কবি ইলিয়াস কমল লিখছেন দীর্ঘদিন। গত দু’তিন বছর তার সাথে দেখা হলে জিজ্ঞেস করেছি—‘একে একে আপনার সময়ের সবার বই হচ্ছে। আপনারটা পাব কবে?’
তার এক উত্তর—‘সময় হয় নি, প্রকাশক নিজ থেকে বললে...’
এবার সেই চাপা-অহম ও নীরবতা ভেঙে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অতিরিক্ত বাগানবাড়ি’। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজীব দত্ত। প্রকাশক : ঐতিহ্য। সেই মলাটবন্দী বই হাতে পাওয়ার আগেই পাণ্ডুলিপি থেকে ৭টি কবিতা তুলে দেওয়া হলো ‘পরস্পর’ পাঠকদের জন্য।
—মাজুল হাসান, পরস্পর।
বাবাকে
আমার কাছে কোনও জাদুর কাঠি ছিল না তাই চলে যাওয়া সন্ধ্যার রূপান্তর ভুলে যাওয়ায় ব্যক্তিগত মাঠজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে গোলাপি ঢেউ যে মাঠে বালক বুনেছিল চিনে বাদামের ক্ষেত সেই মাঠে দেখো বসেছে বিকেলের মেলা প্রপিতামহের কাছে এই কথা লিখতে গিয়ে ভুলে গিয়েছি ঠিকানা ‘বাবা, তোমার বাবা কি আমাকে চেনে? সে কি জানে আমার নাম? অনাগত সন্তান কি ভুল করে নিজের মুখের সাথে তার ছবি মিলিয়ে দেখবে কার মুখশ্রীতে ধরে আছে সত্তা?’ বিকেলের খেলার মাঠে ফুঁসে উঠা গোলাপি ঢেউ এবার জমিয়ে তুলবে শীতের আসর; তুলসির পাতা বেটে উষ্ণতা জড়ালে—বুকে চেপে বসা সেই কুঁজো বুড়ি জন্মাবে নতুন প্রেমিকা হয়ে আসো বাবা, আমি আর তুমি—তুমি আর তোমার বাবা এক হয়ে ফুটবল খেলি খেলা শেষে পেয়ে যাব ঠিকানা লেখা চিঠি যার অপেক্ষায় ছিল তোমার বাবা—আর আমার সন্তান আসলে তারা একই জন্মে বেড়ে উঠা মাছ—
প্রজাপতি কাল
মৃত ছিলাম কি কখনো? কখনো কি জেগে ছিলাম পুনর্জন্মে? সেই গল্পের কথা বলি আজ—একটা ঘোড়া ছিল লাল নীল ডোরাকাটা রেসের ময়দানে ছিল না তার দৌড় অথচ রাত্রি নেমে এলে সেই ঝরনার দৌড় বেড়ে যেত জোয়ারের মতো কোনও কিংবদন্তির গল্প জানতাম না, তবুও নেমেছিলাম সাগরে— ঐ সাগর কেবল মিছে ভুলানো রাশি রাশি বেদনার ভাঁড়ার—তাই বিকেলের ঘুম পাড়ানো রোদে আমরা প্রজাপতি হই
হাসপাতাল
যে বন্ধুকে পাহাড় দিয়েছিলাম সে গতকাল তা ফেরত দিয়ে গেছে; এবার আমি হাসপাতাল উপহার দিলাম এবার বেজায় খুশি—সে জানে আমার পাহাড়ের চেয়ে হাসপাতাল প্রয়োজন ছিল বেশি।
ভিরিদিয়ানার বাড়ি
ভিরিদিয়ানার বাড়ি যাব। বাস স্টপে বসে আছি। আমাদের ছেড়ে গেছে মেঘ। এই পথে আর ফিরবে না কৈশোরের জাহাজ। নাবিকের ডানার মতো এলোমেলো—ভিরিদিয়ানার পথ। আমি তোমার পথেই যাব
অযান্ত্রিক অক্ষরের প্রতিলিপি-৩
পকেট ভর্তি করে জলপাই রঙের শীত নিয়ে এসেছি এনেছি যুবতীর ব্রা’র উষ্ণতার সাথে বিশ্বাসী সংলাপ এই গ্রীষ্মের কথা তোমরা ভুলে যাও নি এখনো, তাই পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে রয়েছে হলুদ স্বপ্নের গল্প আমিই নই কেবল নিজের লাশ বয়ে আনা একমাত্র খুনি তুমিও তার একজন; অথচ তোমার শীত রাত্রে প্রান্তরের কথা বলে হারিয়ে গেছে ঋতু, তাই দেখে একবেলা ভেংচি কেটে কাটিয়ে দিলো সমর্পণের দলিল। আমার শীত বসন্ত প্রিয় দুই ঋতু তোমার প্রিয় নিয়মিত সেই কাল, একবার ধারাপাতের সংখ্যায় ঋতুর নাম লিখি বলি—সহসা হারিয়ে ফেলা চিঠি এবার গর্ভবতী হবে
মাছের জীবন
বৃষ্টি হলে কামিনী ফুলের ঘ্রাণ বাড়ে। ফেরার পথে রোজ একটা শিউলি ফুল-গাছের নিচ দিয়ে আসি। ফুল ফুটতে দেখি নি। ভাজা পুঁটি মাছের ঘ্রাণ পাই। মনে হয় সংসদ ভবনের সামনের সারি সারি বকুলগাছে বাসা বেঁধেছে এক দল টাকি মাছ। এতবার সাবান মাখার পরও শরীর থেকে আঁশটে গন্ধটা যাচ্ছে না। অথচ মোড়ে প্রিয় দোলনচাপা ফুল বিক্রি করছে। বিনে পয়সায় কিছুটা ঘ্রাণও শুঁকেছি। কেনার ভান করে। বাসায় ফুলদানি নেই। থাকলে মাছ চাষ করা যেত। যেন বাজার সয়লাব হয়ে গেছে পাতকুয়ায়।
বিরোধাভাস
আমাকে খেয়ে ফেলে দিলে শূন্যতার টেবিলে আমি হয়ে উঠি শূন্যতার চাবিকাঠি। টেবিলে তখন ভেসে উঠে আলো জ্বালানোর অন্ধকার—আদিমতার অন্ধ গুহায় বিপর্যস্ত বিকেলের খালি উদ্যান ভেসে যাবে এই প্রত্যাশায় আবারো লিখে দিলে সমগ্র জমিন আমাকে ভুলে যাবে প্রত্নগুহার পরিচর্যাকারী; এইভাবে প্রজাপতি শাখার মানুষের মনে আরো আরো বিস্তৃত দিগন্ত উন্মোচিত হলে আলোহীন রাত্রির কথা লিখে রাখব কেবলই শূন্যতার খাতায়!
তুলে দিলে উদ্যান-সমেত কিশোরী পাখির পালক গন্তব্যের কোনও মানে থাকে না।