্পা পাখিদের বেলাশেষের কলহকাণ্ডে, হরিণ-হরিণীদের বিবাহপ্রস্তাবে, নবীন পাহাড়ি ঝরনার অভিষেকে, উদ্বোধনে...। জানি অবহেলা পাব, তবু কখনো বেহাগ রাগে, কখনো তোটক ছন্দে ঘুরব রংচিত্র প্রজাপতিদের পিছু পিছু বাজি ধরব শিকারসফল উদবিড়ালের অন্তরা থেকে সঞ্চারী অবধি জলপলায়নরেখা বরাবর। বহুকাল আগে ভুলে-যাওয়া সহপাঠীদের ঝিলিক-মাখানো মর্নিং স্কুলের রোদ এসে পড়বে গায়ে সেই রোদ দিয়ে সেরে নেব শান্ত প্রভাতি গোসল। প্রীতি পেলে থেকে যাব, না হলে এক মুহূর্ত নয়।

প্রশান্তি

যখনই বাসায় আসে মায়ের পুরনো সেই প্রেমিক, শিশুটি বোঝে— এ নিঃসীম নরকসংসারে ওই স্নিগ্ধ সম্পর্কটুকুই যেন একপশলা মায়াবী শুশ্রূষা, তার চিরবিষণ্ন মায়ের। একখণ্ড নিরিবিলি রঙিন সুগন্ধদ্বীপ মায়ের এ রং-জ্বলা নিষ্করুণ নিজস্ব ভুবনে। স্রেফ, স্রেফ কিছুটা সময় হাসিখুশি দেখবে মাকে, শিশু তাই দ্রুত গিয়ে সিডিতে চালিয়ে দেয় সেই গান, যে-গান গেয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেমিক-প্রেমিকা চাঁদনি রাতে, প্রশান্ত নদীতে, দু-পা মেলে দিয়ে, ছইয়ের ওপর। এইসব ছোট-ছোট মধুর মুহূর্ত, প্রসন্ন নিমেষ ধীরে ধীরে গিয়ে গেঁথে যায় এক বিষণ্ন বিপুল মহাকালে। সার্থক হয় মায়ের প্রণয়, মর্মী সন্তানের সহযোগ পেলে।

অপ্রাকৃত

ছোট্ট একটি ট্রেন— কিশোরী-বয়সী। অসুস্থ, অর্ধবিকল। পরিত্যক্ত লোকোশেড ছেড়ে নিশীথে বেরিয়ে পড়ে একা, নিশ্চালক। সারারাত কোথায়-কোথায় কোন পথে ও বিপথে ঘুরে বেড়ায়... কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে, গ্রাম-গঞ্জ-শহর পেরিয়ে... রেললাইন ছেড়ে নেমে যায় মাঠে। চলতে থাকে মাঠের ভেতর পৌষের শূন্য শীতার্ত মাঠ... সুখী মানুষেরা ঘুমে। অসুখীরা নির্ঘুম, ঊনপ্রাকৃতিক— দীর্ঘনিশ্বাসের আতসবাতাসে একাকার তাদের ঐহিক-পারত্রিক। ঘুমে-ঢুলুঢুলু স্টেশনের বিধ্বস্ত কোণে কয়েকজন নির্দন্ত নুলা ভিখারি সোল্লাসে মেতেছে সম্মিলিত স্বমেহনে। পথ থেকে এক পথকিশোরকে গাড়িতে উঠিয়ে নিচ্ছে দুই সমকামী সদ্যমৃত শিশুর লাশ তুলে নিয়ে পালাচ্ছে এক শবাহারী। কাঁপতে কাঁপতে এগোচ্ছে চোখবাঁধা এক হতভাগা, ক্রমে ক্রসফায়ারের দিকে। তা দেখতে পিছু নিয়েছে দুই রোঁয়া-ওঠা ঘেয়ো ক্ষুধার্ত কুকুর আর রাজ-রহমতে সদ্য-ছাড়া-পাওয়া এক মৃত্যুসাজাপ্রাপ্ত খুনি। বাসায় বাসায় বন্দি, নির্যাতিতা শিশু পরিচারিকাদের স্ফুট-অস্ফুট কান্না... এসব কোন অ্যাবসার্ড নাটকের নিষ্ঠুর নাট্যায়ন, ঘূর্ণ্যমান নাটমঞ্চে! শেষ অঙ্ক থেকে পিচকারির বেগে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে সমাপ্তিসংগীত— পরাজিত মানুষের শোচনা ও খুনির নৈশ নিভৃত অনুশোচনা এ-দুয়ের মিশ্ররাগে জেগে-ওঠা এক নিষ্করুণ গান। প্রাকৃত-অপ্রাকৃতের ভেদ ভুলিয়ে-দেওয়া সব দৃশ্যনাট্য ঠেলে উজিয়ে চলেছে সেই পালিয়ে-বেড়ানো ট্রেনটি। কেউ কি দেখেছে ট্রেনটিকে? —কেউ না। শুধু পরান মল্লিকের চির-রোগা রাতজাগা ছেলেটি বারবার বলে যাচ্ছে— “অনেক রাতে জানালা খুলে দেখি-কি, আগাগোড়া ফিনফিনে কুয়াশা-কালারের হিজাবে মোড়া নূপুর-পরা এক ঘরপালানো গৃহবধূ ত্রস্তপায়ে ঝুমঝুম শব্দ তুলে চলে যাচ্ছে দূরে আরো অধিক কুয়াশার ভেতর।” কিন্তু কেউ বিশ্বাস করছে না তার কথা।

নাম

তারপর চুপচাপ চলে যাব কোনো একদিন, দূরসম্পর্কের সেই মাথানিচু লাজুক আত্মীয়টির মতো, নিজের নামটিকেই ভুলে ফেলে রেখে, তোমাদের কাছে। গিয়ে বার্তা পাঠাব— এসেছি তাড়াহুড়া করে, ভুলে গেছি তাই। পাঠিয়ে দিয়ো তো নামটিকে। উত্তর পাব না কোনো। কিছুদিন অনাথের মতো ঘুরে ফিরে আমার সে-নামও নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে একদিন তোমাদের ছেড়ে। আমিও বিলীন, আর নামও লুপ্ত, থাকবে শুধু তিলেক শূন্যতা। আর তা পূরণ করতে এসে যাবে অন্য এক ভাবী বিলুপ্ততা।

ভাবাধিনায়ক

তোমার উৎফুল্ল হরতনের রাগরক্তিম ব্যঞ্জনা এসে লাগে আমার সাজানো তাসে। কী ভাব জাগালে ওহে ভাবাধিনায়ক, আকাশে বাতাসে আর আমাদের প্রথাসিদ্ধ তাসের সংসারে! ফুটে ওঠে লজ্জারং, জেগে ওঠে রংধনুরূপ, ব্যাকুল তাসের সেটে। হে ভাবের কমান্ডার, বোঝা ভার এ হরতনি লীলাটি তোমার। লজ্জা-আভা-ফুটে-ওঠা স্পন্দমান তাসকেই করেছ হে তুরুপের তাস—অব্যর্থ, মোক্ষম। পুনরায় টেক্কা মেরে দিয়েছ ঘায়েল করে সব উপশম, একদম।

দোলন

কনে-দেখা আলোর বিষণ্নতার মধ্যে লুটোপুটি খায় কনের লাবণ্যার্জিত অর্থ। কিছু তার ভূতপূর্ব, বাকিটা অভূত। একা এক গাছ, পাহাড়চূড়ায়। কবে কাকে যেন ডালে দোলনা ঝুলিয়ে দোল খেতে দেখেছিল মেয়েটি, দূর থেকে। দোল-খাওয়া মানুষটি চলে গেছে কোথায়, কবেই! কিন্তু সেই থেকে দুলেই চলেছে দোলনা, স্বয়ংক্রিয়, সরল দোলকের চালে। দোলনের সবচেয়ে উঁচু অবস্থান থেকে পুনরায় সবকিছু হাস্যকর, বেঢপ দেখায়। জমকালো ঘন ধ্বনিশ্লেষের মতন, শান্ত জ্যামিতির অবজটিল নকশার মতো দিনে দিনে দড়িকে আঁকড়ে গজিয়েছে দুর্বোধ্য, মেঘলা লতাপাতা। কনে-দেখা টাকা, তার বিষণ্ন ভাবার্থ, আঁচলের গাঁটে বেঁধে, পাহাড়ের পাকদণ্ডি বেয়ে, চড়াই-উতরাই পথ পেরিয়ে মেয়েটি একসময় উঠে আসে পাহাড়চূড়ায়। ওঠে দোলনায়। দোলনের প্রথম টানেই ডাল থেকে ছুটে গিয়ে সে-দোলনা লতাপুষ্পশোভন ঘুমঘুম সেই লাবণ্যকন্যাকে নিয়ে এ মনপ্রসন্ন পাহাড়ি হাওয়ায় উড়ে উড়ে পিশাচ-পিশাচী অধ্যুষিত গিরিখাত, উপত্যকা পার হয়ে ফুরফুরে পালকের মতো ভাসছে এখন পূর্ব-উপকূলে, মৌসুমি আকাশে। তারপর থেকে লবণই লাবণ্য আনে বরপক্ষে, বিবাহে, আহার্যে।
মাসুদ খান

মাসুদ খান

কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, পিতার কর্মস্থল জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে।...বিস্তারিত