'আপনি দেখবেন এই শহরটি আউলিয়াদের দখলে। বিমান বন্দরে, গাড়িতে, পথে, ঘাটে আউলিয়াদের নাম। তারাই চলছেন হাওয়ায় হাওয়ায় গতিমান হয়ে।'—রনি আহম্মেদ।

রনি আহম্মেদের সাম্প্রতিক চিত্রকর্ম নিয়ে কথা বলতে হলে তার বিবিধ ভাষা প্রবণতায় আমাদের চোখ পড়বেই। এসব ভাষা প্রবণতার মাঝে অন্যতম হলো তার গড়ে তোলা মহাজাগতিক পরিব্রাজক চরিত্র ও সত্তাটি বিবিধ আলোকিত সময়ের ও রূপের মাঝে নিজেকে বিবর্তিত করেছেন। শিল্পী নিজের বিস্তার ঘটিয়েছেন এসব মহা চরিত্রের মাঝে, মহা আলোকের মাঝে। রনি আহম্মেদ নূর বলে চিহ্নিত করেন। তার সাম্প্রতিক চিত্রকর্মের দিকে তাকালে বিভিন্ন উজ্জ্বল চকচকে রং আপনার চোখ কেড়ে নেবে। তিনি বলেন, ‘এরা নূরের উপস্থিতি।’
সুফি দর্শন ও বিশ্বাস এবং তার শিল্প মাধ্যম মিলে এমন অভিব্যক্তিমালা এক সম্পূর্ণ ভাষার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশের রওজা সমূহে মেলে এমন নানা উপকরণের উজ্জ্বল উপস্থিতি দেখি আমরা তার সাম্প্রতিক ছবিগুলোয়, যেসব তিনি হাজির করেছিলেন বোরাকের ডানা শীর্ষক প্রদর্শনীতে। তার ভাষায়, মাজারগুলোয় বিভিন্ন রঙের ঝলমলে উপস্থিতি আসলে নূরের সাক্ষ্য। আউলিয়া ও আম্বিয়া বা নবীগণ সেই নূরের ধারক বলেই তার এবারের ছবিগুলোয় তাদেরই উপস্থিতি প্রবল হতে দেখি। বলে রাখি যে, রনি এবারের প্রদর্শনীতেই তার আগের প্রদর্শনীর ভাষার উত্তরণ ঘটিয়েছেন পুরাণ অতিক্রান্ত এক জগতে পৌঁছে।
রনি আহম্মেদের ভাষার বিবর্তন চোখে পড়বার মতো। তার আঁকা দুলদুল ছবিটি আমার নজর কেড়েছে প্রথমেই। এই ছবি শুরুতেই যা মনে আনে তা হলো এই শিল্পীর ভাষা সংহত। তবু বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ও সমর্পণ সেখানে ঋজু হয়ে উপস্থিত। ধুলায় লুটানো হুসাইনের পাগড়ির সোনালি রং ধুলায় লুটিয়েও তাই ভাস্বর হয়ে থাকে। দুলদুলের গায়ে বিঁধে থাকা তিরগুলো হয়ে ওঠে শহিদ হুসাইনের নানা ও পয়গম্বরের করে যাওয়া ভবিষ্যদ্বাণী যেমন করে ফলেছিল এবং সেকারণেই যন্ত্রণার রূপ ধরে আসা রহমতের ও শাহাদাতের যে গৌরব হুসাইনের নামে যোগ হয় তারই স্মারক। উজ্জ্বল হয়ে আছে দুলদুলের পিঠ থেকে উঠে আসা পাক পাঞ্জাতনের পাঞ্জা। যুলজানাহ বা দুলদুল নামের ঘোড়াটি কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস, ভক্তি, প্রতিবাদ, পরীক্ষা, রহমত, শ্রদ্ধা ও প্রতিজ্ঞার সাক্ষ্য। রনি আহম্মেদের ভাষা এই ছবিতে এত স্বতন্ত্র ও নতুন যা আমাদের ভাবতে অনুপ্রাণিত করে। সংগ্রাম ও পরীক্ষায় অবতীর্ণ হুসাইনকে রনি রহমত ও প্রেমে সিক্ত এক সত্তায় আমাদের সামনে তুলে ধরেন। এমন প্রবণতা আমরা এই প্রদর্শনীর অন্য ছবিতেও দেখতে পাই। রনির এই প্রবণতাকে আমি প্রদর্শনীর বাইরে তার সার্বিক ভাষার বাঁক ফেরার চিহ্ন বলে বুঝে নিই।
অনুষঙ্গ হিশেবে, টেক্সচার আনতে মাজারে পাওয়া বা রিকশায় ব্যবহৃত অলঙ্কার সজ্জার ঝালর, সোনালি-লাল-রুপালি গড়নগুলো রনি আহম্মেদ এখানে আনেন নি। শিল্পীর জগৎ ও তার দর্শন, তার বিশ্বাস এবং শিল্প মাধ্যম বা মিডিয়া এখানে একাত্ম। সেই কারণেই দুলদুল, মুসা, খিজির, হযরত শাহজালালের পুকুর, ফরিদ আল দিন আত্তার-এর পাখি সমাবেশ, নূরে মুহাম্মদী ছবিগুলো এত স্বতন্ত্র। কারণ এখানে অলঙ্করণের বদলে শিল্পীর জগৎ তার নিজের ভাষায় বাহুল্যহীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছে। সুফি দর্শন ও বিশ্বাস এবং তার শিল্প মাধ্যম মিলে এমন অভিব্যক্তিমালা এক সম্পূর্ণ ভাষার জন্ম দিয়েছে। রনি আহম্মেদ এই ধারার অগ্রপথিক হয়ে রইলেন নিঃসন্দেহে।

বেশ দেশীয় রং তথা যেমন রঙের ব্যবহার লৌকিক বাংলায় আমরা দেখি তেমন রং নিয়ে রনি আহম্মেদ কাজ করেন। এই রং তার জগৎ ও ভাষার অঙ্গ। বায়েজিদ বোস্তামীর কচ্ছপ ছবিতে তেমন রঙের উপস্থিতি দেখি। ছবিটিতে ক্যালাইডোস্কোপের নিরিখে আউলিয়াদের সুলতান বায়েজিদ বোস্তামীর স্নেহের প্রতিচ্ছবি এই নিরীহ প্রাণীদের দেখি আমরা। রনি আহম্মেদের জবানীতে, ক্যালাইডোস্কোপের নিরিখে কচ্ছপের রূপে দেখি অস্তিত্বের পর অস্তিত্ব, অস্তিত্বের পর অস্তিত্ব।
রনি আহম্মেদের ভাষা আজ নীড় পেয়েছে তার দেখা আলোকিত জগতের ছবিমালায়।
রনির আঁকা ফরিদ আল দিন আত্তারের পাখি সমাবেশের পাখিরা যখন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে কেবল নিজেদের প্রতিচ্ছবিই দেখতে পায় তখনও দেখি অস্তিত্বের আত্মিক গড়ন।
রনি আহম্মেদের ভাষা বহু সফরের ভেতর দিয়ে নিজের আজকের পরিণতিতে পৌঁছেছে। অনুসন্ধানী চক্ষুষ্মান চরিত্র, মহাজাগতিক পরিব্রাজক চরিত্র, সেমিটীয় পুরাণের পয়গম্বর নূহের গাঢ় ও বিরাটাকায় চিত্র উপস্থিতি, বিবিধ ধর্ম বিশ্বাসের পৌরাণিক চিত্রণ থেকে স্থিত বিশ্বাসের ও দর্শনের আজকের বোরাকের ডানা সিরিজের ছবিগুলো। রনি আহম্মেদের ভাষা আজ নীড় পেয়েছে তার দেখা আলোকিত জগতের ছবিমালায়। অল্প আয়োজনে বিরাট জগৎসমূহ ও মহা সংঘটনের চিত্রণে রনি আহম্মেদ সহজতা দেখিয়েছেন। রনি আহম্মেদ আজ সরল নন, সহজ। বহু চর্চিত তার কারু নিজের অস্তিত্বের নির্যাস নিয়ে পরিমিত অভিব্যক্তিতে নিজেকে প্রকাশ করেছে।
রনি আহম্মেদের ফর্ম বরাবরই বিশিষ্ট ও স্বতন্ত্র, কাজেই আলাদা করে চেনা যায় তাকে সহজেই। একজন শিল্পী নিজেকে কতভাবে ভাঙেন তার খুব ভালো দৃষ্টান্ত রনি আহম্মেদ। গত দেড় যুগ ধরে তিনি বহু গল্পের মাঝ দিয়ে তার পরিব্রাজক চরিত্রকে হাজির করেছেন, নানা রূপে ও গড়নে, বিচিত্র ফর্মে। ফর্মকে শিল্পীর ভাষা বললে সেই ভাষায় রনি বহু পর্যায় পেরিয়েছেন ইতিমধ্যেই। নিজস্বতা বা প্রাতিস্বিক ভাষা মাঝে মাঝে সুখকর অনুভূতি দেয় না। রনির চিত্রে সুখের অনুভূতি দেয়ার চেয়ে ভিন্ন এক জগৎকে সচেতন হয়ে দেখতে বলার প্রয়াস ছিল বরাবরই। একেবারে নিজের তার সেইসব আকৃতি ও গড়ন। ভিন্ন সব জগৎ ও দৃষ্টি। অস্তিত্বকে অন্য কোথাও ফেলে দিয়ে দেখিয়েছেন রনি বারবার। ভিন্ন জগতে অস্তিত্বের মুখ অচেনা মনে হয়; এবং অচেনা বলেই কিঞ্চিৎ কৌতুককরও হয়তো। এভাবে মহাজাগতিক পরিব্রাজক হয়ে উঠেছিল তার অস্তিত্ব, যার কায়া ভিন্ন। বিবিধ পুরাণে ভ্রমণ করেছেন রনি। সেখানেও বহু নতুন ফর্ম, বহু নতুন মুখাবয়ব। এরা একান্তই তার, নিজস্ব। এভাবে ভাষা একসময় পেলব হয়ে আসে রনির। পুরাণের আলোকিত চরিত্রসমূহে এবং তদের পরিপার্শ্বেও তিনি আত্মার জন্য আশ্রয় খুঁজে পেতে থাকেন। গত দুই বছরে অন্তত তিন রকমের ভাষার বিবর্তন আমার চোখে ধরা পড়েছে রনির চিত্র বা শিল্প উপস্থাপনায়। সেই জগতে বোরাকের ডানা নতুনতর স্বর।
নতুন ভাষা উপহার দেয়া রনি আহম্মেদের বড় অবদান আমাদের শিল্পে।
বিভিন্ন মাধ্যমের একত্রীকরণের প্রয়াস এবারেও ছিল রনির কাজে। ইন্সটলেশন ও চিত্রের সহোদর উপস্থিতি আমাদের পরিচিত রনিকে মনে করিয়ে দেয়। তবে পরিমিতি এবং ফোকাস তার এবারের ভাষার কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য। খিজিরের রহস্যময়তা ও গুরুস্থানীয় ভাব কালো ও সোনালি রঙের অল্প দুয়েকটি প্রতীকী উপস্থিতিতেই তিনি ধরেছেন। নাটকীয়তা আছে বুদ্ধের বিমূর্ত উপস্থাপনায়। বিরাট ব্যক্তিত্ব মুসা নবির শিক্ষা সফরের সোনালি মুহূর্ত একটি সোনালি মাছ দিয়ে তিনি বলে দিলেন। এই মাছ আমরা খিজির আলাইহিস সালামের ছবিটিতেও দেখি। অর্থাৎ একই অবয়ব দুই ভিন্ন কথা বলে দিল। এখানেই কবিতা দাঁড়াল রনির।
রনির ভাষার আরও একটি বিশিষ্ট দিক নিয়ে বলা যাক। একটি ছবিতে মাছের পেট থেকে বেরিয়ে আসা ইউনুস নবির রূপায়ন দেখি আমরা। এই ইউনুস ঠিক পুরাণের বিপদগ্রস্ত ইউনুস নন। তিনি খোদার রহমতের দরিয়ায় ভাসতে থাকা একজন মহাপুরুষ। এখানেই রনি তার শিল্পের বিশেষ একটি দিকের উত্তরণ ঘটালেন।
রনি আহম্মেদের ছবিতে সুফি সাধকদের উপস্থাপনা বিশেষ করে চোখে পড়বে। এখানে চিত্রণে তিনি বিমূর্ত নন, তবে ভাবে আধ্যাত্মিক। ফানা হবার নৃত্যে সুফিকে দেখি রনির তুলিতে, আবার খোদার অস্তিত্বে বিলীন ও 'হাল'-এ থাকা বাবা আযিযের উপস্থাপনা আমাদের মরমী ভাবের গহিনে নিয়ে যায়। কত অল্পে, কয়েকটি মাত্র রেখায় তিনি বাবা আযিযকে নিয়ে এলেন। সুফি সাধকদের উড্ডয়নের ছবিটি মানব অস্তিত্ব থেকে ভিন্ন অস্তিত্বের স্মারক হয়ে ওঠে। মরিয়ম আলাইহিস সালামের কাছে ফেরেশতার ভিন্ন চেহারায় বহুডানাময় আগমনেও পরিমিত নন্দনে স্পন্দন তোলা রঙের কাজ দেখি আমরা।
চোখে পড়ার মতো এবং দেশি রঙের জগৎ, দেখতে নাইভ এমন রং দিয়ে করা কাজে শিল্পীর দ্বিধাহীন বিচরণ আমাদের শিল্প জগতে নতুন স্বাক্ষর। রিকশা সাজানোয় ব্যবহৃত ও মাজারে দেখতে পাওয়া যায় এমন সব ঝলমলে এবং আজকের শিল্পে প্রায় অব্যবহৃত সব উপকরণে একটি নতুন ভাষা উপহার দেয়া রনি আহম্মেদের বড় অবদান আমাদের শিল্পে। তার জগৎ ও ভাষার স্বকীয়তা শিল্পকে ছাড়িয়ে অনন্য এক উচ্চতায় পৌঁছেছে।