মালয়েশিয়া ভ্রমণ : সামান্য দেখা

২ পর্বের লিংক

পর্ব- ৩


আন্ডার ওয়াটারওয়ার্ল্ড


ওরিয়েন্টাল ভিলেজ দেখার পর আরও সময় হাতে ছিল। তা-ই ওদিনই আমাদের নিয়ে আসা হলো ওয়াটারওয়ার্ল্ডে। আমাদের সকলেরই চোখেমুখে ক্লান্তি। কিন্তু ওয়াটারওয়ার্ল্ড ও এ-সংশ্লিষ্ট বিপণিতে প্রবেশের পর আর কারও ক্লান্তি দেখা গেল না।

আন্ডার ওয়াটারওয়ার্ল্ড, লংকাউই

ভূমিতে ছোট পরিধিতে সমুদ্রকে দেখার আয়োজন এখন অনেক দেশেই শুরু হয়েছে। জাদুঘর আকৃতির অ্যাকুরিয়াম তৈরি করে সামুদ্রিক দুনিয়াকে উপস্থাপনের এক কৌশল। সমুদ্রের বিশাল অদেখা জগৎকে উপলব্ধির সুযোগ করে দেওয়া। এ লংকাউই-র এ আন্ডার ওয়াটারওয়ার্ল্ড এমন একটি অ্যাকুরিয়াম। যেখানে কৃত্রিমভাবে সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ, প্রবাল, কোরাল, বিভিন্ন পাখিসহ পেঙ্গুইন পাখির নমুনা। এখানে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট প্রবেশদ্বার ও টিকেট কাউন্টার রয়েছে।

যাদের কোনোদিন সমুদ্রের তলদেশ ভ্রমণের সুযোগ নেই, তারা এখানেই দেখতে পারেন কিছু নমুনা। আমারও সে সুযোগ নেই। মেরিনসেনা হলে সে সুযোগ থাকত। যা হোক এ ওয়াটারওয়ার্ল্ড এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যে কোনো ভ্রমণকারীর মনে হবে তিনি সমুদ্রের জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। চারপাশে খেলছে, দৌড়াচ্ছে মাছ আর বিভিন্ন প্রাণী।


একদিকে সতর্কতা ও মূল্যবোধ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হচ্ছে, একইসাথে পর্যটকদের জন্য তারা ঠিকই নানা সুবিধা রেখেছে।


এখানে ১৩টি শাখায় প্রায় ২০০ প্রজাতির ৫০০০ সামুদ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রদর্শন করা হয়েছে। বিভাগগুলো হলো : সাব-এন্টারকটিক জোন, ট্রপিক্যাল রেইনফরেস্ট, টেম্পারেচার জোন, ফ্রেশ ওয়াটার জোন, ম্যারিনলাইফ জোন, কোরাল জোন, রকহোপার পেঙ্গুইন, টেরারিয়াম অ্যান্ড আদার, সি-ড্রাগন, এনাকোন্ডা, আফ্রিকান পেঙ্গুইন, সাউদার্ন ফার্ন সিল, টানেল ট্যাংক। অনেক সামুদ্রিক মাছের প্রদর্শনী রয়েছে যা অন্য কোনোভাবে আমাদের দেখার সুযোগ নেই। এ ছাড়া সামুদ্রিক উদ্ভিদ দেখে খুব আনন্দ পেলাম।

ওয়াটারওয়ার্ল্ডে বিশাল রিজার্ভারের একাংশ

ওয়াটারওয়ার্ল্ড-এর কাছেই রয়েছে সুদৃশ্য পেন্তাই চেনাং সমুদ্রসৈকত। এ সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগে রয়েছে প্রচুর হোটেল, রিসোর্ট ও বার। সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণ ও সাঁতার শেষে জোন শপিংমলসহ পেন্তাই চেনাং সড়কের বিপণিগুলোতে পর্যটকরা কেনাকাটা সেরে নেয়। এছাড়াও রয়েছে হরেক রকমের স্পা, ম্যাসেজ পার্লার। রমজান মাস আর উষ্ণ মৌসুম হওয়ায় এগুলো কিছুটা নীরব। বাইরের পর্যটকদের আনাগোনা কম। আমার তো এ-ম্যাসেজ করানোর অভিজ্ঞতা নেই। আমার সঙ্গী কারও আছে কি না, আমার জানা নেই। কারণ সামাজিক মূল্যবোধের নিষেধ ও টাবু থাকার কারণে কেউ প্রকাশ করতে চায় না। আবার কখনও এগুলোতে কেউ প্রবেশ করে ঠকেছেন কি না তাও বোঝার উপায় আপাতত নেই। নিছক আগ্রহ নিয়ে উঁকি দিয়েছিলাম একটি পার্লারে। ম্যাসেজ কর্মীরা চায়নিজ না কি থাই তাও চিনতে পারি না। তারা তাদের উচ্চারণে আহ্বান জানায়। ‘হ্যালো! কাম অন, ভেরি সু্ইট, সুইটেবল অ্যান্ড রিল্যাক্স! হ্যাভ ইওর অ্যানি চয়েস?’ যেসকল সুন্দরী তরুণী এসব পার্লারে রয়েছে, তারা খুব খোলামেলাই আহ্বান জানায়। আমি আনকোরা থাকায় তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণে বিরত থাকলাম।

পেনতাই চেনাং সৈকত

এ সৈকতে রয়েছে প্রচুর পাম ও নারকেল গাছ এবং পাশেই আছে রেইনফরেস্ট। সূর্যস্নানের জন্য এ সৈকতের খ্যাতি রয়েছে। আমরা সময়াভাবে আর সৈকতে নামি নি। দূর থেকে শুধুই দেখা। ওয়াটারওয়ার্ল্ড দেখার পর একটি হোটেলের সামনে একা একা আমি দাঁড়িয়েছিলাম। লক্ষ করি, সুইমিং কস্টিউম পরিহিত আকর্ষণীয় দুই জোড়া যুগল সুমদ্রে সাঁতার শেষে আন্দামানের জল ও বালি গায়ে হোটেলে ফিরছে। এখানে তারা স্বাধীন, দেখে ভালো লাগল।

ওয়াটারওয়ার্ল্ডসংলগ্ন ডিউটিফ্রি জোন শপিংমল

আন্ডার ওয়াটারওয়ার্ল্ড-এর লাগোয়া বিশাল ডিউটিফ্রি শপিং মল। যার সমতুল্য শপিংমল খুব একটা রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। ঢু মারি একবার এ-শপিংমলে। এত বিশাল এলাকা, চলতে চলতে শেষ হয় না দেখা। এত জিনিসপত্তর, দ্রব্যাদি। আমার মতো মানুষের অবাক হওয়ারই কথা। কোনটা নেই এখানে। রান্না, ঘরগেরস্তির দ্রব্যসহ সবই আছে। বিনিয়োগ আর রিটার্ন, এভাবেই তৈরি করা হয়েছে এটি। প্রসাধন, প্রাত্যহিক জিনিসপত্র, লিকারসহ বিশাল আয়োজন। জীবযাপনে যা-কিছু প্রয়োজন সবই আছে। অন্য দ্রব্যাদির সাথে দেশি-বিদেশি, নানা ব্র্যান্ডের লিকারের সমাহার দেখে থমকে গেলাম। কিভাবে সম্ভব এখানে। ভাবলাম কিভাবে তারা চমৎকার নিয়ন্ত্রণ করছে বিভিন্ন বিষয়। আমার জানার বিষয়— আনুপাতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে। একদিকে সতর্কতা ও মূল্যবোধ নিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালিত হচ্ছে, একইসাথে পর্যটকদের জন্য তারা ঠিকই নানা সুবিধা রেখেছে। পর্যটন শিল্পে এ-উদারতা রাষ্ট্রীয় পলিসিরই অংশ। খবর নিয়ে জানলাম স্থানীয়দের এসব বিষয়ে আগ্রহ খুব একটা নেই। মালয়েশিয়ানরা নেশাদ্রব্য নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি করে না। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে।

রমজান হলেও রকমারি লিকার বিক্রি বন্ধ নয়। তবে বিক্রির নীতিমালা নিয়ে প্রাদেশিক কেদা ও কেন্দ্রীয় সরকারের শক্ত নির্দেশনা রয়েছে। স্থানীয়রা এ মাদকদ্রব্য কিনতে পারে না। এ সুবিধা শুধু পর্যটকদের জন্য। কেউ বাইরে থেকে এলে তা কিনতে পারে। পর্যটন শিল্পকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে মালয়েশিয়া কিছু কিছু বিষয়ে উদারতার পরিচয় দিয়ে থাকে। এক্ষেত্রে উদার বলেই প্রচুর বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণ করতে আসে।

জোন শপিংমলে ভেতরের একাংশ

যা দেখে মনে পড়ে গেল কবি ওমর খৈয়ামের কবিতার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি। তিনি যেভাবে শ্রেণি ও নিয়ন্ত্রিত মানুষের কথা বলেছেন। এ ছাড়া কবিতার বইয়ের সাথে সাকি-সুরার সমন্বিত এক জীবন তিনি কামনা করেছিলেন। কবি কাজী নজরুল ইসলামকৃত অনুবাদ :

‘এক সোরাহি সুরা দিও, একটু রুটির ছিলকে আর, প্রিয় সাকি, তাহার সাথে একখানি বই কবিতার, জীর্ণ আমার জীবন জুড়ে রইবো প্রিয়া আমার সাথ, এই যদি পাই চাইবো নাকো তখত আমি শাহানশার।’

[রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম

মূলত, সকল সুবিধাকে তারা উন্নয়নের কাজে লাগাচ্ছে। নানারকম গল্প শুনেছি মালয়েশিয়ার সমাজ নিয়ে। শোনা গল্পের সাথে অনেককিছুই মিলে না, আবার কিছু মিলে। লক্ষ করি, শপিংমলের প্রতিটি কাউন্টারে বিক্রেতা হিসেবে রয়েছে তন্বী-তরুণীরা। তাদের আচরণ ও অভ্যর্থনা খুবই পরিমিত। যা আমাদের দেশেও ইদানীং লক্ষণীয়। মেয়েরাই পরিচালনা করছে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস ও সুন্দর সুন্দর দোকানগুলো। এখানে ঢুকলে অবশ্যই কিছু কিনতে মন চাইবে, যেহেতু রকমারি ও বাহারি আয়োজন রয়েছে। ডিউটিফ্রি হওয়ার ফলে এখানে কিছু কম দামে বিভিন্ন দ্রব্যাদি ক্রয় করা যায়।


ইফতার শেষে রাতের লংকাউই শহর দেখার জন্য বের হলাম পথে। পরিচ্ছন্ন, নীরব শহর। কোনো গোলমাল নেই, ভিড় নেই। অযথা কেউ টু-শব্দটিও করে না।


কিছু কেনাকাটা করতেই হলো নিজের আনন্দের সামগ্রীসহ। শপিংমলে প্রবেশের আগে দলের কারোরই ভালো লাগছিল না, ক্লান্তি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু মলের ভেতরে ঢোকার পর আর বের হতে কারও ইচ্ছে হচ্ছে না। ওদিকে সময় আমাদের নেই। ফিরে পরিচ্ছন্ন হয়ে আবার ইফতারে যেতে হবে সবাইকে। একটু তাড়া দিয়েই রওয়ানা দিলাম হোটেলের দিকে। সামান্য কেনাকাটা, পথিমধ্যে কিছু বিরতি, ক্লান্তি নিয়ে চেক-ইনের জন্য ফিরলাম হোটেলে।

হোটেল আদিয়া

বিরতি ও স্নান সেরে সকলের সাথে গেলাম ইফতার করতে। আমাদের আবাসন হোটেল আদিয়া ইন্টারন্যাশনাল-এর লবি সংলগ্ন রেস্টুরেন্টে বুফে ইফতার ও ডিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ইফতারের শেষদিকে হাজির হলেও চমৎকার আয়োজন দেখে আমি অবাক। বিশাল ইফতারের আয়োজন। ফল, শরবত, স্থানীয় চায়নিজ, এশিয়ান বিচিত্র খাদ্য আর উপাদান দেখে আমার অনভ্যস্ত বাঙালি চোখ একেবারে এলোমেলো। কোনটা ছেড়ে কোনটা গ্রহণ করব। এ চিন্তায় অবশেষে শুধু ফলের রস আর কয়েক টুকরো ফলেই আমার ইফতার ও ডিনার শেষ। ঘুরে ঘুরে দেখেই তৃপ্ত হলাম। বুফে হওয়ার ফলে সকলে ইচ্ছেমতো খেয়েছেন। প্লেটে জায়গা নেই, কেউ কেউ পরে আর পাবেন কি না এই ভেবে অতিরিক্ত খাদ্য নিয়েছেন। ফলে, প্লেটের মধ্যে কোথাও পিরামিড বা কোথাও ক্রিসমাসট্রি মনে হচ্ছিল। নিজে খাদ্য গ্রহণের এ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত না হলেও দলের সদস্য থাকায় বিষয়টি খুব আনন্দদায়ক ছিল। অবশেষে, মালয়েশিয়ান কতগুলো রেসিপির সাথে পরিচয় না থাকায় অনেক খাবারই নষ্ট হয়েছে। যা দৃষ্টিকটু মনে হয়েছে আমার কাছে। তারা সকলেই কয়েকটি উপাদান কয়েকবার গ্রহণ করেছেন এবং বারবার নিতে চেয়েছেন। একসময় দেখি কয়েকটির আর অবশেষ নেই। নিশ্চয়ই ভ্রমণে তারা যত-না ক্লান্ত, খাবারে আরও বেশি ক্লান্ত হয়েছেন। খাবার গ্রহণের এ-খেলা ছিল খুব উপভোগ্য।

আদিয়া রেস্টুরেন্টে বুফে খাবার

আমরা ছাড়াও স্থানীয় কিছু পরিবার ও দলের ইফতার পার্টি ছিল। মূল রেস্টুরেন্ট, লবির বাইরে ঘাসের চত্বর পর্যন্ত ছিল ইফতার পার্টির বসার ব্যবস্থা। তবে সুশৃঙ্খল ও নীরবতা আমার কাছে ছিল বিস্ময়ের। কারণ, আমাদের দেশে যে কোনো স্থানে এত বড় আয়োজনে কেউ নীরব থাকে না। আবার ইফতার শেষে নীরবেই চলে গেল সবাই। সত্যিই তাদের প্রশংসা করতে হয়।

ইফতার শেষে রাতের লংকাউই শহর দেখার জন্য বের হলাম পথে। পরিচ্ছন্ন, নীরব শহর। কোনো গোলমাল নেই, ভিড় নেই। অযথা কেউ টু-শব্দটিও করে না। আমরা তো হট্টগোল, চিৎকারের স্থান থেকে যাওয়া লোক। এত নীরবতা আমাদের জন্য মানায় না। ভ্রমণের মৌসুম না হলেও এত পর্যটক এখানে, কিন্তু কোনো শব্দ নেই। আমরা ছাড়া এত কথাও কেউ বলছে বলে মনে হলো না। এ যেন ব্যক্তি হিসেবে আমার কাম্য নীরবতা। এরকম নির্জনতা যদি আমার জন্মমাটিতে পেতাম। রাস্তায় গাড়ি ছুটছে, মানুষ হাঁটছে, সদাইপাতি করছে, সবই চলছে; তবে কোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ নেই। গাড়ির হর্ন ভুলেও শুনেছি বলে মনে হয় না। গাড়ি ব্রেক করে, তবে তারা হর্ন বাজায় না। পরে জেনেছি হর্ন বাজানোকে তারা অভদ্রতা মনে করে। কেউ যদি সিগনাল না মানে, বা না বুঝে রাস্তা পার হয় বা গাড়ি থামায়, তখন পেছনের বা পাশের ড্রাইভার ক্ষোভ প্রকাশে হর্ন বাজায়। লক্ষ করি, কেউ সজোরে শব্দ উচ্চারণও করে না। কথা বলে এমন স্বরে যাতে অপর বক্তা বা শ্রোতা বুঝে নিতে সক্ষম হন।

পথ চলতে চলতে শুধুই ভেবেছি এমন ভালো বৈশিষ্ট্যগুলো সাথে নিয়ে যেতে পারি আমি, আমরা। অবশেষে নেব না, এটাই ঠিক। জেনে-বুঝে গেলেও দেশে ফিরে সেই চিৎকার, চেঁচামেচি, উচ্চস্বরে বলায় আবার স্থিত হব। সুনসান নীরতায় ঘুরছি। সুন্দর সুন্দর গাছ শোভা পাচ্ছে পথের ডিভাইডারে, ফুটপাতের কিনারে। সবকিছুর মধ্যে একটি পরিকল্পনা আছে। দেখছি আর বিস্ময়ে অবাক হচ্ছি, এশিয়ার মধ্যে একটি দেশে গোছানো, সাজানো পরিবেশ। আমাদের দেশের প্রকৃতি, সামুদ্রিক এলাকা কত সুন্দর; তা আমরা পারি না কেন? এই কেন প্রশ্নের উত্তর খুুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গেলাম হনুমান মন্দিরে।

হনুমান মন্দির, লংকাউই

বিশাল এ-হনুমান মন্দিরের মূল ফটকে মালয়ালম আর ইংরেজি ভাষায় লেখা আছে মন্দির পরিচিতি। ততক্ষণে মন্দিরটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে, আমরা আর ভেতরে প্রবেশ করতে পারলাম না। বিকাল ৫টা পর্যন্ত মন্দিরটি খোলা থাকে আবার খুব ভোর হলে সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়। মূল রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে ওঠে আবার মন্দিরের একটি প্রবেশপথ, ওই পর্যন্ত পৌঁছে কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম ইলেকট্রিক বাতির আলোতে। কারণ আর এখানে আসার সময় নাও পেতে পারি। এটি হলো ভারত ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রাচীন যোগাযোগের এক নিদর্শন। আরও রয়েছে, আমরা সেসব পরে দেখব।


নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছি আর আনন্দ করছি একাই। আমার ভালো লাগছে এ কারণে যে, চমৎকার এক পরিবেশে একদিনের জন্য হলেও এ আমার পৃথিবী।


ফিরছি আর রাতের নীরবতাকে উপভোগ করছি। লংকাউই দ্বীপে প্রথম রাত, সতিই অন্যরকম ভালো লাগা। প্রচুর গরম তাও হোটেলের ব্যালকনিতে বসে রাতের দৃশ্য দেখছিলাম। অনতিদূরে দেখা যায় সাগরের বিশাল জলরাশির একাংশ, যে জলধারা প্রবেশ করেছে এ দ্বীপের অভ্যন্তরে। জলের ওপর ভাসমান নৌযানগুলো এখন স্থির হয়ে আছে। ছড়ানো কিছু আলো ঠিকরে পড়ছে জলে। সে এক অনন্য দৃশ্য। দেখা যাচ্ছে ঈগল স্কয়ারে বসে আছে ঈগল পাখি উড়ালের প্রস্তুতি নিয়ে। ব্যালকনি থেকে দেখছি গাড়িগুলো রাস্তায় ছুটছে নিঃশব্দে। কাছেই পাহাড়। পাহাড় হলেও শহরের কাছাকাছি থাকায় বনভূমিতেও রয়েছে আলোর ব্যবস্থা। ফলে, মেঘ জমানো বন-জঙ্গল হোটেলের ব্যালকনি থেকে অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছে। সাদা সাদা ধোঁয়ার মতো মেঘ উড়ে উড়ে যাচ্ছে, আবার যেন বিশ্রাম নিচ্ছে। এ দৃশ্য যারা দেখেন নি তারা নিশ্চয়ই একটা কিছু মিস করবেন। অবশ্য কেউ কেউ এসব পাগলামি খেয়ালও করবে না। বোঝাই যাচ্ছে নাগরিক প্রয়োজনে এখানে কেউ বৃক্ষরাজি নিধন করে নি।

আমার সঙ্গীরা এখন হয়তো ক্লান্তিতে নীরব, ঘুমিয়ে গেছেন। বলা যায় একমাত্র আমি একাই নীরবতায় জেগে আছি। নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছি আর আনন্দ করছি একাই। আমার ভালো লাগছে এ কারণে যে, চমৎকার এক পরিবেশে একদিনের জন্য হলেও এ আমার পৃথিবী। হোটেল কক্ষের ব্যালকনিতে বসে বাইরের আলো, আকাশে ভাসমান নক্ষত্র, দূরে সমুদ্রজল, বিপরীতে পাহাড়ে বৃক্ষবাগান দেখে শুধুই কবি জীবনানন্দ দাশ-এর কথা মনে হলো। তিনি যেভাবে বলেন কবিতায় :

‘মালাবার পাহাড়ের কোল ছেড়ে অতি দূর তরঙ্গের জানালায় নামি নাচিতেছে টারান্টোলা—রহস্যের; আমি এই সমুদ্রের পারে চুপে থামি চেয়ে দেখি বরফের মতো সাদা ডানা দু’টি আকাশের গায় ধবল ফেনার মতো নেচে উঠে পৃথিবীরে আনন্দ জানায়।’

[সিন্ধুসারস

রাত যত গভীর হচ্ছে লংকাউই-র প্রকৃতির রূপ অন্যভাবে অনুভূত হলো। আমার মনে হলো, রমজান মাস না হলে হয়তো ভিন্নভাবে দেখতে পেতাম। রমজান থাকায় মানুষের সীমিত চলাচল লক্ষ করা গেছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা ঘোরের মধ্যে কিছুক্ষণ ছিলাম। এমন পরিবেশে ঘোর না-লাগাই অস্বাভাবিক। ভাবছি নিজের বাসভূমিতে এমন নির্জন কোনো এলাকা বানানো যায় কি না। যেখানে কর্মব্যস্ততার ফাঁকে মাঝে মাঝে নিজের মতো থাকা যাবে। ভাবতে ভাবতে একসময় প্রচুর ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।


৪ পর্বের লিংক

স্বপন নাথ

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ,...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা