পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো সিনেমা। দিনকে দিন এর প্রকাশ এতই ব্যাপ্তি পাচ্ছে যে সামগ্রিকভাবে এখন সিনেমা হয়ে উঠেছে জীবনের অংশ। কিন্তু সিনেমা যেখানে জীবনের অংশ তবুও সবখানে সিনেমার ভাষার পর্যাপ্ত বিচরণ। বড় পর্দা আর ছোট পর্দার তর্কের বাইরে সিনেমার যে আলাদা ভাষা রয়েছে তা যেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনালোকিত ও এক অধরা অধ্যায়। তাই বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসের সাথে আমাদের ভাবতে হয় সিনেমার ভাষার কথাও। সিনেমার ভাষাই আদতে ধরে রাখে শিল্পের ও স্বাতন্ত্রের রূপ। অথচ ছাই ফেলতে ভাঙা কুলার মতো কেবল গল্প বলাই যেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে, সেখানে সিনেমার ভাষা তো আরও দূরের এক গল্প।
রাশিয়ায় যখন সিনেমার শুরু হয় তখনকার একটা গল্প আছে প্রচলিত। সিনেমা দেখানোর আগে রাশিয়ার সেরা মঞ্চ-অভিনেতাকে ডাকলেন চলচ্চিত্রের জন্য ছবি তুলতে। তিনি আসলে তাকে বলা হলো আপনি কোনো অনুভূতিহীন একটা অভিব্যক্তি দিন। এমন তিনটা ছবির সাথে পৃথক তিন ধরনের ছবি যোগ করা হলো। প্রথমটায় খাবারের ছবি। দ্বিতীয়টায় একটা শিশুর ছবি ও তৃতীয়টায় একটা মরদেহের ছবি। তারপর দর্শকদের প্রথমটা দেখিয়ে বলা হলো কী দেখলেন? দর্শক জানালো, মনে হচ্ছে লোকটা ক্ষুধার্ত। দ্বিতীয়টা যখন দেখালো, তখন প্রশ্নের উত্তরে দর্শক জানালো, মনে হচ্ছে লোকটি খুব উৎফুল্ল। তৃতীয়টি দেখে দর্শকের মনে হয়েছিল, থিয়েটারের অভিনেতাটার খুব মন খারাপ। সিনেমা-ভাষার এই প্রাথমিক উদাহরণটা শেষ পর্যন্ত মন্তাজ হয়ে গল্প বলার ধরনে নানাভাবে আধুনিক সিনেমায় ঢুকে গেছে। মরুভূমির লং শটের পর যখন আমরা ক্লোজ শটে র্যাটেল স্নেকের শট দেখি তখন আমরা স্বাভাবিকভাবেই বুঝে যাই এই মরুভূমি কতটা ভয়ঙ্কর। এইগুলোকে মর্ডান ফিল্ম পরিভাষায় ডিটেইলসও বলে। কিন্তু সামগ্রিক অর্থে সমস্ত ডিটেলসই সিনেমার ভাষা। সেই ভাষাটা আমাদের মানে বাংলাদেশের সিনেমায় কতটুকু আছে? আদতে বলা চলে নেই। উপযুক্ত পরিমাণে তো নেইই, বরং প্রয়োজনীয় হিসেবেও নেই।
গল্প বলার জন্য স্বাভাবিক যে ভিজুয়ালাইজেশনটা প্রয়োজন হয়, আমাদের নির্মাতারা সেইটুকু তৈরিতেই যেন গলদঘর্ম হয়ে ওঠেন।
জহির রায়হানকে বাংলাদেশের সিনেমা-নির্মাতা ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে ধরা হয় বলে তার নির্মিত সিনেমাগুলোকেও বাংলাদেশের সিনেমা হিসেবেই আমরা ধরতে পারি। জহির রায়হানের সিনেমায় আমরা এই ভাষার ব্যবহার পাই উপযুক্ত পরিমাণে। তারও আগে ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এও তা যথেষ্ট আছে। বলা যায়, সত্তর দশকের বাংলাদেশের সিনেমায় এই পরিমিত ডিটেইলসের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সত্তরের পর থেকে চলচ্চিত্রের মূল ধারায় এই ডিটেলস হারিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু বিকল্প ধারা অর্থে যা ছিল, কালে কালে যা প্রায় মূল ধারায় রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে তাতেও কি আছে বিস্তারের বিস্তার? শতকরা ৯৯ ভাগ সিনেমাতেই নাই। গল্প বলার জন্য স্বাভাবিক যে ভিজুয়ালাইজেশনটা প্রয়োজন হয়, আমাদের নির্মাতারা সেইটুকু তৈরিতেই যেন গলদঘর্ম হয়ে ওঠেন। সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশের বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির বহুল ব্যবহারে আমাদের হাতে সিনেমা-ভাষা বলে আর কিছু থাকছে না বহুলাংশেই। কেন থাকছে না, সে প্রসঙ্গ অনেক বিস্তারিত আলোচনার যোগ্য। বিস্তারিত সেই আলোচনায় না গিয়ে আমরা যেতে চাই সিনেমা-ভাষা কেন জরুরি, এ বিষয়ে।
সিনেমা-ভাষা কেন জরুরি?
মাত্র দুইটা সিনেমা নির্মাণ করলেও দুটিতেই সা’দের সিনেমার ভাষা বা গল্প বলার ধরনকে আইডেন্টিফাই করা যায়।
যে কোনো বৈশ্বিক আয়োজনে রাষ্ট্রপ্রধানরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিজের সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে তুলে ধরতে নিজেদের পোশাককেই সবার আগে বেছে নেন। এতে করে ভিন্ন রকম পোশাক চোখে পড়লেই কৌতূহলী মনে প্রশ্ন উঁকি দেয়, সেই দেশ ও তাদের সংস্কৃতি প্রসঙ্গে। আমার মনে পড়ে না, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিদেশের কোনো অনুষ্ঠানে গিয়েছেন, কিন্তু শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরেছেন। শাড়িকে ভারতীয় অঞ্চলের পোশাক ধরা হলেও এটি যে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পোশাক তা সহজেই অনুমেয় হয়। সিনেমার ক্ষেত্রেও তাই। বৈশ্বিক বাজারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সিনেমার দুনিয়ায় বাংলাদেশের সিনেমার সেই রকম কোনো আইডেন্টিটি নাই। বলা যায় প্রায় শূন্য। সাম্প্রতিক সময়ে কানের মূল প্রতিযোগিতায় ‘রেহানা মারিয়াম নূর’ যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সা’দ-এর সিনেমা নিয়ে আলাপ হলেও বরাবরই একটি বিষয় মানুষ এড়িয়ে গেছে, তা হলো মাত্র দুইটা সিনেমা নির্মাণ করলেও দুটিতেই সা’দের সিনেমার ভাষা বা গল্প বলার ধরনকে আইডেন্টিফাই করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশের নির্মাতাদের শতকরা নিরানব্বই ভাগেরই এই আইডেন্টিফাই করার মতো নির্মাণ নাই। তাই আমাদের সিনেমা যাত্রা করছে এক অনির্দিষ্ট ও উদ্ভ্রান্ত পথের দিকে।
মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর সিনেমা এক্ষেত্রে কিছুটা উদাহরণ হতে গিয়েও হয় না।
সম্প্রতি দেখা হলো ভুটানের নির্মাতা পাও চিয়ং দরজির সিনেমা ‘দ্যা মঙ্ক অ্যান্ড দ্যা গান’। মাত্র সাড়ে সাত লাখ জনবসতির একটা দেশের সিনেমা বিশ্বজয়ের কাছাকাছি পৌছাতে পারলেও ১৫ কোটি মানুষের (জনশ্রুত আছে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশ কোটি, কিন্তু সুমারিতে নাই) দেশের সিনেমা বর্হিবিশ্বে এখনও রীতিমতো অচেনা। হ্যা, সিনেমা অচেনা হলেও কোনো কোনো নির্মাতা অবশ্য চেনা। সেও সিনেমার জন্য হলেও আদতে সিনেমাই কি তার এই পরিচয় দাঁড় করিয়েছে কি না তা অন্য প্রসঙ্গ। নির্মাতাদের সিনেমাই যদি তাকে চিনিয়ে দিতে পারে, তার চেয়ে বড় আর কিছু হয় না। আমাদের নির্মাতাদের সিনেমায় সেই পরিচয়টাই দাঁড়ায় না। উদভ্রান্তের মতো ছুটতে থাকা সিনেমার জগতে যার আদতে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নাই। পাও চিয়ং দরজির প্রথম সিনেমা ‘লুনানা’ যারা দেখেছেন তারা নিশ্চয়ই তার দ্বিতীয় সিনেমা দেখার সময়ই টাইটেল ছাড়াও বুঝতে পারবেন এইটা সেই নির্মাতার সিনেমা। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেরই দুইজন নির্মাতার কথা এখানে উল্লেখ না করলেই নয়। তারা দু’জন হলেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত ও কৌশিক মুখোপাধ্যায় বা কিউ। এই নির্মাতাদের সিনেমার যে কোনো জায়গা থেকে দেখলেই বোঝা যায় যে এগুলো তাদের নির্মাণ। এই যে স্বতন্ত্র সিনেমা-ভাষা নির্মাণ তারা করেছেন, তার কিছুই আমাদের এত বছরের নির্মাণেও উঠে আসে না। এই রকম নিজেদের পরিচয়টা বা নিজের খুঁটির মাটিটা শক্ত করার জন্যই প্রয়োজন নিজস্ব ভাষা। মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর সিনেমা এক্ষেত্রে কিছুটা উদাহরণ হতে গিয়েও হয় না। তার নির্মাণ যেন তার মতোই বলে, ‘আমি আমার ভাষায়ও বলব না, আর কারো ভাষাতেও না’। অথচ বাংলাদেশে এফডিসি-কেন্দ্রিক চলচ্চিত্রের বাইরে নেতৃত্ব দেয়ার মতো অবস্থায় থেকেও এই স্বতন্ত্র রূপটা, যার দ্বারা বাংলাদেশও চিহ্নিত হতে পারত, তার দিকে মনোযোগ দিলেন না। ব্যক্তিক অর্জনের জায়গার চেয়ে এটা এখন জাতিগত অর্জনের দিক থেকে বড় একটা শূন্যতা বলা চলে। এই শূন্যতা ঢাকতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে, তাকিয়ে থাকতে হবে আগামীদিনের নির্মাতাদের দিকে—তারা নিজেদের কাজ দিয়ে দেশের সিনেমার ভাষাটা চিহ্নিত করতে পারেন কি না!