সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ : আত্মপরিচয়ের সন্ধানে যাত্রা

‘চাকার আবর্তনে আবর্তনে অপরিচিতি থেকে পরিচয় ক্রমে গাঢ় ও অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। চাকা যত পথের ভেতরে প্রবেশ করেছে লাশটিও ওদের অন্তরের ততদূরে ভেতরে চলে গেছে* সঙ্গে থাকতে থাকতে সঙ্গী হয়ে ওঠে মৃত।’—নাটকের গল্পে যেমন লাশের ঠিকানা সন্ধান মূল উপজীব্য তেমনি নাট্যাখ্যানটি রচনার মধ্যেও বাঙালি জাতিসত্তার নাট্যসংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের সূত্রের সন্ধান প্রতীয়মান। সংলাপপ্রাধান্য-দ্বন্দ্বমুখরতা প্রভৃতি ইউরোপীয় নাট্যগুণের বিপরীতে হাজারের বাঙালির বহমান নাট্যসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যে ‘চাকা’ নাট্য হিসেবে স্বতন্ত্র। প্রাচীনকালের কথাসরিৎসাগর ও বাংলার পালানাট্য রচনারীতির মতো এ নাট্যের শরীর। নাট্যকার বেদনা সহমর্মিতার যুগল মন্থনে পাঁচটি দিবসে এ নাট্যকলামালার উদ্ভাবন করেছেন। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে নাটকটি প্রথম গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এটি ঢাকা থিয়েটার; যুক্তরাষ্ট্রের এন্টিয়ক থিয়েটার, ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক বিভাগ, বুনন থিয়েটারসহ অসংখ্য দল প্রযোজনা করে। ‘চাকা’ নাট্যাখ্যানের গল্প নিয়ে মোরশেদুল ইসলাম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। আমরা এই আলোচনায় ‘চাকা’ নাটকের ভেতর দিয়ে কিভাবে সেলিম আল দীন বাঙালি নাট্যসংস্কৃতির আত্মপরিচয়ের সূত্র সন্ধান করেছেন তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত পরিসরে ব্যাপ্ত থাকব। সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাট্যাখ্যানের প্রেক্ষিতের ভাবনাগুলোর স্বরূপ অনুসন্ধানই এ লেখাটির অভীষ্ট।


রচনারীতির দিক থেকে নাট্যকার হাজার বছরের বাঙলার যে রচনারীতি তাকেই গ্রহণ করেছেন।


‘চাকা’ শব্দটি গ্রামীণ জীবনে অতিপরিচিত একটি শব্দ। চক্র যানবাহনে পরিবহনে ব্যবহার হয় এ শব্দটি। একটি বৃত্তাকার যন্ত্রাংশ। কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত অক্ষ বরাবর এটি ঘুরতে ঘুরতে যানবাহনটি এগিয়ে চলে। প্রতীকী ধারায় এটাও বলা যায় যে সভ্যতার শুরু হয়েছে মানুষের চাকা আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। নাটকের গল্পে একটি অপরিচিত মৃত লাশকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দেবার জন্য চাকানির্ভর যে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়েছে তার গন্তব্য পৌঁছার প্রতীকে নাট্যকার নাটকটির নামকরণ করেছেন ‘চাকা’। নাট্যকার নিজেই বলেছেন, ‘তিনটি লম্বকে এই নাট্য কথামালা বিবৃত হয়েছে* প্রতি লম্বকে আছে বিষয় ও বাঁকের তরঙ্গ* কিন্তু কখনও কোথাও গল্পে বর্ণিত পথের চাকার ধ্বনি মিলায় না* এমনকি এই ধবলরক্তিমাভ কথায় বিধৃত চাকা...।’ [কথামুখ, চাকা

‘চাকা’ নাটকটি রচনার পেছনে একটি রাজনৈতিক ঘটনার প্রভাব রয়েছে। ১৯৮৭ সালের দিকে যখন বাংলাদেশে স্বৈরাচার পতনের আন্দোলন চলছিল তখন নূর হোসেন নামের প্রায় অচেনা অজানা এক যুবক বুকে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে রাস্তায় নেমেছিলেন। তিনি স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। নূর হোসেন ১০ নভেম্বর আকস্মিকভাবে পুলিশের গুলিতে মারা যান। এ ঘটনাটি নাট্যকার সেলিম আল দীনের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। এ লাশের দায় কে নিবে? এই অজানা অচেনা যুবকের লাশটির কী হবে? কিভাবে পৌঁছে দিবে তার স্বজনের কাছে? রাষ্ট্রের এমন বিমূঢ় ঘটনায় নানাভাবে আন্দোলিত হয়ে ওঠেন নাট্যকার। নাটকটিতে নানা উক্তি, নানা বর্ণনায় সে-শঙ্কার রূপই প্রতিভাত হয়ে ওঠে। নাটকটিতে যখন বলেন—‘শহর থেকে একটি সরকারি লাশ এসেছে’, ‘কল্যাণমূলক রাষ্ট্র মানেই লাশের গন্তব্যে লাশকে পৌঁছানো’ বা ‘নয়ানপুর কলেজের ছাত্রী রেহানা (১৯) যে ছেলেটাকে ভালোবাসে গোপন একটি রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করে’, কিংবা ‘এখন করুণা জাগে তাদের জন্য যারা তাকে হত্যা করেছে—যারা তাকে ভুল ঠিকানার দিকে প্রেরণ করেছে*—করুণা জাগে তাদের জন্য যারা পেট চিরেছে, হত্যার কারণ গোপন করেছে’ ইত্যাদি সংলাপ থেকে সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে নাট্যকার কোন বিষয়কে ইঙ্গিত করেছেন। সেলিম আল দীন নিজেই নাটকের কথাপুচ্ছে সে-দায় নিয়ে বলেছেন, ‘রাজনৈতিক অভিপ্রায় নাটকের শরীরে নেই—শিরায় হয়ত আছে। আমি ঠিক নিশ্চিত নই—সমাজমনস্ক রাজনীতিপিপাসু পাঠক নাড়ি ধরে পাবেন কিনা তেমন উদ্বেলিত স্পন্দন তাদের নিজ নিজ ঘড়ি মিলিয়ে। না পেলে আমার অস্বস্তি নেই এই জন্য যে সমকালীন রাজনৈতিক আবেগ তাতে তড়িৎ ক্রিয়া করে না—আমি যদ্দুর জানি আমার কবিস্বভাব।’

নাটকের আখ্যানভাগটা কী? এলংজানি নামে একটি গঞ্জ। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে কাকেশ্বরী নদী। গঞ্জের হাসপাতালে এক যুবকের লাশ পড়ে আছে। লাশটি পৌঁছে দেবার কোনো লোক নেই। বৈশাখের ভোরে একটি গরুর গাড়িতে জোর করে হাসপাতালের ডাক্তার পঞ্চাশ টাকা ভাড়ায় লাশটি তুলে দেয় গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য। পঞ্চাশ টাকার বিনিময়ে বাহের গাড়োয়ান ও সঙ্গীরা সারাদিন গাড়ি চালাতে থাকে। কিন্তু লাশের সাথে যে ঠিকানা দেওয়া হয় তাতে গাঁয়ের নাম খানিকটা মিললেও প্রকৃত ঠিকানা পায় না। বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু কোনো গাঁয়ের কেউ লাশটির দায়িত্বও নিতে চায় না। নয়ানপুর গ্রামের লাশটি নিয়ে উপস্থিত হলেও স্কুলের হেডমাস্টার নবীনপুরের বলে সন্দেহ হয়ে। শুরু হয় নবীনপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা। এভাবে যেন এক অজানা গন্তব্য তাদের। পথিমধ্যে লড়াকু ষাঁড়দ্বয়ও আহত হয়। অপরিচিত এক বাজারে ভাত রেঁধে খায় গাড়োয়ান ও তার সঙ্গী। দীর্ঘ সময় কাটতে থাকে তাদের। লাশটিকে যখন কেউ গ্রহণ করছে না তখন লাশটির প্রতি প্রচণ্ড মায়া জন্মে বাহের গাড়োয়ানের। লাশটি তাদের সাথে থাকতে থাকতে একসময় যেন তাদেরই সঙ্গী হয়ে ওঠে। কোথায় কোনো ঠিকানায় পৌঁছাতে না পেরে অবশেষে এক শীর্ণ নদীর বালুচরে নিজেরাই কবর খুঁড়ে জানাজা পড়ে লাশটিকে দাফন করে। বেনামি একটি মৃতদেহকে তার পরিজনের কাছে পৌঁছানোর আবর্তনের যে মানবিকযাত্রা সেটিই নাটকের মূল আখ্যানভাগ।

শিল্পনন্দনে বাঙালি সৌন্দর্যভাবনা চিরকালই ছিল স্বতন্ত্র। রচনারীতির দিক থেকে নাট্যকার হাজার বছরের বাঙলার যে রচনারীতি তাকেই গ্রহণ করেছেন। হাজার বছরের এ বাঙলা ভূখণ্ডের সাহিত্য-শিল্প ছিল কাব্যধারার। ঘটনা বা বিষয়ের প্রবাহের উপর ভিত্তি করে এগুলোর শরীর বিভিন্নভাবে বিভাজিত থাকত। মুখ, পদ, বোলাম, তরঙ্গ, লম্বক, প্রবাহ প্রভৃতি নানা নামে সেগুলো পরিচিত ছিল। প্রতিটি বিষয়পর্বের আবার শিরোনাম যুক্ত হতো। আজকের বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক অঞ্চলে যে পালা বা জারিগুলো তৈরি হচ্ছে সেগুলোর রচনারীতিতেও এরূপ বিষয় বা ঘটনের বিভাজনীয় শিরোনাম দেখতে পাওয়া যায়। টাঙ্গাইল জেলার ‘বেহুলার ভাসান’, খুলনা জেলার ‘রয়ানী’, কুষ্টিয়ার ‘পদ্মার নাচন’, কিংবা বরিশালের ‘পদ্মপুরাণ গান’ প্রভৃতি উপস্থাপনেও তারা ঘটনার শিরোনামকেন্দ্রিক পরিবেশন করে থাকে। সেলিম আল দীনের নূর হোসেনকে নিয়ে যে মানবিক অভিঘাত সেটা যদি জামশা গ্রামের জান্নাতবাসী অমর গায়ক হাকিম আলী বয়াতী পরিবেশন করতেন তাহলে রূপটা কেমন হতো সেই নিরিখেই রচনা করেছেন। নিজেকেই বয়াতী বা গায়েনের সঙ্গে সাদৃশ্যমণ্ডিত ভেবেছেন। বাঙলার মধ্যযুগে কথায় কথায় বা কথার অনুশাসনে নাট্য পরিবেশনা রীতি বিদ্যমান ছিল। নাট্যকার এটিকে কথানাট্য হিসেবে অভিহিত করতে চেয়েছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক পর্যায়ে সিংহভাগ নাট্যরচনারীতি ইউরোপীয় স্টাইলের। ১৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ভাষা শেখার প্রেক্ষিতে ‘ডিসগাইস’, ‘লাভ ইজ দ্য বেস্ট ডক্টর’ অনুবাদ করে পরে মঞ্চস্থ করা হয়। এ নাটকগুলো ছিল সংলাপ-নির্ভর। এসময় ইউরোপীয় শাসনের কারণে ব্যাপকভাবে ইউরোপীয় ধারার নাট্যরীতির প্রচলন শুরু হয়। সে-নাটক বা থিয়েটারগুলো ছিল সংলাপ-নির্ভর, দ্বন্দ্বমুখর ও স্থান-কালের ঐক্যভিত্তিক। ফলশ্রুতিতে বাংলা ভাষায় রচিত হলেও তা ছিল ইউরোপীয় তত্ত্বভিত্তিক। সেলিম আল দীন এ রচনায় সে-ইউরোপীয় ধারাকে ভেঙে দিলেন। রচনায় নিয়ে এসেছেন আবহমান বাঙলার রচনারীতি। এমনকি ইউরোপীয় গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটকের বিভাজনকে উপেক্ষা করছেন। সেলিম আল দীন বলেন—‘চাকাকে কেউ যদি কাব্য বলেন আপত্তি করব না—গল্প বললে অখুশী হব না। আমি সব সময় চেয়েছি আমার লেখা নাটকগুলো নাটকের বন্ধন ভেঙে অন্য সব শিল্পতীর্থগামী হোক। কারণ শিল্পে আমি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী। তবুও সংস্কৃত কথাসরিৎসাগর-এর রীতিটাকে ধ্রুপদী জ্ঞানে এর গল্পবিভাজনরীতি মেনে চলেছি। কথাসরিৎসাগরের কথামুখ বা কথাপীঠ এবং লম্বক ও তরঙ্গ বিভাগ চাকাতে মেনে চলেছি। এর লক্ষ্য আধুনিক কথানাট্যের একটি নৈয়ায়িক ভিত্তি গড়ে তোলা।’ [কথাপুচ্ছ, চাকা

বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতি স্বতন্ত্র। পরিচয়হীন একটি লাশকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস ও সংস্কার যেন বাঙালির চিরদিনের বোধ-ধারণাকেই তুলে ধরে। জীবন্ত মানুষ, মৃত মানুষ কিংবা প্রাণী যে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ তা অত্যন্ত স্পষ্ট করে তোলে। গ্রামীণ নানা আচার-আচরণ এতে প্রস্ফুটিত। বস্তুগত বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে। গ্রামীণ পুঁথিপাঠ, পটচিত্র এবং আবহমান কাল ধরে বহমান গ্রামীণ খেলা কিংবা ষাঁড়ের লড়াই এখানে লক্ষ করা যায়। বাঙালি জীবনের প্রচলিত কিংবদন্তি, মন্ত্র বা গাঁথাও এ নাটকে অবিচ্ছেদ্য। কথোপকথনে বাঙালি সমাজের ঐতিহ্যবাহী নানা প্রথা বা রীতির প্রসঙ্গ এসেছে। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে গালাগাল, বিরক্তি নানা বিষয়ে ঐতিহ্য-সংশ্লিষ্টতাই লক্ষণীয়। ইউরোপীয় সংলাপ রচনার মতো কোলন নেই এ নাটকে। নাটকটির মধ্যে বর্ণনা-উক্তি-প্রত্যুক্তি মিলে প্রায় একাকার। নাটকে বাড়ির বর্ণনা, বিয়ের অনুষ্ঠান, বাজারে কামারে টঙ, মোষের গাড়ি, ডেকচি, পাতিল, দা, খন্তা, চিড়া, মুড়ি, গুড় ইত্যাদি বাঙালি সংস্কৃতিকেই বিশ্বসংস্কৃতিতে স্বতন্ত্র পরিচয়ে উপস্থাপন করে। এ নাটকের রীতিটি পাঠ ও অভিনেতা নিজের মতো অর্থবিন্যাস করতে পারেন। বাংলার সংস্কৃতিতে বহমান ধারণার ‘কবি’ স্বভাবরীতি এ ‘চাকা’ নাট্যে বিধৃত হয়।


সেলিম আল দীন রচিত এ ‘চাকা’ নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ইংরেজি অনুবাদে নামকরণ করা হয় The Wheel.


চরিত্র নির্মাণ; উক্তি-প্রত্যুক্তি রচনায় অসম্ভব জীবনঘনিষ্ঠে পৌঁছেছেন সেলিম আল দীন। বাহের গাড়োয়ান বাঙালির গ্রামীণজীবনের অনবদ্য প্রতিনিধি। বাহেরের হাতে যখন পঞ্চাশ টাকার নোট গুঁজে দেয় তখন তার নোটে ছাপা মসজিদের ছবির চেয়ে অন্য বিষয়ই মনের মধ্যে প্রবল হয়ে ওঠে। টাকার অভাবে যে খেপ ছেড়ে না দিলেও তার মধ্যে দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার অপরিসীম পরিচয় বিধৃত হয়ে উঠেছে। বাহের গাড়োয়ান গরুর গলায় ঘণ্টি বেঁধেছে। এ ঘণ্টি যেন গানের তালে তালে নাচে। বারবার মানিক পীর যেন তাকে আগলে রেখেছে। মৃত লাশটির সঙ্গে সঙ্গে যেন কারবার একটি মিল খুঁজে পায়। অলক্ষ্যেই বেদনার্ত হয়ে ওঠে। চাল ভাজা, বিচিকলা যেন এ ক্ষুধায় একমাত্র সম্বল তাদের। বাহের গাড়োয়ান যখন নয়ানপুরে পৌঁছে তখন সে বলে ওঠে—‘এই তো সামনের গাঁও নয়ানপুর এই তো আপনে নেমে যাবে* ধরমরাজ ঠাকুর মেনেছে হামরাও জানি* মানিকপীরের ষাঁড় আছে না অন্তরের খবর জানে* এই তো তুমার শরীর ঘিরে মাটি থাপড়ে থাপড়ে কানবু স্বজন পরিজন* তুমার মনের মানুষ চুল ছড়ায়ে নিছে কানবু* মরা বুলেই কি মরা। বেবাক তোম জানো বুঝ দেখ।’ নাটকের অন্যান্য চরিত্রগুলো হলো—শুকুর চান, অর্শরোগী ডাক্তার, শ্বেতীরোগী ডাক্তার, হোসেনালী, বাজার কমিটির মেম্বার, শ্রমিক, দিনমজুর প্রমুখ। বাহের গাড়োয়ান যেন বাঙালি গ্রামীণ সমাজের চিরপরিচিত একটি চরিত্র।

নাটকের ভাষা আঞ্চলিক হলেও এ সর্বজনীন অর্থই প্রকাশ করে। রূপক অর্থে নানা শব্দের ব্যবহার হয়েছে। লাশটি নিয়ে যখন নয়ানপুর পৌঁছে তখন নাট্যকার বর্ণনা করেন—‘আল্লাহর কছম মোর চাওয়াল মোক দেখবার দেও॥ সে গাড়ির পাটাতনে মাথা কুটে ঠুক ঠুক॥ হায় নিত্য দিন দূরবাসী পুত্রের জন্য তার শঙ্কা ব্যর্থ হবার নয়* ঝাপসা চোখে সে মুখ পুরো দেখে না বলে মৃতের মুখ হাতড়ায় হা সোনা হা সানা এমান ঠ্যান্ডা ক্যা তোরশরীল।। দূরে সমবেত নারীগণ আরও দ্বিগুণ স্বরে শোক উদ্গিরণ করে॥ কিন্তু ততক্ষণে হেডমাস্টার গম্ভীর কণ্ঠে বলেন* না এ তোর ছেলে না সোনাফরের মা ॥ বৃদ্ধা চীৎকার করে হামাকে মিছা কথা দিয়ে ভুলাতে চাস* এই তো সোনাফর আ হা হা ॥ হেডমাস্টার আরও উচ্চকণ্ঠে বলেন* বুইলেছিত এ তোর ছাওয়াল না এই নয়ানপুরের এরে দেখিনিক কুনোদিন।’ [দ্বিতীয় তরঙ্গ

গ্রামীণ জীবন ও সংস্কৃতির নানা বিশ্বাসগুলো নাটকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। বাঙালি জীবনে অভেদাত্মক জীবনবিশ্বাস এ নাটকের পরতে পরতে। নাট্যকার নাটকের শুরুতেই বলেন—‘সাঁওতাল দেবতা ধরম করম এক সাক্ষী* মানিক পীরের সুউচ্চ কুঁদাল এবং ধবল ষণ্ডদ্বয় এই উপকথার সাক্ষী* কথার বর্ণিত শব এই ষণ্ডদ্বয় যোজন যোজন পথ বয়ে নিয়ে গিয়েছিল।’ মানিক পীরের যেন দুটি ষাঁড়। গ্রামীণ জীবনের এ এক প্রচলিত রীতি। সব প্রাণীই অভেদাত্মক। নাট্যকার ধর্ম ও ইতিহাসের নানা ঘটনার বর্ণনার সাথে সাথে চরিত্রের ঘটনার ব্যাখ্যা করেছেন। কাব্যিক অলংকারে অনবদ্য হয়ে উঠেছে বর্ণনার পর বর্ণনা। বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নানা আচার-আচরণকে সেলিম আল দীন তুলে ধরেছেন ভাষার নিপুঁণ গাঁথুনিতে। গ্রামীণ সংস্কৃতির একটি দৃশ্য—‘ইঁদারা দেখে খয়ের গাছের ছায়ায় ওরা দুপুরের খাবার খেতে বসে* দূরে বিঠা গাছের ছায়ায় লাশটি* ষাঁড়দ্বয় ঘাস খেতে থাকে॥ ওরা তিনজন এবং ধরমরাজ আলাদা* ধরমরাজ মুড়ি আর চানাচুর খায় আবার সঞ্জীবনীতেও চুমুক দেয়* বাহের চালভাজা গুঁড়ো আর বিচা-কলা বের করে* পঞ্চাশ টাকা আয় হয়েছে বলে সে পরম উদারতায় সঙ্গী দুজনকে দুটো কলা দান করে॥ শুকুর চান পায়রার ছাতুর ভাগ দেয় সঙ্গীদ্বয়কে এবং করুণ চাউনির কুত্তিটিকেও ॥’ বর্ণনা ও সংলাপে আবহমান বাঙালির গ্রামীণ সংস্কৃতির সাথে সাথে ফুটে উঠেছে নানা প্রথা, নানা রীতি, পরিবহন ব্যবস্থা এবং গ্রামীণ নানা প্রযুক্তির রূপ। নানা উৎসব প্রসঙ্গ, চিকিৎসারীতি, খেলাধুলা ও ধর্মীয় বোধবিশ্বাস অনবদ্যভাবে প্রকাশিত। গ্রামীণ সংস্কৃতির যেন আন্তর্জাতিকতা।

সেলিম আল দীন রচিত এ ‘চাকা’ নাটকটির প্রথম মঞ্চায়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ইংরেজি অনুবাদে নামকরণ করা হয় The Wheel। সৈয়দ জামিল আহমেদ নাটকটির ইংরেজি অনুবাদ করেন। এন্টিয়ক থিয়েটার ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাসে নাটকটি প্রথম মঞ্চায়ন করে। নাটকটি নির্দেশনা দেন সৈয়দ জামিল আহমেদ এবং ডেনি প্যারিজ (Denny Pariridge)। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি থিয়েটার দল ব্রেসার থিয়েটার The Wheel নাটকটি প্রযোজনা করে। বাংলাদেশে নাটকটি প্রথম প্রযোজনা করে ঢাকা থিয়েটার। নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। গ্রুপ থিয়েটারের তথ্যানুসারে এ চাকা নাটকটির ৩৭টি প্রদর্শনী হয়। নির্দেশক একই সাথে মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনা করেছেন। সুর ও সংগীত পরিকল্পনা করেছিলেন শিমূল ইউসুফ, পোশাক পরিকল্পনায় ছিলেন রাশেদুল হুদা। নাটকের কথকের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন শিমূল ইউসুফ। এ ছাড়াও নানা চরিত্রে, এমনকি লাশ চরিত্রটিতেও তিনি অভিনয় করেছেন। বাহের গাড়োয়ান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। অন্য চরিত্রগুলোয় অভিনয় করেছিলেন কৌশিক সাহা, সাইফুদ্দিন আহমেদ দুলাল, নাসরিন জাহান, কামাল বায়েজীদ, শতদল বড়ুয়া বিলু, মিলু চৌধুরী, রোজী সিদ্দিকী, কুমকুম হাসান, এশা ইউসুফ প্রমুখ। নির্দেশক নাটকটি উপস্থাপনার ক্ষেত্রে আবহমান বাঙলার রূপ-রীতি নানা সাজেশনে প্রকাশ করেন। মঞ্চে গাড়ির চাকার সিম্বলসহ নানা উপকরণ ব্যবহার করেন। ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনা সুভিন্যিরে সেলিম আল দীন বলেন, আমি কথার শাসনে নাটক রচনা করেছি তাই এর নাম দিয়েছি কথানাট্য। একে কথকতাও বলা যায়। কিন্তু কথকতা অভিনয়রীতির নাম—নাট্যরীতির নাম নয়। উপরন্তু কথকতা বললে কথানাট্যের দাবি পূরণ হয় না। রামায়ণও কথকতা, কিন্তু আসরে লোকগল্প বলার রীতিটাকে আমরা কেউ কথকতা বলি না। কারণ, যারা পুরাণ কিংবা লোককথাগুলো পরিবেশন করেন তারা একে শাস্ত্র বা হাস্তর বলে থাকেন। গৃহাঙ্গণে কথক যে কিসসা বলেন, দোহারদের সঙ্গে এ নাটকের আঙ্গিক পরিকল্পনায় সে রীতির শিক্ষাটি সক্রিয় ছিল।’

২০০৬ সালে ভারতে দিল্লিস্থ ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা ‘চাকা’ নাটকটি প্রযোজনা করেন। শেষ বর্ষের শিক্ষার্থীদের শিখন কার্যক্রম হিসেবে নাটকটি প্রযোজিত হয়। নাটকটি হিন্দিতে অনুবাদ করেন ভি কে শর্মা। নির্দেশনায় ছিলেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ স্নাতকোত্তর শ্রেণির শেষ পর্বের শিক্ষার্থী শিখন কার্যক্রম হিসেবে প্রযোজনা করে ‘চাকা’ নাটক। নাটকটির নির্দেশনা দেন বিভাগীয় শিক্ষক সুদীপ চক্রবর্তী। চারদিকের দর্শকবেষ্টিত মধ্যমঞ্চে নাটকটি উপস্থাপিত হয়। খড় ছড়ানো গোলাকৃতির মঞ্চ। মঞ্চের দুপাশে প্রায় হাত খানেক উঁচু প্ল্যাটফর্ম। নাটকের কথকের বর্ণনার সাথে সাথে গ্রামে যেমন তৈল তৈরি করা ঘানি টানা হয় তেমনি ঘুরে ঘুরে বর্ণনা হতে থাকে। ঘটনার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝেই অভিনেতারা উঠে আসে। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত তেল ভাঙার ঘানির মতোই বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে মাঝখানে। বর্ণনা এবং অভিনয় অদ্বৈত সুরে অনবদ্য হয়ে ওঠে। নানা চরিত্রে অভিনয় করেন মাহজাবীন ইসলাম, সুশান্ত কুমার সরকার, খান মো. রফিকুল ইসলাম, নুসরাত শারমিন, মেহেদী তানজির, লাবণী আকতার ও সৈয়দা ইফাত আরা প্রমুখ।


‘চাকা’ মূলত একটি পাঠ—যা আমাদেরকে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে ব্যাপ্ত করে।


সাভারের বুনন থিয়েটার নিয়মিত পরিবেশন করে যাচ্ছে সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটক। বুনন থিয়েটারের এ চাকা নাটক নির্দেশনা দিয়েছেন আনন জামান। প্রসেনিয়াম মঞ্চে উপস্থাপিত হলেও নাটকটি আবহমান বাঙলার বর্ণনাত্মক রীতির। বর্ণনার সাথে অভিনয়ে অনবদ্য উপস্থাপন। নানা প্রতীকী বিন্যাসে মঞ্চসজ্জা। নৃত্য-গীত, বর্ণনা ও চরিত্রাভিনয়ে নাটকটি উপস্থাপিত। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ শিক্ষার্থী প্রযোজনা হিসেবে সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটকটি প্রযোজনা করে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ তাদের শিখন কার্যক্রমে এ নাটকটি পাঠ্য রেখেছে। ঢাকার বাইরে নাটোরের ইঙ্গিত থিয়েটারের ‘চাকা’ প্রযোজনাটি অত্যন্ত আলোচিত। এ দলের এ নাটকটির নির্দেশনা দেন জুয়েল কবির।

‘চাকা’ মূলত একটি পাঠ—যা আমাদেরকে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানে ব্যাপ্ত করে। হাজার বছরের বাঙলার ধারা-রীতি-পদ্ধতিকে আত্মপরিচয়ের মর্যাদায় অনুপ্রবিষ্ট হতে উদ্যোগী করে তোলে। বাঙালি হাজার বছরের গৌরবান্বিত সংস্কৃতিসমৃদ্ধ জাতি হলেও উপনিবেশের জ্ঞানতত্ত্বের বিপরীতে ঐতিহ্য-বিকাশের ধারায় দাঁড়াতে পারে নি এখনো। ‘চাকা’ নাট্যের মাধ্যমেই আমরা উপনিবেশ বিযুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় এগুতে পারি। এ নাটকটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় হাজার বছরের বাঙালির ঐতিহ্য ও রীতি। সেলিম আল দীন যেন ফ্রান্স ফ্যানন, নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গা, তালাত আসাদ, হোমি কে ভাবা, গায়ত্রী স্পিভাক প্রভৃতিজনের মতোই জাতীয় জাগরণমুখী তাত্ত্বিক। সেলিম আল দীন এগিয়েছেন সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণে। ‘চাকা’ নাটকের মাধ্যমেই সেলিম আল দীনের শুরু হয়েছিল বাঙালির স্বকীয়তার অন্বেষণ। এবং নাটকে বাঙালির জাগরণ। তার পরবর্তী নাটকগুলোও বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশেই নানা নিরীক্ষাধর্মী উদ্যোগী ভূমিকা পালন করে। সেলিম আল দীন শুধু নাট্যকারের পরিচয়েই সীমাবদ্ধ নন; তিনি একটি প্রপঞ্চ। ‘সেলিম আল দীন শিক্ষা’র মাধ্যমেই বাঙালি বিশ্বে দাঁড়াতে পারে আত্মপরিচয়ের গৌরবে।

আবু সাঈদ তুলু

আবু সাঈদ তুলু

জন্ম ১ মার্চ, ১৯৭৯; জামালপুর । তিনি শৈশব থেকেই সাহিত্য-শিল্পের প্রতি অনুরাগী।...বিস্তারিত