কেঁদেও পাবে না তাকে
এই রচনায় সসম্মানে রবীন্দ্রনাথকে বাদ রাখি। বাদ রাখি কালিদাসকেও। আশাকরি, এই দুজন জনক তনয়ার স্নানের স্মৃতিমাখা রামগিরিতে বসে, আমার নামে বদনাম করবেন না। শুধু এই দুজন নন, কবিতায় বর্ষার কথা বলেতে গেলে, এর শেষ কোনোদিন হবে বলে মনে হয় না। এখানে সুখের নামে বৃষ্টি নামে, দুঃখের নামেও। প্রেম-বিরহ-মিলন-প্রতীক্ষা সবকিছুই আসে বৃষ্টি হয়ে। যতদূর দৃষ্টি গেলে আকাশ মাটিতে মিশে যায়, ততদূরের ফসলের মাঠ থেকে ঘরের চার দেয়ালের মধ্যেও, কবিতার বৃষ্টি অঝোরে ঝরে।
বাংলা ছাড়াও, অন্য ভাষার কবিতায়ও বৃষ্টি আছেন মহাসমারোহে।
আমি বরং আল মাহমুদের দুটি চরণ লিখি—
কেন যে আসতে চাও, এ যে বড় ভয়ানক দিন চালের লতানো ফুল মরে যাবে বৃষ্টির অভাবে
বৃষ্টিতে বিরহ ঘনায়ে আসে! কৃষকের বৃষ্টি আর প্রেমিকের বৃষ্টি তবে এক নয়!
আল মাহমুদ তার প্রেয়সীকে বৃষ্টিহীন রুক্ষ দেশে আসতে নিরুৎসাহিত করছেন। বৃষ্টির অভাবের দেশে সে যদি আসেও দুঃখের চৌকাঠ ভেঙে, এসে দাঁড়াবে কোথায়। আগুন ঠিকরে পড়া দোজখে, কিভাবে সে বাসর সাজাবে। জলের প্রার্থনা না করে কোমরে নীল শাড়ি পেঁচিয়ে, আকাশে উদ্ধত তরবারি ঠেকাবে সেই বেপরোয়া নারী, দুঃখের ঘরকে করবে প্রেমের বাগান।
বৃষ্টিহীনতায় আরোহণ করে আবার বলেছেন আল মাহমুদ—
বৃষ্টিতে না হোক, তবু অন্য কিছু ঘটুক এখন এমন রাত্রিতে এসে থেমে যাবে বন্ধ্যা বিস্ময়!
বৃষ্টি হলেই ভালো হতো কিন্তু, বৃষ্টি না হলে এই রাত বৃথা তো যেতে পারে না।
ভাবছেন, এ লেখা তবে বর্ষা বন্দনা করে নয় ! আশ্বস্ত করি, এ লেখা বর্ষার কবিতাদের বন্দনা করেই। বৃষ্টির অভাব দেখিয়ে কেবল তৃষ্ণা বাড়ানো। যে দেশে বৃষ্টি নেই, সেই দেশে বসে বৃষ্টির কথা শুনতে হয়।
মুজতবা আলীতে পড়েছিলাম, কায়রো শহরে দুই ফোঁটা বৃষ্টি পড়লে, কী ভীষণ কাণ্ড হয়! একদল বলে, আমাদের কৃষিকাজ হয় নীল নদের পানিতে, আমাদের বৃষ্টির দরকার কি! কেবল একজন দূরে চলে যাওয়া প্রেমিকার কথা ভেবে বৃষ্টিতে বিরহ মিশিয়ে কাঁদে!
আহ বিরহ! বৃষ্টিতে বিরহ ঘনায়ে আসে! কৃষকের বৃষ্টি আর প্রেমিকের বৃষ্টি তবে এক নয়!
না একই। বৃষ্টি আর প্রতীক্ষা সহদরা।
আল মাহমুদই ফের ‘অন্যায় বৃষ্টি’তে বলেছেন—‘সকালে ঘুম থেকে জেগেই মনে হলো আজকের এই বৃষ্টিটা তোমার জন্য।’ কার বৃষ্টি কে দেয়, কাকে দেয়, কেন দেয়, কে জানে! কবিতা এক আশ্চর্য জাদু, কেবল কবিতায়ই বলা যায়—আজকের এই বৃষ্টিটা তোমার জন্য।
কেঁদেও পাবে না তাকে বর্ষার অজস্র জলধারে।
অমিয় চক্রবর্তীর এই লাইনটা পড়ে চমকে উঠতে হয় না? একটা কবিতার শুরু হতে পারে এই লাইন দিয়ে! এই যদি শুরু হয়, তবে তার পরে কী! মনে হয় যেন, সব কথা বলা হলে, কেন তাকে পাওয়া যাবে না, জানা হয়ে গেলে, একেবাবে শেষে এই হাহাকার আসতে পারত। কেমন চোখ বন্ধ করে ফেলতে ইচ্ছা হয়, এরপরে আর কিছু কি থাকতে পারে, না থাকা উচিত! কিন্তু এটা তো বৃষ্টি—
বারে-বারে পাওয়া, হাওয়া, হারানো নিরন্ত ফিরে ফিরে— ঘনমেঘলীন কেঁদেও পাবে না যাকে বর্ষার অজস্র জলধারে
এই হলো কবিতার শেষ ! মনে হয় যেন, এই একটা কথা ঘুরেফিরে বলার জন্যই এই কবিতা। কিছু কথা ফাঁকে ফাঁকে বলেই আবার, বারবার কেঁদেও যাকে পাওয়া যাবে না, তার তরেই বৃষ্টি নিবেদন।
এই কবিতার অতৃপ্তিই বুঝি আবার তাকে আরেকটা কবিতা লিখিয়ে নিয়েছিল—বৃষ্টি !
অন্ধকার মধ্যদিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে
যেন তার মনে হয়েছে কেঁদেও যাকে পাওয়া যাবে না, তার কথা বলতে গিয়ে বৃষ্টিকে অবহেলা করা হয়েছে। এবার তাই নিবেদন পুরোপুরি বৃষ্টিতে। তপ্তদিন, জলাধার, ঘাস, মাটি সবই সৃজনের অন্ধকার যাপন করে বিদ্যুতে, ঘূর্ণিঝড়ে। আর মনের মাটিতেই বৃষ্টিকে আটকে না রেখে, অরণ্য তরঙ্গশীর্ষে উদাসীন বৃষ্টিচিহ্নিত ভালোবাসা ছেড়ে দেয়া। বৃষ্টির কারণে হঠাৎ করে অন্ধকার হয়ে যাওয়া মধ্যদিন, তাকে নিয়ে গেছে, বৃষ্টি যেখানে যেখানে যায়, সবখানে।
মনে আছে একবার বৃষ্টি নেমেছিল?
আবুল হাসানের বৃষ্টি আবার আমাদের নিয়ে যায় বৃষ্টিচিহ্নিত ভালোবাসায়। বৃষ্টির অথই শ্লোগানে যখন থেমে গিয়েছিল সব নাগরিক কাজ, তাদের তাই শুয়ে থাকতে হয়েছিল সারাদিন পাশাপাশি। হৃদয়ের অক্ষর পড়া উপন্যাস পড়তে পড়তে কত কী উঠে এল—কার বেতন বাড়ছে না, কার বৃষ্টির জন্য অযথা বেশি খরচ হয়েছে যানবাহনে, কোথায় চা-খোর মানুষেরা বৃষ্টি মাথায় এল চায়ের দোকানে—সব। আর যেন সবকিছু ঘটেছিল তাদের দুই জনকে একসঙ্গে রাখতে; তারা বৃষ্টিকে অজুহাত বানিয়েছিল। আর অনেক কাল পরে তারা একজন আরেকজনকে মনে করিয়ে দিচ্ছে—একদিন বৃষ্টি হয়েছিল! কী যে সুখের দিন ছিল সেটা! সেই একদিন বাইরের পৃথিবীর সবকিছু বৃষ্টিবিঘ্নিত হয়েছিল, কেবল তাদের ছিল সুখের দিন।
বাংলার কবিদের ছেড়ে আসুন ভিজে আসি তুর্কি ভাষার এক বৃষ্টিতে।
গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি … যেন চমকানো চাপা গলায় কোন রাজদ্রোহের আলাপ।
এইবার দেখুন, বৃষ্টি কার চোখে কেমন, কার কানে কেমন শোনায়। আজীবন বিপ্লবী কবির কানে, বৃষ্টির শব্দ শোনায় চাপা গলায় রাজদ্রোহের আলাপের মতো। যেন কোনো বেইমানের ফ্যাঁকাসে উলঙ্গ পা স্যাঁতস্যাঁতে মাটিতে ধাবমান। নক্ষত্রহীন নিশুতি রাতে নাজিম হিকমত আমাদের নিয়ে যান সেরেজের বাজারে, যেখানে একটি গাছে ঝুলে আছে শেখ বেদরুদ্দীন! সেরেজের বাজার হাত দিয়ে ঢেকে আছে মুখ ! আহা শেখের উলঙ্গ দেহ, সে কি তবে রাজদ্রোহী ছিল! বাতাসের অন্ধতায়, বৃষ্টির বিষাদে হিকমতের কেন শেখ বেদরুদ্দীনকেই মনে পড়বে!
বাংলা কবিতায়ই আবার ফিরব, তার আগে মাহমুদ দারবিশের একটা বৃষ্টির কবিতা ঘুরে যাই।
ও হেলেন, কী বৃষ্টি! বৃষ্টির শব্দ আর হেলেনের সঙ্গ, এই দুই মিলিয়ে মঙ্গলবারের বেলা তিনটা হয়ে উঠেছিল স্তবগানের মতো। হোমারের কাব্য থেকে উঠে আসা হেলেনের শরীর থেকে রুটির গন্ধ, বৃষ্টিতে ধুয়ে কমে আসে। গ্রিকরা কত নিষ্ঠুর ছিল ওই সময়ে! হেলেন উত্তর দেয়, ট্রয়ে কখনও যুদ্ধ হয় নি! চারপাশে শুধু একটাই শব্দ, বৃষ্টির! কবিতার শুষ্ক বৃক্ষরাজির মধ্য দিয়ে, বৃষ্টি আর বৃষ্টি! আভিজাত্যহীন এশিয়ান রক্তের সঙ্গে একাত্ম হতে না পারা হেলেনের শিরায় ছড়িয়ে গেছে অভিশাপ। কবিতার শুরু হেলেনের সঙ্গ, প্রার্থনার মতো সঙ্গ, কত কিছু ছুঁয়ে, শেষে বৃষ্টি! আহ বৃষ্টি! আরব কবির বৃষ্টি নয়, আমাদের বৃষ্টি।
বৃষ্টির কথা মনে হলেই আমার ঝাঁপিয়ে আসে শৈশব। গ্রামের পরে বিল, বিল পেরিয়ে হাইস্কুল, স্কুলে প্রাণের বন্ধুরা।
কালিদাসের আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে তো গেলাম না, কিন্তু আব্দুল মান্নান সৈয়দের কাছে যাওয়া যায়। রাত বারোটায় কালো রাত্রি আলো-করা একটি ময়ূর, ভোর নিয়ে এল ধূমল ধূসর কালো অক্লান্ত বৃষ্টি। ইমেজের বৃষ্টি হয় শ্রবণে, দৃষ্টিতে; যেন সাত সুর গলে পড়ে হারমোনিয়াম থেকে।
আবার নোয়াই মাথা প্রকৃতির আশ্চর্য গণিতে মিথ্যার পাথর ফুঁড়ে গেজে ওঠে লক্ষ-লক্ষ ঘাস, স্তব্ধ, বোবা জুঁইগাছের প্রথম প্রকাশ।।
আষাঢ়ের প্রথম রাতে শুরু হওয়া বৃষ্টি, রাত পেরিয়ে, দিন পেরিয়ে গ্রীষ্মের পাহাড় বেয়ে নেমে এল যেন, মুঠো মুঠো হিরা-জহরত। দ্রিমিদ্রিমি সবুজ নহবত এক আষাঢ়ে শেষ হয়ে যায় না, ফিরে ফিরে আসে। বৃষ্টি তো ভালোবাসাই, তাকে আসতেই হয় ফিরে ফিরে। তার প্রেমের অমোঘ সংগীতে, ধরিত্রী পূর্ণ হয় আস্বাদে, আঘ্রাণে, রূপে, রসে।
মন মানে না বৃষ্টি হলো এত সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পরে আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল স্পর্শ করি জলের অধিকারে
উৎপলকে দূরে বসিয়ে রেখে, কবিতায় বৃষ্টি নামানো যায় না বেশিক্ষণ। আমার কেন জানি মনে হয় এই কবিতার নাম ‘নবধারা জলে’ রাখা ঠিক হয় নি। আরো সুন্দর নাম পাওনা ছিল এর। আরো আপত্তি আছে আমার। টানটান ছন্দবদ্ধ প্রথম ষোলো লাইনের পরে দ্বিতীয়, তৃতীত, চতুর্থ গদ্যকবিতা জুড়ে না দিলেই কি হতো না!
এত প্রিয় কবিতা বলেই এত আবদার।
বৃষ্টির পরের রোদের সকালে রেলব্রিজের তলে বাজার বসিয়ে দিলে, কত ছবি ছুটে যায় চোখের সামনে দিয়ে। সে কাদের গ্রামে এমন কাণ্ড ঘটতে দিয়েছে নবধারাজল!
পরের অংশ নিয়ে অভিমান কেটে যায়, ‘যখন এখনি যাবে কি তুমি?’ বলা হয়! অথচ বর্ষা আসে, আদিগন্ত একাকী মাঠের দৈর্ঘ্য কত—আবার নোয়াই মাথা প্রকৃতির আশ্চর্য গণিতে আর ভয়, ব্যাকুলতা সব একাকার করে বলা—এখনই কেন চলে যেতে হবে! মত্ত কোনো আঙুল, কার করতলে বিঁধেছিল আহা।
এবার বৃষ্টির ঝংকার শোনাই— এসো বৃষ্টি, এসো তুমি অতল ভূতলে রুদ্ধ স্তম্ভিত পাষাণে দীর্ঘ দগ্ধ প্রতীক্ষার পরে
এই শুরু! কবিটি বুদ্ধদেব বসু, এখানে, এই রকম আহ্বানই থাকার কথা। এক চরণে ছয় শব্দের পাঁচটাই বিশেষণ! দীর্ঘ দগ্ধ প্রতীক্ষায় বৃষ্টির ডাকার আগে তাকে যেন বিরহের মাত্রা বলা। সেই কবে থেকে তপ্ত নিশ্বাস ফেলছে পাহাড়, ধূমল অক্ষরে তার প্রতীক্ষার অবসান ঘটানোর আহ্বান—এসো। যেখানে যত শূন্যতা আছে, সব ভরাট হয়ে যাক ঝঞ্ঝার স্বরে। মাটি হয়ে যাক কোমল, জল শীতল, অগ্নি উদ্দীপ্ত উজ্জ্বল। চারদিক হয়ে উঠুক রূপসী, ছন্দময়ী—এসো বৃষ্টি!
অরুণ মিত্র একেবারে মন জয় করে কবিতার নাম রেখেছেন—‘বৃষ্টির দেশ থেকে এলে’। গদ্য কবিতায় বৃষ্টি, তবু কেমন মর্মে স্পর্শ করে বলে, কে বলেছে, বৃষ্টির কবিতায় খুব কাব্য লাগে, অতশত সুললিত শব্দ লাগে?
তুমি বৃষ্টির দেশ থেকে এলে। এই এতগুলো পাতা আমি জড়ো করেছি, এত ডালপালা। দ্যাখো তো এরা তোমাকে আগুন ছাড়া অন্য কথা বলে কিনা।
কী আছে এই তিনটা কথায়! কার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন! জড়ো করা ডালপালার সামনে দাঁড়িয়ে এই ধাঁধার জবাব খুঁজতে হবে যেন। ‘তুমি হয়তো বুঝবে, মানুষের লক্ষণগুলো তুমি হয়তো ঠিক ঠিক জেনে এসেছ।‘ বৃষ্টির দেশ থেকে যে এসেছে, তার তবে মানুষকে ঠিক ঠিক চেনার কথা! আরো আরো অনেক কিছু জানার কথা তার—মৌসুমকে, ফলনকে। একবার সে তার জলছোঁয়া হাতে মাটিকে আদর করে দিলেই, নতুন করে তৈরি হবে সব।
বৃষ্টির কথা মনে হলেই আমার ঝাঁপিয়ে আসে শৈশব। গ্রামের পরে বিল, বিল পেরিয়ে হাইস্কুল, স্কুলে প্রাণের বন্ধুরা। সকালের বৃষ্টি, আলপথের সাথে খুব দোস্তি পাতিয়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিত। বারবার খোলা আকাশের নিচে হাত পেতে পরীক্ষা করে, স্কুল টাইম পেরিয়ে গেলে, তবে মন খারাপ সরিয়ে দিয়ে, বৃষ্টিকেই বন্ধু বানিয়ে খেলা হরেক রকম। আর বন্যা এলে তো কথাই নেই। বিল তখন খেলার মাঠ, নৌকা হলে তো বড়ই ভালো, নাহলে কলাগাছের ভেলা, সেও তো সাত রাজার ধন।
কেউ আর ডাকিবে না
বৃষ্টির কবিতায় জোর করে রবীন্দ্রনাথকে সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু মৃত্যুর কবিতায় তিনিই এসে যাচ্ছেন সবার আগে।
মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।
মরণকে শ্যামের সমান বলছে বটে, কিন্তু রাধা আসলে শ্যামবিরহের যাতনা ভুলতে মৃত্যুকে কাছে ডাকছে। নির্দয় মাধব যদি রাধাকে ভুলে যায়, তখন মরণকেই তার সেই সখা মনে হয়, যে কখনও তার বিপক্ষে যাবে না। মৃত্যুর বাড়িয়ে দেওয়া দুহাতের মধ্যে নিজেকে সমর্পণ করে শ্যামের আলিঙ্গনই যেন পেতে চায় রাধা। মরণের অতুল পরশে সে ঘুচিয়ে দিতে চায় সকল অসহনীয় যন্ত্রণা। বাঁশি বাজিয়ে বাজিয়ে মৃত্যু তাকে ডাকুক—রাধা রাধা। মৃত্যুর অভিসারে যেতে তাকে সেই ভয় পেতে হবে না, যা তাকে অষ্টপ্রহর ভীত করে রাখে।
মৃত্যুর জন্য রাধার এই আকুলতা দেখে যেন ভয় পেয়ে গেলেন ভানুসিংহ। রাধাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, ভয় দেখিয়ে, গালি দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। ছি ছি রাধা, কী বলছ তুমি? শান্ত হও, বড়ই অস্থির হয়ে আছ তুমি! মাধব তো মরণের চেয়ে প্রিয়! মরণকে তার বিকল্প কিভাবে ভাবা যায়! ভালো করে ভেবে দ্যাখো, শ্যাম আর মরণ কি সমান হতে পারে? নাকি শ্যাম যা দিতে পারে মরণের সাধ্য আছে তা দেবার! শান্তি পাওয়ার আশায় মৃত্যুকে ডেকে নিলে, শ্যামের প্রেম আর জীবন দুই থেকেই বঞ্চিত হতে হবে যে!
রবীন্দ্রনাথের রাধাশ্যামমৃত্যু এই ত্রিমুখী টানাটানি থেকে বেরিয়ে যাই।
কাহলিল জিবরান আমাদের অপেক্ষায়।
সব চলবে ঠিকঠাক, শুধু আমি থাকব না, এই হাহাকারই মানুষকে বারবার ফিরে আসার লোভ দেখায়।
মৃত্যুর সামনে এসে আমরা হতবাক হয়ে যাই, পেছনে তাকিয়ে যখন জীবনও আর দেখা যায় না। মনে হয়, এক জীবনে অনেক রকম করে বাঁচা যায়, কিন্তু মরণও কি অনেক রকম? নাকি মরণ এক রকমই? জীবনের বাঁকবদল আছে, উত্থান-পতন আছে, প্রেম-অপ্রেম আছে। কিন্তু মৃত্যু যেন কেবল ‘শেষ’ শব্দটাই শোনায়। কিন্তু জিবরান আমাদের নিয়ে গেছেন সেই আলোতে, যেখানে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েই মৃত্যুকে চেনা যায়।
নিশাচর প্যাঁচা যেমন জানে না দিনের আলোর রহস্য, তেমনই অজানা থেকে যাবে মৃত্যুর রহস্য, যদি জীবনকে না জানা হয়।
নদী যেমন সমুদ্রে মেশে, জীবনও তেমনি মৃত্যুতে একাকার হয়ে যায়। তুষারে ঢাকা বীজের স্বপ্নের মতো, অন্য এক বসন্তের স্বপ্নের মধ্যেই আছে জীবন ও মৃত্যুর মীমাংসা।
সম্রাটের সামনে সামান্য এক রাখাল বালকের মতো মৃত্যুর ভয়ে ভীত আমরা, কিন্তু রাজদর্শনও তো দারুণ রোমাঞ্চকর। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে তো জীবনের অবিরাম ছুটে চলা থেকে মুক্তি। এর পরেই আছে বাধাবন্ধনহীন অনন্ত ভুবন, যেখানে স্রষ্টার সঙ্গে মিলিত হওয়ার অপার সম্ভাবনা।
মৃত্যু যেন বাতাসে মিশে যাওয়া কর্পূর, প্রখর রোদে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়া।
নিস্তব্ধতার নদী থেকে তৃষ্ণা মিটলেই সুরে ভরে যাবে দশদিক, পর্বত শিখরে পৌঁছে গেলেই, শুরু হবে প্রকৃত যাত্রা। মাটি যখন ফিরিয়ে নেবে আমাদের, তখনই একেবারে শূন্য হয়ে নাচতে পারব, সত্যিকারের নাচ। মৃত্যু তো একদিন আসবেই, সবাই জানে, তাহলে তার মুখোমুখি হওয়া কেন এত রোমাঞ্চকর! রোমাঞ্চকর কারণ, সেই বিশেষ দিন কখন আসবে, কিভাবে আসবে জানে না কেউ। যাবতীয় জাগতিক যন্ত্রণার অবসানের কথা ভাবলেও, মৃত্যু হয় পরম বন্ধু।
ফয়েজ আহমদ ফয়েজ মৃত্যু নিয়ে একদম মূল কৌতূহল দেখিয়েছেন। মৃত্যু তো একদিন আসবেই, কিন্তু কিভাবে আসবে? না চাইতেই পাওয়া প্রথম চুম্বনের মতো আসবে হয়তো; যে চুমুতে খুলে গিয়েছিল সমস্ত জাদুর দরজা। দূরে কোথাও অজানা গোলাপ বসন্ত, হঠাৎ ব্যাকুল হয়েছিল পূর্ণিমার বুকে। নক্ষত্রের শব্দ ভেসে আসা রাতে কোলাহলহীন পথিকের মতো, আধ ফোটা কলিতে আদিগন্ত সবুজ ভোরের মতো মায়াময় হয়ে আসতে পারে মৃত্যু।
খুব সুখের বা অনাবিল শান্তির মতো মৃত্যু আসবে, এটা ভেবে নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যায় না। বিপরীতটাও ভাবনায় এসে যায়। মৃত্যু আসতে পারে রুদ্ররূপে। ধারাল তরবারি হাতে ভয়ানক ঘাতক হয়ে আসতে পারে মৃত্যু। হয়তো তীক্ষ্ণ কোনো ক্ষুর, ঘ্যাচাং করে কেটে দেবে শিরা। তীব্র চিৎকারে, অসহনীয় ব্যথায় বরণ করতে হবে দস্যুর মতো মৃত্যুকে। মৃত্যু আসুক ঘাতকের মতো বা প্রেমাস্পদের মতো, তাকে সমস্ত যন্ত্রণার পরিণতির জন্য কৃতজ্ঞতার সাথে মেনে নিতে হবে।
আসতে পারে গৌরবের মৃত্যুও। দুনিয়ার সব অসাম্য দূর করতে, সাম্যের লড়াইয়ে যেতে পারে প্রাণ।
ফাঁসির দড়ির কণ্ঠহার পরে যারা গাওয়ার, প্রতিদিন গেয়ে গেল শেকলের নূপুর বাজিয়ে আহা একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।
জীবনানন্দকে দূরে রেখে বেশিক্ষণ কবিতায় মৃত্যু নিয়ে কথা বলা যায় না।
সব ভালোবাসা যার বোঝা হল, দেখুক সে মৃত্যু ভালোবেসে !
এবার! এই কথা বলে বসলেন তিনি। ধূসর পাণ্ডুলিপির ছায়াতলে নিয়ে গিয়ে জীবন শিরোনামের ধোঁকায় একের পর এক দেখালেন, শোনালেন মৃত্যুনৃত্যগীত। সব সাধ মিটে গেলে, সকল মাটির গন্ধ আর নক্ষত্রের সব আলো পাওয়া হয়ে গেলে, মৃত্যুকেও ভালোবেসে ফেলতে হবে। জেগে জেগে যা জানার জানা হয়ে গেলে, বাকি জানা জানতে হবে ঘুমের অতলে। কিংবা জীবনেরে একবার এইভাবে ভালোবেসে দেখি, কোনভাবে? মৃত্যুকেও ভালোবাসার নিশ্চয়তায়।
পৃথিবীর পথে নয়, এইখানে, ধ্যান পেরিয়ে স্বপ্ন, ধ্বসে যাবে মন, ছিঁড়ে যাবে দেহ, অন্ধকারে আকাশ কথা বলে উঠবে, তারপর সব গতি থেমে যাবে—মুছে যাবে শক্তির বিস্ময়।
কেউ আর ডাকিবে না,—এইখানে এই নিশ্চয়তা !
এই হলো মৃত্যু, কেউ আর ডাকবে না। তবে মৃত্যুকেও ডাকা যায় সেই ব্যথা আর আকাঙ্ক্ষার অস্থিরতা নিয়ে। ডাকা যায় প্রিয়ের নাম ধরে।
মৃত্যুর পরে মানুষ, মানুষই থাকে। মৃত্যুদিনের আগে যে জীবনেরা ভিড় জমিয়েছিল, তারা মরে যায়, প্রতিটি মানুষ তার নিজস্ব সত্তা নিয়ে অন্ধকারে হারায়। তবু কখনও কখনও আজকের আলোর ভিতরে, আজকের মানুষের সুরে উঠে আসে অতীতের মানুষেরা, ইতিহাস হয়ে। একান্ত স্মৃতি হয়েও। কবেকার প্রেম, হাহাকার, যুদ্ধ, বুদ্ধ, প্রাচীন প্রাসাদের প্যাঁচানো সিঁড়ি, মাটির অতলে ঘুমিয়ে থাকা শহর, আঁধারকে করেছে শানিত।
কুসুমকুমারী দেবি যে ছেলের নাম রেখেছিলেন জীবনানন্দ, সেই ছেলে মরণকে যেভাবে চিনেছেন, চিনিয়েছেন—এমন আর পারে নি কেউ।
আরেক মৃত্যু আছে, পুনর্জীবনের মায়াস্পর্শ নিয়ে যে মৃত্যু অস্বীকার করে মাত্র একবার মরা। আবার ফিরে এসে পৃথিবীর রোদে গাওয়া হবে প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে। মৃত্যু নয়, মৃত্যু নয়, মরণের অন্য মানে আছে—লোকশ্রুত ল্যাজারসের মতো, তিন দিন কবরে থেকে আবার ফিরে আসা। আবার ফিরে আসার আশা মানুষের সেই অতৃপ্তি, ভাস্করের অসম্পূর্ণ মূর্তির মতো। মৃত্যুর ক্ষমাহীন অন্ধকারকে মানুষের বরাবর ভয়। ফিরে এসে আবার মরে যাওয়া—এই চক্রে জীবন মৃত্যুকে আটকে ফেলতে চায় মানুষ।
একদা যে-নদী নীলিমাকে ভালোবেসে চেতনায় নিপুণ শিল্পীর মতো গড়েছে নিবিড় দুই তীর তাকে আর পাবোনাকো দৃষ্টির রেখা দীপ্ত, প্রাণে হবে না মুখর ঝরনা বসন্তের বিফল সম্ভাসে
সব চলবে ঠিকঠাক, শুধু আমি থাকব না, এই হাহাকারই মানুষকে বারবার ফিরে আসার লোভ দেখায়।
শামসুর রাহমানই আবার বলেছেন একেবারে অন্য মৃত্যুর কথা। বরাদ্দ আয়ুটুকুও যখন ফুরাতে চায় না—কেন তবু থাকে আরেক আগামীকাল! ছটফট করতে করতে বলা—কেন এখনই শেষ হয়ে যায় না জীবন! শয্যাত্যাগ, প্রাতরাশ, বাস, ছয় ঘণ্টার কাজ, আড্ডা, খাদ্য, প্রেম, ঘুম, জাগরণ; সে-একই সোমবার, মঙ্গলবার, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি! সেই নেংটি ইঁদুরের মতো গর্তে ঢুকে পড়া। ক্লান্তিকর একঘেয়ে চক্র থেকে মুক্তির জন্য হাতে উঠে আসা বিশ্বস্ত খুর গলায় ছোঁয়ালে অথবা সামান্য কয়েক ফোঁটা বিষ কণ্ঠ বেয়ে নেমে গেলে, সব যন্ত্রণার তাৎক্ষণিক অবসান। বারবার ফিরে আসতে চাওয়ার অতৃপ্তি আর বরাদ্দ আয়ুটুকুও না টানতে চাওয়া, কী তফাত—এই দুইয়ে? জীবনে জীবনে কি এমন ফারাক?
বস্তুত, একটা মানুষ কতোদিন বাঁচে? হাজার দিন? না, শুধুই একটি দিন? এক সপ্তাহ? না কয়েক শতাব্দী? কতোদিন পর্যন্ত একটা মানুষ মরতে খরচ করে? কী মানে হয় ‘চিরকালের জন্য’ কথাটার?
এই যে প্রশ্নে প্রশ্নে ক্লান্ত করে ফেললেন, পাবলো নেরুদা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবটাই জীবন নয়। সামান্য কিছু মুহূর্তই কেবল জীবন। বাকিটুকু কেবল মৃত্যুর দিকে যাওয়া, জীবনপরিক্রমা শেষে বয়েস বাড়িয়ে মরে যাওয়া।
দারিদ্র্য নজরুলকে মহান করেছে, হায়! ক্ষুধার কাছে নিচু হয়ে যায় উঁচু মাথা।
আবার মৃত্যুর কথা ভাবলেই, কেবল যে মরে যাবে তার কথা ভাবলেই হয় না, যারা র’য়ে যাবে, তাদের শূন্যতা, তাদের বেদনা, তাদের ভুলে যাওয়া—এত সব কিছু একটা মৃত্যুকে ঘিরে। যখন প্রিয় কেউ মরে যায়, যে যায় সে তো যায়, যারা বেঁচে থাকে—তারা মৃত স্বজনকে ফের নতুন করে ভালোবাসে। যেন মৃত মানুষটি আবার বেঁচে ওঠে প্রিয়জনের অন্তরে। আর দ্বিগুণ বেদনায় দেখতে পায়, ধীরে ধীরে ভুলে যাওয়া। দ্বিতীয় মৃত্যুর বেদনা কেবল এক তরফা।
আরেক মৃত্যু আছে—মৃত্যুক্ষুধা, ক্ষুধায় মৃত্যু। এই যে যুদ্ধের দুনিয়ায়, বিতাড়িত বুদ্ধ, এই দুনিয়ায় মানুষ শুধু মরে যায় না, আরো আরো প্রাণী, এমনকি গাছও মরে যায়। যাদের জীবন নেই ভাবি, তারাও মরে ক্ষুধায়।
চল-পথে অনশন-ক্লিষ্ট তনু, কী দেখিয়া বাঁকিয়া ওঠে সহসা ভ্রূ-ধনু, দু’ নয়ন ভরি’ রুদ্র হানো অগ্নি-বাণ, আসে রাজ্যে মহামারী দুর্ভিক্ষ তুফান, প্রমোদ-কানন পুড়ে, উড়ে অট্টালিকা- তোমার আইনে শুধু মৃত্যু-দণ্ড লিখা!
দারিদ্র্য নজরুলকে মহান করেছে, হায়! ক্ষুধার কাছে নিচু হয়ে যায় উঁচু মাথা। সঙ্কোচ, শরম সব ভুলে কেবল ভয়াল ক্ষুধার হাত মৃত্যু পর্যন্ত যেন না আসতে পারে—সেই চেষ্টা। বারবার মনে হয়—পৈশাচিক সুখে মৃত্যু-যজ্ঞ আসছে, নিত্য অভাবের আগুন নিয়ে।
সর্বহারার একটি ক্ষুদ্র মাটির পাত্র ভরা অভাব, হীরা নাই জহরত নাই, তবু আসে জরা, মৃত্যু আর সিঁদেল চোর।
অনেক লাশ পেরিয়ে এসেছিল আমাদের স্বাধীনতা। এখনো তাই বাতাসে লাশের গন্ধ, মাটিতে মৃত্যুর নগ্ননৃত্য। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের কখনও ভুলতে দেন না সেই দুঃস্বপ্নের দিনরাত। তন্দ্রার ভেতরে সে রক্তাক্ত সময়ের চিৎকার, বিভীষিকা হয়ে ফিরে ফিরে আসে। এ দেশ কি ভুলে যাবে সেই সব দুঃসহ মৃত্যুর মিছিল! অতশত মৃত্যু পেরিয়ে যে পতাকা উড়েছিল, সে-পতাকা তলে দাঁড়িয়ে মনে পড়বে না, কত দাম দিয়ে কিনতে হয়েছে তাকে? বারুদে সাজানো বর্ণমালায় লেখা—স্বাধীনতা হায়, আনে নি মুক্তি।
বন তুলসীর পাশে বসে, ঘাসের রিং বানিয়ে উড়িয়ে দেওয়া বেলুনময় শৈশব, নিমপাতার খাঁজকাটা প্রান্তে লেগে কেটে যাওয়া বাতাসের মতো কৈশোর বা খুব নির্জন রেলস্টেশনের, মাকড়শা জাল ভরা টিকিট ঘরের মতো যৌবন—মৃত্যুশয্যায় কী মনে পড়ে মানুষের? নাকি শুধু এই জানা হয়, একটা জীবনে অনেকরকম বাঁচা যায়, মৃত্যু হয়তো একরকমই। কিংবা কে জানে, মৃত্যুও হয়তো একের জনের একেক রকম। কিন্তু যতক্ষণ জীবন থাকে ততক্ষণ তার বদলের আশা থাকে, মৃত্যু তো সেই আশার শেষ আসলে।