শিরোনাম দেখে চমকাবেন না। এই দুজনের ঘনিষ্ঠ যোগ বিলক্ষণ আছে। সে-কথাই সবিস্তারে বলব।
মুজতবা আলী কিছু রচনা লিখেছেন হিটলারকে নিয়ে, সেগুলো এক করে হিটলার নামের একটা বই হয়েছে, এই কারণে তাদের যোগ আছে বললাম, তা নয় কিন্তু। হিটলার সাহেব আলী সাহেবের চেয়ে বয়সে বছর পনেরো বড়। হিটলার মারাও গেছেন মুজতবা আলীর চেয়ে প্রায় বিশ বছর আগে। তবু জীবনের একটা সময় এরা দুইজন একই দেশে কাটিয়েছেন। দেশটা জার্মানি। তরুণ মুজতবা আলী যখন পিএইচডি করতে সে-দেশে যান, ঠিক সেই সময়টাতে হিটলার জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠছিলেন। মাঠে ময়দানে হিটলারের সম্মোহনী বক্তৃতা নিজের কানে শুনেছেন। জার্মান বন্ধুদের সাথে আড্ডার টেবিল মাতিয়ে হিটলারকে নিয়ে তর্ক করেছেন। ১৯৩২-এ পিএইচডি শেষ করেন আলী সাহেব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আগের বছর ফের যান, শেষবার যান ৬২ সালে। ফলে তিনি জীবিত হিটলার ও মৃত হিটলারকে নিয়ে জার্মানির মানুষের প্রায় সব ধরনের আবেগ স্বচক্ষে দেখেছেন। আরো কারণ আছে, হিটলারকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তিনি যত বই পড়া সম্ভব, সব পড়েছেন। পড়ে সেগুলোর সামারি করে নিজের লেখা লিখেছেন, তা নয় মোটেই। তার নিজের একজন হিটলার এঁকেছেন; রক্ত মাংসের হিটলার।
মুজতবা আলীর এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল হিটলারের প্রতি?
মুজতবা আলীর হিটলারভ্রমণে পা রাখার আগে ঘুরে আসি রবীন্দ্রনাথের জার্মানি সফরে।
দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে মোট তিনবার জার্মানি সফর করেছেন রবি ঠাকুর—১৯২১, ১৯২৬, ১৯৩০-এ। প্রথমবার ১৯২১ সালে, মানে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার অল্পকাল পরেই। জার্মানির মানুষ তাকে বিপুল সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। পৃথিবীর শান্তি ও মঙ্গল কামনায় তারা কবিকে আপন করে নিয়েছিলেন। তারা জানতেন, এই সেই সখা যিনি বিশ্বপ্রেমের কবি, শান্তির প্রতীক, পদদলিতের পরিত্রাণ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তারা বলেছিলেন : ‘মানব সংসারে ভালো লোকের দেয়ালি উৎসব চলিতেছে, প্রত্যেক জাতি আপন প্রদীপ উঁচু করিয়া তুলিলে তবে সে উৎসব সমাধা হইবে।’ শান্তির কবিকে এতটা আপন করে নেওয়া জাতি কিভাবে হিটলারের মতো নিষ্ঠুর যুদ্ধবাজকে এতটা মাথায় তুলেছিলেন, তার সাক্ষাৎ সাক্ষী স্বয়ং মুজতবা আলী। কিভাবে আসুন মিলিয়ে দেখি।
১৯২৭, আরও নির্দিষ্টভাবে বললে তারও দুই তিন বছর আগে থেকে হিটলার মিউনিখ অঞ্চলে এমনই প্রখ্যাত হয়ে গিয়েছিলেন যে, যেখানেই যেতেন চারদিকে ভিড় লেগে যেত। দিনের পর দিন বিশাল জনতার সামনে দেশের দুঃখ-দৈন্যের নিদারুণ বর্ণনা দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধকর বক্তৃতা দিয়েছেন। শিশু পুত্র-কন্যাদের জন্য খাবার, কাপড় জোগাড় করতে মা জননীদের কত কষ্ট করতে হয়, দরদি কণ্ঠে সেসব বলে মনজয় করেছেন নারীদের। সেসময় মুখে হাতচাপা দিয়ে কাঁদলেও, নারীদের সম্মিলিত কান্নায় তার বক্তৃতা থেমে যেত কয়েক মিনিটের জন্য! সমসাময়িক রাষ্ট্রনায়কদের অযোগ্যতা নিয়ে সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে তুমুল হাততালি পেতেন। সর্বোপরি, জার্মানিকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ নেশনরূপে পরিণত করার অঙ্গীকার তাকে উঁচু থেকে উঁচুতে তুলে দিয়েছিল। এসব বক্তৃতার অনেকগুলিই নিজের কানে শুনে মুজতবা আলী বলেছেন, তার বক্তৃতা দেবার ভঙ্গি ও বিষয় নিয়েই লম্বা রচনা লেখা যেতে পারে। আড্ডাতেও যেতেন এডলফ, কিন্তু সেখানে আর কেউই কথা বলার সুযোগ পেত না, কথা একা তিনিই বলতেন, বাকিরা শ্রোতা। তাহলে বলে ফেলা যায়, কথার জাদুতেই মাত করেছিলেন বাগ্মী হিটলার। নাকি পুরো দুনিয়াকে জার্মানির পায়ের তলায় এনে দেবেন—এমন প্রলোভনে শান্তিপ্রিয় জার্মানরা তাকে মাথায় তুলেছিল?
চাইলেই আলী সাহেব, হিটলারের পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখতে পারতেন। কিন্তু স্বভাবসুলভ খণ্ড খণ্ড লেখাই পছন্দ করেছেন তিনি। সেখানে যুদ্ধবাজ হিটলারের চেয়ে ব্যক্তি হিটলার প্রবলভাবে উপস্থিত। তবে কি মুজতবা আলীর এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব ছিল হিটলারের প্রতি? তা নয় আসলে। রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রপ্রধান হিটলারকে নিয়ে কিতাবের তো শেষ নেই, তাই হয়তো ওপথে হাঁটেন নি। কে না জানে মুজতবা আলী উল্টো পথের পথিক।
যুদ্ধবাজ হিটলারকে নিয়ে চূড়ান্ত কথাও বলেছেন, কিন্তু মৃদুলয়ে বলেছেন, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তীব্রভাষায় আক্রমণ করেন নি। তিনি তো ইতিহাস জানেন; আলেকজান্ডার বা চেঙ্গিস খান একের পর এক রাজ্য জয়ের সময় মানুষের মৃত্যু হিসেবে রাখেন নি। হিটলারও পররাজ্য জয় করে, সে-দেশের মানুষকে দাস বানিয়ে, সুপরিকল্পিত পৈশাচিক শোষণ চালিয়ে জার্মানদের বিলাসিতা এনে দিতে চেয়েছিলেন। আলীর বয়ানে শুনুন—‘বিনষ্ট রাষ্ট্রের ভস্মস্তূপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে লোক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয় তাকে কিছুতেই রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রনির্মাতা বলা চলে না। কোনো রাষ্ট্রদর্শনও রেখে যেতে পারেন নি যেটা পরবর্তী প্রজন্ম অনুসরণ করতে পারে।’ তার সংগ্রামনীতির ফলে লক্ষ লক্ষ সৈন্য দেশে-বিদেশে নিহত হয়েছে। সারা বিশ্বের কথা বাদ দিয়ে শুধু জার্মানির জন্য হিটলার কী ছিলেন—সে-আলাপ তুলেই চূড়ান্ত মত দিয়েছেন আলী। তার কণ্ঠে ঘৃণা নেই বলে, শুনতে মৃদু লাগতে পারে।
অসাধারণ বাগ্মিতা-গুণ ছাড়াও ব্যক্তি হিটলারের চরিত্রের চারটি দিক খুঁজে বের করেছেন আলী সাহেব—
১) হিটলার নিরামিষভোজী ছিলেন। ২) মদ্যপান করতেন না। ৩) নারীলোলুপ ছিলেন না। ৪) তিনি শিশুদের খুব ভালোবাসতেন।
কী মনে হয়? এই চারটি গুণ থাকলে একজন সাধারণ মানুষকে আমরা নির্দ্বিধায় ভালো মানুষ বলে ফেলতে পারি না?
মৃত্যুর চল্লিশ ঘণ্টা আগে ইভা ব্রাউন নামের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন তিনি!
ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যাকারীকে এখানে পাওয়া যায়? ভাববেন না আলী সাহেব মনগড়া কিছু বলেছেন। অনেকের গবেষণা ক্রস চেক করে করে একেকটা তথ্য মেনেছেন।
হিটলারের প্রেমকাহিনি নিয়ে আলী’স ফর্মুলা দেখুন :
১/২+ ১+ ১/২
কী বুঝলেন? মোট তিনটা প্রেম দুইটার সমান। প্রথমটা আর শেষটা আধা আধা, মাঝখানেরটা ফুল।
তাকে সাধুসন্ত প্রমাণের জন্য তার চ্যালারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, জার্মানিই তার বধূ, তার আর কোনো প্রেম নাই। শত্রুরা বলেছেন, নপুংশক ছিলেন, সমকামী ছিলেন ইত্যাদি। ১৯৪৫ সালের ১ মে জার্মানির জনগণকে হাজার ভোল্টেজের শক দিয়েছিল আপন দেশের বেতার। হিটলার মারা গেছেন এই খবর হজম করতে না করতেই পরের শক—মৃত্যুর চল্লিশ ঘণ্টা আগে ইভা ব্রাউন নামের এক নারীকে বিয়ে করেছিলেন তিনি! জার্মানির জনগণ একযোগে বলেছিল—সেকি! বারো বছর ধরে যে শুনলাম তিনি সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন! সুখের নীড় বানান নি, সহচরী খোঁজেন নি, এমনকি সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর কথাও চিন্তা করেন নি। আর কে সেই নারী যার কথা কেউই জানে না! রাশিয়ান সৈন্যরা প্রায় ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে দিয়ে গেছে বার্লিন! তা সত্ত্বেও এ খবরে চমকে উঠে বলেছিল—প্রপাগান্ডা মন্ত্রী গ্যোয়েবেল তবে মিছা কয়ে গেছেন দিনের পর দিন। জার্মানির পদতলে পুরা দুনিয়া এনে দেওয়ার সংকল্পে তিনি নিজের ব্যক্তি জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন—এ তবে ছলনা ছিল! এই ছলনার কিন্তু দরকার ছিল না।
বউ বাচ্চা আছে এটা তার ভাবমূর্তির জন্য মোটেই হানিকর হতো না। একাধিক ঘনিষ্ঠজনের বয়ানে জানা যায় ইভার সাথে তার স্বাস্থ্যকর যৌনজীবন ছিল। কিন্তু ইভার বিষয়ে তিনি কেন এত গোপনীয়তা মেনেছেন! সেইখানেই আধা প্রেমের রহস্য লুকিয়ে আছে। ইভা তাকে এতই ভালোবাসত যে তিনি সেটা অগ্রাহ্য করতে পারেন নি। আলীর বয়ানে শুনুন, ‘ইভা সেই অর্থে চটকদার বুদ্ধিমতি ছিলেন না। কিন্তু সর্বাঙ্গ জুড়ে হৃদয় ছিল, সে-হৃদয়ের সবটা জুড়েই হিটলার ছিলেন।’ যখন তাকে কেউই চেনে না, চাইলেই তিনি হিটলারের বাংকার সঙ্গী না হয়ে পালিয়ে যেতে পারতেন। নিশ্চিত মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে হিটলারের বৈধ স্ত্রী হওয়াই তার জীবনের মোক্ষ না হতে পারত। হিটলারের সাথে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে না নিতে পারতেন। এত কিছুর পরও ইভা, হিটলারের পুরো প্রেম নন! কে না জানে যে প্রেমে একপক্ষের পুরো সমর্পণের কথা অন্য পক্ষ যখন জেনে যায়, সে-প্রেমে আবেগের সমান লেনদেন হয় না। পাই নি বা হারাই হারাই এই হাহাকার না থাকলে প্রেম কখনো পূর্ণ নম্বর পায় না। জাত-ব্যাচেলর হিটলার নিজের আশু মৃত্যু নিয়ে কনফার্ম সিদ্ধান্ত না নিলে, ইভাকে তিনি কোনোদিনই বিয়ে করতেন না।
তাই এই প্রেমকে আধা প্রেমের মর্যাদা দিয়েছেন নির্দয় মুজতবা আলী। তাহলে তার পুরো নম্বর পাওয়া প্রেম কোনটা? আছে। সেটা শোনার আগে পয়লা আধাটা শুনুন। শুনতে শুনতে গুনতে থাকুন নিজের দেশে সুন্দর শৈশব শুরু করে, নিজের ইচ্ছা মতো স্থাপত্যবিদ হয়ে প্রথম প্রেমিকাকে নিজের করে পেলে, হিটলার জার্মানির দিকে পা বাড়াতেন কিনা। নিজের দেশে সবকিছুতে ব্যর্থ হয়ে কাউকে কিছু না জানিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন। কৈশোরের প্রেম নিয়ে বাল্যবন্ধু গুস্তাফের বয়ানে তাই সামান্য কিছুই জানা যায়। সে-বয়ানেও পাওয়া যায় ছদ্মনাম ‘স্তেফানি’। তাকে নিয়ে সবকিছু এই বন্ধুকেই বলতেন হিটলার। প্রেমিকা বউ হলে তাকে নিয়ে যে বাড়িতে থাকবেন সেই বাড়ির স্কেচ এঁকে দেখাতেন। কিন্তু সেই মেয়ে এসবের কিছুই জানত না। চলতি পথে হঠাৎ হঠাৎ তার চোখে পড়ত মুগ্ধ চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে এক কিশোর। কোনোদিন হয়তো কিশোরের টুপি খোলা অভিবাদনের জবাবে সামান্য একটু হাসতেন, সেটা নিয়ে বন্ধুকে দিনভর উচ্ছ্বাস দেখাতেন হিটলার। কিন্তু কখনো কথা বলার বা অন্তত চিঠি লেখার চেষ্টাও করেন নি। এটা অবাক করা ব্যাপারই। কারণটা দুই বন্ধুই জানতেন—হিটালারের চেয়ে অযোগ্য পাত্র সেই মেয়ের জন্য আর কেউই হতে পারত না। হিটলারের ভিয়েনা থাকাকালীনই স্তেফানির বিয়ে হয় সুযোগ্য পাত্রের সঙ্গে।
গেলিই হিটলারের ‘ওয়ান গ্রেট লাভ’। একমাত্র এই মেয়ের প্রেমেই পুরোপুরি পড়েছিলেন হিটলার।
হিটালারের জার্মানি অধ্যায় শুরুর আগে মুজতবা আলী চিরুনি অভিযান চালিয়েছেন এটা খুঁজে বের করতে যে স্তেফানি ছাড়া আর কোনো মেয়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বা অন্তত সান্নিধ্য ঘটেছিল কিনা। সেই সময়ের ভিয়েনা ‘মদ্য-মৈথুন-সংগীত’-এ প্যারিসের সঙ্গে পাল্লা দিত। কিন্তু হিটলার তখন স্বপ্নের স্থাপত্য বিদ্যালয়ে ঢুকতে অক্ষম, নিদারুণ দৈন্য, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে অবিচারে নানা জাতের বই ভক্ষণ—এসবে ডুবে ছিলেন। গুস্তাফ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, ওসব দিকে তার কণামাত্র আগ্রহও দেখেন নি।
এরপর হিটলারের উনিশ বছর বয়স থেকে তিরিশ বছরের জীবন পর্যন্ত প্রায় কিছু জানা যায় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি শারীরিকভাবে আনফিট হবার কারণে সৈন্য হিসেবে যোগ দিতে পারেন নি, স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিলেন।
হিটলারের পূর্ণ নম্বর পাওয়া প্রেমকাহিনি শোনার সময় মুজতবা আলী ছাড়াও সঙ্গে রাখুন হফম্যানকে। নেতা হয়ে ওঠার পর হিটলারের সত্যিকারের অন্তরঙ্গ বন্ধু কেউই ছিলেন না, তবু এই ফটোগ্রাফার ভদ্রলোককে সে-মর্যাদা দেওয়া যায়। হফম্যান ব্যক্তি হিটলার সম্পর্কে সবচাইতে বেশি জানতেন। হিটলারের মৃত্যুর দশ বছর পরে তিনি বই লেখেন—‘হিটলার ওয়াজ মাই ফ্রেন্ড’। তিনি শিল্পী মানুষ ছিলেন, দুই বন্ধুতে আলাপ হতো আর্ট নিয়ে। হফম্যান ভালো বুঝতেন ছবি, আর হিটলারের আগ্রহ ছিল স্থাপত্য, চিত্র ও ভাস্কর্যে। কিন্তু তাই বলে তিনি হিটলারের গ্যাস চেম্বারে ইহুদি পোড়ানো নিয়ে কিছু জানতেন না, তা হতে পারে না। কিন্তু বন্ধুর জীবনীতে তিনি ভালো ভালো কথাই লিখেছেন।
মেয়েটির নাম আঙেলিকা রাউবাল, ডাক নাম গেলি, হিটলারের সৎ বোনের মেয়ে, মানে ভাগ্নি। এই গেলিই হিটলারের ‘ওয়ান গ্রেট লাভ’। একমাত্র এই মেয়ের প্রেমেই পুরোপুরি পড়েছিলেন হিটলার। সোজা বাংলায় বলতে গেলে, হিটলার এই মেয়েটিকে দেবীর আসনে বসিয়ে পুজো করেছেন। সর্বত্র সঙ্গে নিয়ে যেতেন, যেন এক মুহূর্ত চোখের আড়াল করতে না হয়। যে হিটলার বন্ধুদের আড্ডায় একাই বক্তা ছিলেন, সে হিটলার আড্ডায় গেলিকে নিয়ে গেলে, গেলিই কথা বলত, হিটলার মুগ্ধ শ্রোতা। কিন্তু প্রকাশ্যে কখনো এমন কিছুই করেন নি, যা ইউরোপের প্রেমিকযুগলেরা হরহামেশাই করে থাকে।
গেলির সবকিছুই তিনি অম্লানবদনে মেনে নিতেন, এমনকি তার সঙ্গে শপিংয়েও যেতেন। কিন্তু একটা বিষয়ে ছিলেন কঠোর, যার তার সঙ্গে গেলির গল্প করা বা ঘুরতে যাওয়া বন্ধ ছিল। অস্থিরমতি প্রেমিকাকে হারিয়ে ফেলার ভয় ছিল প্রেমিক হৃদয়ে। গেলির সঙ্গে প্রেম নিয়ে দুটি ধারণা পাওয়া যায়। এক. ভিয়েনায় ফিরতে চাইত গেলি, সেখানে তার প্রেমিক থাকত বলে। সেটা কঠোরভাবে আটকেছেন হিটলার। এই প্রেমটা যে হিটলারের এত সর্বস্ব ছিল, কারণটা এই যে একে কখনো পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
দুই. গেলি আত্মহত্যা করেছিল, নিজের গায়ে গুলি চালিয়ে। ইভার সঙ্গে হিটলারের দেখা হয়েছে কাছাকাছি সময়ে। কেউ কেউ মনে করেন, সেটাই গেলির আত্মহত্যার কারণ। কিন্তু ক্রস চেক করে মুজতবা আলী এই ধারণা বাতিল করেছেন। সেই সময়ে হিটলারের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হফম্যানের বরাতে জানা যায়, কতটা ভেঙে পড়েছিলেন হিটলার। ভিয়েনায় নিজের প্রেমিকের কাছে যেতে না পেরে নিজেকে হিটলারের বন্দি ভাবত গেলি। তাই এত কিছু করেও গেলির মন পান নি হিটলার। গেলির মৃত্যুর পর পুরো তিনদিন খাওয়া-ঘুম সব বন্ধ করে একটা ঘরে বন্দি থেকে দিনরাত শুধু পায়চারি করেছেন। গেলির মৃত্যুর পর বহু বছর পর্যন্ত সে ঘরে মারা গিয়েছিল, সেই ঘরে তার প্রিয় ফুল রাখতেন হিটলার। মায়ের মৃত্যুর পর একমাত্র গেলির মৃত্যুতেই এতটা ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। গেলির মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পরে ইভাকে বিয়ে করেন। কে জানে নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে মরে যাওয়ার সময় হয়তো ইভার চেয়ে গেলিকেই বেশি মনে পড়েছে তার।
হিটলারের যাবতীয় বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড নিয়ে একটুও আক্রমণাত্মক কথা না বলে পাঠকের বিরাগভাজন হয়ে গেছেন কিনা সেই দ্বিধা হয়তো আলীর ছিল। পুষিয়ে দিয়েছেন শতকণ্ঠে আডেনাওয়ারের প্রশংসা করে। কনরাট আডেনাওয়ার।
হিটলার বারো বছরে যে জার্মানিকে বিনাশ করেন, আডেনাওয়ার তার চৌদ্দ বছরে সেটি পুনর্নির্মাণ করেন। শুধু পুনর্নির্মাণ নয় এবং চৌদ্দ বছরেও নয়, দশ বছরেই জার্মানিতে যে সুখসমৃদ্ধি গড়ে তোলেন সেটা হিটলারের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে ১৯৪৫ সালে অতি আশাবাদীর পক্ষেও কল্পনা করা অসম্ভব ছিল। আডেনাওয়ার ছিলেন ধর্মভীরু, শিক্ষিত, বিদগ্ধ নাগরিক। যেখানে হিটলার ধর্ম মাত্রকেই, বিশেষ করে খ্রিষ্টধর্মকে ঘৃণা করতেন। মনে করতেন, এ ধর্মকে ইউরোপে ছড়ানোর পেছনে ইহুদিদের হাত আছে। যিশুকে মনে করতেন জারজ সন্তান।
যে মমতায় আডেনাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়া জার্মানি গড়েছেন, সেই হৃদয়বান নেতা আমাদের কোথায়!
আডেনাওয়ারের কৃতিত্ব সম্পর্কে পুরো বিশ্ব একমত। মুজতবা আলী গুছিয়ে তিনটি পয়েন্ট বলেছে :
১। তিনি পদদলিত জার্মানিকে লুপ্ত-আত্মসম্মানবোধ ফিরিয়ে এনে দেন এবং ইউরো-আমেরিকার রাষ্ট্রসমাজে তার জন্য গৌরবের আসন নির্মাণ করেন।
২। চিরবৈরী ফ্রান্সের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন।
৩। এক কোটি বিশ লক্ষ বাস্তুহারাকে পরিপূর্ণ মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি একটি মাত্র কাজে সফল হতে পারেন নি—দুই জার্মানিকে এক করতে পারেন নি।
ব্যক্তি আডেনাওয়ার কেমন ছিলেন? তার ছেলের জবানীতে জানা যায়, মায়াময়, স্নেহময় বাবা ছিলেন তিনি। তার মাথার উপর যখন সমগ্র জার্মানির ভার, সেই সময় মারা যান স্ত্রী। নিজের কাজের রুটিনে আমূল পরিবর্তন এনে বাচ্চাদের জন্য সময় বের করেছেন। নিজের দেশকে যেমন বঞ্চিত করেন নি, নিজের পরিবারকেও নয়।
এবং মুজতবা আলীর সঙ্গে একটা কমন দুঃখের সামনে দাঁড়াই। কবিগুরুও সঙ্গে থাকুন। স্বদেশি আন্দোলন ও পরবর্তী অসহযোগ আন্দোলনের সময় কবিগুরু বারবার বলেছেন : আত্মাকে অবহেলা কোরো না। অধিকাংশ রাজনীতিবিদ তখন মুচকি হেসে বলেছেন—আগে তো ইংরেজ তাড়াই। ইংরেজ তো বহুদিন হলো বিদায় হয়েছে। আমাদের চরিত্র, আত্মার দেউলিয়াত্ব ঘোচে নি। যে মমতায় আডেনাওয়ার ধ্বংস হয়ে যাওয়া জার্মানি গড়েছেন, সেই হৃদয়বান নেতা আমাদের কোথায়!