যে নদী বাঁকখালি ❑❑
দেখেছি নাফনদী, গড়িয়ে আসে, কতদূর! সমুদ্রসন্তান সে। তারও আসে প্রতাপ, নুনজ্বর। পিতৃসূত্রে পেয়েছি বাঁকখালি।
আজন্ম কুয়াশা পেয়েছি মায়ের কাছ থেকে। মাতামহী দিয়েছিল একথলি জোছনা। সন্ধ্যা হওয়ার আগে বাড়ি ফেরা নেই। বাড়িই আমার ভেতর চুপ মেরে থাকে। মানুষ মেলায় যায়, কুড়িয়ে আনে রঙ। আমি কয়েকশো ফানুশের ফাঁকে আঁধার দেখি। আমি বাঁকখালির কাছে যাই—তার টলটলে জল কেমন ভরভরতি যৌবন নিয়ে একা! এমন সবুজ শান্ত নদী বাবা কেন দিয়ে গেল?
ব্রিজের ধারে ছাতিমছায়া মেখে আমি দেখি বাঁকখালি, ঝিম মেরে থাকা জল। মানুষের উত্তরদক্ষিণ ছুঁয়ে আকাশকে টেনে নিয়ে যায় জন্মসূত্রে পাওয়া সমুদ্রের দিকে। দেখি বাবার নুনমাখা মুখ, চিরল বাঁক বেয়ে ঢুকে-পড়া নুনের প্লাবন। দেখি আমার পূর্বপুরুষের প্রতিচ্ছবি আর একজন্ম উপেক্ষা নিয়ে আমার ভেতর ঘুমিয়ে আছে জলপাইরঙ বাঁকখালি।
দাগ ❑❑
বিস্ময়ের শেষ দিন ডিমের খোসার মতো ভেঙে পড়ে আছে পারদ পেরোচ্ছে সীমারেখা, যতখানি দাউদাউ বলিষ্ঠ অগ্নির তুমিও পেরিয়ে গেছ বহুকাল আগে, পাথরের মতো মুখ করে যেসব হাতের টানে বুক থেকে ঝরাও মমতা, জঙধরা রাতে নগরের পইঠায়, এদিক ওদিক ছড়িয়ে দাও শরীরগামী মন বাসি ঠোঁটে পলি জমে, পাললিক পাঁকে ডুবন্ত পা টেনে তোলে? মাটিতে প্রোথিত রাখি দাগ, কুঁড়ি মেলে পাতা যেন বিপন্ন সোহাগ বিসর্জিত প্রতিমার মুখ ভাসে অবেলায় কীর্তিনাশা জলে দিনমান পুঁতে রাখি সমস্ত জীবন। পাখির খিদের কাছে নত অজস্র ফুলের শেষ, নক্ষত্রের নিচে শুয়ে সবুজ শরীর যতসব দ্বিখণ্ডিত ভাষা তর্জমা পেরিয়ে গেছে মানচিত্র ভুলে বিষণ্ন আলোয় কেউ তোমার ছায়ার পাশে বুক ঘেঁষে বসে।
বিষসাপ ❑❑
চোখজোড়া দেখলেই বুঝি—একটা সবুজ সুতোনালি সাপ হিসহিস নিয়ে ঢুকে পড়ছে আমার শরীরে, রক্তে সাঁতার কাটছে আর যেন আমার সমস্ত স্নায়ুতে ছড়িয়ে দিচ্ছে বহুমুখী বিষ! যেসব জানালা উড়ে গেছে সাইকেলের গতিতে, চাকার বুকে মানচিত্র নিয়ে—আমরা কোনোদিকে যাই নি তার মতো, অথবা যেতে পারি না। এসব অসারতার ভেতর, বিনা গন্তব্যের ভেতর, মুখ লুকিয়ে আমরা আরেকবার ঢুকি স্বেচ্ছায়—অন্য কোনো সম্পর্কের দিকে, নদীর মতো হাত ধরাধরি করে। এতসব ক্রিয়াশীলতা, সাপটি ততক্ষণে পাঁজরের নিচে ঘুমিয়ে পড়েছে...
পথ ❑❑
ধার-করা জীবন সেদ্ধ কচুপাতার ঘ্রাণ নিয়ে শুয়ে থাকে। সিলিঙে ঝুলানো চোখ, ঝুলকালিতে আটকে থাকে বোঁটামুক্ত মুখ। বাড়ন্ত নখের মতো বিষাদ বাড়ে। তুমি-আমি কতদূর আর? থাই জানালার কাচে পাখি আসে, নিজের মুখের উপর ঝাপটা খেতে খেতে ভুলে যায় একটু পেছন ফিরলেই তার উড়ে যাবার পথ হা করে আছে।
ভস্ম ❑❑
কতসব ভস্ম জমা হলো! বিধবা শাদায় আজ আঙরা কাঠের কালো। পালং শাকের পাতায় দৃশ্যত শিশুকাল। তার হাঁটুভর্তি হামাগুড়ি। জল-খিচুড়ির দানায় লেগেছিল এক টুকরো জীবন। আজ তা গুঁড়ো করছে বাচাল ব্লেন্ডার।
দেয়াল ❑❑
এই যে পালাই পালাই করি! যেন একপৃথিবী ঋণের বোঝা আমার মাথার উপর আর আমাকে তাড়া করছে অজস্র কেউ! আমি ছুটছি ছুটছি... আমার সামনে দেয়াল, পেছনে দেয়াল, আমার ডানে-বামে দেয়াল!
আমার পথ ফুরিয়ে আসে, গণ্ডি খুব ছোট হয়ে আসে। ক্ষয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর পরিধি। এইসব দুর্দিনে প্রকৃতির রঙ সব উবু হয়ে থাকে, একটু একটু করে ছত্রাকের গায়ের মতো হয়ে ওঠে তাবৎ বর্ণহীন। মানুষের ভেতর থেকে মানুষ ফুরিয়ে যায়...
তোমারে বন্দনা করি ❑❑
তোমারে রাঁধিয়া খাই, গিলে খাই য্যান ঠাণ্ডা শরবত যখন তখন ক্যান কলিজা ধরিয়া দাও জোর টান? হিংসা নিয়া খেদ নিয়া জরা নিয়া কতদূর টানি রথ! তোমারে চিবিয়া খাই আর চুষে খাই আমার পরান তোমারে যে সেদ্ধ করি জ্বরতাপে, দেহে মাখাই প্রলাপ তোমারে মন্থন করি ঋতুবন্ধ চক্রদার কত ধ্যান! তোমারে তপস্যা করি, মায়া করি, প্রিয় প্রার্থনা ও শাপ ফোঁটা ফোঁটা অন্ধকার ক্রমাগত ঝরে বোধের কল্যাণ তোমারে কামনা করি, খুব প্রেম করি আদরে আমোদে যাবতীয় আলো মেখে তোমারে জড়ায়ে রব প্রিয় ঘুম তোমাতে প্রবেশ করি, তোমাতে আবেশ করি কী দরদে! সামনে-পিছনে জল চোখের দূরত্বে বিষধর চুম তোমারে মিলন করি, স্পর্ধা, ভয় করি শান্ত হেলেসাপ তোমার অন্দরে যাই, দুগ্গা দুগ্গা! মৃত্যুর মতন পাই তোমারে বন্দনা করি , মধু লুঠে খাই, বাড়াই আলাপ তোমারে আনন্দ করি ওঁ বাসনা করি, বিষ মেনে খাই
ফিনিক্স ❑❑
সন্ধ্যার দিকে গুটি গুটি হেঁটে-যাওয়া বিকেল খালি জার-ভর্তি নীরবতার তর্জমা করতে করতে একটা নীল পাথর কুড়িয়ে পেয়েছিলাম—প্রিয়তম পাথর থেকে কাঠিন্যের পাঠ নিই রাত্রির প্ররোচনা মিলিয়ে যায়—স্নানঘরের চৌকাঠ পেরুতে থাকা জলে কাজল খুলে দিয়েছি, প্রিয় লাল টিপও এবার খুলে দেব চোখ করতলে রেখে গোল করে ছড়িয়ে দিয়ো তারপর, আমি এক অন্ধ পাখি—পুনরুজ্জীবনের ধ্যানাসন লেপ্টে থাকে দেহের প্রতি ভাঁজে।
শহর ❑❑
আমি এই শহরের মানুষ চিনি না। তবে মুখ চিনি। আর কাছাকাছি থাকি বলে দেখা হয়ে যায় হুটহাট। একই রাস্তায় হাঁটি। সওদাপাতি কিনি। মাঝেমাঝে কুশলাদি জেনে নিই ! ইচ্ছে হলে হেসে কথা বলি। বলি—বাসায় আসুন একদিন! আমরা কখনো কারো স্বপ্নকে জানতে চাই নি। হরেকরকম জামা-পরা মানুষ। হরেক আদল কিংবা ভেতর বাহির। আমাকে চেনে না বলে আমিও চিনতে চাই নি কোনোদিন বিরহে-আনন্দে। এই শহরের লোকগুলো দেখতে আফ্রিকার মতো। আমেরিকা কিংবা জাপানের মতো। এই শহরের মানুষসকল আমার মতোই দোদুল্যমান পায়ে আয়ু গোনে। বছর শেষে ভাবে—আর ক'বছর ঠিক এভাবে গড়িয়ে যাবে দিন। সকলেই সকলের কাছে থাকে জুমের ফসল হয়ে। কিঞ্চিৎ নিজেকে চেনে। কিঞ্চিৎ চেনে না।
তুমি সিরিজ ❑❑
এই শূন্যকাল, খরা বিশুদ্ধতা মাঝামাঝি ঘুমের পর্বত ডিঙিয়ে কুয়াশা বাগান। জানালায় কয়েক টুকরো আকাশ। ফিরে যাচ্ছ শীত। পর্ণমোচীর নিঃস্বতা। এভাবে আরো কিছুদূর পালিয়ে পালিয়ে তোমার মুখ থেকে, চোখ থেকে মুছে যাব। মুছে গেলে, ঝরে গেলে, আরও নিঃন্ব হয়ে গেলে, কী হয়? হতে আছে? ভ্রুভঙ্গি নিয়ত বদলায়। পালাতে পালাতে পা ফুরিয়ে গেছে। গোল হয়ে থমকে আছি দলছুট মার্বেল। পৃথিবী ডুবে-যাওয়া জলে আমি ডুবে যাই কয়েকশো পৃথিবী আর একমাত্র 'তুমি' নিয়ে।