সিনেমার নিয়মিত দর্শক যারা তারা জানেন, পৃথিবীর নামকরা অনেক পরিচালকদের একত্র করে বিভিন্ন সময় অ্যান্থলজি সিনেমা নির্মিত হয়। একই বা কাছাকাছি বিষয়ের ওপর নির্মাতারা তাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটের গল্প নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ছোট দৈর্ঘ্যের ছবি বানায়। সেগুলো একত্রিত বা সংকলনের মতো করে একটা পূর্ণাঙ্গ ছবির আকার ধারণ করে। এমন একটা অ্যান্থলজি সিনেমা দেখতে গিয়ে ‘টেন মিনিটস ওল্ডার’ ছবিটা দেখছিলাম। বেশ অনেকদিন আগের কথা। সব পরিচালকের কথা মনে নেই। যার কথা বলার জন্য এইসব সিনেমা ধর্ম-ধারণ বিষয়ক প্যাঁচাল তার ছবিও তাতে ছিল। কিন্তু তাকে তখন মার্ক করা হয় নি। কেন হয় নি, সে প্রশ্নের সহজ উত্তর এখন যতটা সহজে তার কাজ বা কাজের ধরন চোখে পড়ে, তখন তা পড়ে নি।
হ্যাঁ, তিনি নির্মাতা হিসেবে বিখ্যাত। অন্তত : ফর্মুলা সিনেমার বাইরের ছবির যে জগৎ সেখানে জিম জারমুশের নাম উল্লেখযোগ্যই বলা চলে। ফ্রান্সের কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে যে কিনা একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। আর ছবি মুক্তি পেলেই স্থান পেয়েছে উৎসবের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়। সমালোচকদের কাছেও জারমুশ অনেক প্রিয় এবং আলোচিত।
ব্রোকেন ফ্লাওয়ারজারমুশের মা ছিলেন সিনেমার রিভিউয়ার। ছোট বেলায় তাকে নিয়ে হলে ছবি দেখতে যেতেন মা। সেখান থেকেই তার যে আন্তর্জাতিক স্বাধীন চলচ্চিত্রের সাথে সম্পর্ক তার জের ধরেই আমাদের কাছে আসে ‘প্যাটারসন’র মতো ছবি।নীরবতা আর স্তব্ধতার সংস্পর্শে থাকা তার চরিত্রগুলোকে আসলে টুকরো টুকরো জিম-ই মনে হয়।
হ্যাঁ, ‘প্যাটারসন’ দেখেই জারমুশের নাম আবার মনে করার প্রয়োজন পড়ে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই জারমুশ একটা সময় কবি হতে চেয়েছিলেন। স্কলারশিপের টাকা দিয়ে সিনেমা বানানো শুরু করায় বিশ্ববিদ্যালয় তার শেষ গ্রাজুয়েশনের ডিগ্রিটা দেয় নি। যদিও ওই ছবি কখনো বাণিজ্যিকভাবে মুক্তি পায় নি। সমালোচকদের কাছেও সেই প্রথম ছবি ‘পারমানেন্ট ভ্যাকেশন’ ততটা গুরুত্বপূর্ণ না। তবুও জিমের জগৎ আমাদের আলোচনার জগতে ঢুকে যায়। তার কারণ হলিউডের যে রং-চঙা সিনেমার ভূমি, এর বাইরে এক খণ্ড আকাশ বলি বা একটা স্বস্তির জানালা বলে তাকে বা তার ছবিকে চিহ্নিত করা যায়।
দ্বিতীয় ছবি ‘স্ট্র্যাঞ্জার দেন প্যারাডাইস’ দিয়েই জিম জারমুশ সমালোচকদের দৃষ্টিতে পড়েন। আর ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন নিজের এক জগৎ। সেই জগতের চরিত্ররা আর সব মুখস্থ হলিউডি চরিত্র না। স্বাধীন, নিঃসঙ্গ, সুখী ও মানবিক।
ব্রোকেন ফ্লাওয়ারমূলত জিমের সবশেষ ছবি ‘প্যাটারসন’ই এখন পর্যন্ত সর্বাধিক আলোচিত ও পরিচিত। এর বেশ কয়েকটি কারণ হতে পারে। প্রথমত এই ছবি বড় প্রডিউসার ও ডিস্ট্রিবিউটরের প্রোডাকশন। দ্বিতীয়ত ইরানি সুন্দরী গোল্ডস্ফিথ ফারহানি ছবির নায়িকা এবং সবশেষ চমৎকার নির্মাণ। পারতপক্ষে ফারহানির নতুন ছবি হিসেবেই আমার এই সিনেমার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। দেখতে বসে আমি আর ফারহানিকে ততটা মনে রাখতে পারি নি। আমার মনোযোগ চলে গিয়েছিল তার বাস ড্রাইভার ও কবি স্বামীর প্রতি। ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রও সেই। যে গল্পটা জিম তার ‘প্যাটারসন’-এ বললেন, এ গল্পটা অনেকটা তারও গল্প। হ্যাঁ, এ কথা আমরা বলতেই পারি। যেহেতু একটা সময় সে নিজেও কবি’ই হতে চেয়েছিলেন। কবি হওয়ার তার আকাঙ্ক্ষার যে ব্যর্থ ভ্রমণ, সেই ভ্রমণটাই হয়তো অন্য মুখে এসে হাজির হয়েছে ‘প্যাটারসনে’। আর আমরা মুগ্ধ হয়েছি তার গল্প বলার ঢং, চরিত্র নির্মাণ ও পরিমিত সংলাপের চিত্রনাট্যেও।প্যাটারসন’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র পেশায় একজন বাস ড্রাইভার ও কবি। কবিতার ভেতর যে তার মুক্তির ঘ্রাণ বুনা, তা তার জীবনের মতো নয়। যেন এক অন্য জগতের জীবন তিনি বয়ে বেড়াচ্ছেন। হ্যাঁ, এই রকম একটা জগতের কথা জারমুশ বহু আগেই বলেছেন। এক সাক্ষাৎকারে। ‘মুভি ম্যাকার’ নামের একটা ম্যাগাজিনে ‘দ্য গোল্ডেন রুলস অব ফিল্মিং’ নামে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছিলেন :
আসল বলে কিছুই নেই। তুমি যেকোনো জায়গা থেকে যে কোনো কিছুর উপাদান সংগ্রহ করতে পারো, আর তাকে ব্যবহার করতে পারো কল্পনার সাথে। পুরনো-নতুন সিনেমা, সংগীত, বই, চিত্রকলা, আলোকচিত্র, কবিতা, স্বপ্ন, টানা কথোপকথন, স্থাপত্য, সেতু, রোড সাইন, গাছ, মেঘ, পানি, আলো-ছায়া কিছুই আসল না। একমাত্র নিজের আত্মার সাথে, বোধের সাথে কথা বলাই সত্যি। যদি তুমি তা করতে পারো, তাহলেই তোমার কাজ বিশ্বাসযোগ্য কিছু একটা হবে। সত্যতা অমূল্য সম্পদ, অরিজিনালিটি বলতে কিছু নেই। তুমি কোত্থেকে নিচ্ছ, কোত্থেকে অনুপ্রাণিত এসবে তখন কিচ্ছু আসে যায় না। গদ্যার একটা কথা বলেছিলেন, তুমি কোত্থেকে নিচ্ছ সেটা মুখ্য নয়, নিয়ে কোথায় রাখছ বা বসাচ্ছ সেটাই তার পরিচয়—এটা মনে রাখতে হবে।
জিম জারমুশ আসলে সে কাজটাই তার সিনেমায় করছেন।
প্যাটারসন প্যাটারসননীরবতা আর স্তব্ধতার সংস্পর্শে থাকা তার চরিত্রগুলোকে আসলে টুকরো টুকরো জিম-ই মনে হয়। মনে হয়, এইসব চরিত্রের হাত মুখ চোখ আর হৃদয়ের মাঝখানে ছড়িয়ে আছে অন্য এক হলিউডের মুখ। যে মুখ ভিড়ের মাঝে একা, নিঃসঙ্গ কিন্তু অপ্রকাশিত এক কবিতার খাতা।