ভূগোলটি মানবিক হোক

সভ্যতার প্রতি কণায় অনেক লেখা হলো, কথা হলো, চিৎকার হলো এ-ভূগোলে। কত কথা, লাখ লাখ বই, পাণ্ডুলিপি। কেউ না কেউ পড়ছে, হারিয়ে ফেলছে পাঠের স্মৃতি। আবার পড়ছে। কেউ না পড়লেও কোনো লেখক নিজেই নিজের লেখা পড়ছেন। কোনো কোনো লেখা বার বার পড়া হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনা নিয়ে লেখা হচ্ছে প্রচুর। যাদের প্রয়োজন তারা বই এবং বাস্তব জীবনকেও পাঠ করছে। জীবনের বাস্তবতা হলো আসল গ্রন্থ। জীবনের এমন কিছু ঘটনা আছে, যা ভাষায় বর্ণনা দিয়ে বোঝানো যায় না। জীবনের বিষয়গুলোই নতুন নতুন ভাবনায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। থেমে নেই লেখা, পড়া, গবেষণা, অনুসন্ধান করে দেখা। না পড়লেও সমস্যা নেই। তবে কোনোটাই অমূলক নয়। অকার্যকর নয়। এত লেখালেখি হলো,—তবে হলোটা কী! মনে হয় এসব লেখালেখি আর সুন্দরের সপক্ষে কিছু মানুষ আছে বলেই সভ্যতার বিনির্মাণ হচ্ছে। ভালো-মন্দ ভেদজ্ঞান বজায় আছে।

একটি প্রশ্ন ভাবনার ভেতর ঘুরপাক খায় যে, কত মহামানব, নবি, পয়গম্বর, সাধু, সন্ত, ঋষি, গুরু, সাধক, মানবতাকর্মী, নেতা, সমাজহিতৈষী চিন্তক, ভাবুক এ পৃথিবীতে এলেন। তাঁদের বাণী, পথনির্দেশ মেনে চলতে চেষ্টা করছি আমরা। ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, সাহিত্য, সঙ্গীত, সংস্কৃতি, বাণী, কথা চর্চা করে চলছি। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি বাঁকবদলে নতুন নতুন কথা নিয়ে এসেছে। তবু থামছে না যুদ্ধ, হিংসা, হত্যা, পীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনা। তাহলে গরমিল কোথায়? যুদ্ধ, হিংসা, হানাহানি, বিরোধিতা কমছে না কেন?

জলা-জঙ্গলা পরিষ্কার, হিংস্র পশু তাড়িয়ে চাষাবাদ, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণ—সবই মানুষ করেছে। একদিকে ঈশ্বর, ধর্মচর্চা, মানবতার বাণী প্রচার, মনুষ্যত্ব, আলোকিত জীবনের প্রচার; অন্যদিকে মারামারি, হানাহানি, যুদ্ধ, দখল, হিংসাবৃত্তির জয়জয়কার। এরূপ বাস্তবতার নিয়তিকে মানুষ এড়িয়ে যেতে পারছে না। এ বহুবিধ বিষয় ও দ্বন্দ্বের মধ্যে মানুষ কত অসহায়! মানবতার পক্ষে সাধারণত দুর্বল, ক্ষমতায় পিছিয়ে থাকা মানুষেরা যুগযুগ ধরে হিংসার কাছে পরাজিত হচ্ছে। এ থেকে উদ্ধারের উপায় কী হতে পারে? এ নিয়ে ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে অন্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহে এবং আলোকিত মানুষের বাণী ও কথায় মানুষের ইতিবাচক ইতিহাস, নির্মাণ এবং আগামীতে মুক্তি ও নির্বাণের কথা বলা হয়েছে। তবুও বেশিরভাগ মানুষ কিছুই মানছে না। বাস্তবতা হলো—তারা ঈশ্বর-নির্দেশিত ও মহাপুরুষদের অনুসৃত পথে চলছে না। মানবজাতি ক্ষুদ্র স্বার্থ, ক্ষুদ্র ইচ্ছা, লাভ-লোভ, নিছক খেয়ালি, জাগতিক স্বার্থে, প্রয়োজনে এড়িয়ে যাচ্ছে সব। অবহেলা, অনিচ্ছায় অথবা জাগতিক শক্তিতে পিষ্ট করে চলছে নিজের ভালো ও কল্যাণ। ক্ষমতা থেকে দূরে থাকা, সাধারণত দুর্বল, মানুষেরা পর্যুদস্ত হচ্ছে যেখানে সেখানে। তাদের রক্ষার কেউ নেই। তাদের জন্য ক্ষমতাবানরা সামান্যতমও ছাড় দিতে অনিচ্ছুক। যুদ্ধ চলমান যেসব স্থানে সেসব এলাকায় শিশু, বৃদ্ধ, নারীরা কষ্টে আছে। ওখানে মানবাধিকার কাজ করে না। নির্যাতিত মানুষের হাহাকার কয়েকটি বৈঠক, সভা, সম্মেলন, সিদ্ধান্তগ্রহণেই আঁধারে মিলিয়ে যাচ্ছে সব। আবেদন নিবেদন, কষ্টের কথাগুলো শুধু হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে নিরর্থক। এর মধ্যে আমরা যারা অপেক্ষাকৃত পেছনে পড়ে আছি, ক্ষমতার কানাকড়ির সাথে সম্পর্কহীন, নিছক সুযোগ-সুবিধার অভাবে সততার কথা বলি; তারাই বলে যাচ্ছি—আমাদের বাঁচাও, শুধু রক্ষা করো! নিম্নস্বরের উচ্চারণগুলো শূন্যে বাধা পেয়ে আবার আমাদের কাছেই ফিরে আসে। এ গোত্রের লোকজন শুধুই পীড়িত হচ্ছে যুগযুগ ধরে। অন্যদিকে আমরা সৎ আছি সুযোগ ও সুবিধার নাগাল পাই নি বলে। 

এই আমাদের নিয়তি-নির্ধারিত জীবন। তাহলে মানব-অস্তিত্বের কী হবে? অনেকটা বাধ্য হয়ে, নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় মানবিক কথা ও বাণী শুনি ও বলি। সংস্কৃতিচর্চা ও নির্মাণের কথা বলি। আমাদের আর তো কোনো সম্বল নেই। একান্ত প্রয়োজনে আমরা একটি শ্রেণিতে আবদ্ধ রয়েছি। মানবিক হতে নয় কিংবা মানবিক নই, আমরা জাগতিক প্রয়োজন, অনিবার্য নিয়তির প্রভাবে মানবতার কথা প্রচার করছি। মানবিক হতে চেষ্টা করছি। নিজের ভাবনা ও ভূগোলের সীমানায় আহত পাখির মতো ছটফট করতে থাকি। আমাদের আসলে কিছুই করার থাকে না। কেবলই এ সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবারের ভূমিকায়, চারপাশের বিড়ম্বনায় কত অসহায় হয়ে যাই আমরা। এ প্রকৃতির দেয়ালের ভেতর মানুষ কত অসহায়! এ পরিস্থিতিতে ঈশ্বরভজনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পাঠ, চর্চায় নির্ভরতা খুঁজি। সান্ত্বনা খুঁজে বেড়াই। অনিবার্য পরাজয়, অপ্রত্যাশিত বিপদের সম্মুখে বিশ্বাস, চর্চা, সামাজিক শৃঙ্খলাকে খড়কুটোর মতো ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি। প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই, সংগ্রাম, বিপদ-আপদ থেকে নিজেকে আগলে রাখি জীবনের প্রত্যাশায়, ভয়ানক প্রতিযোগিতায়। বিপরীতে নির্যাতন, হানাহানি, পীড়ন, শোষণে এ জীবন কত হতাশার, কত কষ্টের। কত মানুষ কতভাবে আপাত সমাধান দিতে চেষ্টা করে। এগুলো আসলে কথার কথা মাত্র। বোঝাপড়া করতে হচ্ছে নিজের সাথে নিজের। জীবনের কোনো উচ্ছ্বাসই থাকে না প্রতিদিন লড়াই আর বাঁচার তাগিদে।


দ্বিজাতিতত্ত্ব, ক্ষমতার ভাগাভাগি, রাজনীতির খেলায় সংঘটিত দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছে এ ভূখণ্ড।


২ 
এ পর্যায়ে ব্যক্তিগত কৈফিয়তে বলতে চাই—অনেকের এ-ক্ষুদ্র জীবনের তেমন অভিজ্ঞতা নেই। জানাবোঝাও কম। তবে, আমাদের চারপাশ ও নিজের ওপর পীড়ন থেকে বুঝে নেই যে, জীবন কিভাবে বহমান থাকে। এ বিষয়কে তো বিকাশ বলা যায় না। যেহেতু আশেপাশের পরিবেশ থেকে অর্জনের অংশ অল্পই, সেহেতু আমাদের সবসময়ই দ্বারস্থ হতে হয় অন্যের বলা, লেখা ও অভিজ্ঞতার কাছে। মানুষ ও প্রকৃতির মতো মহান পাঠশালা কোথায়ও পাই না। মানুষই তো মানুষের কথা বলে। মানুষ মানুষের বিপক্ষে গেলেও ওই মানুষই থাকছে মানুষের জন্য। সেভাবেই মানুষেরই বিবৃত কিছু টুকরো বর্ণনা থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যা বুঝি, এসব থেকে আমার নিজের জানাবোঝা দিয়ে নিজের ভাষ্য তৈরি করি। সেখান থেকেই শিখে নেই জীবনের ভিন্ন পাঠ, ভিন্ন চিত্র। কতজনার লিখিত পাঠের কাছে কিছু প্রশ্ন তৈরি হতে থাকে। সে-ই লেখক কিভাবে জীবনের এরকম পাঠ সৃষ্টি করেছেন? নিজেও ভেবে পাই না, কেন এত প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে! শুধুই কি তাহলে প্রশ্ন? এগুলোর উত্তর খুঁজে বেড়াই। আবার কখনও অনেক বিবরণ পাঠে কোনো প্রশ্ন তৈরি হয় না। বুঝে নেই—সব লেখা লেখা নয়, অক্ষরে সাজানো ফ্যান্টাসি প্রলাপ মাত্র। 

লিখিত বিবরণে কষ্টের কথাগুলোর উত্তর খুঁজে বেড়াই। এসব যন্ত্রণা, কষ্টের পেছনে নিহিত আছে মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস, হিংসা, হানাহানি আর সমূহ নেতিবাচক প্রবৃত্তি। এ সভ্যতার আলোতে এত যন্ত্রণার বিবরণ তৈরি হবে কেন? তা হওয়ার তো কথা নয়। আজও মেলে নি সেসব প্রশ্নের উত্তর। মানুষ এত কঠিন, হিংসুটে হতে পারে, কেন অত্যাচারী হয় অন্যজনের ওপর? বলা বাহুল্য যে, পৃথিবীজুড়ে হিংসাভিত্তিক ক্ষমতার জয়জয়কার। এসব কমানোর চেষ্টা, আন্দোলন চলমান, তবে কমে নি, কমছে না। হিংসা প্রকাশের সাথে শিল্প, সুন্দর, সঙ্গীতের চর্চা চলমান। রক্ষাকবচ হিসেবে সবসময়ই সভ্যতার কথা প্রচার করা হয়, সভ্যতাকে সামনে নিয়ে আসা হয়। শিক্ষা-সভ্যতার কথা বলে তা হলে কী করা হচ্ছে! এখানে আমার প্রশ্ন জেগে ওঠে, সন্দেহ জেগে ওঠে। সভ্যতার কথা যেভাবে বলা হয়, সেখানে যুদ্ধ, হানাহানির প্রসঙ্গে বলার অবকাশ থাকে না। বুঝে নেই, এ সভ্যতার প্রলেপেও গোলমাল রয়েছে। স্থান-কাল-ব্যক্তি-গোষ্ঠী-রাষ্ট্র-সমাজভিত্তিক বিচিত্র রঙ বিদ্যমান। সহজ কথায়—এ সভ্যতা দেশে দেশে সাধারণ মানুষকে রক্ষা, নিরাপত্তা দিতে পারে নি। নিয়তি হলো যে, নির্যাতিত মানুষের শ্রমে-ঘামে নির্মিত এ সভ্যতার কার্নিশ, কোলে ওই বঞ্চিত মানুষের স্থান হয় নি। যেখানে সভ্যতার পলে পলেই হিংসাত্মক পরিণাম দেখছি। তা হলে এ মানুষ প্রজাতির ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এর উত্তর অনেক হতে পারে। ভিন্ন ভিন্ন কায়দায় ভিন্নজন দিয়ে থাকেন। উত্তর শুনে তৃপ্তি, স্বস্তি, শান্তি খুঁজে পাই না। তা হলে কি ফ্রান্সিস ফুকুওমার বয়ান সত্য বিবেচিত হবে? তিনি এ সভ্যতা ও বর্বতার উৎস ও বিনাশকে একই সমতলে বিবেচনা করেন। 

ফিরে তাকাই পাঠক হিসেবে আমার পরিধির দিকে। আশ্রয়ী হই লিখিত পাঠের কাছে। ওই পরিধির কাছে খুঁজে পাই মানুষের ভালোবাসা-হিংসা, আলো-আঁধার, ভালো-মন্দ, কষ্ট-সুখ—এসব দ্বিধারিক এলাকা। এসব উদাহরণ থেকে ফিল্টার করে তুলে আনি আমার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে খুশবন্ত সিংহ-এর ট্রেন টু পাকিস্তান উপন্যাসের কথা। হয়তো অনেকেই পড়েছেন। এতে চিরহিংসার পরিণাম ও এর ভিত্তিতে মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের দেশভাগ নিয়ে ইদানীং কিছু খোঁজ খবর নিতে শুরু করি। খুশবন্ত সিংহের এ উপন্যাস পড়েছিলাম প্রথমে না বুঝে। দ্বিজাতিতত্ত্ব, ক্ষমতার ভাগাভাগি, রাজনীতির খেলায় সংঘটিত দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছে এ ভূখণ্ড। হিংসার বলি হলো সাধারণ মানুষ। সাধারণ নাগরিকরা এত কিছু টের পায় নি। তারা জান তো দেশ স্বাধীন হচ্ছে, তাদের মুক্তি আসবে। হঠাৎ করেই যেন অনাহূত পরস্পর আক্রমণ। এ কারণে চিরায়ত শান্তির একটি গ্রাম মনোমাজরা আক্রান্ত হয়েছিল দাঙ্গায়। যে বিষাক্ত দাঙ্গাটি সংঘটিত হয়েছে ভারত-পাকিস্তান ভাগকে কেন্দ্র করে। হিন্দু-মুসলমান-শিখসহ বিভিন্ন জনমানুষের রক্ত ভেসে গেছে এ উপমহাদেশের মাটি-জল নদীর স্রোতে। এ দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল শুধু পাঞ্জাব নয়, ভারত পাকিস্তানের সর্বত্র। সাধারণ মানুষ বোঝে নি কেন এত রক্তগঙ্গা! প্রশ্ন হলো—‘নিরন্ন মানুষের হাহাকার শুনেও ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’ সাধারণ মানুষের ধরন তো তাই আবার স্থিত হতে চায়। সেসময় হিংসার আগুনে বাড়ি-ঘর পুড়েছে। নারীরা লাঞ্ছিত হয়েছে। উপমহাদেশে কোনো মানুষ চেতনার অস্তিত্ব নিয়ে সেদিন বাঁচে নি। না হলে রক্তপাত হত কি না! দুর্বলরা সবই নীরব। কী এক রাজনীতি, স্বরাজের ফাঁকে বিকশিত ও বাস্তবায়িত হলো—হিংসা, বিভাজন। আজও এ নিয়ে কথা হয়, বিতর্ক হয়। একে অন্যকে দোষারোপ করে। এ উপমহাদেশে ১৯৪৭ সালে ও পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণের নির্মমতায় না-বলা নৃশংসতায় নিহত, ধর্ষিত ও দেশছাড়া হয়েছেন, কেউ কেউ চিরজীবনের জন্য অসুস্থ হয়েছেন। এ বিপরীতে কী বলা যায়, জানা নেই। বস্তুত, আর্থসামাজিক বাস্তবতা, স্বাধিকার আন্দোলন, নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, রেফারেন্ডাম, রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ইত্যাদি কারণে ভাগাভাগি হতে পারে। তবে বিপ্লবী কোনো তৎপরতা ছিল না, না কোনো আন্দোলন, তবুও এত রক্তপাতের নির্মম কাজে অংশ নিয়েছে এ উপমহাদেশের মানুষ। কেন হলো এমন পরিস্থিতি? এসব প্রশ্ন এখনও জেগে থাকে অংশত আমাদের কাছে। ফলে, ইতিহাসের এ বিষয়গুলো পুনরায় পাঠ করি। খুশবন্ত সিং উপন্যাসে লিখেছেন—অসংখ্য শরণার্থী, বিপদাপন্ন মানুষ নিয়ে ট্রেন ছুটে চলেছে ভারত থেকে পাকিস্তনে আর পাকিস্তান থেকে ভারতে। এরকম যাওয়া-আসার এক পর্যায়ে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত পাঞ্জাব থেকে ট্রেন আসে, তবে যাত্রীশূন্য। মানোমাজরার অধিবাসীরা ভাবে যে, হয়তো পাকিস্তান থেকে আগত সকলকে হত্যা করা হয়েছে। ছুটে চলেছে মানুষ শুধু জীবনের তাগিদে, আশ্রয়স্থলের দিকে। এভাবে উভয় ভূখণ্ডে এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের অনুসারী লোকজনকে নির্বিচারে হত্যা করেছে। তারা একবারও ভাবে নি তারা মানুষ, এত নিরীহ মানুষকে কেনইবা হত্যা করা হচ্ছে—এ ধরনের প্রশ্নও তাদের মনে আসে নি। হুজুগ, অন্ধত্ব, হিংসায় ইতিহাসের সর্বোচ্চ নির্মমতা প্রদর্শন করছে এ উপমহাদেশের মানুষ ১৯৪৭ সালে। কী ধর্ম, কী রাষ্ট্র, কী চেতনাবোধ, নৈতিকতা কিছুই ছিল না। হত্যাই অবশেষে মূল্যবোধের নিয়ামক, নির্ণায়ক ছিল কি না? তাহলে, রক্ত, কান্না, হাহাকার; মানুষ অস্তিত্বহীন হলো কিসের বলিতে, কিসের প্রয়োজনে?   

উপন্যাসের বয়ানে লক্ষণীয়—ভারত-নিয়ন্ত্রিত পাঞ্জাবের মুসলিম, যারা নিরাপত্তাজোনে অপেক্ষা করছিল পাকিস্তানগামী ট্রেনের জন্য, এ ট্রেনকে কেন্দ্র করে প্রতিশোধ নিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিক্ষুব্ধ হিন্দুরা। তারা সিদ্ধান্ত নেয় প্রতিশোধ গ্রহণে ফিরতি ট্রেনে বিস্ফোরক দ্বারা আক্রমণ করা হবে। ওই সময় অংশত মানবিক ও অমানবিক ব্যক্তিত্বে নির্মিত জগৎ সিং গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠে। মহত্ত্ব ও হিংস্রত্ব—এ দুয়ের সংমিশ্রণে গড়া মানুষ—জগৎ। ঘটনার উপান্তে সমূহ সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এ জগৎ সিং জেগে ওঠে ভালোবাসার টানে। সময়ের প্রয়োজনে ভালোবাসার প্রতিদানে মানবিক ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাসের দায় পালন করেছে সে। জগৎ সিং প্রাণবিসর্জন না দিলে তাঁর প্রিয় নুরানসহ অনেকেই হারিয়ে যেত প্রতিহিংসার করতলে। অতঃপর জগৎ-এর মৃত্যু ও লাশের ওপর দিয়ে ট্রেন ছুটে যায় পাকিস্তানের দিকে। জগৎ সিং-এর সর্বোচ্চ ত্যাগে উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটে। সর্বোচ্চ ত্যাগের এ ঘটনাকে লেখক বর্ণনা করেছেন যেভাবে :  

He slashed away in frantic haste. The engine was only a few yards off, throwing embers high up in the sky with each blast of the whistle. Somebody fired another shot. The man’s body slid off the rope, but he clung to it with his hands and chin. He pulled himself up, caught the rope under his left armpit, and again started hacking with his right hand. The rope had been cut in shreds. Only a thin tough strand remained. He went at it with the knife, and then with his teeth. The engine was almost on him. There was a volley of hots. The man shivered and collapsed. The rope snapped in the centre as he fell. The train went over him, and went on to Pakistan. (1956/ 2007: 164-65) 

এ ত্যাগ শুধু সম্ভব হয়েছে ভালোবাসার কারণেই। জগৎ সিং-এর জীবনদানের বিষয়টির দিকে যদি একবার ফিরে তাকাই, তাহলে শুধু দাঙ্গার নির্মমতা দেখি না, দেখি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাও। তবে দেশভাগের পরিণামে কেবলই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এরূপ যন্ত্রণা, বেদনাময় ক্ষত শেষ হয় নি। পরবর্তীকালে এর প্রতিষেধক হিসেবে করণীয় সম্পর্কে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয় নি। ফলে, সৃষ্ট হিংসার বিস্তারই ঘটেছে কেবল। এবং তা জিইয়ে রাখা হয়েছে এবং সময়ে সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। বলার অবকাশ থাকে না, দাঙ্গার নানামুখি আঘাতে অসংখ্য মানুষ চলে যায় ট্রমা স্তরে। মানসিক বিপর্যয়ের নানাবিধ লক্ষণ দেখা দেয়। এখান থেকে আর ফিরে আসে নি আগের স্তরে। দাঙ্গাকালীন আতঙ্ক, আশঙ্কা এবং ভিটেমাটি, ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে উচ্ছেদ, অনিশ্চিত জীবন নিয়ে দৌড়। ভয়ে স্বভাবতই জীবন স্বাভাবিক থাকে না। কোনো যুদ্ধ-সংঘাতই নিশ্চিত জীবনের ছায়া তৈরি করে নি। যুদ্ধ, দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া উপস্থাপনে শুধু নিহত-আহত হওয়া, স্বজন হারানোর বেদনা, উদ্বাস্তু হওয়ার তথ্য পেয়ে থাকি। কিন্তু এসব কারণে উপদ্রুত জনমানুষের আর্তি, অন্তরের ক্রন্দন, চিরঅসুস্থতার বিবরণ কোনো গবেষণাতেই তেমন আসে নি। ফলত, যুদ্ধ, আতঙ্ক, বিধ্বস্ততা জীবনকে আর স্বাভাবিক রাখতে পারে নি। চিরায়ত অসুস্থতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে অনেকেই। দাঙ্গা-উত্তর সময়ে পর্যবেক্ষণ হলো : অগণিত মানুষ স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরে আসতে পারে নি। উর্বশী বুটালিয়ার সম্পাদনায় Partition: The Long Shadow[2015] ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও দাঙ্গা-উত্তর কয়েকটি কেসস্টাডি উপস্থাপিত হয়েছে। লক্ষণীয়, এসব গবেষণায় চিকিৎসা-মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে দাঙ্গাক্রান্ত কয়েকজনের জৈবনিক অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি কেসস্টাডি এখানে উল্লেখ করা হলো; যা থেকে অন্তত অনুমান করা সম্ভব যে দাঙ্গার প্রভাব কেমন ছিল :  

1. A 23 year old boy developed symptoms of paranoia, feelings of sadness, and and recurring nightmares. His entire family was killed. He somehow managed to escape and took shelter in his neighbour’s house. After many months of hiding he left town and stayed with his distant relatives. Though he is continuing his studies now, he is still haunted by memories of that time. He is not able to move on as he feels that it can happen to him anytime any where. [Butalia, p 261]


2. A 21 year old girl developed symptoms of depression, recurrent nightmares and feelings of despair. She hid in a school along with thousands of people in different classrooms. She know that she would be killed and she would also have to witness her mother’s and sister’s killing. So she went to another room where she didn’t know anyone. Everyone hiding in all the rooms including hers was brutally killed but somehow they weren’t able to find her as she was in a very narrow place. She even had to witness an infant being slaughtered. She is haunted by the memories every time she close her eyes. [ ibid, p 262]

কেউ কেউ এসব মর্মান্তিক ঘটনা শুনে ও দেখে উল্লসিত হয়েছে, এখনও হয়। উত্তর অনেকের কাছেই আছে, অন্তত যাঁরা হিংসাত্মক কর্মকে স্বীকৃতি ও সমর্থন দেন। হিংসা-প্রতিহিংসা, হত্যা এবং ভারত পাকিস্তান উভয় দেশে জায়গাজমি, প্রতিবেশী, প্রেম ও মধুর সম্পর্ক ফেলে আসা মানুষের মানসিক দ্বন্দ্ব, কষ্ট, যন্ত্রণা এবং বৈকল্য এ গ্রন্থে উপস্থাপিত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে অনেকেই অন্তরের গহিনে গোপন রেখেছেন আহাজারি। দুঃখ, কষ্ট, কান্নার বহুস্তর। আমরা যারা এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি, তারা বুঝতে পারব এ ক্ষতটি কত গভীর। শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সহ্য করা যায় না। কষ্ট চেপে রাখা কৃতিত্বের, কিন্তু তা ধারণ করে চলমান থাকা আরও অধিক যন্ত্রণার বিষয়। সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হয়। দেশভাগের পরিস্থিতিতে মানুষের মধ্যে দূরত্ব অনেক বেড়ে যায়, তৈরি হয় অবিশ্বাস, হিংসা। এর পরিণাম আমরা এখনও বহন করে চলেছি। এমন তিক্ত, কষ্টের ইতিহাস আরও অনেক জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে। 


দ্বিজাতিতত্ত্ব, ক্ষমতার ভাগাভাগি, রাজনীতির খেলায় সংঘটিত দাঙ্গায় রক্তাক্ত হয়েছে এ ভূখণ্ড।


যারা লেখক নন, তাঁরা তাঁদের কষ্টগুলো লিখিত আকারে রূপ দিতে পারেন নি। ভেতরের কথা বলে ভাগাভাগি করতে পারেন নি। তাঁরা নিজের কষ্ট, দুঃখ বুকে চেপে জীবনযাপন করে ও অনুক্ত রেখে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সুনন্দা সিকদার লিখেছেন একজন দয়াময়ীর জীবনের গল্প—দয়াময়ীর কথা (২০১২) গ্রন্থে। বইটি আকারে ছোট, কিন্তু আবেদনে রয়েছে বিশালত্ব। দয়াময়ী তাঁর বাল্যবয়সে পাড়ি জমান কলকাতায়। তবে, শৈশবের সেই গ্রাম তাঁর মাথা থেকে একবারও সরে যায় নি। এজন্য দেশ ছেড়ে যাওয়া ও মানুষের বিবিধ বিষয়-আশয় যেমন রয়েছে, তেমনি তিনি গ্রামীণ হিংসা, কুৎসারটনা, সাধারণ মানুষের মানসিক আচরণ, আনন্দ-বিনোদনের বিচিত্র দিকগুলো উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিজ গ্রাম বা আত্মীয়-পরিজন, প্রতিবেশীদের কথা বলেছেন, যাঁদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা অন্য কোনো ক্ষমতাও ছিল না। কিন্তু সেসব মানুষের কাণ্ডজ্ঞান ও লোকজ্ঞান ছিল প্রখর। এসব সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন বিভাজন ছিল, তেমন ছিল ভালোবাসাও। লোকমানুষ এ ভাগ-বিভাজনেও কেমন মানবিকবোধ বজায় রাখত, এসবই আমাদের কাছে বিস্ময়ের। তাঁর বিবরণ থেকে উপলব্ধি জন্মে এবং বিস্মিত হতে হয় যে, এসব মানুষের ছিল না অক্ষরজ্ঞান, লেখাপড়া; তারপরও তাঁরা কেমন অগ্রসর চিন্তা করতেন। দয়াময়ী শৈশব থেকেই মানবিক শিক্ষা গ্রহণ করেছেন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে—এ সূত্রে তিনি ইয়েদালি ও সোবহানের উদাহরণ দিয়েছেন। ‘আসলে আমার ধর্ম বিষয়ে যতটুকু জানা তা ইয়েদালি কাকা আর সোবহান দাদার কাছ থেকে। ইয়েদালি কাকাই আমাকে বলেছিলেন, ইসলাম মানে শান্তি। যারা মানুষের শান্তি নষ্ট করে, তারা কখনও সাচ্চা মুসলমান হতে পারে না। আর সব মানুষকে সমান না দেখলে, মেয়েদের ধন-সম্পত্তির অধিকার না দিলে সে মুসলমানই না। আর কাকা আমাকে বলেছিলেন বুদ্ধদেব বলে একজন মানুষের কথা। বুদ্ধদেব বলেছেন, সব মানুষই সমান, জাতপাত মানুষের তৈরি। আড়াই হাজার বছর আগে তিনি জন্মেছিলেন রাজার ঘরে, তখন তার নাম ছিল গৌতম। রাজার ঘরে জন্মেও মানুষের দুঃখ দেখে রাজার ঘরে তাঁর মন টেকে নি। সন্ন্যাসী হয়ে গিয়ে তিনি মানুষকে ভালবাসার মন্ত্র শেখানোর চেষ্টা করেন।... সাদি কাকার বড় ছেলে আমাকে বলেছে যিশুখ্রিস্টের কথা। দুই হাজার বছর আগে বিলাতে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তিনিও বারবার মানুষকে ভালোবাসার কথা বলে গেছেন। সোবহান দাদা বলেছে, এইসব কথা যদি মানুষ শুনত তাহলে আর হিন্দুস্থান-পাকিস্তান হত না। [সিকদার :  ৮৮-৮৯]'

দয়াময়ীদের বাড়িতে কৃষিকাজসহ যাবতীয় কাজে সহায়তা করতেন গ্রামেরই মজম ও আজম দুই ভাই। এ সূত্রে দয়াময়ীকে ছোটোবেলায় দেখাশোনা করতেন এই মজমই। পারিবারিক প্রয়োজন-সম্পর্কের বাইরে দুজনের মধ্যে ভাই-বোনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। তিনিও মজমকে একান্ত দাদা হিসেবে মানতেন এবং মজমের মাকেও দয়াময়ী আম্মা বলে সম্বোধন করতেন। এ আত্মিক সম্পর্ক ছিন্ন হলো দেশত্যাগের কারণে। বিচ্ছিন্নতার এ কান্না তিনি আজীবন বহন করেছেন। তাঁর লেখা থেকে বোঝা যায় মজম দাদার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর দয়াময়ী তাঁর অন্তরের যন্ত্রণাবিদ্ধ কথাগুলো অক্ষরে প্রকাশ করতে পেরেছেন। যে ভাই-বোনের সম্পর্কের বিবরণ তিনি দিয়েছেন, সকল স্বার্থের বাইরে এমন দৃষ্টান্ত সাধারণত পাওয়া যায় না। কী এক মায়া, অসামান্য সে টান পরস্পরের প্রতি। কেবলই দাঙ্গা এমন চমৎকার একটি হৃদয়জ সম্বন্ধকে গ্রাস করে ফেলল, ভাবতে গেলে অবাকই হতে হয়। দয়াময়ীর বর্ণনা থেকে উদ্ধৃত করা যাক : ‘‘অপ্রত্যাশিতভাবে বাংলাদেশ থেকে আমার দাদার এক চিঠি এল। দাদা নিরক্ষর, চিঠি তাই অন্যকে দিয়ে লেখানো। দাদা লিখেছেন, ‘আমরা বাঁচিয়া আছি। পথের খরচ জুটাইতে পারিলে একবার তোমার মুখখানি দেখিয়া আসিব।’ পথের খরচ জোটাতে চার বছর লাগল। ইতিমধ্যে আমার বিয়ে হয়ে গেছে। আমি বাড়ি আসছি বিয়ের পর প্রথম। পথেই খবর পেলাম, ‘তোকে যে মানুষ করেছিল, তোদের মুসলমান চাকর, সে তোদের বাড়ি এসেছে। বলছে তোকে দেখতে এসেছে।... আমার ভিখিরি অন্নহীন দাদা গোরু বেচে আমাকে একবার দেখতে এসেছে। তার মধ্যে আমার আত্মীদের কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়েছিলেন। বিয়েতে যে সামান্য টাকা উপহার পেয়েছিলাম, হয়তো সব মিলিয়ে চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা হবে, সেই টাকা দিয়ে দাদাকে একটা লুঙ্গি কিনে দিয়েছিলাম। আর বাকি টাকাটা দাদার হাতে দিতে পেরেছিলাম। ফেরার খরচ নিশ্চয়ই হয়নি। হয়তো এই কলকাতা যাতায়াতের জন্যে বাড়ি ফিরে আমার ভূমিহীন চাষি দাদাকে আরেকখানা হালের গোরু বিক্রি করতে হয়েছিল।... পশ্চিম বাংলার এই শহরে আমি অনেকদিন আছি। এখানে আমার অজস্র বন্ধুবান্ধব। এই শহরের জীবনযাপনের সবগুলো অভ্যেস আমার মধ্যে ঢুকে গেছে। তবু সমস্ত কিছুর মধ্যেই দাদার এক অনিবার্য উত্তরাধিকার আমি বহন করে চলেছি।... আর বইপড়ার অভ্যাস সেও এই দাদার জন্যে। নিরক্ষর হলে কী হয়, কেতাব শোনার জন্য দাদা ভুখেপেটে বহু দূর হেঁটে যেত ইয়েদালি কাকার বাড়ি, তা সে কোরআন, হাদিস, সিরি-ফরহাদই হোক কিংবা লায়লা-মজনুই হোক। আর আমার দাদার বাউণ্ডুলেপনা পেয়েছি আমি। আমার কিছুই থাকে না, সবই হারিয়ে যায়। আর মজম শেখ এক চাষি, যার কি না একছিটে জমি নেই, হালের গোরু আর জোয়াল সম্বল, সে কত বড় বাউণ্ডুলে হলে গোরু বেচে হিন্দুস্তানে আসে শুধু স্নেহের টানে!... সে ছিল খুব নিষ্ঠাবান মুসলমান। আমি এখন মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান হতে পারিনি, সম্ভবত হতে চাইওনি। আমার সাচ্চা মুসলমান দাদা খুব সুন্দর কণ্ঠে আজান দিত, বিচিত্র ভাষায় ফজরের নমাজের সময় পৃথিবীর সব মানুষের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া ভিক্ষা করত।... আমার বড় আকাক্ষা হয় দাদার ওই ভালোবাসার ধর্মটি অর্জন করার। কিন্তু সব কি আর অর্জন করা যায়! দাদা কিভাবে মারা গেছে জানি না। চিঠি লিখে বহুদিন উত্তর পাইনি। হঠাৎ করে মৃত্যুসংবাদ এসেছে আমার কাছে। জানি না মৃত্যুর দিন তার দুটো ভাত জুটেছিল কি না। [সিকদার : ১০-১২]' এই ভাই-বোনের সম্পর্কে ধর্ম কোনো বাধা হয়ে আসেনি। দয়াময়ীর দাদা মজম ছিলেন খুবই ধর্মপ্রাণ একজন মানুষ। তা তাঁর লেখাতেই উল্লেখ করেছেন। মজম নামাজের সময় শিশু দয়াময়ীকে পাশে বসিয়ে রাখতেন। আর সকল মানুষের মঙ্গল কামনায় আল্লাহ্‌র কাছে করুণা চাইতেন। লেখক উল্লেখ করেছেন বিশেষত দক্ষিণ বাংলাদেশের মানুষের উৎসব, পূজা, ঈদ, পরস্পর বোঝাপড়া, শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সামাজিকতা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি। এর বিপরীতে সাম্প্রদায়িক মনোভাব, বর্ণবিভাজিত সমাজের চালচিত্র, আন্তঃকলহ, নির্মমতা ও নিষ্ঠুর দৃষ্টিভঙ্গি। এত ভালোবাসা, স্নেহ, আত্মিকবোধ থাকা সত্ত্বেও কেন হাজার হাজার মানুষ বাস্তুভিটা ত্যাগ করে স্থানচ্যুত হয়েছে? এ কোনো সুখের অদলবদল ছিল না। নিষ্ঠুর রাজনীতি কী এমন বিভাজনের জন্ম দিল! দয়াময়ী যেদিন বিদায় নিচ্ছেন কলকাতার উদ্দেশে, সেদিনের হাহাকার এই লেখা থেকে অনুমান করা যাবে না। এই স্মৃতিময় মাটি, মাঠ, ক্ষেত, ঘাট, বাগান জীবিতকালের কোনো সময়ই ত্যাগ করা যায় না। যে ভূমিতে আমাদের জন্ম হয়নি, শৈশবের কোনো স্মৃতি নেই, সে মাটির প্রতি কোনো মায়াও থাকার কথা নয়। দয়াময়ী যেদিন বিদায় নিচ্ছেন চিরকালের জন্য, সকল বন্ধন ছিন্ন করে, শৈশবের স্মৃতিকে পেছনে রেখে সেদিনের বর্ণনায় লেখকের বেদনার্ত উচ্চারণ—‘‘দেখতে দেখতে ১৩ই মাঘ রাতটা ভোর হল। বাজারের ঘাটে চান করতে গেলাম যাতে সকলের সঙ্গে দেখা হয়। চোখের জল মুছে মা সিদ্ধভাত চাপাল। দুটো খেয়ে যেতে হবে। আমি কিংবা মা কেউ-ই খেতে পারলাম না। সারা উঠোনে মানুষ গিজ-গিজ করছে। সবাই হাউ-হাউ করে কাঁদছে। মদিনা ভাবী এসেছে পনেরো দিনের ছেলে কোলে নিয়ে। মদিনা ভাবীও কাঁদছে, তবে আগের তুলনায় ভাল আছে। আমাকে বলল, দয়া, কাইন্দো না। লেহাপড়ি হইয়া গ্যালে গাঁয়ে ফিরা আইসো। ছোটকর্তারে কইয়ো মদিনার পোলা হইচে।’ ইয়েদালি কাকা, সাদি কাকা কোনও কথা বললেন না, শুধু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন। মাকে যখন কদমবুসি করলেন তখন ওদের চোখে জল ছিল।... দাদা তো জানতই। জানত বলেই দাদা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল।... আমরা রেলগাড়িতে উঠলাম, সবাই হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। সেদিন মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আমি মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কখনও দেশের কথা উচ্চারণ করব না। মা, আমার মধ্যে চিরকাল দেশের প্রসঙ্গ অনুচ্চারিত ছিল। আমারও এই একটা প্রতিজ্ঞা আমি রাখতে পেরেছিলাম। মায়ের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত দেশের কথা আমি উচ্চারণ করিনি। [সিকদার : ১৩৫]" এ অংশটি পাঠে চলচ্চিত্রের মতো ভেসে ওঠে ছিন্ন হওয়ার হাহাকার, তা কেমন হতে পারে। যা ভাষায় ততটুকু প্রকাশ করা যায় না। শুধু এটুকু ভেবে নেওয়া যায় বেদনার দৃশ্যটি কেমন! অধিকাংশ মানুষেরই এমন অনুভূতি নেই। নেই বলেই এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা আজও খুঁজে বেড়াই।    

রূঢ় বাস্তবতার কারণেই দয়াময়ীর পরিবার তাঁকে নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে গেলেন। আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখানে চলেন রহিমা খাতুন অনন্ত দুঃখে। এর কারণ আমাদের অবশ্যই খুঁজে বের করতে হয়। তা না হলে অনন্তকাল ধরে আমাদের এ অভিশাপ বহন করতে হবে। যে প্রায়শ্চিত্ত সকল মানুষকে বারবার দিতে হয়। এর মাশুল নানাভাবে আমি, আমরা সকলেই দিয়ে যাচ্ছি। আমরা চাই ভূগোলটি মানবিক হোক। 

স্বপন নাথ

স্বপন নাথ

জন্ম ৪ মে ১৯৬৮; বড়লেখা, মৌলভীবাজার। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা বিভাগ,...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা