আগস্ট আবছায়া : রেফারেন্সময় এক মৃদুভ্রমণ

কৃতজ্ঞতা স্বীকারসহ তিনশ আটাশ পৃষ্ঠার বই। প্রথমেই ভাগ করে নিয়েছিলাম, দিনে পঁচিশ পৃষ্ঠা করে পড়ব। তাহলে মোটামুটি তের দিনে শেষ করে ফেলতে পারব। ধরেই নিয়েছিলাম এটা পৃষ্ঠা গুনে গুনেই পড়তে হবে। প্রথম দিনের পঁচিশ পৃষ্ঠা পড়ার পর এক বড় ভাইকে বললাম, রেফারেন্সে ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তাকে বললাম, কারণ তিনি আমাকে বইটা পড়তে উৎসাহ দিয়েছিলেন।

কিন্তু এই উপন্যাসের রিভিউ লেখা কঠিন। মনে করুন, কোনো আড্ডা চলছে, নিজের মতো করে আসর জমাচ্ছে সবাই, তার মধ্যে একজন শুধু বলছে, ‘অমুক বইয়ে পড়েছি, অমুক সিনেমায় দেখেছি’, সে ওই আড্ডাটা বোরিং করে তুলবে না? প্রথম পঁচিশ পৃষ্ঠায় লেখক কাফকা, মারসেল প্রুস্ত, গ্রিক কমেডি, পজ হারভের গান, নবোকভ, স্যার টমাস ব্রাউন, জোসেফ কনরাড, বোরহেস, সিমোন বলিভার, ওয়েসিসের অ্যালবাম, ইভান তুরগেনেভকে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছেন! এঁরা প্রায় সবাই অন্তত নামে আমার পরিচিত। হয়তো সে কারণেই পঁচিশ পৃষ্ঠার পর থেমে যাই নি। ‘পাঠকের বিদ্যার পরীক্ষা নিতে গিয়ে লেখকের পাঠাধিক্য জাহির করা’ মনে হয়েছে কোথাও কোথাও। পুরা উপন্যাস জুড়ে এরকম আরো অজস্র রেফারেন্স।


গল্প কে বলছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই উপন্যাসের ন্যারেটর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক।


তবে লেখকদের সবসময় ক্ষমা করে দিতে চাই আমি। উপন্যাসটা উত্তম পুরুষে বলা। লেখক সুমন রহমান কোথাও একবার বলেছিলেন, গল্প কে বলছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই উপন্যাসের ন্যারেটর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক। ধরেই নেওয়া যায় পিএইচডিও করেছেন, বইয়ে কোথাও উল্লেখ নেই মনে হয়, তবে তার সহকর্মীরা অনেকেই ডক্টরেট। ফলে একটা ঘটনার সাত সাতটা রেফারেন্স দিতে পারেন তিনি। প্রথম দিকে মনে হয়েছে রেফারেন্সের লোভে পড়ে, মূল গল্প থেকে বারবার পাঠককে সরিয়ে নিচ্ছেন। মৌলিক অংশ খুঁজে নিতে রীতিমতো কষ্ট করতে হয়েছে। কিন্তু তিন দিন ধরে পঁচাত্তর পৃষ্ঠা পড়ার পর চতুর্থ দিনে কখন পঞ্চাশ পৃষ্ঠা পড়ে ফেলেছি খেয়ালই করি নি। বড় শরীরের উপন্যাসের বেলায় এমন হয়, মূল সুরে পৌঁছাতে সময় লাগে। আর যেহেতু এটা আমি মাঝপথে ছেড়ে দেব না বলে একরকম প্রতিজ্ঞাই করেছিলাম, ফলে এটাকে ভালো লাগাতেই হতো।

পুরা উপন্যাসের একটা সামারি করার চেষ্টা করি। একজনকে গল্পটা আমি এভাবে বলেছি : ‘গল্পের নায়ক, যে এই উপন্যাসের কথকও, সে দর্শনের অধ্যাপক হলেও, বিশ্বসাহিত্যে তার আগ্রহ ও দখল মজবুত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো, কাফকা অনুবাদ করা, প্রেম করা—এসবে তাকে স্বাভাবিকই লাগে। শুধু আগস্ট বিষয়ে তার এক ধরনের অস্বাভাবিক ঘোর কাজ করে। তার পনেরই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে। এই ঘোর এই উপন্যাসের ব্যাপ্তিকালের চেয়ে অনেক বেশিদিনের। এটা গোপন কোনো ইচ্ছার মতোও না। তার অস্ত্রব্যবসায়ী বন্ধু, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকর্মী, প্রেমিকা ও বন্ধুরা সবাই এটা জানেও।’

এটা আসলে উপন্যাস নয়, বড় বড় কিছু গল্প জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ঠিক গল্পও নয়, কোথাও কোথাও প্রবন্ধের আদল যেন। কোনো একটা রেফারেন্স এসে গেলেই, একাডেমিশিয়ানের মতো বলা হয়েছে পাতার পর পাতা। এ বইটা শেষ করার পর, হয়তো একজন পাঠকের গুগল সার্চ দিয়ে অনেক কিছু জানতে ইচ্ছা করবে। অথচ, বড় কলেবরের উপন্যাসের সুবিধা নিয়ে লেখক, চরিত্রগুলির মনজাগতিক বিস্তৃতি ঘটিয়ে, উপন্যাসটি নিয়ে হৈচৈয়ের প্রতি সুবিচার করতে পারতেন। পাঠকের মনে হতো, তিনি উপন্যাসই পড়ছেন, বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে তার জ্ঞান বা অ-জ্ঞান নিয়ে নাজেহাল হতে এটা হাতে নেন নি।

যেহেতু আগস্ট আবছায়া পনেরই আগস্টের বঙ্গবন্ধু পরিবারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখা উপন্যাস বলে মনে করেন সবাই, কাজেই পড়তে পড়তে একধরনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। প্রায় দুইশ পৃষ্ঠা পড়ার পর পাঠক সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ঢুকতে পারেন। উত্তম পুরুষে লেখা বলে, কথককে সেই ঘটনায় উপস্থিত থাকতে হয়। জানা ঘটনা আবার জানতে গিয়েও, রাসেলের জন্য মনে হাহাকার জন্মায়। ধানমন্ডি বত্রিশ থেকে টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত। নিজেকে উপস্থিত রাখতে গিয়ে কথক চরিত্রটিকে এক ধরনের অ্যাবনর্মাল জার্নির ভেতর দিয়ে যেতে হয়।

উপন্যাসটির গল্প টানা বলে যাওয়া যায় না। এর গল্প সবচেয়ে ভালো বলে যাওয়া যায় এভাবে—চরিত্রগুলির আলাদা আলাদা গল্প বলা।


এইরকম একটা পাওয়ারফুল নারীচরিত্র না থাকলে এত এত রেফারেন্সের কারণে বিরক্ত হয়ে যেতাম।


উপন্যাসটির প্রায় শুরুতেই নায়কের ইন্ডিয়া ট্যুর। সেখানে একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার, আইয়ার যার নাম, তার সঙ্গে নায়ক এবং পাঠকের একটা লম্বা সময় কাটে। যেহেতু গল্পের নায়ক কাফকার অনুবাদক, কাজেই ট্যাক্সি ড্রাইভারের ভেতরে সামসাকে আবিষ্কার করতে পারেন কেউ কেউ, আইয়ারের জীবিকা এবং বাসস্থানের দূরত্ব তাকে মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমাতে দেয়। সেই গভীর রাতে ঘুমানো আর ভোরবেলা ট্রেন ধরতে দৌড়ানো চলে দিনের পর দিন। যখন মনে হবে প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে ড্রাইভারের একটা ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তখনই শহরের একটা বনের গল্প এসে পড়ে, যে বনে চোরাবালির মতো কিছু আছে। সেখানে খুন করা লাশ ফেলে দিলে ডুবে যায়। আমার মনে হলো, অন্যদের নাও হতে পারে, নায়কের ভয়, অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। জার্নি শেষ করে ট্যাক্সি ড্রাইভারকে টিপস দেয় না সে। পথে এক দোকানে নেমেছিল নায়ক, সেখানে এক বন্দুকধারী তাকে একটা ফোন নম্বর দিয়ে বলে ভাড়াটে খুনি লাগলে এই নম্বরে ফোন দিতে। গাড়িতে এসে সেই নম্বরে ফোন দিলে আইয়ারের ফোন বেজে ওঠে। আইয়ার তখন বলে, কাল্পনিক কারো সঙ্গে দেখা হয়েছে নায়কের এবং নায়ক দ্বিধায় পড়ে। টিপস না দেওয়ার এটাই হয়তো কারণ, যদিও নায়ক নিশ্চিত হতে পারে না। দেশে ফিরেও তার মধ্যে টিপস না দেওয়ার আপসোস কাজ করে।

মেহেরনাজ। নামটা খুব পছন্দ হয়েছে আমার। মেহের বললেই যেন ঝনঝন করে বেজে ওঠে কিছু। এরকম আর কোনো নায়িকা পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। মেহেরকে পড়তে পড়তে দুই একবার মুজতবা আলীর শবনমকে মনে পড়েছে আমার। এইরকম একটা পাওয়ারফুল নারীচরিত্র না থাকলে এত এত রেফারেন্সের কারণে বিরক্ত হয়ে যেতাম। মেহেরনাজের জন্য শত রেফারেন্স কবুল।

নায়কের নেপালি প্রেমিকা সুরভী এবং কলিগের বউ লূনা এই দুজনের সঙ্গে নায়কের সম্পর্ক পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, নারীদের সঙ্গে সম্পর্কের বেলায় সে প্রায় পুস্তকের মতো।

এই রকম একটা লোকের সঙ্গে ঝানু অস্ত্রব্যবসায়ীর তুই-তোকারি বন্ধুত্ব থাকতে পারে কিনা, সেই প্রশ্ন তোলা যেত। কিন্তু এটা নায়কের আগস্ট-প্রতিশোধ স্পৃহার জন্য জরুরিই। আরোপিত লাগলেও, নায়ককে পনেরই আগস্টে ঢুকতে, এই চরিত্র আমদানির জন্য মাফ করা যায়। হরেক রকম বন্দুক পিস্তলের নাম পড়তে পড়তে, অজ্ঞ পাঠক হিশেবে নিজের জন্য বন্দুকের জাদুঘরের খোঁজ করতে ইচ্ছা করে। তবে অস্ত্রব্যবসায়ী ইব্রাহিমের চরিত্রটা দারুণ। পুরা উপন্যাসের একমাত্র বহুমাত্রিক চরিত্র।


শেষের বিরাট একটা চ্যাপ্টার প্রায় বহন করা যায় না। এটা সংযোজনের লোভ সামাল দেওয়া উচিত ছিল।


নায়কের ছোটবেলা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, উপন্যাসটার চাবি থাকতে পারত এখানেই। শিশুবেলায় এক মৃত্যু দেখে শিশু নায়ক বলছে, ‘আমি কখনও মরব না, ছি!’ এটা এমন এক ডায়লগ যেটাকে অতিনাটকীয় বলে বাতিল করার সুযোগ নেই। কিন্তু পুরা উপন্যাসের সঙ্গে এই বাল্য-কথনের যোগ নেই তেমন। মনে হয় যেন, এটা আলাদা করে লেখা হয়েছিল, পরে জুড়ে দেওয়া হয়েছে। উপন্যাসের অন্যান্য আরোপিত অংশগুলি চোখে পড়ার এটাও কারণ।

ঢাকা শহর এই উপন্যাসের প্লট। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, এপোলো হসপিটাল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এসব এলাকায় বেশিরভাগ অংশ। ধানমন্ডি আর টুঙ্গিপাড়ায় গিয়ে যদি পাঠক এই উপন্যাসের সঙ্গে সংযোগ বোধ না করেন অথবা ইন্ডিয়া আর নেপাল ঘুরে যদি বুঝতে না পারেন, এই উপন্যাসে আসলে কী আছে, তাহলে হয়তো দ্বিতীয়বার পড়তে চাইতে পারেন কেউ কেউ। কিন্তু শেষের বিরাট একটা চ্যাপ্টার প্রায় বহন করা যায় না। এটা সংযোজনের লোভ সামাল দেওয়া উচিত ছিল। অতিপ্রাকৃত এই থ্রিলার অংশ অপছন্দ করেছি আমি।

আর বেশি কিছু বলার নাই। টুকরা টুকরা কিছু বিদ্যুৎ-অংশ ছাড়া, এই উপন্যাসের প্রায় সবই ভুলে যাব মনে হয়।

আনোয়ারা আল্পনা

আনোয়ারা আল্পনা

জন্ম ৭ মার্চ ১৯৭৮; উল্লাপাড়া, সিরাজগঞ্জ। অর্থনীতিতে মাস্টার্স, জাহাঙ্গীরনগর...বিস্তারিত