যে যার হুইল চেয়ারে—যেভাবে

একটি জীবনের অধিকাংশ কাটানো হলো। এখন আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই আর। এখন আমি পরিবেশ বান্ধব যেমন, তেমন জীবন বান্ধবও অনেকটাই। আমার অ্যালার্জি নেই, সর্দি-কাশি-জ্বর অথবা পেটের পীড়াও। বস্তুত, রোগ-শোকহীন আমি ভালোভাবেই টিকে আছি, এমনকি এগিয়েও। শুধু মাঝে মাঝে পায়ুর ব্যথা জানান দেয়, হজমশক্তি কমে এসেছে, আর যৌনশক্তির সংশয় যেমন সাদিয়া থেকে দূরে রেখেছে, তেমন পরনারী থেকেও নিরাপদ অবস্থানে থাকার উৎসাহ জুগিয়েছে, প্রবল। এখনও আমি ঘড়ি না দেখেই বলে দিতে পারি সঠিক সময়। বলে দিতে পারি আকাশের হাল-হকিকত, বৃষ্টি-বাদলা, ঝড়ের আভাস। এমনকি সাদিয়া কখন, কোথায় ঘুমিয়ে পড়বে কিংবা জেগে উঠবে তাও; আর ও রমণীয় ভণিতায় আমাকে একইসাথে আশ্বস্ত ও বিভ্রান্ত করতে করতে নিশ্চিত করবে যে, ওকে চিনতে বা বুঝতে যে সমঝোতার প্রয়োজন ছিল না কখনও, তা আবশ্যক হয়ে পড়ায় পাশের ফ্লাটের মিসেস রহমান কিংবা তার ষোড়শী কন্যা, এমনকি আশে-পাশের অনেকেই নিশ্চিত হয়েছে, আমি বিপন্ন হয়ে পড়েছি, আর আমার এই বিপন্নতার মাঝে যে দারুণ সংশয় রোজ ঘাপটি মেরে ঘুমিয়ে থাকে অলস বেড়ালের মতো, তাকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই তাদের কার্য সামাধা হবে, ফলে, আমার এই সতের তলার চৌদ্দশ’ স্কয়ারফুটে অনেক সতেজ বাতাস, স্বপ্ন ও রং না কি সবসময় খেলা করে—এই তথ্যটি এখন সবার মুখে মুখে।


আমার মনে হয়, সাদিয়াকে বিয়ে করা ছিল জীবনের চরমতম ভুল, আর মিসেস রহমানের মতো নারী বিছানা-সঙ্গী না হলে যৌনতার সকল আনন্দই বৃথা।


এসব আসলে আমার অকার্যকর মস্তিষ্কের সবচেয়ে অনুর্বর ভাবনাগুলোর অন্যতম, যখন আমি নিশ্চিত নই, সাদিয়া আজ ফিরবে কি না, আর মিসেস রহমান অথবা তার মেয়ে বারবার এসে আপন মানুষের মতো খোঁজ নিয়ে যাবে, বসে বসে রাজ্যের যত অনর্থক গল্প শোনাবে আয়েশ করে, চা বানিয়ে খাওয়াবে, কিংবা নিজের রান্না করা ভালো তরকারি পাতে বেড়ে দিতে দিতে রাতে থাকার বা থেকে যাবার প্রস্তাব দিয়ে বসবে। আমি সাদিয়ার উজ্জ্বল মুখ ভাবি, খোলা বুক, যা এই চল্লিশে খানিকটা নিচের দিকে ঝুঁকে এসেছে, কিংবা ভরাট নিতম্ব। এসব ভাবতে ভাবতেই কেন জানি ঘুম পায়, হয়তো বা খানিকটা ঢলেও পড়ি, যা দেখে ওদের দয়া বা করুণা কিছু একটা হয়, এবং আমাকে বিছানায় যাবার অনুরোধ করে ফিরে যাবার সময় জানিয়ে দিতে ভুল করে না, আমি বিবাহিত সেই করুণ প্রজাতি, যার প্রসারণক্ষম এক-পিণ্ড মাংস আছে, যা বহুদিন কার্যহীন রয়েছে, এবং তাকে যথাযথভাবে প্রসারিত হতে দিলেই আমার সার্থক মুক্তি, তা সে মা হোক অথবা মেয়ে। আমি উদ্বুদ্ধ হই মনে মনে, আবার ঘুমের মধ্যে ঢলে পড়তে পড়তে চমকে উঠি এই ভেবে, সাদিয়া ফিরে এসেছে, হয়তো আজও জলদি ফিরেছে, ভোর থাকতে থাকতেই, যেমন ও মাঝে মাঝেই করে। অথচ আমার বিপন্নতা আমাকে সার্বিকভাবে গ্রাস করে জানান দেয়—অনেক রাত হলো, এবার ঘুমিয়ে পড়তে হবে।

মিসেস রহমান বলে, ‘আপনি একটা শিশুর মতো, যতবার দেখি ততবারই মনে হয় চুমো খাই। আমার মেয়েটিরও একই ধারণা আপনার সম্পর্কে। অবশ্য আমি ওকে শাসন করেছি, কিন্তু মানুষের পছন্দ-অপছন্দের উপর তো আর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি না।' আমি নির্বোধের মতো তাকিয়ে থাকি ওর নগ্ন কাঁধের দিকে। নারীর কাঁধ এত সুন্দর হতে পারে, অন্তত ও-কে না দেখলে বুঝতাম না। হাতাকাটা ব্লাউজ আর হালকা কলাপাতা রঙে সোনালি সুতোয় কাজ করা শাড়িটা পরে মাঝে মাঝে যখন ও সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে হালকা করে নাচায়, আমার মনে হয়, সাদিয়াকে বিয়ে করা ছিল জীবনের চরমতম ভুল, আর মিসেস রহমানের মতো নারী বিছানা-সঙ্গী না হলে যৌনতার সকল আনন্দই বৃথা। আমার মনোভাব বোঝা খুব কঠিন নয় ওর পক্ষে, যেহেতু এর আগেও ও কয়েকবার পুরুষ বদলেছে, এবং বর্তমান স্বামীর প্রতি ওর চরম উদাসীনতা ও অবজ্ঞা প্রমাণ করে, বিছানা-সঙ্গী হিসেবে এর চেয়ে চমৎকার নারী সচরাচর মিলবে না। প্রেম-ভালোবাসা কিংবা বিয়ে থেকে যে যৌনতা, আর সাদিয়া যেভাবে আমাকে বুঝিয়েছে, তা বুঝতে গিয়ে দেখেছি, আমার অভ্যাস ও রুচি দুটোই বদলেছে, এবং রোজ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে প্রেম-ভালোবাসা নয় বরং ঘর্মাক্ত শরীর জুড়ে ছেয়ে থাকা ক্লান্তির যে আবেশ আমাকে প্রশান্তির নামে সংসারের এই গুমোট বেড়াজালে যা উপহার দেয়, তার জন্য সাদিয়া নয় মিসেস রহমানই শ্রেয় এবং সঠিক।

মিস্টার রহমানের হুইল চেয়ারটি আমার খুব পছন্দের। কয়েকদিন উনার হুইল চেয়ার পেছন থেকে ঠেলে দেখেছি, ধীরে ধীরে, তার স্ত্রী ও কন্যা দু’জনের সাথেই শুয়ে পড়ার তীব্র ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠছে। একজন অথর্ব মানুষের সাথে আরেকটি অথর্ব মানুষের জীবন ও বোধের দারুণ সামঞ্জস্য রয়েছে, সেই সাথে রয়েছে অদৃশ্য টান। মিসেস রহমান অথবা তার মেয়ে, এদের যে কারও সাথেই শুয়ে পড়তে এখন আর দ্বিধা নেই কোনো, শুধু ঠিক করতে পারছি না কার সাথে আগে ঘুমালে ব্যাপারটা বেশি আকর্ষক ও স্বস্তির হবে। যতবারই ভাবি ষোড়শীকেই প্রাধ্যান্য দেয়া যথাযথ, তখনই মিস্টার রহমানের হুইল চেয়ার ও মিসেস রহমানের কাল্পনিক অভিমানী মুখ ভেসে ওঠে। আমি দ্বন্দ্বে পড়ে যাই এবং গত তিন বছর যে ঘুমন্ত মানুষটির সাথে আমার বসবাস, কিংবা বলা যেতে পারে, যে ঘুমন্ত মানুষটি আমার মধ্যে বসবাস করে, সে আমাকে বিভ্রান্ত করে। আপাত দৃষ্টিতে দুটো বাক্য একই অর্থ প্রকাশ করতে চাইলেও, আমি নিশ্চিত করছি, মানুষটির সাথে আমার বয়সের পার্থক্য কম করেও কুড়ি বছর এবং যখন সে আমার সাথে থাকে, তখন কেউ কারও বয়স নিরূপণ করতে পারি না, অথচ যখন নিজের মধ্যে তাকে টের পাই, খুব স্বাভাবিকভাবেই বলতে বাধ্য হই, একটি জীবনের আরও কিছু অংশ আমি কাটাতে চাই। অবশেষে মিসেস রহমানকেই আমার সাধু মনে হয় এবং সাদিয়ার দ্বিতীয় মাতৃত্ব সেলিব্রেট করার জন্য আমার যাবতীয় ইচ্ছা অস্থির হয়ে ওঠে।


আমাদের চোখাচোখি হয়, আর তিনি প্রথমবারের মতো তার স্নিগ্ধ হাসি ও উদারতা আমাকে উপহার দিয়ে ব্যালকনি থেকে লাফিয়ে পড়েন নিচে।


এই চৌদ্দশ’ স্কয়ারফিটের বাতাস প্রতিদিন আমাকে হত্যা করে, আর সাদিয়াকে বাঁচিয়ে তোলে একটু একটু করে। সপ্তাহান্তে অথবা কখনও মাস শেষে ও ফিরে এলে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি, অলক্ষ্যে। এই মধ্য চল্লিশেও ও কত বেশি সুন্দর। এখনও নিয়ম মতো ব্যায়াম করে, খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সচেতন, আর বরাবরের মতোই এত চমৎকার ব্রা পরে যে, নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারি, মিসেস রহমান ও তার মেয়ে উভয়েই ও-কে ঈর্ষা করে। আমি আমার অবস্থান শূন্য হয়ে ভাবি, ও-কে এখনও প্রেমে প্রস্তাব করা যেতে পারে, যা শুনে ও অবশ্যই হেসে উঠে জানাবে, ‘তোমার এই অর্থহীন আবেগ আমাকে আর যাই হোক গর্ভ দিতে পারবে না কখনও, আর আমি মা হতে চাই যে কোনো মূল্যে।’ গোপন সংশয় আমাকে শান্ত করে ও দূরে রাখে এবং ও যতক্ষণ বাড়ি থাকে ততক্ষণ আমাকে ওর চোখের আড়ালে থাকতে হয়, পাছে চোখাচোখি অথবা মুখোমুখি হয়ে পড়ি, আর ও অবজ্ঞা ভরে জানিয়ে দেবে, ওর জীবনে আমার প্রয়োজন খুব সামান্য, যা অনেক আগেই ফুরিয়েছে। আমি আমার সাথের ঘুমন্ত মানুষটিকে এইসব বলে রাখি, আর সে আমাকে সান্ত্বনা দেয় এই বলে, ‘সবকিছুই বদলে যাবে দেখো, আর যখন আমি জেগে উঠব, তখন তুমিও মেনে নেবে সব স্বাভাবিকভাবে, যেন বা এই দারুণ জেগে উঠার অপেক্ষাতেই তোমার জীবনে নতুন বিশ্বাস ফিরে আসবে, যেখানে তুমিও বাতাস নেবে প্রাণ ভরে।’

সাদিয়ে চলে যায়। ওর ক্রমশ উঁচু হতে থাকা পেট আমাকে এক ধরনের শান্তির মধ্যে ডুবিয়ে রাখে, আর হয়তো ওই আপাত শান্তিটুকুই আমার শেষ পাওনা বলে আমাকে তা দিতে এভাবে ফিরে ফিরে আসে এবং সজাগ রাখে। হয়তো এভাবেই কেটে যেত বাকি সময়, হয়তো এভাবেই ফুরিয়ে যেত এই সতেরো তলার সমস্ত সতেজ বাতাস। একটা অসুস্থ ফুসফুস বা প্রাণ যত সতেজ বাতাস-ই গ্রহণ করুন না কেন, একসময় না একসময় তা অকেজো হতে বাধ্য। সাদিয়ার প্রাণ ছেঁড়া হাহাকার ও দ্বিতীয় সন্তানের লাশের গন্ধে ভারী হওয়া বাতাস, আর মিসেস রহমান ও তার মেয়ের নতুন গর্ভ সম্ভাবনার মধ্যে দেখি, পাশাপাশি দুই ব্যালকনিতে আমি ও মিস্টার রহমান নিচের দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে, যেন বা জীবনে প্রথমবার মাটির পৃথিবী একদম চলে এসেছে আমাদের ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে এবং তা ধরার জন্য দু’জনেই উদ্‌গ্রীব তাকিয়ে, নিচে। হঠাৎ আমাদের চোখাচোখি হয়, আর তিনি প্রথমবারের মতো তার স্নিগ্ধ হাসি ও উদারতা আমাকে উপহার দিয়ে ব্যালকনি থেকে লাফিয়ে পড়েন নিচে। শূন্যে হুইল চেয়ার ছিটকে সরে যায় পেছনে, আর আমি ওপারের ব্যালকনিতে ছুটে আসা মা-মেয়ের চিৎকার ও আর্তনাদ উপেক্ষা করে ওদের খুব চেনা ও আপন পেটের দিকে তাকিয়ে অনুভব করি—মিস্টার রহমানের পরিত্যক্ত হুইল চেয়ারটি সত্যিই আমার ভীষণ পছন্দের।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.। প্রকাশিত বই...বিস্তারিত

এই লেখকের সব লেখা